জাতীয়

নতুন বছরে বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে কী হতে পারে

সানজানা চৌধুরী

ঢাকা, ০১ জানুয়ারি – অনেকটা নিশ্চিতভাবেই বলা যায়, আগামী বছর রাজনীতিতে সবচেয়ে আলোচিত বিষয় থাকবে জাতীয় নির্বাচন এবং রাজনৈতিক দলগুলোর কার্যক্রম থাকবে সেটিকে কেন্দ্র করেই।

বাংলাদেশের দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনের বাকি এক বছরের কিছু বেশি সময়। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ এখন নিজেদের অবস্থান পুনরায় পাকাপোক্ত করতে এবং বিএনপি পনেরো বছরের খরা কাটাতে মরিয়া।

গত বছর দেশব্যাপী গণ-সমাবেশ, গণ-মিছিলের মতো নানা কর্মসূচির মাধ্যমে নিজেদের দাবি দায়ের আন্দোলন চালিয়েছেে বিএনপি।

আওয়ামী লীগ চেষ্টা করছে ইমেজ সংকট কাটাতে।

দুই দলের পাল্টাপাল্টি অবস্থান উত্তাপ ছড়িয়ে যাচ্ছে রাজনীতির মাঠে।

নতুন বছরে বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে কী হতে পারে, সেটাই এখন প্রশ্ন।

আন্দোলনের মাধ্যমে রাজনীতির মাঠ উত্তপ্ত রেখেছে বিএনপি।

খন্দকার মোশাররফ

বিএনপির চ্যালেঞ্জ
বিএনপির সামনে প্রধান দুই সংকট হল পনেরো বছর ধরে ক্ষমতার বাইরে থাকা এবং দলের শীর্ষ দুই নেতার মামলায় সাজাপ্রাপ্ত হওয়া।

এমন অবস্থাতেও দল যথেষ্ট সংগঠিত এবং নির্দলীয় সরকারের দাবিতে আন্দোলন চলবে বলে জানিয়েছেন দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য খন্দকার মোশাররফ হোসেন।

দলীয় কর্মসূচিতে তারা একটি বিষয় স্পষ্ট করেছে যে তারা শেখ হাসিনার সরকারের অধীনে কোন নির্বাচনে আর যাবে না।

সরকারের পদত্যাগ, নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন, সংসদ বিলুপ্তির দাবিতে দলটি আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছে।

“আমাদের এতো নেতাকে গ্রেফতার করা হয়েছে, এতো বাধাবিপত্তি তারপরও কি সমাবেশে আমাদের লোক কম হয়েছে?” প্রশ্ন করেন মি. হোসেন।

”আমরা স্মরনকালের সবচেয়ে বড় গণ-মিছিল করেছি, একজন নেতা থাকবেন না তাতে কি হয়েছে? দল সংগঠিত, যেকোনো প্রোগ্রাম করার মতো ক্ষমতা দলের আছে,” তিনি বলেন।

পূর্ব অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা
রাজনীতি বিশ্লেষক দিলারা চৌধুরীও মনে করেন পূর্ব অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে বিএনপি এবারে আগের চাইতে সাংগঠনিকভাবে শক্ত অবস্থানে গিয়েছে।

এই ধারাবাহিকতা অব্যাহত রেখে দলটি সামনের বছর নিজেদের আরো শক্তিশালী করতে চাইবে।

মিসেস চৌধুরী জানান, বিএনপি এখন একা নয়, তাদের সঙ্গে অন্য বিরোধীদলগুলো যোগ দিয়েছে, যা তাদের অবস্থানকে আরও জোরালো করেছে।

বিএনপি এখন যে অহিংস পথ বেছে নিয়েছে একে বিএনপি কৌশলগত ভালো কাজ বলে তিনি মনে করেন।

তার মতে, বিএনপির তৃণমূল থেকে যে সাংগঠনিক শক্তির উত্থান হয়েছে সেটাকে আরও মজবুত করতে পারলে বিএনপি এখন শক্ত অবস্থানে চলে যেতে পারবে।

“বিএনপিতে যারা এখন নেতৃত্ব দিচ্ছেন তাদের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে এই আন্দোলনটিকে ধাপে ধাপে অহিংস পথে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া,” মিসেস চৌধুরী বলেন।

আওয়ামী লীগের অধীনে নির্বাচন কমিশন কতটা সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ দায়িত্ব পালন করতে পারবে— সেটি নিয়ে দেশ ও দেশের বাইরে বিভিন্ন মহলে বড় প্রশ্ন উঠেছে।

