জাতীয়

কাগজ নিয়ে উদ্বেগ

এস এম আববাস

ঢাকা, ১৫ নভেম্বর – ডলারের মূল্য বৃদ্ধি, মূল্যস্ফীতি, গ্যাস ও নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুতের অভাবে কাগজ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে দেশে। প্রায় এক বছর ধরে কম-বেশি কাগজ নিয়ে সমস্যা থাকলেও এখন তা জটিল আকার ধারণ করছে। আগামী দুই মাস চরম পর্যায়ে সংকট থাকবে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা। কাগজ শিল্প সংশ্লিষ্টদের অনেকে বলছেন, ডলার সংকট না মিটলে এবং লেখা ও ছাপার কাগজে শুল্কহার না কমালে এই সমস্যা দীর্ঘায়িত হবে। অন্যদিকে উৎপাদন খরচ বাড়ায় কাগজের দামও বাড়বে।

কাগজ কল মালিকপক্ষ বলছে, দেশে কাগজ সংকটের এই সময় পাঠ্যবই ছাপার জন্য প্রায় এক লাখ ২০ থেকে ৩০ হাজার টন কাগজের চাহিদা রয়েছে সরকারের। এছাড়া বছরের শেষ দিকে এসে ডায়েরি, ক্যালেন্ডার ছাপানোর জন্যও বাড়তি কাগজের চাপও আছে। এই পরিস্থিতিতে মুদ্রণ প্রতিষ্ঠানগুলো শুল্কমুক্ত আমদানির অনুমতি চেয়েছে। তবে সরকার ডলার খরচ করে কাগজ আমদানি করতে দেবে না। দেশের কাগজ কলগুলোকে সরবরাহ নিশ্চিত করতে অনুরোধ জানিয়েছে সরকার।

এদিকে লেটার অব ক্রেডিট (এলসি) খুলতে না পারায় ‘অফসেট’ কাগজ বা উন্নত কাগজের জন্য ভার্জিন পাল্প আমদানি করতে পারছেন না কাগজ কল মালিকরা। তাই চাহিদা মতো কাগজ সরবরাহও করতে পারছেন না তারা। ভার্জিন পাল্প ছাড়া রিসাইকেল করে যারা কাগজ (নিউজপ্রিন্ট) উৎপাদন করেন, তা চাহিদার তুলনায় খুবই কম। পাশাপাশি উৎপাদন খরচও বেড়ে গেছে।

আম্বার পেপার মিল, লিপি পেপার মিল, টিকে পেপার মিল, মেঘনা পেপার মিল ও রশিদ পেপার মিল মালিকরা ডলারের মূল্য বৃদ্ধি, টাকার মূল্যস্ফীতি, গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের কারণে তাদের উৎপাদন খরচ অনেক বেড়ে গেছে বলে সরকারকে জানিয়েছেন। বিশেষ করে গ্যাস সংকটের কারণে মিলের উৎপাদন ক্ষমতা এক-তৃতীয়াংশে নেমে গেছে বলে তারা উল্লেখ করেছেন।

কাগজের চাহিদা কতো

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে দেশে কাগজের চাহিদা প্রায় ১০ লাখ টন। ২০১৪ সালের পর থেকে লেখা ও ছাপার কাগজের (আর্ট পেপার ছাড়া) চাহিদা মেটানো হতো দেশি কাগজ কল থেকে। তবে যদি উৎপাদন বাড়ানো না যায় তাহলে দেশব্যাপী কাগজ সংকট চরমে পৌঁছাবে বলে মনে করছেন কাগজ কলের মালিকরা। অন্যদিকে এলসি না পাওয়ায় আর্ট পেপারও আমদানি করা যাচ্ছে না। ফলে সব ধরনের কাগজ সংকট চলছে এখন।

এদিকে সরকারের বিনামূল্যের পাঠ্যবই ছাপতে প্রায় এক লাখ ২০ থেকে ৩০ হাজার টন কাগজ লাগবে ডিসেম্বরের মধ্যে। ফলে আগামী দুই মাস কাগজ সংকট চরম পর্যায়ে পৌঁছাবে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ডিসেম্বরের পরও সংকট থাকতে পারে। ডলার সংকট না মেটা পর্যন্ত এই সংকট অব্যাহত থাকবে।

