জাতীয়

১০ ডিসেম্বর: বিএনপির চাওয়ায় ডিএমপির ‘না’

মেসবাহ য়াযাদ

ঢাকা, ২৪ নভেম্বর – রাজনৈতিক অঙ্গনে সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে আলোচিত বিষয় ১০ ডিসেম্বর বিএনপির ঢাকা বিভাগীয় গণসমাবেশ। এই সমাবেশকে ঘিরে কয়েক স্তরের পরিকল্পনা করছে দলটি। যেকোনো পরিস্থিতিতে সব ধরনের বিকল্প ব্যবস্থাও ভেবে রাখছেন দলের নীতি-নির্ধারকরা। অন্তত পাঁচ লাখ লোক সমাগম করে বিএনপি তার শরিকদলগুলোকে সাথে নিয়ে ঢাকা থেকে ঘোষণা দিতে চায় যুগপৎ আন্দোলনের। এজন্য সমাবেশের স্থান নিয়ে কয়েকটি বিকল্প ভাবাও হয়েছে দলের পক্ষ থেকে।

১০ ডিসেম্বরে গণসমাবেশ করার জন্য রাজধানীতেই অনুমতি পাওয়ার আশা নিয়ে সমাবেশের প্রস্তুতি নিচ্ছে বিএনপি। যদিও বিএনপি ঘোষিত এই কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে নির্দিষ্ট জায়গার অনুমতি বিষয়ে এখনও অফিসিয়ালি কিছু বলেনি ডিএমপির তরফ থেকে। বিএনপির সূত্র জানিয়েছে, অবশ্য সমাবেশের স্থান বিষয়ে পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, নয়াপল্টনের দলীয় কার্যালয় বা সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে নয়, ১০ ডিসেম্বর বিএনপিকে গণসমাবেশের জন্য বিকল্প স্থানের ব্যাপারে অনানুষ্ঠানিক প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। কিন্তু সেটা মানতে নারাজ বিএনপি।

ডিএমপি সূত্রে জানা যায়, বিএনপির ঢাকা বিভাগীয় গণসমাবেশ শহরে না করে টঙ্গী ইজতেমা মাঠ, পূর্বাচল বাণিজ্য মেলার মাঠ কিংবা মিরপুরের কালশীতে করার জন্য দলটিকে মৌখিকভাবে প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। পুলিশের এমন প্রস্তাবনার সমালোচনা করে বিএনপি নেতাকর্মীরা বলছেন, ঢাকার মহাসমাবেশ যেকোনো মূল্যে মহানগরের মধ্যেই করতে দিতে হবে। পুলিশ অনুমতি না দিলেও সেটা করা হবে।

এর আগে, মঙ্গলবার (১৫ নভেম্বর) সমাবেশের অনুমতির জন্য বিএনপির প্রতিনিধি দল ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনার খন্দকার গোলাম ফারুকের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন। সাক্ষাৎ শেষে বিএনপি ঢাকা মহানগর উত্তরের আহ্বায়ক আমান উল্লাহ আমান বলেন, তারা ১০ ডিসেম্বর রাজধানীর নয়াপল্টন কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে শান্তিপূর্ণ গণসমাবেশ করতে চান। সমাবেশকে কেন্দ্র করে যাতে গণপরিবহন বন্ধ করে দেওয়া না হয়, সে বিষয়েও ডিএমপি কমিশনারের কাছে জানানো হয়েছে বলে উল্লেখ করেন আমান। ডিএমপি কমিশনারের পক্ষ থেকে বিএনপির নেতাদের বলা হয়েছে, তারা আলোচনা করে জানাবেন।

ডিএম‌পি ক‌মিশনারের স‌ঙ্গে সাক্ষা‌তের সময় বিএন‌পি প্রতিনিধি দলে ছিলেন ঢাকা মহানগর দ‌ক্ষি‌ণের আহ্বায়ক আব্দুস সালাম, উত্ত‌রের আহ্বায়ক আমান উল্লাহ আমান, কেন্দ্রীয় যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল, সাংগঠনিক সম্পাদক অ্যাডভোকেট আব্দুস সালাম, প্রচার সম্পাদক ও বিএনপি মিডিয়া সেল সদস্য সচিব শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানি, বিএনপি ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণ সদস্য সচিব আমিনুল হক ও রফিকুল আলম মজনু।

