সচেতনতা

স্ট্রোকের আঘাত থেকে শত হাত দূরে থাকতে যা করবেন

কাউকে যদি কল্পনা করতে বলা হয় তার এক হাত, এক পা এবং মুখের এক পাশ ব্যবহার না করে দিনের স্বাভাবিক কাজগুলো করার চেষ্টা করতে, তা হলে তার পক্ষেই কিছুটা অনুভব করা সম্ভব, স্ট্রোক আক্রান্ত একজন রোগীর জীবন কতটা ভয়াবহ বিপর্যয়ের মধ্যে দিয়ে যায়।

স্ট্রোক মস্তিষ্কের মারাত্মক একটি রোগ। এতে মস্তিষ্কের রক্তনালিতে জটিলতা দেখা দেয়, হঠাৎ করে মস্তিষ্কের একাংশ কার্যকারিতা হারিয়ে ফেলে। মস্তিষ্কের কোষ অত্যন্ত সংবেদনশীল। অক্সিজেন ও শর্করা সরবরাহে একটু হেরফের হলে কোষগুলো মারতে থাকে। যদি মস্তিষ্কের কোনো অংশের রক্ত চলাচল বিঘ্নিত হয় (আঘাতজনিত কারণ ছাড়া) এবং তা ২৪ ঘণ্টার বেশি স্থায়ী হয় কিংবা ২৪ ঘণ্টার মধ্যে রোগী মৃত্যবরণ করে, তা হলে এ অবস্থার নামই স্ট্রোক।

স্ট্রোকে প্যারালাইসিসের (পক্ষাঘাত) মতো উপসর্গ দেখা দেয়। কিছু স্ট্রোকে রোগীর মৃত্যুও হতে পারে। স্ট্রোক হলে শরীরের যে কোনো একদিকে হাত-পা ও মুখমণ্ডল প্যারালাইসিস হয়ে যায়। মস্তিষ্কের ভেতর স্ট্রোক যদি বাম দিকে হয়, তা হলে ডান দিকের হাত-পা এবং ডান দিকে স্ট্রোক হলে বাম দিকের হাত-পা প্যারালাইসিস হয়ে যায়। মোটকথা, ব্রেইনের যে যে অংশ শরীরের যে যে অংশ নিয়ন্ত্রণ করে, সেই সেই অংশ স্ট্রোকে আক্রান্ত হলে শরীরের ওই স্থানগুলো অকেজো হয়ে পড়ে। স্ট্রোকের ধরন ও পরিমাপ অনুযায়ী প্যারালাইসিসের ধরন ও পরিমাপ নির্ভরকরে।

আমাদের অনেকের মধ্যেই এ ভুল ধারণা বিদ্যমান যে, স্ট্রোক ও হার্ট অ্যাটাক একই রোগ। মনে রাখতে হবে, স্ট্রোক হয় মস্তিষ্কে আর হার্ট অ্যাটাক হয় হৃৎপিণ্ডে। চিকিৎসার জন্য হাসপাতালও ভিন্ন ভিন্ন। প্রতিটি রোগ নিরাময়ে নির্দিষ্ট বিভাগ ও ডাক্তার থাকেন। স্ট্রোকের চিকিৎসার জন্যও আলাদা বিভাগ এবং ডাক্তার রয়েছেন। স্ট্রোকের লক্ষণ বুঝে রোগীকে দ্রুত নির্দিষ্ট হাসপাতালে নিয়ে গেলে সুস্থ হওয়ার সম্ভাবনা অনেক গুণ বেড়ে যায়।

স্ট্রোকের লক্ষণ: হঠাৎ করে শরীরের একাংশ অবশ বা দুর্বল হয়ে যাওয়া, মাথাব্যথা ও বমি হওয়া, হঠাৎ অজ্ঞান হওয়া বা কথা জড়িয়ে যাওয়া অথবা একেবারেই কথা বলতে না পারা। স্ট্রোক হলে মাথা ঝিমঝিম করে, প্রচণ্ড মাথাব্যথার সঙ্গে ঘাড়, মুখ ও দুই চোখের মাঝখান পর্যন্ত ব্যথা হয়। হাঁটতে বা চলাফেরা করতে এবং শরীরের ভারসাম্য নিয়ন্ত্রণে রাখতে সমস্যা হয়। কথাবার্তা জড়িয়ে যায়, অস্পষ্ট শোনায়। শরীরের একপাশ দুর্বল, অসাড় কিংবা দুটি দৃশ্য দেখা, বমি-বমি ভাব বা বমি হওয়ার মতো ঘটনা ঘটে।

