কক্সবাজার

৩৩ উন্নয়ন প্রকল্পে বদলে গেছে কক্সবাজারের গ্রামীণ জনপদ

আবদুল আজিজ

কক্সবাজার, ২৮ ডিসেম্বর – কক্সবাজারের উখিয়ায় ৩৩টি উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদফতর (এলজিইডি)। বিশ্বব্যাংকের সহায়তায় স্থানীয় জনপদ ও রোহিঙ্গা ক্যাম্পে বিভিন্ন সেবা ও সুবিধা সহায়ক এসব অবকাঠামো নির্মাণ করা হচ্ছে। গ্রামীণ সড়ক ছাড়াও সেতু-কালভার্ট এবং স্কুল-মাদ্রাসাসহ নানা অবকাঠামো নির্মাণের কারণে বদলে গেছে উখিয়ার গ্রামীণ জনপদ।

প্রকল্পের অধীন নির্মিত অবকাঠামোগুলো হলো—বিদ্যালয় কাম দুর্যোগ আশ্রয়ণ কেন্দ্র নির্মাণ ৫০টি, বহুমুখী কমিউনিটি ও সার্ভিস সেন্টার নির্মাণ ৩৪টি, রাস্তার উন্নয়ন ২৩৭.৩৮ কিমি, মাঠ পর্যায়ের অফিসের সংস্কারসহ সম্প্রসারণ একটি, রাস্তা মজবুত ও প্রশস্তকরণ ৪২.১৫ কিমি, অভ্যন্তরীণ রাস্তা, ফুটপাত, ড্রেনেজ সুবিধা নির্মাণ এবং পার্শ্ব-ঢাল সুরক্ষা ২.৫ কিমি, আরসিসি গার্ডার ব্রিজ নির্মাণ ৩৭১ মিটার, রাস্তার পাশের ড্রেন নির্মাণ ২০০০ মিটার, হাটবাজারের উন্নয়ন ছয়টি, ত্রাণ প্রশাসন ও বিতরণ কেন্দ্র নির্মাণ একটি, সোলার স্ট্রিট লাইট স্থাপন ৪০০০টি, বজ্র নিরোধক সুরক্ষা সিস্টেম সরবরাহ এবং স্থাপন ৯৭৫টি, বিভিন্ন রাস্তার রক্ষণাবেক্ষণ ২০ কিমি, রাবার ড্যাম নির্মাণ এবং উন্নয়ন ২৬৫ মিটার. জেটি উন্নয়ন ১৫৫০ মিটার, সোলার পিডি ন্যানো গ্রিড সরবরাহ ও স্থাপন ১০০টি, উখিয়া ও টেকনাফে বিদ্যমান ফায়ার সার্ভিস অফিসের উন্নয়ন দুটি, কক্সবাজারে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের জন্য ভবন নির্মাণ একটি, কক্সবাজারে এলজিইডি ভবনের উন্নয়ন একটি, কক্সবাজারে এলজিইডির জন্য প্রশিক্ষণ সুবিধা নির্মাণ একটি। বিশ্বব্যাংকের সহায়তায় ‘জরুরি ভিত্তিতে রোহিঙ্গা সংকট মোকাবিলায় মাল্টি-সেক্টর প্রকল্প (ইএমসিআরপি)’ এর আওতায় এসব প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে এলজিইডি।

 

এছাড়া উখিয়া রোহিঙ্গা ক্যাম্পের মাল্টিপারপাস কমিউনিটি অ্যান্ড সার্ভিস সেন্টার ক্যাম্প-৪ এক্সটেনশন, ক্যাম্প-৫, ২০ এক্সটেনশন, ১৫, ১৭, ১৮, ১৯, ক্যাম্প-২০ ব্লক-এম-৮, ২০ ব্লক-এম-৩১ এবং ক্যাম্প ২ ডব্লিউতে একাধিক কাজ চলমান রয়েছে। পাশাপাশি গভীর নলকূপ স্থাপন ও নিরাপদ পানি সরবরাহ, পয়োবর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য প্ল্যান্ট নির্মাণ, সৌরবিদ্যুৎ, বিভিন্ন সেবাকেন্দ্র নির্মাণ, জেটি নির্মাণ, রাবার ড্যাম স্থাপন, ফায়ার সার্ভিস স্টেশন নির্মাণ ও পুনর্নির্মাণ করা হয়েছে।

প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, এসব প্রকল্প বাস্তবায়নের ফলে উখিয়ার রাজাপালং ইউনিয়নের শৈলারডেবা, টাইপালং, ডেইলপাড়া, দরগাহ বিল, দরগাহ পালং, হাতিমুড়া, লম্বাঘোনা, ডিগলিয়া পালং, চাকবৈঠা, গয়াল মারা, আমতলী, ভালুকিয়া ও তুলাতুলিসহ বেশ কয়েক এলাকার লাখ লাখ মানুষ সুফল পাচ্ছে। সেইসঙ্গে রোহিঙ্গাদের যোগাযোগ ব্যবস্থা সহজ হয়েছে।

