জাতীয়

দেশে উচ্চ বায়ুদূষণে বছরে মৃত্যু ৮৮ হাজার

ঢাকা, ৪ ডিসেম্বর – উচ্চমাত্রার বায়ুদূষণের কারণে বছরে বাংলাদেশে ৭৮ থেকে ৮৮ হাজার মানুষ মারা যাচ্ছে। ফলে জিডিপির ক্ষতি হচ্ছে ৩ দশমিক ৯ থেকে ৪ দশমিক ৪ শতাংশ। পাশাপাশি উল্লেখযোগ্যভাবে শ্বাসকষ্ট, কাশি, নিম্ন শ্বাসনালির সংক্রমণ এবং বিষণ্নতার ঝুঁকি বাড়ছে। এ ছাড়া অন্যান্য স্বাস্থ্যগত অবস্থার ঝুঁকি বাড়ায় পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশু, বয়স্ক এবং সহজাত রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের যেমন ডায়াবেটিস, হার্ট বা শ্বাসযন্ত্রের অবস্থা সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে।

বিশ্বব্যাংকের এক নতুন প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।

রবিবার রাজধানীর একটি হোটেলে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হয়। এতে সভাপতিত্ব করেন বিশ্বব্যাংক ঢাকা অফিসের ভারপ্রাপ্ত কান্ট্রি ডিরেক্টর ড্যান ড্যান চেন।

অতিথি ছিলেন সংসদ সদস্য সাবের হোসেন চৌধুরী এবং স্বাস্থ্য সচিব আনোয়ার হোসেন হাওলাদার। বক্তব্য দেন বিশ্বব্যাংকের হেলথ স্পেশালিস্ট ওয়ামেগ আজফার রাজা প্রমুখ।

‘ব্রিদিং হেভি: নিউ ইভিডেন্স অন এয়ার পলিউশন অ্যান্ড হেলথ ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক প্রতিবেদনে ঢাকা ও সিলেটের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর বহিরাঙ্গন বায়ুদূষণের প্রভাব মূল্যায়ন করা হয়।

স্বাস্থ্যের ওপর বায়ুদূষণের প্রভাব কমানোর জন্য, প্রতিবেদনে জনস্বাস্থ্য পরিষেবা এবং প্রতিক্রিয়া প্রক্রিয়ার উন্নতি, বায়ুদূষণের ডেটা মনিটরিং সিস্টেমের উন্নতি, প্রারম্ভিক ওয়েমিং সিস্টেমে বিনিয়োগ এবং আরো গবেষণাসহ অবিলম্বে পদক্ষেপের সুপারিশ করা হয়েছে।

প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ঢাকা শহরের বড় বড় নির্মাণ এবং ক্রমাগত যানবাহনসহ সাইটগুলোতে বায়ু দূষণের মাত্রা সবচেয়ে বেশি। এ সাইটগুলোতে সূক্ষ্ম কণা পদার্থ পাওয়া যাচ্ছে, যা স্বাস্থ্যের জন্য সবচেয়ে বিপজ্জনক বলে মনে করা হয়। ঢাকায় বায়ুদূষণের অবস্থা হচ্ছে এয়ার কোয়ালিটি নির্দেশিকা থেকে গড়ে ১৫০ শতাংশ বেশি, যা প্রতিদিন প্রায় ১ দশমিক ৭ শতাংশ সিগারেট ধূমপানের সমতুল্য। মাত্রার দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ঘনত্ব বৃহত্তর ঢাকার ইটভাটার কাছে পাওয়া যায়, যা সহনীয় মাত্রার চেয়ে ১৩৬ শতাংশ বেশি, প্রতিদিন ১ দশমিক ৬ সিগারেট খাওয়ার সমান।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ইটভাটাসহ দেশের অন্যান্য স্থানের তুলনায় প্রধান নির্মাণ এবং যানজটের কাছাকাছি বসবাসকারী শিশুদের মধ্যে নিম্ন শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণের ঘটনা উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি ছিল। সিলেট বিভাগ, যেখানে দেশের সবচেয়ে বিশুদ্ধ বায়ু রয়েছে, এখনো ডব্লিউএইচও নির্দেশিত জিআই এম ডব্লিউ পিএম-২ ঘনত্বের মাত্রা ৮০ শতাংশ বেশি অনুভব করে। এটি প্রতিদিন ১২টি সিগারেট খাওয়ার সমান।

