জাতীয়

বছর জুড়ে বিএনপির ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা

আকরাম হোসেন

ঢাকা, ৩১ ডিসেম্বর – বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপি। প্রায় ১৬ বছর টানা ক্ষমতার বাইরে। দলটি সৃষ্টির পর থেকে সবচেয়ে বেশি সময় ধরে ক্ষমতার স্বাদ বঞ্চিত। দলীয় সরকারের অধীনে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন বর্জন করে সরকার পতন আন্দোলনে নামে দলটি। তবে আন্দোলনে বার্থ হয়ে কোণঠাসা হয়ে পড়ে। অবশ্য বিগত ২০২২ সাল রাজনীতিতে নানা ঘটনার জন্ম দিয়েছে। চেষ্টা করছে ঘুরে দাঁড়ানোর। চেষ্টা সফলও হয়েছে। চলতি বছরে ‘নিষ্ক্রিয়’ দলকে চাঙা করেছে বিএনপি।

উঠোন-বৈঠক, মানববন্ধন, বিক্ষোভ, সমাবেশে, সংবাদ সম্মেলন, টকশো এবং সোশ্যাল মিডিয়ার ব্যাপক প্রচারণা চালায় দলটি। এর পাশাপাশি বড় আকারের তিনটি সিরিজ কর্মসূচি পালন করেছে। এসব কর্মসূচির মধ্যে খালেদা জিয়ার মুক্তি, নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচনসহ বেশ কিছু দাবি থাকলেও মূলত সরকার পতনের লক্ষ্যেই ভেতরে ভেতরে কাজ করে বিএনপি।

চাঙা তৃণমূল

২০১৪ সালে নির্বাচন বর্জন ও ২০১৮ সালের নির্বাচনে হেরে যাওয়ায় বিএনপি নেতাকর্মীদের মনোবলও ভেঙে যায়। মাঠেও তেমন একটা দেখা যায়নি দলটিকে। নেতাকর্মীরা ‘নিষ্ক্রিয়’ হয়ে পড়েন। এ সময় নানা কর্মসূচি দিলেও কোনোটাই জমাতে পারেনি। চলতি বছরের শুরু থেকে তৃণমূল নেতাকর্মীদের চাঙা করতে বিভিন্ন কৌশল বাস্তবায়নের চেষ্টা করেন দলটির কেন্দ্রীয় নেতারা। এতে সুফলও পেয়েছেন। বিএনপির তৃণমূল এখন রাজপথে সরব।

চিকিৎসার জন্য খালেদা জিয়াকে বিদেশ পাঠানো ও মুক্তির দাবি

দুর্নীতি মামলায় দীর্ঘদিন কারাগারে থাকার পর ২০২০ সালে করোনার প্রকোপের মধ্যে সরকারের নির্বাহী আদেশে মুক্তি পান খালেদা জিয়া। মুক্তি পেলেও শর্ত থাকায় দলীয় কোনো কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ করতে পারছেন না তিনি। এমন অবস্থায় খালেদা জিয়ার স্থায়ী মুক্তি ও বিদেশে সুচিকিৎসার দাবি জানায় বিএনপি। এই দাবিতে বারবার রাজপথে নামার ঘোষণা দিলেও কার্যকর কোনো আন্দোলন গড়ে তুলতে পারেনি দলটি। চলতি বছরেও পরিবারের পক্ষ থেকে খালেদা জিয়ার সুচিকিৎসার জন্য তাকে বিদেশে পাঠাতে সরকারের কাছে বারবার আবেদন করা হয়। তাতে ফল আসেনি।

২০ দলীয় জোট বিলুপ্ত

বিএনপির নেতৃত্বে ২০১২ সালে চারদলীয় জোটের সম্প্রসারণ ঘটিয়ে ১৮ দল এবং পরে পর্যায়ক্রমে আরও কয়েকটি দল নিয়ে ২০ দলীয় জোট গঠিত হয়। ডানপন্থী ও মধ্য-ডানপন্থী দলগুলোর সমন্বয়ে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকারবিরোধী এ জোট গড়ে উঠেছিল। তবে আলোচনার মাধ্যমে চলতি বছরের শেষে এসে জোট বিলুপ্ত করা হয়েছে। যদিও অনুষ্ঠানিক কোনো ঘোষণা দেয়া হয়নি। তবে গত ৮ ডিসেম্বর মির্জা ফখরুল বলেন, আমাদের কোনো জোট নেই।

যুগপৎ আন্দোলন

সরকারের পদত্যাগ, বর্তমান সংসদ ভেঙে দেয়া, নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীন জাতীয় সংসদ নির্বাচন, কারাবন্দী নেতাদের মুক্তিসহ ১০ দফা দাবিতে যুগপৎ আন্দোলন শুরু করেছে বিএনপি। ৩৩টি দল বিএনপির যুগপৎ আন্দোলনে যোগ দিয়েছে। গত ২৪ ডিসেম্বর মাঠে গড়ায় যুগপৎ আন্দোলন। ৩০ ডিসেম্বর গণমিছিলের মধ্যে দিয়ে ঢাকায় যুগপৎ আন্দোলন শুরু করে তারা। যুগপৎ আন্দোলন সমন্বয় করতে ৭ সদস্যের লিয়াজোঁ কমিটি গঠন করেছে বিএনপি। যুগপৎ আন্দোলনে রয়েছে গণতন্ত্র মঞ্চ, ১২ দলীয় জোট, সাত দলীয় জোট। এছাড়াও রয়েছে জামায়াতে ইসলামী ও লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি।