শহরের মধ্যে অনুমতি না দেওয়ার পক্ষে ডিএমপির নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, বিএনপির ১০ ডিসেম্বরের গণসমাবেশে তৃতীয়পক্ষ সুযোগ নিতে পারে। আর সেটা হলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি এবং জান-মালের ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বিশেষ করে জামায়াত-শিবিরের উপস্থিতি নিয়ে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে।

যদিও বিএনপির পক্ষ থেকে এই বিষয়ে পুলিশকে আশ্বস্ত করা হয়েছে। গণসমাবেশের অনুমতি নিতে গিয়ে বিএনপি নেতারা বলেছেন, ১০ ডিসেম্বরের গণসমাবেশে জামায়াত-শিবির থাকবে না, এটা বিএনপির নিজস্ব কর্মসূচি।

সমাবেশ ঘিরে বিএনপির প্রস্তুতি নিয়ে দলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ঢাকার বিভাগীয় গণসমাবেশ সামনে রেখে এরই মধ্যে ব্যবস্থাপনা, প্রচার, অভ্যর্থনা, শৃঙ্খলাসহ কয়েকটি উপ-কমিটি গঠন করা হয়েছে। আগামী ২৫ নভেম্বর নাগাদ এসব কমিটি চূড়ান্ত করা হবে। প্রস্তুতি কমিটির মূল দায়িত্বে রয়েছেন দলের ভাইস চেয়ারম্যান আব্দুল্লাহ আল নোমান এবং উপদেষ্টা হিসেবে রয়েছেন স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস।

দলের পাঁচ শতাধিক বিশ্বস্ত ও নির্ভরযোগ্য নেতাকর্মীর সমন্বয়ে তৈরি করা হচ্ছে স্বেচ্ছাসেবক টিম। গণসমাবেশকে কেন্দ্র করে থাকবে নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় সিসিটিভি ক্যামেরা ও ড্রোন। সমাবেশ থেকে বিক্ষোভ, মিছিল, পথসভা, লংমার্চ, হরতাল, অবরোধসহ সিরিজ কর্মসূচি আসতে পারে। এই কর্মসূচির মাধ্যমে বিএনপি শরিকদের সঙ্গে যুগপৎ আন্দোলনের যাত্রা শুরু করবে। পাশাপাশি ক্ষমতায় এলে পুরো রাষ্ট্র ব্যবস্থাকে আধুনিকায়নের মাধ্যমে কীভাবে পরিবর্তন করা হবে এর একটি রূপরেখাও তুলে ধরা হতে পারে সমাবেশ থেকে।

গণসমাবেশকে কেন্দ্র করে অন্যান্য বিভাগীয় শহরের মতো ঢাকাতেও সরকারি তরফ থেকে বাধা আসতে পারে- এই আশঙ্কায় নেতাকর্মীদের সমাবেশে উপস্থিতি নিশ্চিত করতে প্রয়োজনে এক সপ্তাহ আগে থেকে ঢাকায় চলে আসার ব্যাপারে বলা হয়েছে। ঢাকায় এসে গ্রেপ্তার এড়িয়ে আত্মীয়ের বাসা ও হোটেলে সতর্কাবস্থায় থাকা, যাদের থাকার জায়গা নেই তাদের নেতাকর্মীদের বাসা-বাড়িতে রাখার জন্য বলা হয়েছে। প্রয়োজনে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে নেতাকর্মীদের থাকার ব্যবস্থা করা হবে বলেও জানিয়েছেন দলের নীতিনির্ধারক পর্যায়ের নেতারা। এ ব্যাপারে ডিসেম্বরের ৫ তারিখ স্থায়ী কমিটির সভায় সব বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলেও জানান তারা।

ঢাকা বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক আব্দুস সালাম আজাদ বলেন, আমরা নয়াপল্টনে বিভাগীয় গণসমাবেশ করার প্রস্তুতি নিয়ে এগোচ্ছি। কিন্তু পুলিশ টঙ্গী ইজতেমা মাঠ, পূর্বাচল বাণিজ্য মেলা মাঠে করার কথা বলছে। এখনও পুলিশের তরফ থেকে চূড়ান্ত কিছু জানানো হয়নি।

