পশ্চিমবঙ্গ

জেলে থেকেও যেসব বায়না ধরছেন পার্থ চট্টোপাধ্যায়

কলকাতা, ২২ নভেম্বর – ভারতের প্রেসিডেন্সি কারাগারের নিয়ম অনুসারে সপ্তাহে তিন দিন দুপুরে বন্দিদের আমিষ খাবার দেওয়া হয়। মাছ হলে প্রত্যেক বন্দি পান দুই টুকরো করে। আর মাংস হলে চার টুকরো।

তবে কারাগারের কর্মকর্তারা বলেছেন, পার্থ চট্টোপাধ্যায় বায়না ধরেছেন- চার টুকরো মাছ এবং মাংস হলে ছয় টুকরো দিতে হবে।

তার দাবি, অন্য বন্দিদের থেকে তাকে সব সময় বেশি দিতে হবে।
খাবারের মতো গোসলের ক্ষেত্রেও পার্থের আবদারে তারা নাজেহাল বলে কারারক্ষীদের একাংশের অভিযোগ। নিরাপত্তার কারণে ‘পহেলা বাইশ’ ওয়ার্ডে পার্থের দুই নম্বর সেলের সামনে বড় প্লাস্টিকের ড্রামে পানি রাখা থাকে। এত দিন তিনি নিজেই মগ দিয়ে সেই ড্রামের পানি তুলে গোসল সারতেন।

এখন তার দাবি, গোসলের সময় লোক দিতে হবে, যিনি ড্রাম থেকে পানি তুলে তার গায়ে ঢেলে দেবেন। কারা-কর্তৃপক্ষের বক্তব্য, এটা সম্ভব নয়। কারণ, এ ধরনের কোনো আইন বা বিধি নেই। পার্থ অসুস্থ নন। শারীরিকভাবে তিনি সক্ষম। সে-ক্ষেত্রে এমন ব্যবস্থা করা সম্ভব নয়। কিন্তু পার্থ নাছোড় বান্দা!

ভারতের পশ্চিমবঙ্গে এসএসসি বা স্কুল সার্ভিস কমিশনের নিয়োগ দুর্নীতির মামলায় অভিযুক্ত, সাবেক শিক্ষামন্ত্রী পার্থ এভাবেই গোসল থেকে খাবার পর্যন্ত সব বিষয়ে নানা বায়নায় কারাকর্মীদের বিরক্ত করে ফেলছেন বলে জেল সূত্রের খবর।

তার কার্যকলাপে কারা-কর্তৃপক্ষ থেকে কারারক্ষীদের বেশিরভাগই অসন্তুষ্ট। না করে দেওয়ার পরেও তিনি একই আবদার-আবেদন করে চলেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। গোসল, খাবারদাবারের সঙ্গে ইদানীং যুক্ত হয়েছে ফোন নিয়ে বায়না।

কারাগারের ফোন থেকে প্রত্যেক বন্দি যেকোনো তিনটি নম্বরে ১০ মিনিট কথা বলতে পারেন। পার্থ দু’টি নম্বর কারাগার কর্তৃপক্ষকে দিয়েছেন। একটি তার আইনজীবীর, অন্যটি তার এক আত্মীয়ের।

কারারক্ষীদের অভিযোগ, তার ফোনের সময় কোনো রক্ষীর ধারেকাছে থাকা চলবে না, তার সেলের সামনে সর্বক্ষণ রক্ষী রাখা যাবে না বলে দাবি তুলেছেন পার্থ।

পার্থের ‘হুকুম’, তার অনুমতি ছাড়া রক্ষীরা যেন সেলের সামনে না যান। কারারক্ষীদের বক্তব্য, এর কোনোটাই সম্ভব নয়। আদালতের নির্দেশে পার্থের জন্য বিশেষ নিরাপত্তার ব্যবস্থা হয়েছে।

পার্থের ‘হুকুম’ নিয়েও অভিযোগ তুলছেন কিছু কারারক্ষী। তারা জানান, পার্থ নিজেকে এখনো ভিআইপি ভাবছেন, মন্ত্রী ভাবছেন। সব কিছু সুযোগ-সুবিধা তার প্রাপ্য বলে মনে করছেন।

কারাকর্মকর্তারা অবশ্য জানান, পার্থের কোনো অন্যায্য আবদারই শোনা হচ্ছে না। নিয়ম মেনে সব বন্দিকে একই রকমের খাবার দেওয়া হয়। তবে পার্থ প্রতিদিনই নিজের টাকা দিয়ে ক্যান্টিন থেকে খাবার আনিয়ে খাচ্ছেন। সকাল-সন্ধ্যায় তার সেলের সামনে গিয়ে ক্যান্টিনের পক্ষ থেকে খাবার বিক্রি করা হচ্ছে। প্রতি সপ্তাহে পার্থের আইনজীবী ও আত্মীয়রা টাকা জমা দিচ্ছেন। তা দিয়ে পার্থ খাবারের দাম মেটাচ্ছেন। তবে চিকিৎসকদের নির্দেশ অনুযায়ী তার খাবারদাবারের দিকে সতর্ক নজর রাখা হচ্ছে।

পার্থের উপরে শুধু কারারক্ষীরাই বিরূপু নন। নিয়োগ-দুর্নীতিতে ইডি বা এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেটের মামলায় পার্থের এক সময়ের ঘনিষ্ঠ পলাশিপাড়ার বিধায়ক তথা প্রাথমিক শিক্ষা পর্ষদের অপসারিত সভাপতি মানিক ভট্টাচার্যও এখন তার দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন। যদিও একই ওয়ার্ডের সাত নম্বর সেলে থাকেন তিনি।

কারারক্ষীরা জানান, প্রথম দিন জেলে ঢোকার পরেই পার্থের সেলে উঁকি দিয়ে ‘পার্থদা’ বলে ডাক দিয়েছিলেন মানিক‌। সেদিন তার ডাকে সাড়া দেননি পার্থ। পরের দিন সকালেই জেলবন্দি শান্তিপ্রসাদ সিংহ, অশোক সাহা, কল্যাণময় গঙ্গোপাধ্যায় ও সুবীরেশ ভট্টাচার্যের সঙ্গে কারাগার চত্বরে অনেকক্ষণ গল্পগুজব হয় মানিকের। তার পর থেকেই পার্থকে এড়িয়ে চলেছেন মানিক।

শান্তিপ্রসাদরা রয়েছেন পহেলা বাইশ ওয়ার্ডের পাশের ওয়ার্ড ‘তেইশ-চুয়াল্লিশে’। মাঝেমধ্যেই মানিকের সঙ্গে তাদের আড্ডা হয়। তাদের সবাইকে জেল সুপারের অফিস, ক্যান্টিন বা জেল হাসপাতালে যেতে হলে পার্থের সেলের সামনে দিয়েই যেতে হয়। মানিককে দেখে সেলের ভিতর থেকে পার্থ বেশ কয়েক বার ‘মানিক মানিক’ বলে ডাক দিয়েছেন। কিন্তু মানিক ঘুরেও তাকাননি বলে জানান কর্তব্যরত কারারক্ষীরা।

সূত্র: কালের কন্ঠ
আইএ/ ২২ নভেম্বর ২০২২

Back to top button