৬ সংসদ সদস্যদের পদত্যাগ

একাদশ সংসদ নির্বাচনে বিএনপি জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের ব্যানারে অংশ নিয়ে নির্বাচনে ছয়জন বিজয়ী হন। পরে সংরক্ষিত নারী আসনের একটি পায় দলটি। দ্বাদশ সংসদ নির্বাচন ঘনিয়ে আসায় ১০ ডিসেম্বর ঢাকায় বিএনপির গণসমাবেশ থেকে পদত্যাগের ঘোষণা দেন বিএনপির সংসদ সদস্যরা।

আন্দোলনে নিহত ৭

দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি ও জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রতিবাদে জনসম্পৃক্ত একাধিক ইস্যু নিয়ে মাঠে নামে বিএনপি। দেশব্যাপী কর্মসূচি পালন করতে গিয়ে পুলিশের গুলিতে ভোলায় আবদুর রহিম নামে স্বেচ্ছাসেবক দলের কর্মী নিহত হন। এরপরই জনসম্পৃক্ত ও নেতাকর্মীদের হত্যার প্রতিবাদে বিক্ষোভ সমাবেশ ও মিছিল করে দলটি। কর্মসূচি পালন করতে গিয়ে পুলিশের গুলিতে নিহত হন নারায়ণগঞ্জে যুবদল কর্মী শাওন প্রধান, ভোলা জেলা ছাত্রদল সভাপতি নূর আলম, মুন্সীগঞ্জে শহীদুল ইসলাম শাওন, ব্রাক্ষণবাড়িয়া ছাত্রদল নেতা রফিকুল ইসলাম নয়ন, ঢাকায় মকবুল হোসেন নামের স্বেচ্ছাসেবক দলের কর্মী এবং সর্বশেষ পঞ্চগড়ে বিএনপি নেতা আবদুর রশিদ আরেফিন (৫০)।

এছাড়াও যশোরে বিএনপি নেতা আবদুল আলিম ও সিলেটে জেলা বিএনপির স্বাস্থ্যবিষয়ক সম্পাদক আ ফ ম কামাল আওয়ামী সন্ত্রাসীদের হামলায় নিহত হয়েছেন বলে অভিযোগ দলটির।

বিভাগীয় সমাবেশ

নেতাকর্মীদের চাঙা করে গত ১২ অক্টোবর চট্টগ্রাম থেকে বিভাগীয় সমাবেশে শুরু করে বিএনপি। দলটির বিগত রাজনৈতিক কর্মসূচিগুলোর তুলনায় যা ব্যতিক্রম ছিল। এরপর যথাক্রমে গত ২২ অক্টোবর খুলনা, ২৯ অক্টোবর রংপুর, ৫ নভেম্বর বরিশাল, ১২ নভেম্বর ফরিদপুর, ১৯ নভেম্বর সিলেট, ২৬ নভেম্বর কুমিল্লায় ও ৩ ডিসেম্বর রাজশাহীতে গণসমাবেশ করে বিএনপি।

আলোচিত ১০ ডিসেম্বর

১০ ডিসেম্বর ঢাকার মহাসমাবেশ ঘিরে ব্যাপক উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। বিশেষ করে ঢাকায় সমাবেশের প্রায় দেড় মাস আগে দলটির নেতা আমানউল্লাহ আমানের এক বক্তব্যে রাজনৈতিক অঙ্গনে উত্তাপ ছড়িয়ে পড়ে। আমান বলেন, ১০ ডিসেম্বর থেকে দেশ চলবে খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের নির্দেশে। ঢাকায় বিএনপির সমাবেশের ভেন্যু নিয়ে সরকার ও বিএনপির মধ্যে উত্তেজনা তৈরি হয়। এ নিয়ে বিতর্ক ও আলোচনার মধ্যেই গত ৭ ডিসেম্বর বিএনপি নেতাকর্মীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এতে একজনের মৃত্যু এবং অনেকেই আহত হন।

রাষ্ট্র মেরামতে ২৭ দফার রূপরেখা

রাষ্ট্রকাঠামো মেরামতে ১৯ ডিসেম্বর ২৭ রূপরেখা ঘোষণা করে বিএনপি। এতে ‘সংবিধান সংস্কার কমিশন’ গঠন করে বর্তমান ‘অবৈধ আওয়ামী লীগ’ সরকারের গৃহীত সব অযৌক্তিক, বিতর্কিত ও অগণতান্ত্রিক সাংবিধানিক সংশোধনী ও পরিবর্তনসমূহ রহিত ও সংশোধন করা, নির্বাচনকালীন দলনিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা প্রবর্তন, রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিসভার নির্বাহী ক্ষমতায় ভারসাম্য আনাসহ নানা বিষয় তুলে ধরা হয়।

বিএনপি থেকে বহিস্কার

দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে সিটি করপোরেশন নির্বাচনে অংশ নেয়া কুমিল্লার মেয়র মনিরুল ইসলাম সাক্কু, খুলনার নজরুল ইসলাম মঞ্জু, নারায়ণগঞ্জের তৈমুর আলম খন্দকারসহ একাধিক নেতাকে শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে বহিষ্কার করে বিএনপি।

সূত্র: বাংলাদেশ জার্নাল
আইএ/ ৩১ ডিসেম্বর ২০২২

Back to top button