জাতীয়

কমিটি গঠনে গুরুত্ব পাবে জাতীয় নির্বাচন

মুহম্মদ আকবর

ঢাকা, ২৪ ডিসেম্বর – বাংলাদেশের অন্যতম প্রাচীন রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের ২২তম সম্মেলন আজ শনিবার অনুষ্ঠিত হবে। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে সকাল সাড়ে ১০টায় শুরু হবে সম্মেলনের উদ্বোধনী পর্ব। বিকাল ৩টায় শুরু হবে কাউন্সিল অধিবেশন। এর মধ্য দিয়ে পালাবদল হয়ে ‘নতুনের কেতন’ উড়বে। কেউ কমিটিতে আসবেন, কেউ বিদায় নেবেন, কারও হবে পদোন্নতি।

সম্মেলনের তারিখ ঘোষণার পরেই শুরু হয় নেতৃত্ব বদলের আলোচনা, জল্পনা-কল্পনা। তবে সভাপতি পদে ৪১ বছরেরও বেশি সময় ধরে দায়িত্বে থাকা শেখ হাসিনার বিষয়ে বাড়তি আলোচনা নেই। নেতৃত্বের চার দশক পেরোলেও এখনো তার বিকল্প ভাবছে না আওয়ামী লীগ। ফলে তিনি আবারও সভাপতির দায়িত্বে যাচ্ছেন। আজকের সম্মেলনে আলোচনার কেন্দ্রে থাকবে সাধারণ সম্পাদকের পদ।

আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের একাধিক সূত্র আভাস দিয়েছে, ওবায়দুল কাদের টানা তৃতীয়বারের মতো সাধারণ সম্পাদক হতে যাচ্ছেন। তবে এই পদে আরও অন্তত ৭ কেন্দ্রীয় নেতার নাম আলোচনায় রয়েছেÑ সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ড. মো. আবদুুর রাজ্জাক, জাহাঙ্গীর কবির নানক, আবদুর রহমান, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল আলম হানিফ, ডা. দীপু মনি, ড. হাছান মাহমুদ ও আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম। তারা নিজেরা প্রার্থিতার কথা না বললেও অনুসারীদের মাধ্যমে প্রত্যাশার কথা ব্যক্ত করছেন।

 

আলোচনায় আছেন গত সম্মেলনে বাদ পড়া বর্তমান নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী, পানিসম্পদ উপমন্ত্রী একেএম এনামুল হক শামীম ও শিক্ষা উপমন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল। তাদের পুনরায় দলের গুরুত্বপূর্ণ পদে ফেরানোর কথা শোনা যাচ্ছে।

দলীয় সূত্র বলছে, আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে এবারের সম্মেলন হবে অনেকটা ‘নিয়ম রক্ষার সম্মেলন’। সম্মেলনে বড় কোনো পরিবর্তন আসবে না। আর এক বছর পরই জাতীয় নির্বাচন। তাই নতুন কমিটি গঠনে এবার জাতীয় নির্বাচন গুরুত্ব পাবে। এ ছাড়া সম্মেলনে জাতীয় নির্বাচনসহ দল ও দেশের সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে নানা দিকনির্দেশনা দেবেন শেখ হাসিনা।

এদিকে গত সম্মেলনের মতো সজীব ওয়াজেদ জয়, সায়মা ওয়াজেদ পুতুল এবং রাদওয়ান মুজিব সিদ্দিক ববিকে ঘিরে চলছে নানা আলোচনা। তারা এবার কেন্দ্রীয় কমিটিতে আসছেন কিনা তা নিয়ে কৌতূহল রয়েছে অনেকের। বৃহস্পতিবার রাতে ওবায়দুল কাদেরের নেতৃত্বে দলের কেন্দ্রীয় নেতারা সজীব ওয়াজেদ জয়কে ফুলেল শুভেচ্ছা জানিয়ে সম্মেলনে আমন্ত্রণ জানান। এই ছবি প্রকাশের পর নানা আলোচনা শুরু হয়।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সম্মেলনে গঠনতন্ত্র ও ঘোষণাপত্রে তেমন কোনো পরিবর্তন আসছে না, বাড়ছে না দলের আকার; বড় পরিবর্তন আসছে না কেন্দ্রীয় কমিটিতেও। প্রতিবারের মতো এবারও সম্মেলনে বিএনপিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। বাংলাদেশে নিযুক্ত বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূতকে আমন্ত্রণ জানানো হলেও কোনো বিদেশি রাজনৈতিক দলের সদস্য বা প্রতিনিধিকে আমন্ত্রণ জানানো হয়নি।

