যূক্তরাষ্ট্র

ফিলাডেলফিয়ায় “বাংলাদেশ এসোসিয়েশন অফ ডেলাওয়্যার ভ্যালি’র দুই দিনব্যাপী বর্ণাঢ্য ‘সুবর্ণ জয়ন্তী উৎসব’

ওয়াশিংটন, ২৬শে ডিসেম্বর – ১৯৭১ এ বাংলাদেশের মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের সাথে সম্পৃক্ত যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম সংগঠন বাংলাদেশ এসোসিয়েশন অফ ডেলাওয়্যার ভ্যালি (বিএডিভি) গত ২০২১ এ ৫০ বছরে পদার্পন করেছে । করোনা প্যান্ডেমিকের কারণে এক বছর পিছিয়ে গত ১৬ ও ১৭ ডিসেম্বর – দুদিন ব্যাপী আয়োজনে ফিলাডেলফিয়া সিটি হল (১৬ই ডিসেম্বর) ও পেনসিলভানিয়া কনভেনশন সেন্টার (১৭ই ডিসেম্বর) এ জাকজমকপূর্ণ আয়োজন ও উৎসব মুখর পরিবেশে ৫০ বছর পুর্তি উদযাপন করেছে ।

১৬ই ডিসেম্বর ২০২২ শুক্রবারে বেলা ৩টায়, ফিলাডেলফিয়া শহরে, ডেলাওয়্যার ভ্যালি অঞ্চলের সকল বাংলাদেশী কমিনিটির অংশগ্রহণের মাধ্যমে, প্রায় কয়েকশো বাংলাদেশী, ফিলাডেলফিয়া সিটি ও স্টেট রিপ্রেসেন্টেটেটিভ, স্টেট সিনেটর, তথা ১৯৭১ এর বাংলাদেশী কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধা, ও উদ্যোগী সংগঠনের কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দের উপস্থিতিতে ফিলাডেলফিয়া সিটি হলের সামনে বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা উত্তোলন করা হয়। পরবর্তীতে ফিলাডেলফিয়া সিটি মেয়র-এর কনভার্সেশন হলে একটি মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও আলোচলনা সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। এই প্রথম ফিলাডেলফিয়া শহর ১৬ই ডিসেম্বর ২০২২ কে “বাংলাদেশের বিজয় দিবস” হিসেবে মেয়রের পক্ষথেকে স্বীকৃতি দিয়েছে এবং সিটি-মেয়রের অফিস এতে সক্রিয় ভাবে অংশ নিয়েছে। এটি আমেরিকার ইতিহাসে একটি অভিনব ও ঐতিহাসিক মুহূর্ত । এইদিনে বাঙালি নারী পুরুষ নির্বিশেষে লাল সবুজে সুসজ্জিত হয়ে আমাদের জাতীয় পতাকাতলে একটি আনন্দ মুখর সমাবেশের আয়োজন করে, এটি ছিল বাংলাদেশের বিজয়ের একটি অসামান্য মুহূর্ত, যা সবাইকে ছুঁয়ে গেছে।

১৭ই ডিসেম্বর বিএডিভি পেনসিলভানিয়া কনভেনশন সেন্টার-এ আরেকটি সুবর্ণ জয়ন্তীর সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করে । অনুষ্ঠানের শুরুতে শিশুকিশোর ও তাদের অভিবাবকরা বিজয় দিবসের জাতীয় পতাকা ও বাংলাদেশের বিজয়ের গানের সুরমূর্ছনার সাথে মঞ্চে এসে একটি অনবদ্য মিউজিক্যাল প্যারেড করে সারিবদ্ধ ভাবে দাঁড়িয়ে, জাতীয় সংগীত পরিবেশন করে ।

