অপরাধ

রেলে আরেক কালোবিড়াল

ঢাকা, ৬ ডিসেম্বর – ‘কালো বিড়ালের’ থাবা থেকে বের হতে পারছে না বাংলাদেশ রেলওয়ে। দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়ছেন রেলের কিছু কর্মকর্তা। কোভিড মহামারীর সময় সুরক্ষাসামগ্রী কেনাকাটায় জড়িয়ে পড়া এবং ইঞ্জিন কেনায় দুর্নীতির সহযোগী ব্যক্তি এখন রেলের সর্বেসর্বা। দুদকের তদন্ত, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের চিঠি, রেলের অভ্যন্তরীণ তদন্তে অনিয়মের প্রমাণÑ সবই তার কাছে তুচ্ছ। তিনি রেলওয়ের অতিরিক্ত মহাপরিচালকের (রোলিংস্টক) চলতি দায়িত্বে থাকা মঞ্জুর-উল আলম চৌধুরী। সম্প্রতি ডেমু ট্রেন চালু করতে গিয়েও অনিয়মের অভিযোগে আলোচনায় এসেছেন তিনি।
‘তৃতীয়’ গ্রেডের এ কর্মকর্তার দাপটে
রেলওয়ের অনেকেই কোণঠাসা। রেলে দ্বিতীয় গ্রেডের তিনজন কর্মকর্তা রয়েছেন। এর মধ্যে দুজন যোগ্যতা অর্জন করেছেন। কিন্তু তাদের ডিঙিয়ে তৃতীয় গ্রেডের কর্মকর্তাকে রেলওয়ে মহাপরিচালকের আসনে বসাতে চলছে তদবির। এমনকি জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রীকে চার পৃষ্ঠার ডিও লেটারও পাঠিয়েছেন রেলমন্ত্রী নূরুল ইসলাম সুজন। ‘পছন্দের ব্যক্তির’ যোগ্যতা হিসেবে মন্ত্রী লিখেছেন, বাংলাদেশ বেতারের তালিকাভুক্ত গীতিকার হওয়ার বিষয়টি। ওই কর্মকর্তার শ্বশুরের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রয়াত স্বামী ড. ওয়াজেদ মিয়ার বন্ধুত্বকেও দেখানো হয়েছে যোগ্যতা হিসেবে।
এ বিষয়ে প্রতিক্রিয়া জানতে এক সপ্তাহ ধরে মন্ত্রীর দপ্তরে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। কিন্তু তিনি সাক্ষাৎ দেননি। দেখা করা যায়নি মঞ্জুর-উল আলম চৌধুরীর সঙ্গেও। তার কক্ষে যতবারই এই প্রতিবেদক গিয়েছেন, ততবারই বলা হয়েছে যে তিনি মিটিংয়ে আছেন।
মন্ত্রী তার ডিও লেটারে লিখেছেন, বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে মঞ্জুর-উল আলমের রচিত ‘মহানায়ক’ ব্যাপক সাড়া জাগিয়েছে। তিনি এ গানের জন্য একাধিক পদক পেয়েছেন। তিনি গভীরভাবে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ধারণকারী ও সংস্কৃতিমনা।
সরকারি চাকরিতে পদোন্নতির জন্য সুপারিশ-তদবির নিষিদ্ধ। ‘সরকারী কর্মচারী (আচরণ) বিধিমালা, ১৯৭৯’-এর বিধি ২০-এ বলা হয়েছে, ‘কোনো সরকারি কর্মচারী তার পক্ষে হস্তক্ষেপ করার জন্য কোনো অনুরোধ বা প্রস্তাব নিয়ে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কোনো সংসদ সদস্য বা অন্যকোনো বেসরকারি ব্যক্তির দ্বারস্থ হতে পারবেন না।’ অথচ রেলমন্ত্রী তার আধা সরকারিপত্রে ওই কর্মকর্তার পদোন্নতির যুক্তি তুলে ধরেছেন চার পৃষ্ঠাজুড়ে।