আওয়ামী লীগ নেতারা বলছেন, আওয়ামী লীগ একমাত্র দল, যেখানে অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র আছে। দলীয় কাউন্সিলরদের মতামতের ভিত্তিতে অত্যন্ত শৃঙ্খলার সঙ্গে নেতৃত্বের পরিবর্তন হয়। মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ^াসী নবীন ও প্রবীণের সমন্বয়ে হয় কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটি। এবারও এই ধারা অব্যাহত থাকবে।

বঙ্গবন্ধু পরিবারের তরুণ সদস্যদের রাজনীতিতে আসার বিষয়ে জানতে চাইলে দলের সভাপতিমণ্ডলীর এক সদস্য বলেন, আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে বঙ্গবন্ধু পরিবারের সদস্যদের আসাটাই স্বাভাবিক। না আসাটা বরং অস্বাভাবিক। এই দলের চেতনা এবং গন্তব্য বঙ্গবন্ধুর পরিবার ছাড়া আর কে ভালো বুঝবে। জয়, পুতুল, ববি সরাসরি রাজনীতিতে যুক্ত না হলেও আওয়ামী রাজনীতির রক্ত প্রতিনিয়ত তাদের শরীরে প্রবাহিত হয়।

আভাস পাওয়া গেছে, এবার যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক থেকে দুজন সভাপতিমণ্ডলীতে, সভাপতিমণ্ডলী থেকে দুই-তিনজন উপদেষ্টা পরিষদে জায়গা পেতে পারেন। আবার সাংগঠনিক থেকে একজন বাদ পড়তে পারেন আর দুজনকে যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক করা হতে পারে। সম্পাদক পদ থেকে দুজনকে সাংগঠনিক পদে নেওয়া হতে পারে বলে আলোচনা আছে। এ ছাড়া ৫-৭ জন নতুন নেতার ঠাঁই হতে পারে কেন্দ্রীয় কমিটিতে। এই তালিকায় রয়েছেন ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি মাঈনুদ্দিন হাসান চৌধুরী, বাহাদুর বেপারী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি ব্যারিস্টার সাজ্জাদ হোসেন, ছাত্রলীগের সাবেক সহসভাপতি আবদুল মতিন, খ ম হাসান কবির আরিফ, সাইফুদ্দিন আহমেদ নাসির, এ এইচ এম মাসুদ দুলাল, সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক খলিলুর রহমান খলিল ও সাবেক দপ্তর সম্পাদক কাজী নাছিম আল মোমিন রূপক।

ছাত্রলীগের সাবেক নেতা নির্মল গোস্বামী, ছাত্রলীগের সাবেক নেতা ও প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী মশিউর রহমান হুমায়ুনের নামও আলোচনায় আছে। জাতীয় চার নেতার পরিবারের মধ্যে শহীদ ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলীর নাতি শেহেরিন সেলিম রিপন অথবা তানভীর শাকিল জয় এবং শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলামের মেয়ে ডা. জাকিয়া নূর লিপিকে কেন্দ্রে আনা হতে পারে। এ ছাড়া শহীদ এএইচএম কামরুজ্জামানের ছেলে খায়রুজ্জামান লিটন ও শহীদ তাজউদ্দীন আহমদের কন্যা সিমিন হোসেন রিমিকে পুনরায় দলে রাখা হতে পারে বলে অনেকে মনে করেন।