কী বলছেন ব্যবসায়ীরা

বাংলাদেশ পেপার ইমপোর্টার অ্যাসোসিয়েশনের প্রেসিডেন্ট ও এফবিসিসিআই পরিচালক শাফিকুল ইসলাম ভরসা বলেন, “মোটা কাগজ (আর্ট পেপার) যেটা ‘ডিউটি ফ্রি’ (শুল্কমুক্ত) আমদানি হয় সেটা আরএমজি (তৈরি পোশাক শিল্প) সেক্টরে ব্যবহার করা হয় রফতানির জন্য। আর ‘ডিউটি’সহ বাইরে যেটা আমদানি হয় সেটা খুবই সীমিত। ‘ডিউটি ফ্রি’ যেটা আমদানি হয় সেটা কিছু মিসইউজ হয়ে বাইরে বিক্রি হয়। এখন যে সংকট সেটা ব্যাংক থেকে এলসি না পাওয়ার কারণে। যাদের ‘ডিউটি ফ্রি’ অনুমোদন আছে তারাও খুব বেশি এলসি করতে পারছে না। করোনার পর থেকে দেশের কয়েকজন বিগসর্ট নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যের মতো কাগজ নিয়ে ‘সিন্ডিকেট’-এর খেলা চালাচ্ছেন। এই ‘সিন্ডিকেট’-এর খেলা যেভাবে চলছে তাতে শতভাগ মার্জিন দিলেও এলসি দিচ্ছে না ব্যাংকগুলো।”

তিনি আরও বলেন, ‘কমার্শিয়াল হোক আর নন-কমার্শিয়াল হোক যে সংকট এখন তা অনাকাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে চলে গেছে। চাহিদার সঙ্গে জোগানের সমন্বয়হীনতা আমদানি না করতে পারার কারণে তৈরি হয়েছে। এই সংকট আরও দীর্ঘায়িত হবে যদি এলসি না করতে পারা যায়। প্রয়োজন এলসি খোলার ব্যবস্থা করতে হবে। এখন এই সংকট ডলার সংকটের কারণে। দেশি কাগজের মিলের এক টন কাগজের (প্রিন্টিং পেপার) রেট এক লাখ ২০ হাজার থেকে বেড়ে এখন এক লাখ ৪০ হাজার বা এক লাখ ৫০ হাজার টাকা। আর লেখার ও বই ছাপার কাগজের রেট বেড়ে এখন এক টন এক লাখ ৩০ হাজার টাকা। আর আর্ট পেপার যেটা বিদেশ থেকে আমদানি করা হয় সেটা এক লাখ ৮০ হাজার টাকা। এই সংকট চলছে প্রায় এক বছর ধরে। ’

আম্বার পেপার মিলস লিমিটেডের পরিচালক মো. আক্তারুজ্জামান বলেন, “শিল্পটাই এমন এর শতভাগই ‘র’ ম্যাটেরিয়াল আমদানি করতে হয় (কর্ণফুলী পেপার মিল ছাড়া)। আর অল্প কিছু পেপার মিল আছে যারা রিসাইকেল ফাইবার থেকে কাগজ বানায়। তাদের পাল্প লাগে না, তাদেরও অন্যান্য কেমিক্যাল ও ক্যালসিয়াম কার্বনেট আমদানি করতে হয়। ভালো মানের কাগজ তৈরি করতে পাল্প আমদানি করতে হবে। কিন্তু ডলার সংকটের কারণে এলসি খুলতে দিচ্ছে না। সর্বশেষ বাংলাদেশ ব্যাংক বলেছিল ৩০ হাজার ডলার এলসি করতে পারবে। কিন্তু পাল্পের এলসির জন্য একেকটি এলসি করতে হয় পাঁচ থেকে ১০ হাজার টনের জন্য ৩০ লাখ থেকে ৫০ লাখ ডলার। কাগজ কলের জন্য এলসি করতে হয় ছয় মাস আগে। মিল মালিকরা ১০ থেকে ২০ শতাংশ মার্জিন ধরে হিসাবে করেছিল ২০ লাখ থেকে ৪ কোটি টাকা লাভ হবে। কিন্তু ব্যাংক যে সময় পেমেন্ট দিয়েছে, তখন ডলারের দাম বেড়ে গেছে, ব্যাংক পেমেন্ট দিয়েছে প্রতি ডলারের বিপরীতে ১০৬ টাকা থেকে ১০৪ টাকা। তখন দেখা গেছে লাভ তো নেই, আরও একশ’ কোটি টাকা নেই। বাংলাদেশে যেসব বড় পেপার মিল তাদের কারও কাছেই পাল্প নেই। শুধু মেঘনা গ্রুপের কাছে কিছু প্লাপ আছে, কিন্তু গ্যাসের কারণে তারা পেপার তৈরি করতে পারছে না।”

