দক্ষিণ এশিয়া

বিদেশি কূটনীতিকরা ভারতে সীমার মধ্যেই থাকেন

নয়াদিল্লি, ২৬ ডিসেম্বর – প্রথমবার প্রধানমন্ত্রী হিসাবে শপথ নেয়ার সময় পাকিস্তানের সেসময়ের প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফকেও আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন নরেন্দ্র দামোদরদাস মোদী৷ পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী এসেওছিলেন৷ ঠিক ছিল, তার মাস কয়েক পরেই ভারত ও পাকিস্তানের পররাষ্ট্র সচিবরা আলোচনায় বসবেন৷ সেই আলোচনার সপ্তাহখানেক আগে পাকিস্তানের রাষ্ট্রদূত আব্দুল বাসিত কাশ্মীরের বিচ্ছিন্নতাবাদী নেতাদের আমন্ত্রণ জানান আলাপ করবেন বলে৷

ভারতের পররাষ্ট্রসচিব সুজাতা সিং সেসময় বাসিতকে মানা করেছিলেন এবং অনুরোধ করেছিলেন এই বৈঠক না করার জন্য৷ বলেছিলেন, ‘হয় আমাদের বেছে নিন, না হয় বিচ্ছিন্নতাবাদীদের’৷ বাসিত সেই অনুরোধ রাখেননি৷ তিনি বিচ্ছিন্নতাবাদীদের সঙ্গে বৈঠক করেন৷ আর তারপরেই ভারত জানিয়ে দেয়, সুজাতা সিং পাকিস্তানে যাবেন না৷ বৈঠক বাতিল৷

ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে এখন আর আলোচনা হয় না৷ ভারতের অবস্থান হলো, সন্ত্রাসবাদে মদত দেয়া ও আলোচনা একসঙ্গে চলতে পারে না৷ পাকিস্তান প্রথমটা বাদ দিক, তাহলেই একমাত্র দ্বিতীয়টা হবে৷ তবে সেই কাহিনি আলাদা৷ এখানে শুধু এটুকু বলাই যথেষ্ট যে, ভারত একটা স্পষ্ট বার্তা দিয়ে রেখেছে৷ ভারতে বসে কোনো রাষ্ট্রদূত যদি দিল্লির অভ্যন্তরীণ বিষয় নিয়ে কথা বলেন বা কোনো কাজ করেন, সেটা বরদাশত করা হবে না৷ বিদেশি রাষ্ট্রদূত বা দূতাবাস কর্মীদের সীমার মধ্যে থাকাটা খুব জরুরি৷

কিছুদিন আগের বড় ঘটনার দিকে তাকানো যাক৷ মহানবি(সাঃ)-কে নিয়ে বিজেপি মুখপাত্র নূপুর শর্মা ও নেতা নবীন জিন্দল অত্যন্ত বিতর্কিত মন্তব্য করলেন৷ তারপর কাতার, ইরান, কুয়েত, সৌদি আরব-সহ একাধিক উপসাগরীয় দেশ ভারতীয় রাষ্ট্রদূতদের ডেকে প্রতিবাদ জানিয়েছে৷ ওমান তো খুব কড়া মন্তব্য করেছে৷ কিন্তু ভারতে কোনো দেশের রাষ্ট্রদূত মুখ খোলেননি বা এমন কিছু করেননি যা নিয়ে বিতর্ক হতে পারে৷ পরে ভারতীয় কূটনীতিকরা বলেন, বিজেপি-র ছোটখাট নেতারা এই কথা বলেছেন এবং দল তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়েছে এবং এটা কখনই ভারতের মত নয়, তখন ধীরে ধীরে সেই বিতর্কও থেমে গেছে৷

লাদাখে ভারত ও চীনের সেনাদের মধ্যে সংঘর্ষের পর দেশজুড়ে চীনা জিনিস বয়কটের হিড়িক ছিল৷ বেশ কিছু সংগঠন এই ডাক দিয়েছিল৷ তখন চীনের রাষ্ট্রদূত বলেছিলেন, চীন তার সার্বভৌমত্ব ও আঞ্চলিক অখণ্ডতা রক্ষা করবে৷ কিন্তু তারা সীমান্তে শান্তিরক্ষাও করবে৷ আর বয়কট নিয়ে তার মন্তব্য ছিল, দুই দেশ এখন সেনা সরানো নিয়ে আলোচনা করছে, এখন বাণিজ্যিক সম্পর্ক যেন খারাপ করা না হয়৷

