জাতীয়

মার্কিন নিষেধাজ্ঞা: ‘ক্রসফায়ার’ কমেছে শতকরা ৯৪ ভাগ

ঢাকা, ৩১ ডিসেম্বর – গত বছরের ডিসেম্বরে মার্কিন নিষেধাজ্ঞার পর এক বছরে বাংলাদেশে ‘ক্রসফায়ারের’ ঘটনা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে৷ চলতি বছরের ১২ মাসে তিনটি ক্রসফয়ারের ঘটনা ঘটেছে বলে মানবাধিকার সংগঠনের প্রতিবেদন থেকে জানা যায়৷

এর আগের বছর ২০২১ সালে ‘ক্রসফায়ার’ বা ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হন ৫১ জন৷ চলতি বছরের সঙ্গে গত বছরের তুলনা করলে ‘ক্রসফায়ার’ বা ‘বন্দুকযুদ্ধে’র ঘটনা শতকরা ৯৪ ভাগ কমে গেছে৷

অবশ্য চলতি বছরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হেফাজতে মোট ১৮ জন মারা গেছেন৷ ‘ক্রসফায়ার’ এর তিনজন বাদে বাকি ১৫ জন নির্যাতনসহ আরো কয়েকটি কারণে মারা গেছে বলে মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) জানায়৷ আর যারা মারা গেছেন তারা সবাই র‌্যাবের সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হয়েছেন বলে জনানো হয়েছে৷

এই তিনজনের মধ্যে দুইজন গ্রেপ্তারের আগে এবং একজন গ্রেপ্তারের পরে নিহত হন৷

নিষেধাজ্ঞার আগে-পরে

গত বছরের (২০২১) ১০ ডিসেম্বর পুলিশ ও র‌্যাবের সাত শীর্ষ কর্মকর্তার ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞারচার মাস পর চলতি বছরে প্রথম ‘ক্রসফায়ার’এর ঘটনা ঘটে৷ গত ১৭ এপ্রিল রাতে কুমিল্লার সদর আদর্শ উপজেলার গোলাবাড়ি এলাকায় র‌্যাবের সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ রাজু নামে একজন নিহত হন৷ তিনি সাংবাদিক মহিউদ্দিন সরকার নাঈম হত্যার আসামি৷ মহিউদ্দিন সরকারকে গত ১৩ এপ্রিল রাত ১০টার দিকে ডেকে নিয়ে কুমিল্লার বুড়িচং উপজেলার সীমান্ত এলাকায় দুর্বৃত্তরা গুলি করে হত্যা করে৷

এরপর গত ১৯ সেপ্টেম্বর ভোর রাতে কক্সবাজারের টেকনাফে র‌্যাবের সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ মোহাম্মদ মুবিন নামে একজন ‘মাদক কারবারি’ নিহত হন৷ র‌্যাবের দাবি, নিহত যুবক একজন মাদক কারবারি৷ ঘটনাস্থল থেকে দুই লাখ ২০ হাজার ইয়াবা, একটি বিদেশি পিস্তল, ম্যাগাজিন ও চারটি গুলি উদ্ধার করা হয়৷ আর গত ১০ নভেম্বর নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ উপজেলার চনপাড়া পুনর্বাসন কেন্দ্রে র‌্যাবের সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ শাহীন মিয়া ওরফে সিটি শাহীন নামে এক ‘‘তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসী’’ নিহত হন৷ ওই দিন দুপুরে গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর বিকেলে ঢাকার মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়৷

আসক বলছে, ২০২১ সালে ‘ক্রসফায়ারে’ মোট নিহত হন ৫১ জন৷ তাদের মধ্যে র‌্যাবের সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ ৩০জন নিহত হন৷ তাদের ২৮ জন নিহত হন গ্রেপ্তারের আগে এবং দুই জন গ্রেপ্তারের পরে৷ পুলিশের সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ মারা যান পাঁচজন৷ এরা সবাই গ্রেপ্তারের আগে নিহত হন৷ ডিবির সঙ্গে চার জন৷ তিনজন গ্রেপ্তারের আগে এবং একজন গ্রেপ্তারের পরে৷ বিজিবির সঙ্গে ১২ জন৷ এরা সবাই গ্রেপ্তারের আগে নিহত হন৷

২০২০ সালে আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে বন্দুক যুদ্ধে মোট ১৮৮ জন নিহত হন৷ তাদের মধ্যে র‌্যাবের সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হন ৬০ জন৷ পুলিশের সঙ্গে ৯০ জন৷ ডিবির সঙ্গে ১৩ জন এবং বিজিবির সঙ্গে ২৫ জন৷ ২০১৯ সালে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ মোট নিহত হন ৩৫৬ জন৷ তাদের মধ্যে র‌্যাবের সঙ্গে ১০১ জন, পুলিশের সঙ্গে ১৭২ জন, ডিবির সঙ্গে ৩০ জন, যৌথ অভিযানে একজন, কোস্ট গার্ডের সঙ্গে একজন এবং বিজিবির সঙ্গে বন্দুক যুদ্ধে ৫১ জন নিহত হন৷

কিন্তু চলতি বছরে র‌্যাব ছাড়া অন্য কোনো বাহিনীর সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ কেউ মারা যাননি৷

‘ক্রসফায়ার’ কমার নেপথ্যে কী?