বিএডিভি’র বর্তমান প্রেসিডেন্ট আশিক আনসার সুবর্ণ জয়ন্তী উৎসবের উদ্বোধনী ঘোষণা করেন। মূল অনুষ্ঠান শুরু হয় সাংস্কৃতিক সম্পাদক দিতি হোসাইন ও সাধারণ সম্পাদক শোয়েব আহমেদ এর সাদর সম্ভাষণ এর মধ্য দিয়ে। এর পরে অনুষ্ঠানটি বিভিন্ন পর্বে উপস্থাপনা করেন দিতি হোসাইন, আব্দুল হাফিজ চৌধুরী, রুমানা আলম, ইশরাত জাহান পিকু ও নুরুন বেগম। সোমা কুন্ডু – এর তত্ত্বাবধানে শিশুকিশোরদের দেশাত্মবোধক পরিবেশনা, এবং জলি দাস-এর সংগীত নিকেতনের সংগীত ও নৃত্য পরিবেশনার পরে পরিবেশিত হয় বিএডিভি’র নিজস্ব সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান—-অংশ নেন প্রতিথযশা সংগীত শিল্পী সালাহউদ্দিন আহমেদ, জাফর বিল্লাহ, তাদের সাথে দলীয় সংগীত পরিবেশনায় ছিলেন মুরাদ হোসেন, লাবিব হোসেন, এশা হোসেন, স্বপন দাস, ইসরাত জাহান পিকু ও অন্যান্যরা । বিজয় দিবসের এই সাংস্কৃতিক সন্ধ্যাটি ছিল অত্যন্ত মনোজ্ঞ ও হৃদয় ছোঁয়া । বিএডিভির সুবর্ণজয়ন্তী স্মারক-উত্তরীয় পরিয়ে অংশগ্রহণকারীদের সম্মান প্রদর্শন করেন বিএডিভি’র সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক ।

মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মাননা :

বিএডিভি’র সুবর্ণ জয়ন্তী উপলক্ষে ডেলাওয়ার ভ্যালি অঞ্চলে বসবাসরত ১১ জন মুক্তিযোদ্ধাদের সর্বোচ্চ সম্মান জানাতে উদ্দ্যেগ নেয়. তারা হলেন মুক্তিযোদ্ধা আবু তাহের ,আবু তাহের ভূঁইয়া , শওকত ইমাম, প্রণব দাস, লুৎফর রহমান, শারাফাত আলী খান, এ কে এম ফজলুল হক, হাবিব সিদ্দিকী, মতিউর রহমান, আবু আমিন রহমান এবং জিয়াউদ্দিন আহমেদ । তাঁদের মধ্যে মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন আবু তাহের , শওকত ইমাম, শারাফাত আলী খান, আবু আমিন রহমান এবং জিয়াউদ্দিন আহমেদ। মুক্তিযোদ্ধাদের পক্ষ থেকে বক্তব্য রাখেন জনাব শওকত ইমাম।

স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের মুক্তিযোদ্ধা কণ্ঠসেনাদের স্বীকৃতি ও সম্মাননা :

স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের তিন প্রখ্যাত মুক্তিযুদ্ধের কণ্ঠসেনা কাদেরী কিবরিয়া, শহীদ হাসান এবং রথীন্দ্র নাথ রয় কে সম্মানপূর্বক ভাবে মঞ্চে আমন্ত্রণ জানানো হয়, এবং মুক্তিযুদ্ধের এইসকল অতন্দ্র প্রহরীদের সম্মাননা স্মারক প্রদান করেন বিএডিভি’র প্রাক্তন সভাপতি-সালাহউদ্দিন আহমেদ, হিরণ্ময় শিকদার, ফেরদৌস জান, এবং তাদের উত্তরীয় পরিয়ে দেন যথাক্রমে ইভা সাক্কার, মুক্তিযোদ্ধার সন্তান রুখসানা হাসিব। এর পরপরই শুরু হয় স্বাধীন বাংলা বেতার এর কণ্ঠশিল্পীদের স্মৃতি জাগানিয়া গান, মঞ্চে আসেন যথাক্রমে কাদেরী কিবরিয়া, শহীদ হাসান এবং রথীন্দ্র নাথ রয়. ফিলাডেলফিয়াতে ২০২২ এর ১৭ই ডিসেম্বর লেখা হয় আরেক ইতিহাস–“স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র” থেকে এই গুণী শিল্পীরা ফিলাডেলফিয়ার ইতিহাসে এই প্রথম একসাথে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে নতুন ভাবে তুলে ধরেন, বাংলাদেশিদের জন্য যা ছিল অভূতপূর্ব এবং অত্যন্ত গর্বের ।

