ইসলাম

ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের সঙ্গে আচরণ সম্পর্কে ইসলাম কী বলে?

মহানবী হজরত মোহাম্মদ (সা.) সব যুগে জগতবাসীর জন্য সর্বশ্রেষ্ঠ আদর্শ ও অনুকরণীয় ব্যক্তি। মহাপ্রলয় পর্যন্ত যেকোনও মানুষ তাঁর জীবন থেকে পাথেয় গ্রহণ করতে পারে। ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের সঙ্গে সহানুভূতিশীল আচরণের মাধ্যমেও তিনি মানবতার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করে গেছেন। তাঁর উত্তম চরিত্রের সাক্ষ্য দিয়ে মহান আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘তোমাদের মধ্যে যারা আল্লাহ ও আখিরাতের প্রতি বিশ্বাস রাখে এবং আল্লাহকে অধিক স্মরণ করে তাদের জন্য রাসুলের অনুসরণের মধ্যে রয়েছে উত্তম আদর্শ।’ (সুরা আহজাব, আয়াত: ২১)

ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের সঙ্গে রাসুল (সা.)-এর উত্তম আচরণের কয়েকটি উদাহরণ:

মমত্ববোধ

রাসুল (সা.) এমন এক পরিবেশে জন্মগ্রহণ করেন, যেটিকে জাহিলিয়াতের যুগ আখ্যায়িত করা হয়। অন্ধকারে নিমজ্জিত ওই সমাজকে তিনিই আলোর পথ দেখিয়েছিলেন। তিনি সবসময় চাইতেন পাপাচারে ডুবে থাকা মক্কাবাসী সদাচারী হয়ে যাক, অন্ধকার থেকে আলোর পথে ফিরে আসুক—এসব চিন্তায় তিনি বিমর্ষ হয়ে পড়তেন। ভিন্ন ধর্মাবলম্বী হওয়ার পরও মানুষের প্রতি তাঁর ছিল অগাধ মমতা। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘হয়তো আপনি তাদের পেছনে পেছনে ঘুরে দুঃখে নিজেকে শেষ করে দেবেন, যদি তারা এই কথার প্রতি বিশ্বাস না রাখে।’ (সুরা কাহফ, আয়াত: ৬)

শুধু তাই নয়; রাসুল (সা.)-এর একজন ইহুদি খাদেম ছিল। সে একবার অসুস্থ হলে তিনি তাকে দেখতে যান এবং খোঁজখবর নেন। (বুখারি শরিফ, অসুস্থতা অধ্যায়) ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের প্রতি তার এরূপ উত্তম মমত্ববোধের আরও অসংখ্য উদাহরণ রয়েছে। তিনি সর্বদা সহনশীলতাকে পছন্দ করতেন এবং অন্যদের তা অবলম্বনে উৎসাহ দিতেন।

মানবাধিকার

আল্লাহর রাসুল (সা.)-এর কাছে মানবাধিকার ও ধর্মের মধ্যে কোনও পার্থক্য ছিল না। কবিরা গোনাহের বর্ণনা করতে গিয়ে তিনি বলেন, সবচেয়ে বড় গোনাহ হলো—শিরক (আল্লাহর সাথে কাউকে অংশীদার সাব্যস্ত করা)। সেই সঙ্গে বলেন, কোনও মানুষকে অন্যায়ভাবে হত্যা করাও কবিরা গোনাহ। এখানে ‘মুসলমান’ বলেননি; বরং মুসলিম কিংবা অমুসলিম। যে কাউকে হত্যা করা বড় গোনাহ। (বুখারি শরিফ)

মুসলমানদের মধ্যে জাত-বংশের ভিন্নতা থাকলেও এটাকে স্রেফ পরিচয়ের মাধ্যম আখ্যায়িত করা হয়েছে। শ্রেষ্ঠত্বের মাপকাঠি নির্ধারণ করা হয়েছে তাকওয়া তথা খোদাভীতিকে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘…তোমাদেরকে বিভক্ত করেছি বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে, যাতে তোমরা একে অপরের সাথে পরিচিত হতে পার। তোমাদের মধ্যে ওই ব্যক্তিই আল্লাহর কাছে অধিক মর্যাদা সম্পন্ন যে অধিক মুত্তাকী।…’। (সুরা হুজুরাত, আয়াত: ১৩)

পৃথিবীতে রাসুল (সা.)-এর আগমনেও ধর্ম-বর্ণের পার্থক্য করা হয়নি; আল্লাহ তায়ালা তাঁকে সমগ্র মানবজাতির জন্য রহমত ও করুণা হিসেবে পাঠিয়েছেন। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘আমি আপনাকে জগতসমূহের রহমত স্বরূপ পাঠিয়েছি।’ (সুরা আম্বিয়া, আয়াত: ১০৭) অর্থাৎ তিনি শুধু মুসলমানদের নবী হিসেবে প্রেরিত হননি। তার উম্মত ভিন্ন ধর্মের লোকেরাও। আর তিনি সারাটি জীবন সেভাবেই সবার কল্যাণের জন্য কাজ করে গেছেন এবং সবার প্রতি সমান ব্যথিত ছিলেন।

একবার রাসুল (সা.)-এর সামনে দিয়ে একটি লাশ নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল। এটি দেখে তিনি দাঁড়ালেন, তখন উপস্থিত সাহাবারা বললেন, এটি ইহুদির লাশ। রাসুল (সা.) তাদেরকে জিজ্ঞেস করলেন, সে কী মানুষ নয়? (বুখারি, হাদিস: ১৩১২)

