জাতীয়

সরকারকে বেকায়দায় ফেলার ইচ্ছা নেই

হাসান শিপলু

ঢাকা, ১৬ নভেম্বর – ‌বিএনপির আগামী ১০ ডিসেম্বরের মহাসমাবেশ ঘিরে সরকার ঢাকা শহরকে কার্যত বিচ্ছিন্ন ও অচল করে দিতে পারে বলে ধারণা করছেন দলটির নীতিনির্ধারকরা। চলমান বিভাগীয় গণসমাবেশগুলোর অভিজ্ঞতা থেকে এমনটা মনে করছে বিএনপি।

বিএনপির জ্যেষ্ঠ নেতারা বলছেন, ঢাকার মহাসমাবেশ ঘিরে সরকার পতন কিংবা সরকারকে বেকায়দায় ফেলার সুনির্দিষ্ট কোনো পরিকল্পনা তাঁদের নেই। চলমান বিভাগীয় সমাবেশগুলোর মতো ঢাকায়ও বড় সমাবেশ করতে চায় বিএনপি।

এর বাইরে কিছু নয়। এমনকি ঢাকায় দূরের জেলা থেকে নয়, শুধু আশপাশের জেলার লোকসমাগম ঘটাতে চায় তারা।
ঢাকায় বিএনপির মহাসমাবেশ ঘিরে সরকারের পরিকল্পনা কী হতে পারে, তা নিয়ে গত সোমবার বিএনপির স্থায়ী কমিটি বৈঠক করে। সেখানেই নেতাদের এমন বিশ্লেষণ উঠে আসে। দলটির একাধিক নির্ভরযোগ্য সূত্র এই তথ্য নিশ্চিত করেছে।

স্থায়ী কমিটির সভায় শীর্ষস্থানীয় নেতারা বলেছেন, দলের বিভাগীয় পর্যায়ের সমাবেশগুলো সফল হয়েছে। সমাবেশ ঘিরে পরিবহন ধর্মঘট, ক্ষমতাসীনদের বাধাসহ নেতিবাচক কর্মকাণ্ডের কারণে নেতাকর্মীরা ঐক্যবদ্ধ ও উজ্জীবিত হয়েছেন।

স্থায়ী কমিটির সদস্যদের বিশ্লেষণ হলো, পরিবহন ধর্মঘটের কারণে তিন দিন আগে এসে সমাবেশস্থলে উপস্থিত হওয়া কিংবা ট্রলার, নৌকা ও হেঁটে সমাবেশে আসার যে দৃশ্য দেখা গেছে, তা সরকারের বাধার কারণে সৃষ্টি হয়েছে। পরিবহন বন্ধ করে দেওয়ায় ভিন্ন পথে নেতাকর্মীদের আসার যে ধরন ময়মনসিংহ ও খুলনা থেকে শুরু হয়েছে, অন্য বিভাগের নেতাকর্মীদের তা অনুপ্রাণিত করেছে।

বৈঠকে ঢাকার মহাসমাবেশ নিয়ে নানা বিশ্লেষণ সামনে আনেন নেতারা। স্থায়ী কমিটির সদস্যরা মনে করেন, সরকারের কাছে হয়তো ভুল বার্তা আছে। নইলে সমাবেশের মাসখানেক আগেই নেতাকর্মীদের গ্রেপ্তার শুরু হবে কেন?

বিএনপির স্থায়ী কমিটির এক নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, এই মহাসমাবেশ সরকার পতনের জন্য কিংবা সমাবেশে সারা দেশ থেকে কয়েক লাখ নেতাকর্মী জড়ো করে নয়াপল্টনে বসে যাবে বিএনপি—এমন নানা কথা ছড়ানো হচ্ছে। এর সঙ্গে বাস্তবের মিল নেই।

বিএনপির এই নেতা বলেন, বিএনপি মহাসমাবেশে বড় জমায়েত করতে চায়, এটা সত্য। সমাবেশ নিয়ে নেতাকর্মীদের আগ্রহ তৈরি হয়েছে, এটাও সত্য। কিন্তু এই সমাবেশ সরকার পতনের জন্য নয়। সে রকম চিন্তা বা প্রস্তুতি বিএনপির নেই। এমনকি ঢাকায় সমাবেশে যেন উসকানিমূলক কোনো বক্তব্য দেওয়া না হয়, তা নিয়েও কথা হয়েছে স্থায়ী কমিটিতে।

ঢাকার মহাসমাবেশের প্রধান উপদেষ্টা ও বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস বলেন, অন্যান্য বিভাগের মতো ঢাকায় সুশৃঙ্খল ও শান্তিপূর্ণ সমাবেশ করা হবে। এই সমাবেশ ঘিরে ভিন্ন কোনো চিন্তা এখনো করছে না বিএনপি।