বিএডিভি’র সুবর্ণ জয়ন্তী স্মারক “এঞ্জেলস অফ বাংলাদেশ” অ্যাওয়ার্ড:

১৯৭১ এ ঐতিহাসিক ব্লকেড আন্দোলনে, ফিলাডেলফিয়া ও বাল্টিমোর এ অপেক্ষমান পাকিস্তানগামী জাহাজে যুদ্ধের-রসদ সামগ্রী উত্তোলন বন্ধের প্রতিবাদে যুক্ত থাকা বিএডিভির প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি মজহারুল হক এবং প্রতিঠাতা সহ-সভাপতি মোনায়েম চৌধুরীকে “এঞ্জেলস অফ বাংলাদেশ” অ্যাওয়ার্ড এ ভূষিত করে বিএডিভি। এই উপলক্ষে ৯১ বছর বয়সী জনাব মজহারুল হকের একটি ভিডিও বার্তা দর্শকদের সামনে উপস্থাপন করা হয়।

বিএডিভি’র বিশেষ সম্মাননা :

শিল্প সংস্কৃতি ও ভাষা আন্দোলন তথা একুশের চেতনাকে উজ্জীবিত রাখতে সেই সাথে বিএডিভির সাংগঠনিক তৎপরতাকে অসাম্প্রদায়িক, নিরপেক্ষ, অরাজনৈতিক ভাবে একটি লক্ষ্যে কাজ করে যেতে, ডেলাওয়্যার ভ্যালি অঞ্চলে তিন যুগের বেশি সময় ধরে অবধান রাখায়, বিএডিভি তিনজনকে বিশেষ কৃতজ্ঞতা জানায়। তাঁরা হলেন: সাংস্কৃতিক বেক্তিত্ব সুস্মিতা গুহ-রয় ও সালাহউদ্দিন আহমেদ, এবং বিএডিভি’র ইলেকশন-কমিশনার অধ্যাপক ফারুক সিদ্দিকী । এর পাশাপাশি ফিলাডেলফিয়াতে বাংলা মায়ের ভাষা ও একুশের চেতনাকে উজ্জীবিত রাখতে বিশেষ অবদান রাখায় বিএডিভি সম্মাননা জানায় চিত্রগ্রাহক আবুল ফজল ও চিত্রকর শাজাদা সুলতানা-কে।

আমন্ত্রিত শিল্পীদের পরিবেশনা :

সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আকর্ষণ ছিলেন কিংবদন্তি শিল্পী সৈয়দ আব্দুল হাদির সুযোগ্য কন্যা–তনিমা হাদি, দিলরুবা খানের সুযোগ্য কন্যা–শিমুল খান এবং স্বনামে ধন্য সংগীত শিল্পী শুভ্র দেব. তাদের অনবদ্য পরিবেশনায় বিএডিভির সুবর্ণ জয়ন্তী অনুষ্ঠানটি আনন্দ আর উচ্ছাসে সবাইকে ছুঁয়ে যায়।

 

শিশুকিশোরদের ছবি আঁকা প্রতিযোগিতা :

প্রায় ৬০০ আসন বিশিষ্ট পেনসিলভানিয়া কনভেনশন সেন্টার এ এই আড়ম্বরপূর্ণ অনুষ্ঠানটি বিকেল ৩টা থেকে রাট ৯টা পর্যন্ত চলে, এর আগে বাচ্চাদের ছবি অঙ্কন প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয়, এর তত্ত্বাবধানে ছিলেন সাদিয়া নিশাত আহমেদ। শিশুদের ছবি অঙ্কনের পুরস্কার বিতরণ করেন শাজাদা সুলতানা ও রুমু আহমেদ।

অনুষ্ঠানের রিসেপশন ডেস্কটি সজ্জিত করা হয় বিএডিভির স্মৃতিজাগানিয়া ছবির পোস্টার এর সমারোহে, সেখানে ছিল সারিবদ্ধ ভাবে ইজেলে সজ্জিত বিএডিভি’র ঐতিহাসিক মুহূর্তগুলো, শিল্পী মশিউল আহমেদ এর করা বিএডিভি’র একটি অনবদ্য লোগো-পোস্টার । ছিল থরে থরে উপহার সামগ্রী, বাংলাদেশ-বিএডিভি গোল্ডেন জুবিলী ল্যাপেল পিন, স্মারক উত্তরীয়, বিএডিভি-লাইফ টাইম মেম্বারদের জন্য স্মারকক্রেস্ট সহ আরো উপহার সামগ্রী।