ভিন্নধর্মের মা-বাবার প্রতি শ্রদ্ধার নির্দেশ

বাবা-মা ইসলাম ধর্মের হোক কিংবা ভিন্ন ধর্মের, তাদের সম্মান ও অধিকার আদায়ে পবিত্র কোরআনে একাধিক আয়াত অবতীর্ণ হয়েছে। আল্লাহ বলেন, ‘আর আমি মানুষকে নির্দেশ দিয়েছি তার মা-বাবার সাথে সদাচরণ করতে…’ (সুরা আনকাবুত, আয়াত: ৮)

হুদাইবিয়ার সন্ধির পর হজরত আসমা বিনতে আবু বকর (রা.)-এর কাছে তার অমুসলিম মা কিছু উপঢৌকন নিয়ে আসলেন, তখন তিনি তাকে নিজের ঘরে প্রবেশ করাতে ও উপঢৌকন গ্রহণে অস্বীকৃতি জানালেন। একপর্যায়ে বিষয়টি রাসুল (সা.)-এর কর্ণগোচর হলো। তিনি বললেন, মায়ের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ো। (বুখারি শরিফ, হাদিস: ২৪৭৭)

হজরত আলি (রা.)-এর বাবা আবু তালিবের ইন্তেকালে আল্লাহর রাসুল মর্মাহত হন এবং চাচার বিয়োগে তাঁর চোখে অশ্রু ঝরে। তিনি আলি (রা.)-কে স্বীয় বাবার দাফনের ব্যবস্থা করার নির্দেশ দেন। যদিও আবু তালিব বাপ-দাদার ধর্মে অনড় ছিলেন। এককথায় কোরআন ও সুন্নাহ আমাদের এই নির্দেশ দেয় যে, বাবা-মা মুসলিম হোক কিংবা অমুসলিম তারা যথাযোগ্য সম্মানের অধিকার রাখেন।

ভিন্নধর্মের প্রতিবেশীর সঙ্গে আচরণ

মানুষ সামাজিক জীব হিসেবে সব ধর্মের মানুষ তার প্রতিবেশী হতে পারে। প্রতিবেশী যে ধর্মেরই হোক তাকে প্রতিবেশী হিসেবে মূল্যায়ন করতে হবে। পারস্পরিক সহযোগিতা ও সহমর্মিতা প্রদর্শনে কোনও প্রকার ত্রুটি করা যাবে না। প্রতিবেশীর অধিকার রক্ষায় ইসলাম অত্যন্ত তৎপর। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘ধর্মের ব্যাপারে যারা তোমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেনি এবং তোমাদের স্বদেশ থেকে বহিষ্কার করেনি তাদের সঙ্গে মহানুভবতা প্রদর্শন ও ন্যায়বিচার করতে আল্লাহ তোমাদের নিষেধ করেন না। আল্লাহ ন্যায়পরায়ণদের ভালোবাসেন।’ (সুরা : মুমতাহিনা, আয়াত: ৮)

ভিন্নধর্মের জান-মালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা

মুসলিম দেশে রাষ্ট্রের আইন মেনে বসবাসকারী ভিন্নধর্মীদের জানের সুরক্ষা এবং মালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা মুসলিমদের দায়িত্ব। এ প্রসঙ্গে রাসুল (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি কোনও ভিন্নধর্মী নাগরিককে হত্যা করল, সে জান্নাতের সুগন্ধও পাবে না, অথচ তার সুগন্ধ ৪০ বছরের রাস্তার দূরত্ব থেকেও পাওয়া যায়।’ (বুখারি শরিফ, হাদিস: ২৯৯৫)

ভিন্নধর্মীদের সঙ্গে লেনদেন করা যাবে

ইসলাম ভিন্নধর্মীদের সঙ্গে আর্থিক লেনদেন, ব্যবসা-বাণিজ্য ইত্যাদি করতে বাধা দেয় না। মহানবী (সা.) ইহুদিদের কাছ থেকে ঋণ নিয়েছেন এবং যথাসময়ে তা পরিশোধ করে দিয়েছেন—এরকম একাধিক উদাহরণ রয়েছে। একবার নির্ধারিত সময়ের আগেই একজন ঋণদাতা ইহুদি এসে রাসুল (সা.)-এর সঙ্গে খারাপ আচরণ করলো, তখন আল্লাহর রাসুল (সা.) এর কোনও প্রতিবাদ করলেন না; বরং সাহাবাদের ঋণ পরিশোধের ব্যবস্থা করতে নির্দেশ দিলেন।

এজন্য জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রের মতো আমাদের ভিন্নধর্মী প্রতিবেশীর সাথে আচরণেও আল্লাহ এবং তাঁর রাসুল (সা.)-এর দেখানো পথ অনুসরণ করতে হবে। যুদ্ধাবস্থা তৈরি হওয়ার আগে তারাও প্রতিবেশী হিসেবে আমাদের কাছে সবরকমের নিরাপত্তার অধিকার রাখেন। আমরা যদি সমস্ত জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে এই সমাজে বাস করতে পারি, তাহলে আমাদের দেশটি বাস্তবিক সোনার দেশে পরিণত হবে। আল্লাহ আমাদের সবাইকে সঠিক বুঝ দান করুন। আমিন।

আইএ

Back to top button