মির্জা আব্বাস বলেন, এখন পর্যন্ত ছয় বিভাগে গণসমাবেশ করেছে বিএনপি। কোথাও তাঁদের নেতাকর্মীরা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করেননি। ঢাকায়ও তা-ই চান তাঁরা। তিনি বলেন, ‘চোরের মনে পুলিশ পুলিশ, সমাবেশ ঘিরে সরকারের প্রস্তুতি এবং নেতাকর্মীদের গ্রেপ্তার দেখে তা-ই মনে হচ্ছে। সরকার ভালো উদ্যোগেও মন্দ কিছুর গন্ধ পাচ্ছে। যারা ভীত থাকে তারা সব সময় এমন সন্দেহপ্রবণ থাকে। ’

সরকারের মনোভাব দেখে প্রস্তুতি : ঢাকার মহাসমাবেশের ২৫ দিন বাকি আছে। এর মধ্যে সিলেট, কুমিল্লা ও রাজশাহীর সমাবেশ হবে। বাকি সময়ে পরিস্থিতি কোন দিকে যায়, সরকারের মনোভাব কী হয়—এসব দেখে বিএনপি তাদের প্রস্তুতি নেবে।

বিএনপি নেতারা ধরে নিয়েছেন, সরকার পরিবহন বন্ধ করে দেবে। হোটেল-রেস্টুরেন্ট বন্ধ রাখতে বাধ্য করবে। এত সব প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যে কিভাবে সর্বোচ্চ লোক জমায়েত করা যায়, সে ব্যাপারে প্রস্তুতি নিচ্ছে বিএনপি।

দেশের অন্য বিভাগ থেকে খুব বেশি নেতাকর্মী ঢাকায় জড়ো করার পরিকল্পনা আপাতত নেই বলে জানাচ্ছে বিএনপি। তবে ঢাকার সমাবেশে বাধা এলে সারা দেশে যেন তাত্ক্ষণিক বিক্ষোভের মাধ্যমে প্রতিক্রিয়া দেখানো যায়, সে জন্য সাংগঠনিক কমিটিগুলোকে প্রস্তুত রাখা হতে পারে। এখন পর্যন্ত এমন পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছেন নীতিনির্ধারকরা।

নয়াপল্টনে সমাবেশের অনুমতি চেয়ে চিঠি : নয়াপল্টনে দলীয় কার্যালয়ের সামনে আগামী ১০ ডিসেম্বর মহাসমাবেশ করতে অনুমতি চেয়ে গতকাল মঙ্গলবার আবেদন করেছে বিএনপি। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) কমিশনার খন্দকার গোলাম ফারুকের কার্যালয়ে গিয়ে এই আবেদন করেন বিএনপি নেতারা।

বিএনপির প্রচার সম্পাদক শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানি বলেন, নয়াপল্টন ছাড়া আরো কয়েকটি স্থানের নাম উল্লেখ করে চিঠি দিতে অনুরোধ করেছে ডিএমপি। ঢাকা মহানগর (উত্তর) বিএনপি আহ্বায়ক আমানউল্লাহ আমান বলেন, ‘নয়াপল্টনে অনুমতি চেয়েছি। তাঁরা বলেছেন, আলাপ-আলোচনা করে সেটা আমাদের জানাবেন। ’ তিনি বলেন, ‘আমাদের সমাবেশে যারা আসবে, তারা যেন কোনো বাধার সম্মুখীন না হয়। তাদের ওপর যেন কোনো ধরনের হামলা করা না হয়, সেই অনুরোধ করা হয়েছে। ’

সমাবেশে বাধা ও অংশগ্রহণের চিত্র কূটনীতিকদের জানানো হচ্ছে : দলের একাধিক নির্ভরযোগ্য সূত্র জানায়, সম্প্রতি বিএনপি বেশ কয়েকজন পশ্চিমা প্রভাবশালী দেশের রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে বৈঠক করেছে। এর মধ্যে কয়েকটি গুলশানে বিএনপি চেয়ারপারসনের কার্যালয়ে হয়েছে। অপ্রকাশ্যেও হয়েছে কয়েকটি বৈঠক।

সম্প্রতি মার্কিন ডেপুটি অ্যাসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারি আফরিন আক্তার ঢাকায় সফরকালে তাঁর একজন দূত এবং যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাসের একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার সঙ্গে বিএনপি নেতাদের বৈঠক হয়।

দলটির নেতারা মনে করছেন, বিএনপির সমাবেশ দেখে কূটনীতিকদের মনোভাবে পরিবর্তন আসছে। সোমবার জাপানের রাষ্ট্রদূত বিগত নির্বাচন নিয়ে যে মন্তব্য করেছেন তা নির্বাচনব্যবস্থা নিয়ে বিদেশিদের মনোভাবের বহিঃপ্রকাশ বলে মনে করছেন জ্যেষ্ঠ নেতারা।

সূত্র: কালের কণ্ঠ
এম ইউ/১৬ নভেম্বর ২০২২

Back to top button