রেলমন্ত্রীর লিখেছেন, ‘আমি মনে করি মঞ্জুর-উল আলম চৌধুরী ™ি^তীয় গ্রেড প্রাপ্তির যোগ্য এবং একটি অদৃশ্য কারণে তিনি পদোন্নতিবঞ্চিত। তার প্রতি অবিচার হয়েছে।’
আগামী ১২ ডিসেম্বর অবসরে যাওয়ার কথা রেলের বর্তমান মহাপরিচালকের। মহাপরিচালক পদটি গ্রেড-১ পদমর্যাদার। ডিজি হতে হলে আগে গ্রেড ২-এ পদোন্নতি পেতে হবে।
মন্ত্রীর ডিওতে বলা হয়েছে, ‘মঞ্জুর-উল আলম বহু উদ্ভাবনী কাজ করেছেন। তিনি দেশীয় প্রযুক্তিতে সাশ্রয়ী মূল্যে অচল ডেমু ট্রেন চালু করেছেন।’
যদিও ডেমু সচলের বিষয় নিয়ে বিতর্ক আছে। পুরো নভেম্বরে মাত্র ৪ হাজার ৬১৪ জন যাত্রী পরিবহন করেছে ডেমু। আয় হয়েছে মাত্র ৯২ হাজার ৩৮৮ টাকা। সূত্রের খবর, মঞ্জুর-উল আলমের কৃতিত্ব বাড়াতেই ডেমু সচল দেখানো হয়েছে।
জানা গেছে, মঞ্জুর-উল আলমের মূল পদ রেলের পশ্চিমাঞ্চলের প্রধান যন্ত্র প্রকৌশলী। নূরুল ইসলাম সুজন রেলমন্ত্রীর দায়িত্ব পান ২০১৯ সালের জানুয়ারিতে। ওই বছরের ১১ জুলাই তৃতীয় গ্রেডে পদোন্নতি পান মঞ্জুর-উল আলম। এই গ্রেডে থাকা অবস্থায় ২০২০ সালের ১৩ জানুয়ারি থেকে চলতি দায়িত্বে দ্বিতীয় গ্রেডের অতিরিক্ত মহাপরিচালক পদে রয়েছেন।
২০২০ সালের ৭ নভেম্বর রেলের তৎকালীন যুগ্ম সচিব ফয়জুর রহমান ফারুকীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের কমিটি করোনার সুরক্ষাসামগ্রী কেনাকাটায় অনিয়মের প্রতিবেদন জমা দেয় সচিবের দপ্তরে। এতে বলা হয়, উচ্চমূল্যে ৪ কোটি ৬৩ লাখ টাকার কেনাকাটার বিষয়টি প্রমাণিত। প্রতিবেদনের সুপারিশে বলা হয়, কেনাকাটায় সম্পৃক্তদের বিষয়ে কর্তৃপক্ষ ব্যবস্থা নিতে পারে। মঞ্জুর-উল আলমসহ সংশ্লিষ্টদের ভবিষ্যতে কোনো ধরনের সরকারি কেনাকাটায় সম্পৃক্ত না করতে সুপারিশ করে কমিটি।
তদন্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী, কোভিডের সময় ৪০০ টাকার ইনফারেড থার্মোমিটার ৪ হাজার ৪০০ টাকায়, পিপিই দেড় হাজার থেকে ২ হাজার ১০০ টাকায়, এন-৯৫ মাস্ক ২৫০ থেকে ৭২৭ টাকায়, প্রতি লিটার স্যাভলন ৪৪২ টাকা থেকে ৭ হাজার ৫০২ টাকায় এবং পাঁচ টাকার কাপড়ের মাস্ক ৭০ টাকা দরে কেনে রেলওয়ে। ঠিকাদারের সঙ্গে চুক্তি সই বা দরপত্র কার্যক্রম শেষ করার আগেই বসানো হয় থার্মাল স্ক্যানার। অর্থাৎ আগেই জানা ছিল, কোন প্রতিষ্ঠান কাজ পাবে। মেটাল ডিটেক্টর, মাস্ক ও পিপিই সরবরাহের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ভিন্ন ভিন্ন হলেও মালিক ছিলেন একই ব্যক্তি। সিসিএস (পাহাড়তলী) দপ্তরে এমন ২৪টি দরপত্র অনুমোদন দিয়েছিলেন মঞ্জুর-উল আলম।
তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পরও মঞ্জুর-উল আলমকে ™ি^তীয় গ্রেডে পদোন্নতি দিতে বারবার প্রস্তাব করে রেল মন্ত্রণালয়। মন্ত্রীর ডিওতে বলা হয়েছে, করোনাসামগ্রীর দুর্নীতির তদন্ত প্রতিবেদন অজ্ঞাত ব্যক্তি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে দেয়। এ বিষয়ে মতামত জানতে ২০২১ সালের ১১ জানুয়ারি রেল মন্ত্রণালয়কে চিঠি দেয় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়। সাত দিনের মাথায় মন্ত্রণালয়ের চিঠিতে জানানো হয়, মঞ্জুল-উল আলম সুনির্দিষ্টভাবে জড়িত নন। বরং ফিডার পদে তিন বছর চাকরির শর্ত প্রমার্জনের অনুরোধ করা হয়। ৪ ফেব্রুয়ারি ফের চিঠি দেয় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়। রেলওয়ে তখন মঞ্জুর আলমকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দিয়ে সতর্ক করে। রেল সূত্রের ভাষ্য, অভিযোগ থেকে অব্যাহতি দিতেই এসব করা হয়েছিল। বিভাগীয় মামলা হলে পদোন্নতি আটকে যেত।
রেল সূত্রের ভাষ্য, দক্ষিণ কোরিয়ার হুন্দাই রোটেমের কাছ থেকে ২০২০ সালে কেনা হয় সোয়া ৩০০ কোটি টাকার ১০টি লোকোমোটিভ (ইঞ্জিন)। চুক্তি মেনে তৈরি না হলেও তৎকালীন প্রকল্প পরিচালক (পিডি) নুর আহম্মদ হোসেন ইঞ্জিনগুলো গ্রহণে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন। তিনি গতকাল বলেন, এসব ইঞ্জিন কেনায় সাবেক ডিজি শামসুজ্জামান ও এডিজি মঞ্জুর-উল আলম চৌধুরী জড়িত। দুদকের তদন্তেও তাদের নাম এসেছে।
এর পরও ইঞ্জিনগুলো চুক্তি অনুযায়ী তৈরি হয়েছে কিনা, তা তদন্তে সেই মঞ্জুর-উল আলমকেই প্রধান করে কমিটি করে রেল মন্ত্রণালয়। কমিটি নিয়ে তৎকালীন পিডি নূর আহম্মদ হোসেন অভিযোগ করেন, মঞ্জুর-উল আলম মূল দায়ী ব্যক্তিদের একজন। পরে সমালোচনার মুখে অতিরিক্ত সচিব মো. ফারুকুজ্জামানকে আহ্বায়ক করে গত বছরের ১৯ জানুয়ারি তদন্ত কমিটি পুনঃগঠন করা করা হয়। এতে প্রমাণ পাওয়া যায়, চুক্তি অনুযায়ী ইঞ্জিনে যন্ত্রাংশ দেওয়া হয়নি। এ ঘটনায় ঠিকাদার ও পরামর্শকের জরিমানা হলেও রেলের কারও শাস্তি হয়নি। বরং পিডি পদ থেকে নূর আহম্মদকে সরিয়ে দেওয়া হয়।
সাবেক পিডি নূর আহম্মদ হোসেন জানান, ইঞ্জিন কোনাকাটায় দুর্নীতি ধরা পড়ার ভয়ে তাকে পিডির পদ থেকে সরিয়ে সাবেক পিডি হাসান মনসুরকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। আর এসব ঘটনায় সরাসরি সংশ্লিষ্ট এডিজি মঞ্জুর-উল আলম। তা ছাড়া রেলের ইঞ্জিন কেনার দুর্নীতি রেলের তদন্তেও ধরা পড়েছিল। কিন্তু বিভাগীয় মামলা হয়নি।

সূত্র: আমাদের সময়
আইএ/ ৬ ডিসেম্বর ২০২২

Back to top button