সাবের হোসেন চৌধুরী বলেন, ধূমপান বন্ধ করতে হবে। প্রধানমন্ত্রী নির্দেশনা অনুযায়ী গত ৭ বছরেও এ নিয়ে কোন গাইডলাইন হয়নি। এটা দুঃখজনক। ব্রিটিশ আমেরিকা টোব্যাকোতে সরকারের ৭ শতাংশ শেয়ার থাকলেও এর বোর্ডে আছে ৬০ শতাংশ প্রতিনিধি সরকারের সিনিয়র সচিব ও সচিবের মতো মানুষ। ফলে তাদের কারণে ধূমপান বন্ধে কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া যাচ্ছে না।

আনোয়ার হোসেন হাওলাদার বলেন, অবকাঠামো তৈরির সময় পরিবেশ সংক্রান্ত নিরাপত্তা মানা হচ্ছে না। সরকারি বরাদ্দ থাকলেও ঠিকাদাররা কাজে লাগাচ্ছে না। ইটভাটা ও এসব কাজে যারা যুক্ত তারা এত ক্ষমতাবান যে আমরা কুলিয়ে উঠতে পারি না। কিন্তু তাই বলে তো হাত গুটিয়ে বসে থাকতে পারি না।

ড্যান ড্যান চেন বলেন, পরিবেষ্টিত বায়ুদূষণ একজন শিশু থেকে বয়স্ক সবাইকেই ঝুঁকির মধ্যে ফেলে। ২০১৯ সালে বায়ুদূষণ ছিল বাংলাদেশে মৃত্যু ও অক্ষমতার দ্বিতীয় বৃহত্তম কারণ। বিশ্লেষণমূলক কাজ এবং নতুন বিনিয়োগের মাধ্যমে, বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশকে বায়ুদূষণ কমাতে সাহায্য করছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, বায়ুদূষণের কারণে বাংলাদেশে ২০১৯ সালে প্রায় ৭৮-৮৮ জন মারা গেছে। দেশের অভ্যন্তরে বায়ুদূষণের মাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে পরিবর্তিত হলেও, সমস্ত অঞ্চলে পিএম-এর ঘনত্ব এয়ার কোয়ালিটি নির্দেশিকা দিয়ে সুপারিশ করা থ্রেশহোল্ডের উল্লেখযোগ্যভাবে ওপরে। সবচেয়ে দূষিত বিভাগ ঢাকা এবং সবচেয়ে কম দূষিত সিলেট। ২০১৮ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত ঢাকা বিশ্বের দ্বিতীয় দূষিত শহর হিসাবে স্থান পেয়েছে। পশ্চিমাঞ্চল (খুলনা ও রাজশাহী) পূর্বাঞ্চলের (সিলেট ও চট্টগ্রাম) চেয়ে বেশি দূষিত। ঢাকা বিভাগে, স্থানীয় দূষণ ছাড়াও, মোট পিএমএস ঘনত্বের এক-পঞ্চমাংশ পর্যন্ত আন্তসীমান্ত উৎস থেকে আসে।

এতে বলা হয়, ডব্লিউএইচও নির্দেশিত মাত্রার তুলনায় পিএমএএসএর সংস্পর্শে এক শতাংশ বৃদ্ধির ফলে একজন ব্যক্তির শ্বাসকষ্টের সম্ভাবনা ১২ দশমিক ৮ শতাংশ বৃদ্ধি পেতে পারে। ভেজা কাশি হওয়ার সম্ভাবনা ১২ দশমিক ৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেতে পারে এবং নিম্ন শ্বাসকষ্টে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি ৮ দশমিক ১ শতাংশ বেশি হতে পারে।

আরো বলা হয়, বায়ুদূষণ মানসিক স্বাস্থ্যকেও প্রভাবিত করে। বড় নির্মাণ এবং ক্রমাগত ট্র্যাফিকসহ অবস্থানগুলিতে বিষণ্নতা সবচেয়ে বেশি রিপোর্ট করা হয়। গবেষণায় দেখা গেছে, ডব্লিউএইচও নির্দেশিত মাত্রার ওপর পিএম-২ এর সংস্পর্শে এক শতাংশ বৃদ্ধি হতাশাগ্রস্ত হওয়ার ২০ শতাংশ উচ্চ সম্ভাবনার সঙ্গে যুক্ত।

ওয়ামেগ আজফার রাজা বলেন, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তন এবং নগরায়ণ বায়ুদূষণকে আরো তীব্র করবে স্বাস্থ্য খাত। বায়ুদূষণ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে আসন্ন স্বাস্থ্য সংকট মোকাবিলা করার জন্য ভালোভাবে প্রস্তুত থাকতে হবে।

সূত্র: দেশ রূপান্তর
আইএ/ ৪ ডিসেম্বর ২০২২

Back to top button