শুক্রবার দুপুর ১২টার দিকে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় উপদপ্তর সম্পাদক সায়েম খান এবং ঢাকা মহানগর দক্ষিণ আওয়ামী লীগের দপ্তর সম্পাদক রিয়াজউদ্দিন আওয়ামী লীগের সম্মেলনের আমন্ত্রণপত্র নয়াপল্টন বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে গিয়ে পৌঁছে দেন। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত দপ্তর সম্পাদক সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স এই তিনটি আমন্ত্রণপত্র (কার্ড) গ্রহণ করেন। এ ছাড়াও জাতীয় পার্টি, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি), বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ), বিকল্পধারা বাংলাদেশ, জাতীয় গণতান্ত্রিক লীগ, জাতীয় পার্টি (জেপি), সাম্যবাদী দলসহ মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সব দলকে সম্মেলনে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে।

সম্মেলন আয়োজন সম্পন্ন হয়েছে। ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে পদ্মা সেতুর অবয়বের ওপরে নৌকার আদলে বানানো হয়েছে মূল মঞ্চ। থাকবে কঠোর নিরাপত্তা। কাউন্সিলে প্রবেশের ৫টি ফটক থাকবে।

আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ও সম্মেলন প্রস্তুত উপকমিটির সদস্য সচিব মির্জা আজম জানান, সম্মেলন মঞ্চে মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী, শামসুল হক, মাওলানা আবদুর রশীদ তর্কবাগীশ ও হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর ছবি থাকবে। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, জাতীয় চার নেতা, বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা, শেখ হাসিনার পুত্র সজীব ওয়াজেদ জয়, সায়মা ওয়াজেদ পুুুতুলের ছবিও থাকবে।

তিনি আরও বলেন, নেত্রীর সঙ্গে আমাদের ৭৮টি সাংগঠনিক জেলার সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক পতাকা উত্তোলন করবেন। এরপর পায়রা ও বেলুন ওড়াবেন। সম্মেলন স্থলে বিভিন্ন স্টল থাকবে। যেমনÑ বঙ্গবন্ধু মেমোরিয়াল ট্রাস্ট, সিআরআইয়ের স্টল থাকবে। দুই শতাধিক ওয়াশ রুমের ব্যবস্থা করা হয়েছে। পর্যাপ্ত পানির ব্যবস্থাও থাকবে।

অভ্যর্থনা উপকমিটি থেকে জানানো হয়েছে, আজকের সম্মেলনে সারাদেশ থেকে কাউন্সিলর ও প্রতিনিধি হিসেবে প্রায় ১৫ হাজার নেতাকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। এর বাইরে রাজনীতিক, মন্ত্রিসভার সদস্য, সংসদ সদস্য, নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি, পেশাজীবী এবং বিদেশি কূটনীতিকদের আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। সব মিলিয়ে ৫০ হাজার মানুষের দুপুরের খাবারের ব্যবস্থা থাকবে।

মুক্তিবোধ আর প্রগতিবাদী রাজনীতির মূলস্বরকে কেন্দ্র করে রচিত হয়েছে ‘থিম সং’। সাংবাদিক ও গীতিকবি জুলফিকার রাসেলের লেখা গানটি গেয়েছেন দেশের খ্যাতনামা কয়েকজন কণ্ঠশিল্পী। আওয়ামী লীগের দপ্তর সম্পাদক ও প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী ব্যারিস্টার বিপ্লব বড়ুয়ার পরিকল্পনায় গানটির সুর ও সংগীত পরিচালনা করেছেন পাভেল আরিন।

এবারের সম্মেলনে ভিজ্যুয়ালি ও পোস্টার ব্যানারে এবং বক্তৃতায় ‘স্মার্ট বাংলাদেশ’-এর ইঙ্গিত দেওয়া হবে। দলের ২২তম জাতীয় সম্মেলনের সেøাগান ‘উন্নয়ন অভিযাত্রায় দেশরত্ন শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের উন্নত, সমৃদ্ধ ও স্মার্ট বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয়।’

এর আগে আওয়ামী লীগের জাতীয় সম্মেলন হয় দুই দিনব্যাপী। কৃচ্ছ্র সাধনের জন্য তা একদিনে নামিয়ে আনা হয়েছে। ২০১৯ সালে সর্বশেষ সম্মেলন হয়েছিল ২০ ও ২১ ডিসেম্বর।

সূত্র: আমাদের সময়
আইএ/ ২৪ ডিসেম্বর ২০২২

Back to top button