যশোর

সভাপতির স্ত্রী-শ্যালিকার নামে দলিল

যশোর, ৩০ ডিসেম্বর – যশোরের মনিরামপুর উপজেলার জি এইচ পাড়দিয়া মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের মালিকানাধীন ৭ শতক জমি বিদ্যালয়ের সভাপতি কামরুজ্জামান তাঁর স্ত্রী ও শ্যালক-শ্যালিকার কাছে বিক্রি করে দিয়েছেন। বিক্রয়কৃত ওই জমিতে এখন বহুতল ভবন নির্মাণ করা হচ্ছে। বিদ্যালয়ের সম্পত্তি বিদ্যালয়ের আনুকূল্যে ফিরিয়ে নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। একই সঙ্গে সরেজমিনে তদন্তের জন্য মনিরামপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কাছে স্মারকলিপিও দিয়েছেন তাঁরা।

 

শ্যামকুড় ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক সদস্য ইউনুছ আলী, মশিয়ার রহমানসহ স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা এলাকাবাসীর পক্ষে ওই স্মারকলিপিতে স্বাক্ষর করেন। স্মারকলিপিতে বলা হয়েছে, জি এইচ পাড়দিয়া মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের মালিকানাধীন ২২ শতক জমির মধ্যে ১০ শতক গোপনে বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে। বিদ্যালয়ের সভাপতি কামরুজ্জামান ও প্রধান শিক্ষক আবদুল গফুর গোপন যোগসাজশে সভাপতির স্ত্রী হোসনেয়ারা, শ্যালিকা জিনাত রেহেনা ও শ্যালক শরিফুল ইসলামের নামে রেজিস্ট্রি কবলা দলিল করে দেন। দলিল করে দেওয়া জমিতে বর্তমানে ব্যক্তিমালিকানাধীন বহুতল ভবন নির্মাণ করা হচ্ছে।

স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে মনিরামপুরের ইউএনও কবীর হোসেন গত ২৩ নভেম্বর উভয় পক্ষ নিয়ে তাঁর কার্যালয়ে শুনানি করেন। এ বিষয়ে জানতে চাইলে কবীর হোসেন বলেন, স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ আমলে নিয়ে উভয় পক্ষ নিয়ে শুনানি করা হয়েছে। শুনানিতে উভয় পক্ষকে দালিলিক প্রমাণ ও নিজপক্ষীয় কাগজপত্র দেখাতে বললে উভয় পক্ষ সময় চায়। পরবর্তী শুনানির দিন উভয় পক্ষের কাগজপত্রের ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বিষয়টি তদন্তাধীন।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, বিদ্যালয়ের অনুকূলে থাকা ৭ শতক জমি দুটি দলিলের মধ্যমে ২ লাখ ৮০ হাজার টাকায় সভাপতির ক্ষমতাবলে কামরুজ্জামান তাঁর স্ত্রী ও নিকটাত্মীয়দের নামে কবলা দলিলের মাধ্যমে বিক্রি করেছেন।

দলিল অনুযায়ী কামরুজ্জামানের স্ত্রী দেড় শতক, শ্যালক শরিফুল ইসলাম ৩ শতক ও শ্যালিকা জিনাত রেহেনা আড়াই শতক জমির মালিকানা লাভ করেছেন। বিক্রয়কৃত জমির মধ্যে ২০১৮-১৯ অর্থবছরে শরিফুল ইসলাম ও জিনাত রেহেনার নামে আড়াই শতক করে জমি নামজারি হয়েছে।

সরেজমিনে দেখা গেছে, পাড়দিয়া বাজারের মোড়ে বিদ্যালয়টি অবস্থিত। বিদ্যালয়টি বাজারের প্রধান সড়কসংলগ্ন। বিক্রয় করা ৭ শতক জমি ওই সড়কের সঙ্গে। সেখানে বহুতল ভবন নির্মাণ করা হচ্ছে। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, রাস্তাসংলগ্ন ওই বাজারের এক শতক জমির বর্তমান মূল্য তিন–চার লাখ টাকা। যদিও তিন বছর আগে জমির দাম কিছুটা কম ছিল। তারপরও বিদ্যালয়ের সভাপতি ও প্রধান শিক্ষক মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে ওই জমি নিজেদের আত্মীয়স্বজনের কাছে নামমাত্র মূল্যে বিক্রি করে দিয়েছেন।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আবদুল গফুর বলেন, ‘তিন বছর আগে বিদ্যালয়ের ভবন নির্মাণের সময় জমির প্রয়োজন হয়। তখন বিদ্যালয়ের কম প্রয়োজনীয় ৭ শতক জমি বিক্রি করে বেশি প্রয়োজনীয় ৮ শতক জমি কেনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ওই সিদ্ধান্ত মোতাবেক ৭ শতক জমি বিক্রি করে ৮ শতক জমি কেনা হয়েছে। এ বিষয়ে বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটির রেজল্যুশন রয়েছে।’

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জমি কেনাবেচার এখতিয়ার ম্যানেজিং (পরিচালনা) কমিটির সভাপতি বা প্রধান শিক্ষকের রয়েছে কি না জানতে চাইলে যশোর জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা এ কে এম গোলাম আজম বলেন, ‘আমার জানামতে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নামে জমি কেনা যাবে, কিন্তু বিক্রি বা হস্তান্তর করা যাবে না। প্রতিষ্ঠানের স্বার্থে যদি কোনো জমি বিক্রি করতে হয়, তাহলে মন্ত্রণালয় বা অধিদপ্তরের অনুমতি বা পরামর্শ নিতে হবে।’

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিদ্যালয়ের সভাপতি কামরুজ্জামান বলেন, ‘বিদ্যালয়ের উন্নয়নের স্বার্থে ৭ শতক জমি বিক্রি করে ৮ শতক কিনেছি। প্রায় ১০ লাখ টাকা দিয়ে ৮ শতক জমি কেনা হয়েছে। ৭ শতক জমি আট লাখ টাকায় বিক্রি করা হয়েছে। যদিও দলিলে কম টাকা দেখানো হয়েছে। মন্ত্রণালয় বা অধিদপ্তরের কোনো অনুমোদন নেই। তবে ম্যানেজিং কমিটির রেজল্যুশন রয়েছে।’

যে রেজল্যুশনের ক্ষমতাবলে জমি বেচাকেনা হয়েছে, ওই রেজল্যুশনে স্বাক্ষর করা অভিভাবক সদস্য মুজিবুর রহমান বলেন, ‘আমি ওই কমিটিতে ছিলাম। কিন্তু জমি বেচাকেনার বিষয়ে কিছুই জানি না।’

এ বিষয়ে জানতে চাইলে জেলা প্রশাসক তমিজুল ইসলাম খান বলেন, বিদ্যালয়ের জমি কেনাবেচায় যদি কোনো অনিয়ম হয়ে থাকে, তাহলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বিদ্যালয়ের সম্পদ রক্ষায় কোনো ছাড় দেওয়া হবে না।

সূত্র: প্রথম আলো
আইএ/ ৩০ ডিসেম্বর ২০২২

Back to top button