মো. আক্তারুজ্জামান আরও বলেন, ‘বাংলাদেশে মোট ২০৬টি পেপার মিল। এরমধ্যে চলমান ৭০ থেকে ৭৫টি। এদের মধ্যে প্যাকিংয়ের জন্য বা গ্রাফ পেপার ইত্যাদি তৈরি করে কিছু পেপার মিল। যদি লেখা ও ছাপার কাগজের মিল বলি, তাহলে ৩০ থেকে ৩৫টা রয়েছে। তারা মাসে ২০ থেকে ২৫ হাজার মেট্রিক টন কাগজ বানায়, যা ব্যবহার হয়ে যায়। এছাড়া পাঠ্যবইয়ের কাগজ তো রয়েছেই।’

মেঘনা পাল্প অ্যান্ড পেপার মিলের জি এম ইয়ারুল ইসলাম বলেন, “বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংকট প্রধান সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। গ্যাস না থাকলে ইন্ডাস্ট্রি চলবে কীভাবে? বিভিন্ন ইন্ডাস্ট্রি এলসি খুলতে পারছে না। ‘র’ ম্যাটেরিয়াল নেই। আর পাঠ্যবই ছাপার কারণে সংকট এখন বেশি। তবে পাঠ্যবই ছাপার কাজ শেষ হলে সংকট থাকবে না।”

উচ্চহারে শুল্ক আরোপ

বাংলাদেশ পেপার ইমপোর্টার অ্যাসোসিয়েশনের প্রেসিডেন্ট ও এফবিসিসিআই পরিচালক শাফিকুল ইসলাম ভরসা বলেন, “সরকার যখন প্রথম শ্রেণি থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত কাগজ বিনামূল্যে দিচ্ছে, সেখানে লেখা বা ছাপার কাগজের ‘র’ ম্যাটেরিয়াল আমদানিতে শুল্ক ৬০ শতাংশের বেশি। লেখার বা ছাপা কাগজে ৬০ শতাংশ ট্যাক্স পৃথিবীর কোথাও নেই। এ ক্ষেত্রে শুল্কহার যদি বেশি না থাকতো তাহলে লোকাল ইন্ডাস্ট্রিতে প্রতিযোগিতা থাকতো। শুল্কহার কমিয়ে দিলে সবাই আমদানি করে কাগজ তৈরি করতে পারবে। সমস্যা দুই জায়গায়। একটি হলো লেখা ও ছাপার কাগজে ৬০ শতাংশ শুল্কহার। আর আরেকটি হলো ডলার সংকটে এলসি খুলতে না পারা। শুল্কহার যৌক্তিক জায়গায় নিয়ে আসতে হবে। পাঁচ শতাংশ শুল্ক দিয়ে লেখা ও বই ছাপার কাগজ আমদানি করতে দিতে হবে। তা না হলে ছেলেমেয়েদের লেখাপড়ার খরচ বাড়বে। লেখা ও ছাপার কাগজের চাহিদা প্রায় ১০ লাখ টন।”