ভারত তার কথার জবাব দিয়েছিল৷ পরে সাবেক কূটনীতিকদের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে কথা বলেছিলাম৷ তারা মনে করেছেন, চীনের রাষ্ট্রদূত সীমা ছাড়াননি৷ তিনি তার দেশের কথা বলেছেন৷ তাদের যুক্তির কথা বলেছেন৷ ভারতও তার কথা বলেছে৷ বারবার জানিয়েছে, চীনের সেনা ভারতীয় ভূখণ্ডে ঢুকে পড়েছিল৷ ফলে বিষয়টি ভারতের সার্বভৌমত্ব রক্ষার৷

ভারতে এখন অ্যামেরিকা, রাশিয়া, চীন থেকে শুরু করে কোনো দেশের রাষ্ট্রদূতই আলটপকা মন্তব্য করেন না৷ করলে তার প্রতিক্রিয়াও ততটাই কড়া হতে বধ্য৷ ভারতের একটা সুবিধা আছে৷ ভারত শুধু আয়তনে, জনসংখ্য়ায় নয়, অর্থনীতির দিক থেকেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দেশ৷ ভারতে মধ্যবিত্ত শ্রেণিও বিশাল৷ সম্প্রতি প্রাইসের একটা রিপোর্ট বলছে, ভারতে প্রতি তিনজনের মধ্যে একজন মধ্যবিত্ত, যাদের বার্ষিক আয় পাঁচ থেকে ৩০ লাখ টাকার মধ্যে৷ তাহলে ভারতে মধ্যবিত্ত মানুষের সংখ্যা ৪৪ কোটির মতো৷ রিপোর্ট বলছে, ২০৪৭ সালে এই সংখ্যাটা দ্বিগুণ হয়ে য়াবে৷ এতবড় বাজার আর কোথায় পাওয়া যাবে৷ ফলে এই বাজার ধরার তাগিদ সব দেশের আছে৷ অর্থনীতির এই শক্তি ভারতকে অনেক বেশি শক্তিসালী করে তুলেছে৷ না হলে, রাশিয়ার তেল কেনা নিয়েই দেখুন না৷ অ্যামেরিকা, ইইউর চাপ অগ্রাহ্য করে ভারত তো সকলের মুখের উপর বলতে পারছে, আমরা তাল কেনা বন্ধ করব না৷ ইইউ গ্যাস কেনা বন্ধ করেনি৷ আমাদের তুলনায় অনেক বেশি বাণিজ্য ওরা রাশিয়ার সঙ্গে করছে৷

আকার, প্রভাব ও অর্থনীতির একটা শক্তি আছে বলেই ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয় নিয়ে রাষ্ট্রদূতরা কোন ছাড়, রাষ্ট্রপ্রধানরাও কিছু বলেন না৷ কাশ্মীরে ৩৭০ ধারা খারিজ, পূর্ণ রাজ্য থেকে তাকে কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল করা নিয়ে কটা দেশ মন্তব্য করেছো? ভারতের বরাবরের নীতি হলো, এটা তাদের অভ্যন্তরীণ বিষয়৷ সেই কথাটা আগেভাগে তাদের কাছে পৌঁছে দেয়া হয়েছে৷ তাই চীন, পাকিস্তান, ওআইসি ছাড়া কেউ সোচ্চার হয়নি৷ ভারতীয় কূটনীতিকরাও জানেন, কীভাবে কাজ করতে হয়৷ কীভাবে, কোথায়, কী কথা বলতে হয়৷ কখন আগাম আলোচনাটা সেরে নিতে হয়৷

তাই আজ বাংলাদেশে বসে বিভিন্ন দেশের কূটনীতিকরা যেভাবে কথা বলছেন, তা ভারতের ক্ষেত্রে ভাবাই যায় না৷

সূত্র: ডয়চে ভেলে
আইএ/ ২৬ ডিসেম্বর ২০২২

Back to top button