নয়াপল্টনে সমাবেশ করতে চাওয়ার কারণ সম্পর্কে বিএনপির প্রচার সম্পাদক ও মিডিয়া সেল সদস্য সচিব শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানি বলেন, পরিবহন ধর্মঘট ডাকা হলে কয়েকদিন আগে থেকেই নেতাকর্মীদের ঢাকায় এসে থাকতে হবে। নয়াপল্টনে সমাবেশ হলে সেক্ষেত্রে বিভিন্ন জেলা থেকে আসা নেতাকর্মীদের থাকা-খাওয়া কিংবা কোনও বাধা এলে তা মোকাবিলা করা সহজ হবে। কারণ কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের আশপাশের অলিগলি সবই পরিচিত। গুরুত্বপূর্ণ অনেক নেতাদের বাসাও রয়েছে এই এলাকায়।

গণসমাবেশে কত লোকের অংশগ্রহণ আশা করছেন? জবাবে এই নেতা বলেন, ঢাকা বিভাগে আমাদের ১১টি সাংগঠনিক জেলা রয়েছে। এর মধ্যে ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর থেকেই আশা করছি চার লাখ লোকের সমাগম হবে। দেশের অন্য জেলাগুলো থেকে এক-দেড় হাজার করে নেতাকর্মী এলে পাঁচ লাখ লোকের উপস্থিতি হবে।

ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির সদস্য সচিব আমিনুল হক বলেন, গণসমাবেশ নিয়ে আমরা সবদিকে সতর্ক রয়েছি। নিকট অতীতে সরকারের তরফ থেকে আমাদের প্রতিটি বিভাগীয় সমাবেশে বাধা দিয়েছে, প্রশাসন দিয়ে প্রতিহত করার চেষ্টা করেছে; দলীয় ক্যাডার দিয়ে আক্রমণ করেছে- তাই এবার আমরা সব দিক থেকেই প্রস্তুতি রেখেছি।

ঢাকা বিভাগীয় গণসমাবেশ বিষয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস বলেন, আমাদের অভিজ্ঞতা বলছে ১০ ডিসেম্বর ঢাকার মহাসমাবেশে কয়েক লাখ মানুষের উপস্থিতি হবে। ১০ ডিসেম্বরের গণসমাবেশ হবে শান্তিপূর্ণ। কিন্তু সরকার যদি সেই সমাবেশে বাধা দেয়, তাহলে বাঁধবে লড়াই। এই মহাসমাবেশ থেকেই সরকার পতনের আন্দোলন চালিয়ে যেতে কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে। আমরা চাই, শান্তিপূর্ণ কর্মসূচির মাধ্যমে জনগণ তার অধিকার আদায় করে নেবে।

গণসমাবেশের স্থান এবং সার্বিক প্রস্তুতি বিষয়ে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু বলেন, ঢাকায় শান্তিপূর্ণ গণসমাবেশ করার জন্য আইনের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে পুলিশ কর্তৃপক্ষের কাছে অনুমতি চেয়েছি। তারা আওয়ামী লীগকে সমাবেশ করার অনুমতি দিয়েছে। আমাদের সমাবেশের অনুমতি দিতে গড়িমসি করছে। যদিও কোনও বাধা-ই গণসমাবেশকে আটকে রাখতে পারবে না। আমাদের ১০ ডিসেম্বরের গণসমাবেশ ঢাকাতেই হবে এবং আমাদের নির্ধারিত স্থানে। সমাবেশকে কেন্দ্র করে কোনও বাধা আসলে সেটা বিএনপি সাংগঠনিকভাবে মোকাবিলা করবে।

বিএনপির ১০ ডিসেম্বরের গণসমাবেশের অনুমতির বিষয়ে সবশেষ আপডেট জানতে চাইলে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশনস বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার মো. ফারুক হোসেন বলেন, বিএনপির প্রতিনিধিদল সমাবেশের অনুমতি চেয়েছে এবং তারা নির্ধারিত জায়গা চায়। এই বিষয়ে এখনো কোনও সিদ্ধান্ত হয়নি। আমাদের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা এ বিষয়টি যখন সিদ্ধান্ত নেবেন তখন বিস্তারিত জানানো হবে।

সূত্র: রাইজিংবিডি
এম ইউ/২৪ নভেম্বর ২০২২

Back to top button