এশিয়া

ইসলামপন্থি দলের উত্থান কী বার্তা দিচ্ছে

কুয়ালালামপুর, ২২ নভেম্বর – মালয়েশিয়ার সাধারণ নির্বাচনে একটি রক্ষণশীল ইসলামপন্থি দলের নাটকীয় উত্থান দেশটির ভবিষ্যৎ গতিমুখ নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখতে পারে। ইসলামী শরিয়াহ অনুযায়ী দেশ পরিচালনার দাবিতে সোচ্চার দলটিকে ভবিষ্যৎ সরকারে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় দেখা যেতে পারে। এটি মুসলিমপ্রধান দেশটির উদারপন্থি নীতি ও বিদেশি বিনিয়োগকে প্রভাবিত করতে পারে।

সাবেক প্রধানমন্ত্রী মুহিউদ্দিন ইয়াসিনের পেরিকাটান ন্যাশনাল (পিএন) জোটের শরিক প্যান-মালয়েশিয়ান ইসলামিক পার্টি (স্থানীয় ভাষায় পার্টি ইসলাম সে-মালয়েশিয়া বা পাস) শনিবারের নির্বাচনে ফেডারেল স্তরে সবচেয়ে বড় দল হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।

এটি দেশটিতে বড় প্রভাব ফেলবে। নির্বাচনে আনোয়ার ইব্রাহিমের পাকাতান হারাপান (পিএইচ) জোট সবচেয়ে বেশি আসন জিতেছে বটে, তবে বড় বিজয়ী স্পষ্টতই পিএনের শরিক দল পাস। সবাইকে অবাক করে দিয়ে পাস ২২২ আসনের সংসদে ৪৯টি জিতে নিয়েছে। এর আগেই এটি ব্যাপকভাবে মনে করা হতো, পাস এবং এর রক্ষণশীল ইসলামের ব্র্যান্ড প্রধানত উত্তর মালয় রাজ্যের তেরেঙ্গানু, কেলান্টান, পার্লিস ও কেদাহর মধ্যে সীমাবদ্ধ। এটি কখনও ফেডারেল রাজনীতির খেলোয়াড় হবে বা ২২২ আসনের পার্লামেন্টে ১০ শতাংশের বেশি পাবে বলে আশা করা হয়নি। গত তিনটি সাধারণ নির্বাচনে পাস ১৮ থেকে ২৩ আসন জিতেছে।

এবার ব্যতিক্রমী সাফল্যের একটি বড় কারণ হলো, প্রবীণদের পাশাপাশি নতুন ভোটারদের কাছেও তাঁদের গ্রহণযোগ্যতা বেড়েছে। দলটি তার ঐতিহ্যগত দুর্গের বাইরেও জিতেছে।

উদাহরণস্বরূপ পাস পেনাংয়ে দুটি আসন জিতেছে। এখানে দেশটির একমাত্র চীনা বংশোদ্ূ্ভত মুখ্যমন্ত্রী রয়েছে। এটি দেশটির সবচেয়ে উদার রাজ্য হিসেবে বিবেচিত। এখানে আনোয়ার ইব্রাহিম, তাঁর স্ত্রী এবং সম্প্রতি তাঁর কন্যা জয়লাভ করেছিলেন।

জাতিগত ও ধর্মীয় রাজনৈতিক পটভূমিতে এই পরিবর্তনের বড় প্রভাব দেখা যেতে পারে। মালয়েশিয়ার ৩ কোটি ৩ লাখ জনসংখ্যার অধিকাংশই মালয় ও মুসলিম। তবে দেশটিতে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক জাতিগত চীনা ও ভারতীয় সংখ্যালঘু বাস করে।

প্রাথমিক প্রতিবেদনে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে, নতুন তরুণ ভোটাররাও পাসকে সমর্থন করেছেন, যদিও তাঁরা বেশি সংখ্যায় ভোটকেন্দ্রে যাননি। বোঝা যাচ্ছে, মালয়েশিয়ার রাজনীতিতে বিশাল পরিবর্তন ঘটেছে। রক্ষণশীল ধর্মীয় রাজনীতির ব্র্যান্ড আরও আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে। দেশটিতে রাজনৈতিক ইসলাম মূলধারায় পরিণত হয়েছে।