ওসব এলাকার বাসিন্দা ও রোহিঙ্গাদের জনজীবনের সুবিধা নিশ্চিত করতে অবকাঠামোগুলোর সুষ্ঠু ব্যবহার ও যত্নের বিষয়টিকে ইএমসিআরপি প্রকল্পে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। জনসচেতনতা বাড়াতে প্রকল্পের কমিউনিকেশন পরামর্শক প্রতিষ্ঠান হিসেবে নিয়মিত কমিউনিটিভিত্তিক নানা কার্যক্রম পরিচালিত করছে বাংলাদেশ সেন্টার ফর কমিউনিকেশন প্রোগ্রামস (বিসিসিপি)।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ২০১৭ সালে মিয়ানমার থেকে বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে আসে। এ অবস্থায় মানবিক সংকট মোকাবিলায় বিশ্বব্যাংকের অনুদান সহায়তায় স্থানীয় ও রোহিঙ্গা ক্যাম্পে বিভিন্ন সেবা-সহায়ক অবকাঠামো নির্মাণের কাজ শুরু করে বাংলাদেশ সরকার। এরই অংশ হিসেবে উখিয়া ও টেকনাফের স্থানীয় অধিবাসী এবং রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর জন্য অভ্যন্তরীণ যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নসহ বিভিন্ন সামাজিক সেবা এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে সুরক্ষা কার্যক্রম চলমান রেখেছে এলজিইডি।

উখিয়ায় ৩৩টি উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন চলছে জানিয়ে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদফতর (এলজিইডি) কক্সবাজারের সিনিয়র সহকারী প্রকৌশলী প্রতিপদ দেওয়ান বলেন, ‘৩৩টি উন্নয়ন প্রকল্পের মধ্যে পাঁচটি প্যাকেজ বাস্তবায়ন হয়েছে। বাকি ২৮টি প্যাকেজের কাজ শেষ পর্যায়ে। স্থানীয় বাসিন্দা ও রোহিঙ্গাদের কথা চিন্তা করে ক্যাম্পে এবং ক্যাম্পের বাইরে এসব উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। রাস্তাঘাট, সেতু-কালভার্ট থেকে শুরু করে আশ্রয়ণকেন্দ্রসহ বিভিন্ন অবকাঠামো নির্মাণ করা হচ্ছে। যাতে এসব এলাকার মানুষজন ও রোহিঙ্গা সুবিধা পান। সরকারের আন্তরিক প্রচেষ্টায় এসব উন্নয়ন সম্ভব হচ্ছে।’

 

এসব প্রকল্প বাস্তবায়ন হওয়ায় স্থানীয় অধিবাসী এবং রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী উপকৃত হচ্ছেন উল্লেখ করে বিশ্বব্যাংকের ডিডিসিএল ফিল্ড রেসিডেন্স ইঞ্জিনিয়ার মো. শফিকুল কবীর বলেন, ‘রাস্তাঘাট, সেতু-কালভার্ট, আশ্রয়কেন্দ্র, সড়কবাতি, সৌরবিদ্যুৎসহ বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা পেয়ে অনেক খুশি স্থানীয় অধিবাসী এবং রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী। রোহিঙ্গা ও স্থানীয় বাসিন্দাদের জন্য তিনটি প্যাকেজে কাজ করছি আমরা। প্যাকেজগুলো হলো—ডব্লিউ-৮, ডব্লিউ-১৪ এবং ডব্লিউ-১৫। এছাড়া সাড়ে তিন কিলোমিটার সড়ক নির্মাণ করেছে এলজিইডি। ৪২ মিটার ও ৪৮ মিটারের দুটি সেতু নির্মাণ করেছে তারা। ক্যাম্প ও ক্যাম্পের বাইরে রাস্তাঘাট, ড্রেনেজ ব্যবস্থাসহ নানা সুবিধা পাওয়ায় উপকৃত হচ্ছেন স্থানীয় বাসিন্দা এবং রোহিঙ্গারা।’

উখিয়ার চাকবৈঠা এলাকার শফিউল আলম বলেন, ‌‘মানুষের চলাচলের জন্য যেসব সড়ক, সেতু-কালভার্ট এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে রক্ষা পেতে আশ্রয়কেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছে, তা এলাকাবাসীর জন্য অত্যন্ত সহায়ক। উখিয়ার টাইপালং হয়ে দরগাহ বিল ও দরগাহ পালংয়ের মাঝামাঝি যে সেতু নির্মাণ করা হয়েছে তার সুবিধা শুধু উখিয়া উপজেলার মানুষজন নন, বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার মানুষজনও সুবিধা ভোগ করছেন। আমরা সবাই সুন্দরভাবে যাতায়াত করতে পারছি। এসব অবকাঠামো আমাদের উপকারে আসছে। দারুণ পরিবর্তন হয়েছে এসব এলাকার।’

আমাদের এলাকায় দারুণ উন্নয়ন হয়েছে জানিয়ে উখিয়ার ক্যাম্প-১৯-এর মাঝি শামশুল আলম বলেন, ‘আগে রাস্তাঘাটের অভাবে চলাফেরা করতে খুব কষ্ট পেয়েছি। অসুস্থ ও অন্তঃসত্ত্বা নারীদের নিয়ে সঠিক সময়ে হাসপাতালে পৌঁছাতে পারিনি। কিন্তু বর্তমানে অনেক সুন্দর রাস্তাঘাট পেয়েছি। খুব সহজে হাটবাজার ও হাসপাতালে যাতায়াত করতে পারি। আমাদের এসব এলাকায় দারুণ উন্নয়ন হয়েছে।’

একই ক্যাম্পের বাসিন্দা হাবিব হোসেন বলেন, ‘প্রাকৃতিক দুর্যোগের জন্য আমাদের আশ্রয়কেন্দ্র দরকার ছিল। আমাদের সমস্যার কথা ভেবে বড় আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ করে দিচ্ছে সরকার। এখন থেকে যেকোনো দুর্যোগে স্ত্রী-সন্তান নিয়ে ওই কেন্দ্রে আশ্রয় নিতে পারবো আমরা।’

সূত্র: বাংলা ট্রিবিউন
আইএ/ ২৮ ডিসেম্বর ২০২২

Back to top button