জাতীয়

খরায় ক্ষতি ২৭৩৪ কোটি টাকা, গড় তাপমাত্রা বাড়ছে

সাইদ শাহীন

ঢাকা, ১৬ নভেম্বর – ‌দেশের খরাপ্রবণ জেলাগুলোতে কৃষিজমি আছে প্রায় ৫৫ লাখ হেক্টর। এর মধ্যে প্রতিবছর খরায় ক্ষতির শিকার হয় প্রায় ৩৫ লাখ ২০ হাজার হেক্টর। খরার কারণে আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে দুই হাজার ৭৩৪ কোটি টাকা। গড়ে প্রতি আড়াই বছরে একটি বড় খরার কবলে পড়ছে দেশ।

পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের ‘ন্যাশনাল অ্যাডাপ্টেশন প্ল্যান অব বাংলাদেশ (২০২৩-৫০)’ শীর্ষক প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। মিসরে চলমান জলবায়ু সম্মেলন কপ২৭-এ প্রতিবেদন উপস্থাপন করবে বাংলাদেশ। বাংলাদেশে জলবায়ু পরিবর্তন ও ক্ষতির প্রভাব মাত্রা বিষয়ে এই প্রতিবেদনের মাধ্যমে ক্ষতিপূরণ দাবি ও আলোচনা এগিয়ে নিয়ে যাবে। প্রাকৃতিক দুর্যোগের তথ্য পর্যালোচনায় পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন সংস্থা সেন্টার ফর এনভায়রনমেন্টাল অ্যান্ড জিওগ্রাফিক ইনফরমেশন সার্ভিসেস (সিইজিআইএস) প্রতিবেদনের সহায়তা নেওয়া হয়েছে।

সিইজিআইএসের তথ্য বলছে, বাংলাদেশের গড় তাপমাত্রা বাড়ছে। শীতকাল ক্রমে উষ্ণ হয়ে উঠছে। বছরে তাপমাত্রা বাড়ছে ১ ডিগ্রি সেলসিয়াস। আগের তিন দশকের তুলনায় গত তিন দশকে তাপমাত্রা তীব্রভাবে বেড়েছে। ১৯৬১-৯০ সাল পর্যন্ত বছরে গড়ে তাপমাত্রা বেড়েছে ০.০০৬৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস, যা ১৯৯১-২০১৯ সাল পর্যন্ত বছরে ০.০৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়েছে।

তবে সাম্প্রতিক দশকে গড় তাপমাত্রা দ্রুত বাড়ছে। ১৯৯১ থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত বছরে গড় তাপমাত্রা ০.৩৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০০১-১০ সময়ে তাপমাত্রা বৃদ্ধির পরিমাণ ছিল প্রতিবছরে প্রায় ০.৫৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস। আর ২০১১-১৯ সালে প্রতিবছরে গড় তাপমাত্রা বৃদ্ধি ছিল ১.০৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস। দেশে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা শীতকালে বেড়েছে ০.৪৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস এবং গ্রীষ্মকালে বেড়েছে ০.৫২ ডিগ্রি সেলসিয়াস। শীতকাল আরো বেশি উষ্ণ হয়ে উঠছে। প্রতিবছর শীতকালে তাপমাত্রা বাড়ছে ০.০২ ডিগ্রি সেলসিয়াস।

খরায় ক্ষয়ক্ষতি

খরার ক্ষয়ক্ষতির নানা তথ্য উঠে এসেছে সিইজিআইএস এবং বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্যে। সিইজিআইএসের তথ্য বলছে, গড়ে প্রতিবছর খরায় ক্ষতির শিকার হচ্ছে প্রায় ৩৫ লাখ ২০ হাজার হেক্টর আবাদি জমি।

বিবিএসের দুর্যোগবিষয়ক পরিসংখ্যান ২০২১

জলবায়ু পরিবর্তন ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ পরিপ্রেক্ষিত’ শীর্ষক প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, ২০১৫-২০ সময়ে গড়ে তিন লাখ ৫৪ হাজার ৭৩৯টি পরিবার খরার শিকার হয়েছে। এ ছাড়া খরায় গড়ে ক্ষতি হয়েছে দুই হাজার ৭৩৪ কোটি টাকা।

এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) ‘বাংলাদেশ ক্লাইমেট অ্যান্ড ডিজাস্টার রিস্ক অ্যাটলাস’ শীর্ষক প্রতিবেদনের তথ্য অনুসারে, দেশের খরাপ্রবণ জেলাগুলোয় মোট জমি ৫৪ লাখ ৬০ হাজার হেক্টর। বাংলাদেশের খরাপ্রবণ জেলাগুলো উত্তর-পশ্চিমাঞ্চল ও উত্তরাঞ্চলে অবস্থিত। চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নওগাঁ, রাজশাহী, নাটোর, রংপুর, দিনাজপুর, জয়পুরহাট, পাবনা ও বগুড়া জেলা উচ্চমাত্রার ঝুঁকিতে রয়েছে।

দেশে খরার সঙ্গে বহুমুখী দুর্যোগপ্রবণ জেলাও রয়েছে। এর মধ্যে খরাপ্রবণ জেলা ১৩টি, খরা ও বন্যাপ্রবণ জেলা ছয়টি, খরা ও আকস্মিক বন্যার ঝুঁকিতে রয়েছে তিনটি জেলা।

বড় ধরনের খরা

বাংলাদেশে এ পর্যন্ত ১৯টি বড় খরা হয়েছে। গড়ে প্রতি আড়াই বছরে একবার বড় খরা হচ্ছে। ১৯৫১, ১৯৫৭, ১৯৬১, ১৯৭২, ১৯৭৬, ১৯৭৯, ১৯৮৯ ও ১৯৯৭ সালে মারাত্মক খরার শিকার হয়। বাংলাদেশে খরা সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলেছিল ১৯৭৮ ও ১৯৭৯ সালে। সে সময় দেশের প্রায় ৪২ শতাংশ আবাদি জমি সরাসরি ক্ষতির শিকার হয়েছিল। চালের উৎপাদন কমে গিয়েছিল প্রায় ২০ লাখ টন। ১৯৯৭ সালে খরার কারণে ১০ লাখ টন ধান ক্ষতির শিকার হয়। সব মিলিয়ে ওই বছরে আর্থিক ক্ষতির ৫০ কোটি ডলার ছিল বলে এডিবির প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

খরার কারণ ও প্রতিকার

পানি ও জলবায়ু বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, দেশে মে-জুন থেকে সেপ্টেম্বর-অক্টোবর সময়ে কম বৃষ্টিপাত হচ্ছে। কম আর্দ্রতা ধারণক্ষমতাসহ মাটির সম্মিলিত প্রভাবের কারণে শুষ্ক দিনের সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে তাপমাত্রা বেড়ে যাচ্ছে। ফলে বিশেষ অঞ্চলে বৃষ্টিপাতের পরিমাণও কমে গেছে। ফলে উত্তরাঞ্চলে খরাপ্রবণতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। এ ছাড়া নদী, খাল, বিল শুকিয়ে যাচ্ছে। এ জন্য ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরতা বেড়েছে।

এ বিষয়ে সিইজিআইএসের নির্বাহী পরিচালক ও জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের সদস্য মালিক ফিদা আবদুল্লাহ খান বলেন, ‘প্রতিবছর বর্ষার সময় যে পরিমাণ পানি ভূগর্ভে সঞ্চিত হচ্ছে, তার চেয়ে বেশি পরিমাণ পানি আমরা খরচ করে ফেলছি। দেশের এসব অঞ্চলকে মরুকরণ থেকে রক্ষা করতে হলে নদীর নাব্যতা ফিরিয়ে আনতে হবে। নদী, খাল, সচল করতে হবে। এগুলো খনন করে পানি ধরে রাখার জন্য পানি উন্নয়ন বোর্ড ও নদী কমিশনকে উদ্যোগ নিতে হবে। ’

বৈশ্বিক সংকট ও সমাধান

গত কয়েক দশকের মধ্যে ইউরোপে এবার তীব্র খরা হয়েছে। নদীগুলো শুকিয়ে গেছে। যুক্তরাষ্ট্রের পশ্চিমাঞ্চলে গত দুই দশক ছিল তাদের ইতিহাসে শুষ্কতম। খরা থেকে উত্তরণের পথও দেখিয়েছে কিছু দেশ। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা বলছে, ব্রাজিল, ইথিওপিয়া, ভারত ও তিউনিশিয়ায় খরার প্রভাব কমাতে টেকসই ভূমি ব্যবস্থাপনাসহ বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এসব দেশে খরা মোকাবেলা করে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে টেকসই পানি ব্যবস্থাপনায় জোর দিচ্ছে।

সূত্র: কালের কণ্ঠ
এম ইউ/১৬ নভেম্বর ২০২২

Back to top button