এটি মালয়েশিয়ার ভবিষ্যতের ওপর বিশাল প্রভাব ফেলবে। বিশ্নেষকরা বলেছেন, পিএইচ জোটের ৮১টি আসন থাকা সত্ত্বেও সরকার গঠনের জন্য যথেষ্ট সমর্থন জোগাড় করা চ্যালেঞ্জিং হবে। মুহিউদ্দিনের পিএন জোট ৭৩টি আসন পেলেও সংখ্যাগরিষ্ঠতা তথা ১১২ আসন নিশ্চিত করা তাদের জন্যও দুরূহ ব্যাপার। সুতরাং পাস এই জোটের অংশ হতে পারে, যা আগামী কয়েক বছরে মালয়েশিয়া শাসন করবে।

পাসের নির্বাচনী সাফল্য এটিকে রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা দিয়েছে। দলটি মুহিউদ্দিনের পার্টি প্রিবুমি বারসাতু মালয়েশিয়াকে (বারসাতু) বামনে পরিণত করেছে। মুহিউদ্দিনের দল জোটের প্রধান দল হলেও মাত্র ২৪টি আসনে জয়লাভ করেছে।

পাস মালয়েশিয়াকে মৌলিকভাবে পরিবর্তনের ক্ষমতা অর্জন করবে, যদি দলটি ভবিষ্যৎ জোট সরকারে মূল মন্ত্রণালয়গুলো পায় এবং এটি আরও ধর্মভিত্তিক জননীতির জন্য চাপ দেয়। ধরুন, তারা শিক্ষা মন্ত্রণালয় পেলে পরবর্তী প্রজন্মের চিন্তাভাবনার ওপর প্রভাব সৃষ্টি করতে পারে। পাস ইতোমধ্যেই মালয় হৃদস্থলে সফলভাবে সমর্থনের শক্ত ভিত্তি তৈরি করেছে। আশির দশক থেকে দলটির সমর্থকরা সক্রিয়ভাবে প্রাইভেট কিন্ডারগার্টেন ও তাহফিজ (ধর্মীয় বিদ্যালয়) প্রতিষ্ঠা করেছে।

দলটি এখন যে কোনো ক্ষমতাসীন জোটের অন্তত এক-তৃতীয়াংশ শক্তি হবে। ফলে কোনো প্রধানমন্ত্রী এত বড় অংশকে উপেক্ষা করতে পারেন না। এখন দেখার বিষয়, পাস মূলধারায় পরিণত হওয়ায় তার অবস্থানকে সংযত করবে কিনা।

যে কোনো ফেডারেল সরকারে পাসের প্রভাব সম্পর্কে অনেক মালয়েশিয়ানের বড় ভয় হচ্ছে- দলটি আরও বেশি ধর্মীয় শাসন আরোপ করবে কিনা; পাশাপাশি ফেডারেল সরকারের ওপর দলটির ছায়া বিদেশি বিনিয়োগকে নিরুৎসাহিত করবে কিনা।

পাসশাসিত রাজ্যগুলোয় খুব বেশি বিদেশি বিনিয়োগ নেই। অর্থনৈতিক উন্নয়নের চেয়ে আধ্যাত্মিক উন্নয়নকে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখে তারা। তাদের নিয়ন্ত্রিত কেলান্তান ও তেরেঙ্গানু মালয়েশিয়ার দরিদ্রতম রাজ্যগুলোর অন্যতম হওয়ার এটি একটি কারণ। পাস দেশটির তিনটি রাজ্যে সরকার পরিচালনা করছে।

সরকার গঠনের চেষ্টা: মালয়েশিয়ার রাজনৈতিক জোটগুলো সোমবারও জোট সরকার গঠনের জন্য ছোট দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা চালিয়েছে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্যতম বৃহত্তম অর্থনীতির দেশটিতে প্রবীণ বিরোধী নেতা আনোয়ার ইব্রাহিম এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী মুহিউদ্দিন ইয়াসিন উভয়ে গতকালও দাবি করেছেন, সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রমাণের জন্য তাঁদের কাছে প্রয়োজনীয় সংখ্যক এমপির সমর্থন রয়েছে। আজ মঙ্গলবার এ বিষয়ে দেশটির রাজা সিদ্ধান্ত জানাতে পারেন।

আনোয়ার ইব্রাহিম বলেছেন, তিনি দুর্নীতির দায়ে কারাগারে থাকা সাবেক প্রধানমন্ত্রী নাজিব রাজাকের দলের সঙ্গে পরবর্তী সরকার গঠনের জন্য আলোচনা করছেন। আনোয়ারের বহুজাতিগত জোট দুর্নীতিবিরোধী টিকিটে প্রচারণা চালিয়ে শনিবারের নির্বাচনে সবচেয়ে বেশি আসন পেয়েছে।

সূত্র: সমকাল
এম ইউ/২২ নভেম্বর ২০২২

Back to top button