লিপি গ্রুপ সম্প্রতি শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও এনসিটির সঙ্গে বৈঠকে জানিয়েছিল, স্থানীয়ভাবে কাগজের চাহিদা মেটানো সম্ভব। তবে শুক্রবার (১১ নভেম্বর) সন্ধ্যায় লিপি গ্রুপের এমডি আব্দুল মতিন খান বলেন, ‘আমরা এলসি খুলতে পারছি না ডলার সংকটের কারণে। মাল আসছে না। তবে এসব সমস্যার সমাধান হলে কাগজের সংকট কাটবে। ’

কাগজের এই সংকট পরিস্থিতি এড়াতে সরকারের পক্ষে শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি কাগজ কল মালিকদের সঙ্গে সম্প্রতি বৈঠক করেন। পাট্যবই ছাপার কাগজের সংকট মেটাতে মিল মালিকদের কাগজ যথাসময়ে সরবরাহের অনুরোধ জানান মন্ত্রী। অন্যথায় মুদ্রণ শিল্প মালিকদের শুল্কমুক্ত কাগজ আমদানির অনুমতি দিতে সরকার বাধ্য হবে বলে মন্ত্রী উল্লেখ করেন।

কী বলছে কর্তৃপক্ষ

শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে মিল মালিকদের বলেছেন, পাঠ্যবই ছাপার কাগজ যথাসময়ে দরপত্রের স্পেসিফিকেশন অনুযায়ী দিতে হবে।

শিক্ষা উপমন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী দেশের বৃহত্তর স্বার্থে পেপার মিল মালিকদের দরপত্রের উল্লিখিত দরের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে এবং স্পেসিফিকেশন অনুযায়ী মান ঠিক রেখে কাগজ সরবরাহের অনুরোধ জানান। সরকারের এই সিদ্ধান্ত মেনে নিয়ে কাগজ কলগুলো এলসি খোলার চেষ্টা করলে ব্যাংকগুলো এলসি দিচ্ছে না বলেও গণমাধ্যমকে জানান তিনি।

কাগজের সংকট মেটাতে আপাতত বইয়ের কাগজের সংকট মেটানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে সার্বিকভাবে সংকট মেটাতে এখন পর্যন্ত কোনও উদ্যোগ নেই।

বাংলাদেশ ব্যাংক যে কথা বলেছে ব্যাংকগুলো সে কথাও রাখছে না। কারণ, ডলার বাইরে দিতে চায় না ব্যাংকগুলো।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র জি এম আবুল কালাম আজাদ বলেন, ডলারের কিছু সংকট থাকলেও এলসি খোলা বন্ধের কোনও নির্দেশনা দেয়নি বাংলাদেশ ব্যাংক। সক্ষমতা অনুযায়ী ব্যাংকগুলো পণ্যের বিপরীতে এলসি খুলছে। গত ১০ দিনে ৫৫টি ব্যাংক পণ্য আমদানির জন্য এলসি খুলেছে। বাজারের চাহিদা মেটানোর জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক নিয়মিত ডলার সরবরাহ করে যাচ্ছে। ভবিষ্যতেও তা অব্যাহত রাখা হবে।

তবে এলসি খুলতে ব্যাংকগুলোতে ধরনা দেওয়া হলে তারা শতভাগ ক্যাশ মার্জিন ছাড়া এলসি খুলতে রাজি হচ্ছে না। শতভাগ ক্যাশ মার্জিন দিয়ে এলসি খোলা সবার পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না। ফলে কাগজের ভার্জিন পাল্প আমদানির অভাবে কাগজ সংকট বাড়ছে।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের ট্রেড সাপোর্ট মেজারস উইংয়ের অতিরিক্ত দায়িত্বে থাকা অতিরিক্ত সচিব মো. হাফিজুর রহমানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি আমদানি ইউংয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলেন। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের আমদানি ও অভ্যন্তরীণ বাণিজ্য (আইআইটি) অনুবিভাগের অতিরিক্ত সচিব নুসরাত জাবীন বানুকে মোবাইল ফোনে একাধিকবার কল করলেও তিনি রিসিভ করেননি। ফোনে মেসেজ দিলেও কোনও জবাব দেননি তিনি।

সূত্র: বাংলা ট্রিবিউন
এম ইউ/১৫ নভেম্বর ২০২২

Back to top button