শেখ হাসিনা।

আওয়ামী লীগের চ্যালেঞ্জ
এখন আওয়ামী লীগ এবং এর সহযোগী সংগঠনগুলোও বিএনপির কর্মসূচির পাল্টা কর্মসূচি নিয়ে মাঠে নেমেছে।

“মাঠ কারও কাছে ইজারা দেয়া হয়নি। আমরা মাঠ ছেড়ে যাইনি,” প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সেপ্টেম্বরে এক সভায় এই ঘোষণা দেন।

কিন্তু মাঠে থাকা এই আওয়ামী লীগের সরকারের আমলে নির্বাচন কমিশন কতটা সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ দায়িত্ব পালন করতে পারবে— সেটি নিয়ে দেশ ও দেশের বাইরে বিভিন্ন মহলে বড় প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষ করে ভোটের পরিসংখ্যান নিয়ে সন্দেহ জেগেছে।

নির্বাচনের আগে এটি আওয়ামী লীগের জন্য একটি চ্যালেঞ্জ হিসেবে দাঁড়িয়েছে।

তবে আওয়ামী লীগের যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক মাহবুব উল আলম হানিফ বলেছেন, নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করা বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি। এতে বিচলিত হওয়ার কিছু নেই।

“বাংলাদেশে স্বাধীনতা পরবর্তীকালে যতো নির্বাচন হয়েছে প্রত্যেকটি নির্বাচনে পরাজিত দল নির্বাচনকে ঘিরে অনেক অভিযোগ উত্থাপন করেছে। সেই বিষয়টিকে বিবেচনায় আনলে নির্বাচন একেবারে অভিযোগমুক্ত করা খুব কঠিন,”তিনি বলেন।

“একটি রাজনৈতিক দল যদি মনে করে তাদের জয় লাভের কোন সম্ভাবনা নাই তখন তারা টার্গেট করে নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। সেটা তারা করতেই পারে। এতে বিচলিত হওয়ার কিছু নেই” তিনি বলেন।

তবে বিগত দুই নির্বাচনের পর আওয়ামী লীগের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে, নিজেদের কাজ ও আচরণ দিয়ে মানুষের মনে আস্থা এবং বিশ্বাসযোগ্যতা গড়ে তোলা- এমনটাই মনে করছেন রাজনীতি বিশ্লেষক শান্তনু মজুমদার।

পাশাপাশি দলটির নেতাকর্মীদের সাংগঠনিক শৃঙ্খলার মধ্যে রাখা, বিশেষ করে অঙ্গ সংগঠনগুলোর ‘বেপরোয়া’ আচরণ কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা।

সেই সাথে ভিন্নমতের প্রতি সহনশীলতার মাধ্যমে দলীয় ভাবমূর্তি মজবুত করাও বেশ গুরুত্বপূর্ণ বলে তিনি মনে করেন।

তার মতে, মাঠ পর্যায়ে স্থানীয় আওয়ামী লীগের কারো কারো ক্ষেত্রে ইমেজের একটা বড় সংকট রয়েছে। বিশেষ করে তৃণমূল পর্যায়ে দুর্নীতির যে অভিযোগগুলো শোনা যায়।

আগামী এক বছরের মধ্যে এই ইমেজের সংকট অতিক্রম করাই দলের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ বলে তিনি মনে করছেন।

দ্বিতীয় চ্যালেঞ্জ হিসেবে তিনি বলছেন, বিরোধী দলের সাথে শ্রদ্ধাশীল আলোচনার মাধ্যমে আওয়ামী লীগ হয়তো তাদের ইমেজ ঠিক হতে পারে।

সংঘাত

যেহেতু ক্ষমতাসীন দলকে মানবাধিকার, সুষ্ঠু নির্বাচন এমন একাধিক প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হবে। তার সদুত্তর ঠিক করতে দলের যথাযথ প্রস্তুতির প্রয়োজন বলে তিনি মনে করেন।

তবে সরকারের কৌশল দেখে তিনি বুঝতে পারছেন না যে তারা কিভাবে বিষয়টি মোকাবিলা করবে।

সংবিধান অনুযায়ী আগামী দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন হবে ২০২৪ সালের ৩০ জানুয়ারির পূর্ববর্তী ৯০ দিনের মধ্যে।

সে অনুযায়ী ভোটের বাকি এখনও এক বছরের কিছু বেশি সময়।

এই নির্বাচন কীভাবে হবে, কারা অংশ নেবে এনিয়ে প্রশ্ন রয়েছে সাধারণ মানুষদের।

সব বিশ্লেষণই ইঙ্গিত দিচ্ছে যে ২০২৩ সাল বাংলাদেশের রাজনীতির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বছরই হতে চলেছে।

সূত্র: বিবিসি
এম ইউ/০১ জানুয়ারি ২০২৩

Back to top button