জাতীয়

বছর শেষে মোট রিজার্ভ ৩৩.৮৩ ও নিট ২৫.৩৩ বিলিয়ন ডলার

ঢাকা, ৩০ ডিসেম্বর – ২০২২ সালে বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ থেকে ১২ বিলিয়ন ডলারের বেশি ক্ষয় হয়েছে। ২০২১ সালের শেষ কর্মদিবসে রিজার্ভের পরিমাণ ছিল ৪ হাজার ৬০৭ কোটি বা ৪৬ দশমিক শূন্য ৭ বিলিয়ন ডলার। ২৮ ডিসেম্বর রিজার্ভের পরিমাণ ৩৩ দশমিক ৮৩ বিলিয়ন ডলারে নেমে এসেছে। সে হিসেবে এক বছরের ব্যবধানে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কমেছে ১২ দশমিক ২৩ বিলিয়ন ডলার।

যদিও বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভের এ পরিসংখ্যান নিয়ে আপত্তি জানিয়ে আসছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (্আইএমএফ)। বহুজাতিক দাতা সংস্থাটির পক্ষ থেকে রফতানি উন্নয়ন তহবিলসহ (ইডিএফ) বিভিন্ন খাতে বিনিয়োগ করা প্রায় সাড়ে ৮ বিলিয়ন ডলার বাদ দিয়ে রিজার্ভের হিসাব করতে বলা হয়েছে। আইএমএফের দাবি আমলে নিলে ২০২২ সাল শেষে দেশের নিট রিজার্ভের পরিমাণ দাঁড়ায় ২৫ দশমিক ৩৩ বিলিয়ন ডলার।

দেশের বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে তীব্র সংকট ছিল ২০২২ সালজুড়ে। রেকর্ড আমদানি দায়ের পাশাপাশি বিদেশী ঋণের কিস্তি পরিশোধ করতে গিয়ে ব্যাংকগুলোকে হিমশিম খেতে হয়েছে। বৈদেশিক মুদ্রাবাজারের অস্থিরতা কাটাতে বছরজুড়েই রিজার্ভ থেকে ডলার বিক্রি করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। শুধু ২০২২ সালেই রিজার্ভ থেকে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর কাছে ১২ বিলিয়ন ডলারের বেশি বিক্রি করতে হয়েছে বলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে।

২০২১ সালের আগস্টে রিজার্ভের পরিমাণ দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ ৪৮ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়। এর পরই রিজার্ভের ক্ষয় শুরু হয়েছিল। স্বল্প সময়ে রিজার্ভের এ অস্বাভাবিক ক্ষয়ের জন্য নীতিনির্ধারকরা রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধকে দায়ী করে আসছিলেন। যদিও বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা যায়, এ যুদ্ধ শুরুর ছয় মাস আগেই দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ক্ষয় শুরু হয়। এ ক্ষয়ের সূত্রপাত রিজার্ভ থেকে অব্যাহতভাবে ডলার বিক্রির ফলে। গত বছরের আগস্ট থেকে এখন পর্যন্ত ব্যাংকগুলোর কাছে প্রায় ১৫ বিলিয়ন ডলার বিক্রি করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এর মধ্যে শুধু চলতি বছরেই ১২ বিলিয়ন ডলার বিক্রি করা হয়। আমদানি দায় ও বিদেশী ঋণ পরিশোধের চাপের কারণেই রিজার্ভ থেকে ধারাবাহিকভাবে ডলার বিক্রি করতে হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, ২০২১ সালের জুলাই পর্যন্ত বাজার থেকে ডলার কেনার ধারায় ছিল কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এর পর থেকে ব্যাংকগুলোর কাছে ধারাবাহিকভাবে ডলার বিক্রি করা হয়েছে। গত বছরের জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তিন মাসে গড়ে ৩১ কোটি ডলার করে বিক্রি করা হলেও পরে তা ক্রমান্বয়ে বেড়েছে। অক্টোবর-ডিসেম্বর তিন মাসে বিক্রি করা হয়েছিল ১৫৪ কোটি ডলার। আর জানুয়ারি-মার্চে ১৫৬ কোটি এবং এপ্রিল-জুনে ৩৫৮ কোটি ডলার বিক্রি করা হয়। এপ্রিল থেকে প্রতি মাসে গড়ে ১ বিলিয়ন ডলার বাজারে বিক্রি করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এরপর জুলাই থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত রিজার্ভ থেকে ৭ বিলিয়ন ডলারের বেশি বিক্রি করতে হয়েছে।

বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের হিসাবায়ন নিয়ে অনেক আগে থেকেই আপত্তি জানিয়ে আসছিল আইএমএফ। বহুজাতিক সংস্থাটির কাছে বাংলাদেশ সরকার সাড়ে ৪ বিলিয়ন ডলার ঋণসহায়তা চাইলে এ আপত্তি আরো জোরালো হয়। গত ২৬ অক্টোবর থেকে ৯ নভেম্বর পর্যন্ত আইএমএফের একটি প্রতিনিধি দল বাংলাদেশ সফর করে। সফর শেষে ঋণ দেয়ার বিষয়ে কর্মকর্তা পর্যায়ে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর হয়েছে। তবে ঋণ পাওয়ার জন্য সরকারকে এক ডজন সংস্কার প্রস্তাব বাস্তবায়নের সুপারিশ করেছে আইএমএফ। এর মধ্যে রিজার্ভের হিসাবায়ন পদ্ধতি সংশোধনের শর্তও রয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যমতে, রিজার্ভ থেকে ৭ বিলিয়ন ডলার নিয়ে ইডিএফ গঠন করা হয়েছে। বিশেষ এ তহবিলের প্রায় পুরোটাই দেশের রফতানিকারকরা ঋণ হিসেবে নিয়েছেন। ইডিএফ ছাড়াও রিজার্ভ থেকে গ্রিন ট্রান্সফরমেশন ফান্ডে (জিটিএফ) ২০ কোটি, লং টার্ম ফাইন্যান্সিং ফ্যাসিলিটি (এলটিএফএফ) তহবিলে ৩ কোটি ৮৫ লাখ, সোনালী ব্যাংকের মাধ্যমে পায়রা বন্দর কর্তৃপক্ষকে ৬৪ কোটি, বাংলাদেশ বিমানকে ৪ কোটি ৮০ লাখ ও শ্রীলংকাকে ২০ কোটি ডলার দেয়া হয়েছে। ইন্টারন্যাশনাল ইসলামিক ট্রেড ফাইন্যান্স করপোরেশনে (আইটিএফসি) রাখা আমানতও রিজার্ভ হিসেবে দেখাচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক। আইএমএফ বলছে, রিজার্ভ থেকে বিনিয়োগ বা ধার হিসেবে দেয়া ৮ দশমিক ৪০ বিলিয়ন ডলার বাদ দিতে হবে।

দেশের বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে অস্থিরতার কারণে গত এক বছরে ডলারের বিপরীতে টাকার প্রায় ২৫ শতাংশ অবমূল্যায়ন হয়েছে। ২০২২ সালের ১ জানুয়ারি দেশে প্রতি ডলারের বিনিময় মূল্য ছিল ৮৫ টাকা ৮০ পয়সা। গতকাল চলতি বছরের শেষ কর্মদিবসে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অনুমোদিত প্রতি ডলারের দর ছিল ১০৭ টাকা।

জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র মো. মেজবাউল হক বলেন, ‘২০২২ সালজুড়ে দেশের বৈদেশিক মুদ্রাবাজার বিভিন্ন ধরনের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করেছে। এসব চ্যালেঞ্জ বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতির সঙ্গে সম্পৃক্ত। ২০২০ সাল থেকে বাংলাদেশসহ পুরো পৃথিবী কভিড-১৯-এর কারণে পর্যুদস্ত ছিল। ওই সংকট কাটিয়ে ওঠার আগেই রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ বিশ্ব অর্থনীতিকে টালমাটাল করে দিয়েছে। তবে আশার কথা হলো বৈদেশিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে যেসব সংকট তৈরি হয়েছিল সেগুলো ধীরে ধীরে কেটে যাচ্ছে। দেশের আমদানি ব্যয় নিয়ন্ত্রণের মধ্যে চলে এসেছে। আশা করছি ২০২৩ সাল ভালো কাটবে। দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভও সমৃদ্ধ হবে।’

সূত্র: বণিক বার্তা
এম ইউ/৩০ ডিসেম্বর ২০২২

Back to top button