নিউ-জার্সি সুপেরিয়র কোর্ট এর বিচারক :

বিএডিভি’র পক্ষে নিনা আহমেদ এই প্রতিষ্ঠানের তরুণ প্রজন্ম-প্রতিনিধিদের মধ্যে বিচারক রাহাত এন বাবর কে অতিথিদের সম্মুখে পরিচয় করিয়ে দেন । উল্লেখ্য যে রাহাত এন বাবর, প্রাক্তন ডেপুটি এটর্নি জেনারেল, যিনি আমেরিকার নিউ-জার্সি সুপেরিয়র কোর্ট এর বিচারক হিসেবে বাংলাদেশিদের মধ্যে সর্ব প্রথম নিয়োগপ্রাপ্ত হন ২০২২-এ ।

 

গোল্ডেন জুবিলী “বাংলা শিখা” ম্যাগাজিন :

“বাংলা শিখা—বাংলাদেশ , রেডিয়েন্ট মাইলস্টোনস” শীর্ষক একটি ম্যাগাজিন প্রকাশ করেছে বিএডিভি, এটির সার্বিক তত্ত্বাবধানে ছিলেন প্রখ্যাত নাট্যকার, এবং নাট্যআন্দোলনের অগ্রণী সৈনিক, অনুবাদক ও কবি বদরুজ্জামান আলমগীর, বাংলাশিখা’র উন্মোচন উপলক্ষে মঞ্চ আলোকিত করেন বেঙ্গল ইনস্টিটিউট এর ডিরেক্টর প্রখ্যাত আরকিটেক্ট প্রফেসর খালিদ আশরাফ এবং ইউনিভার্সিটি অফ পেনসিলভানিয়ার ডেন্টিস্ট্রি ডিপার্টমেন্ট এর ভাইস-ডীন প্রফেসর হায়দার আলী, বিএডিভি-প্রকাশনাতে বিশেষ অবদানের জন্য বদরুজ্জামান আলমগীরকে বিশেষ সম্মানে ভূষিত করা হয় ।

 

বিএডিভি-র পক্ষ থেকে ধন্যবাদ জানানো হয় ওয়াশিংটন ডিসি বাংলাদেশ মিশন দূতাবাসকে, বাংলাদেশের জাতীয় পতাকাটি বিএডিভি’র কাছে হস্তান্তর করার জন্য, যেটি সিটি হল প্রাঙ্গনে উত্তোলিত হয়, সেইসাথে বিএডিভি বিশেষ কৃতজ্ঞতা জানায় ফিলাডেলফিয়া অফিস অফ সিটি রিপ্রেসেন্টেটিভ এর মিস শিলা হেস, এবং ফিলাডেলফিয়া সিটি মেয়র-অফিস ও মেয়র জিম কেনি- কে ।

এই প্রথম ফিলাডেলফিয়ার ইতিহাসে বাংলাদেশ কমুনিটির বিজয় উৎসব এতো জাকজমকপূর্ণ আয়োজনে বাংলাদেশ এসোসিয়েশন অফ ডেলাওয়্যার ভ্যালি – বিএএডিভিই আয়োজন করেছে , যা সকল অংশগ্রহণকারী ও দর্শক যারা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে অংশগগ্রহন করেছেন তাদের সকলেরই ভূয়সী প্রশংসা অর্জন করেছে। বাংলাদেশ স্বাধীনতার জন্মলগ্ন থেকে বিএডিভি’র উত্থান ও দীর্ঘ পথযাত্রায় বাংলাদেশ স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছর ও বাংলাদেশ এসোসিয়েশন অফ ডেলাওয়্যার ভ্যালি -বিএডিভি’র সুবর্ণ জয়ন্তী উৎসব—প্রকৃত অর্থেই অর্থবহ ও বর্ণিল হয়ে ইতিহাসের পাতায় এবং সম্পৃক্ত অনেকের স্মৃতিতে জ্বলজ্বল করবে বহুদিন।

সূত্র: পরিচয়
আইএ/ ২৬শে ডিসেম্বর ২০২২

Back to top button