স্ট্রোকের লক্ষণ মনে রাখার জন্য ঋঅঝঞ শব্দটি মনে রাখতে হবে। যেমন- ঋ-তে ঋধপব (মুখমণ্ডল): মুখের একদিক বাঁকা হয়ে যাওয়া। অ-তে অৎস (হাত): এক হাত দূর্বল হয়ে পড়া। ঝ-তে ঝঢ়ববপয (কথা): কথা জড়িয়ে আসা। ঞ-তে ঞরসব (সময়): যত দ্রুত সম্ভব হাসপাতালে নিয়ে আসা। হঠাৎ কারও ক্ষেত্রে লক্ষণগুলো দেখা দিলে বুঝতে হবে, তার স্ট্রোক হয়েছে। এক্ষেত্রে আতঙ্কিত না হয়ে, সময় নষ্ট না করে রোগীকে দ্রুত হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নিয়ে যেতে হবে। সঠিক সময়ে চিকিৎসার মাধ্যমে স্ট্রোকের রোগীকে সুস্থ করে তোলা সম্ভব।

স্ট্রোকে আক্রান্ত রোগীর চিকিৎসার জন্য সরকারিভাবে বিশেষায়িত হাসপাতাল হচ্ছে- ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস ও হাসপাতাল। এটি ঢাকার আগারগাঁওয়ে অবস্থিত।

চিকিৎসা: দুই ধরনের স্ট্রোকের সেটিই হোক না কেন, ভালো-মন্দ নির্ভর করে প্রাথমিক মেডিক্যাল ও পুনর্বাসন চিকিৎসা কতটা দ্রুত, কার্যকর ও সার্থকভাবে দেওয়া হয়েছে, তার ওপর।

স্ট্রোকের রোগীর ক্ষেত্রে কিছু সতর্কতা প্রয়োজন। যেমন- শ্বাসনালিতে সমস্যা হলে বা শ্বাস নেওয়া বন্ধ হয়ে গেলে মুখে মুখ লাগিয়ে শ্বাস দিতে হবে। বমি হলে মাথা একদিকে কাত করে দিতে হবে। আক্রান্ত ব্যক্তিকে কোনো খাবার বা পানি খাওয়ানো যাবে না। অজ্ঞান রোগীর ক্ষেত্রে শ্বাসনালি, শ্বাস-প্রশ্বাস ও রক্তসঞ্চালন নিয়মিত রাখতে হবে। রোগীকে একদিকে কাত করে শুয়ে দিতে হবে। চোখ ও প্রস্রাবথলির যত্ন নিতে হবে। প্রয়োজনে ক্যাথেটার ব্যবহার করতে হবে। রোগীর সঙ্গে কমপক্ষে দুজন ব্যক্তিকে হাসপাতালে যেতে হবে। পরীক্ষা ও চিকিৎসা দ্রুত সম্পন্ন করতে হবে।

প্রতিরোধের উপায়: স্ট্রোক প্রতিরোধ করা যায়। এজন্য স্ট্রোকের ঝুঁকি সম্পর্কে জানা এবং স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন করতে হবে। স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন অর্থ নিয়মিত রক্তচাপ পরীক্ষা ও নিয়ন্ত্রণে রাখা। বেশি চর্বি জাতীয় খাবার না খাওয়া, কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে রাখা, সঠিক নিয়মে সময়মতো ও সঠিক পরিমাণে খাবার খাওয়া। ডায়াবেটিস পরীক্ষা ও সতর্কভাবে তা নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে। প্রতিদিন কিছু শারীরিক পরিশ্রম করা বা সময় করে হাঁটা, সম্ভব হলে হালকা দৌড়ানো। শরীর যেন মুটিয়ে না যায় অর্থাৎ ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখা। শাকসবজি, ছোটমাছ, সামুদ্রিক মাছ, শুঁটকিমাছ, দুধ, ভূষিসমৃদ্ধ খাবার খাওয়া উচিত।

আইএ

Back to top button