মানবাধিকার কর্মী এবং আইন ও সালিস কেন্দ্রের (আসক) সাধারণ সম্পাদক নূর খান মনে করেন, ‘‘গত ডিসেম্বরে র‌্যাব ও র‌্যাবের যারা পরে পুলিশে কর্মরত ছিলেন তাদের কয়েকজনের ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা দেয়ার কারণে ক্রসফায়ার বা বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের ঘটনা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে৷ এটা এক বছরে তিন জন বলা হলেও চার বা পাঁচজনও হতে পারে৷ সেটা হলেও অনেক কমে গেছে৷ কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলো আমরা মানবাধিকার কর্মীরা যখন এর বিরুদ্ধে সোচ্চার হই তখন তা আমলে নেয়া হয়নি৷ শেষ পর্যন্ত মার্কিন নিষেধাজ্ঞা পর্যন্ত যেতে হলো৷ এটা আমাদের নিজেদেরই বন্ধ করা উচিত ছিলো৷ তা না করে বিদেশি চাপে করা হলো৷’’

তার কথা, ‘‘শুধু ক্রসফায়ার নয়৷ গুম, অপহরণসহ আরো যেসব অপরাধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী জড়িয়ে পড়েছিলো তাও কমে আসছে৷ কেউ নিখোঁজ হলে ছয়-সাত দিনের মধ্যেই তাকে আবার পাওয়া যাচ্ছে৷’’

তবে তিনি মনে করেন, ‘‘আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কার্যপদ্ধতি বা আচরণে তেমন কোনো পরিবর্তন আসেনি৷ যা ইতিবাচক হচ্ছে তা চাপের মুখে৷ সরকার এখনো এমন কোনো পদ্ধতি তৈরি করেনি যাতে ভবিষ্যতে এটা আর হবে না তেমন আশা করা যায়৷ যারা এইসব অপরাধের সঙ্গে জড়িত তাদের বিচারের আওতায় আনারও কোনো ইচ্ছা সরকারের আছে বলে এখনো স্পষ্ট হয়নি৷ সেটা প্রয়োজন৷ প্রয়োজন স্বাধীন তদন্ত কমিশন গঠন করে দায়ীদের চিহ্নিত করা৷ মেজর (অব.) সিনহা হত্যাকাণ্ডের পরও কয়েক মাস ক্রসফায়ার বন্ধ থেকে আবার শুরু হয়৷ তাই ক্রসফয়ার যে আবার শুরু হবে না তা কিন্তু এখনই নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না৷’’

রাষ্ট্রকেই দায়িত্ব নিতে হবে

বাংলাদেশের জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান ড. কামাল উদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘‘মার্কিন নিষেধাজ্ঞা দেয়া বা না দেয়া বড় কথা নয়৷ রাষ্ট্রকেই মানবাধিকারের বিষয়গুলো দেখতে হবে৷ রাষ্ট্র বিষয়গুলো তার প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে দেখবে এটাই তো সবাই প্রত্যাশা করে৷ তবে এটা নিয়ে আলোচনা, সমালোচনা সরকারসহ সব পক্ষকে সচেতন করে৷ সুশাসন প্রতিষ্ঠায় সহায়তা করে৷ সুশাসন প্রতিষ্ঠা একটি রাষ্ট্রের জন্য জরুরি৷’’

তার কথা, ‘‘মানবাধিকার কমিশন এখন প্রতিটি ঘটনার প্রতি নজর রাখছে৷ কোথায় কী ঘটছে তা কমিশনের নজরদারির মধ্যে আছে৷ যেখানে প্রয়োজন সেখানেই কমিশন কাজ করছে৷’’

তিনি আরেক প্রশ্নের জবাবে বলেন, ‘‘এই বিষয়গুলো নিয়ে নানা মহলে কথা হচ্ছে৷ আলোচনা সমালোচনা হচ্ছে৷ সংবাদমাধ্যমও কথা বলছে, প্রতিবেদন করছে৷ ফলে যা হয়েছে তাহলো, সব ক্ষেত্রেই এক ধরনের সচেতনতা বাড়ছে৷ বিষয়গুলো চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়ার কারণে এগুলো যে বন্ধ করা দরকার, দমন করা দরকার তার প্রয়োজনীয়তা অনুভূত হয়েছে৷ ফলে বিচার বহির্ভূত হত্যা, মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা উল্লেখযোগ্যভাবে কমছে৷’’

তিনি আরো বলেন, ‘‘বিভিন্ন ধরনের দুর্ঘটনা, নানা রকম দুষ্কৃতি ঘটে থাকে কিছু খারাপ লোকের কারণে৷ তাদের ওপর যদি নজরদারি বাড়ানো হয়, তাদের ওপর যদি খবরদারি জোরদার করা হয় তাহলে এধরনের ঘটনা অবশ্যই কমতে বাধ্য৷’’

সূত্র: ডয়চে ভেলে
এম ইউ/৩১ ডিসেম্বর ২০২২

Back to top button