জাতীয়

বিমানের আকাশভরা অনিয়ম

আশরাফুল হক

ঢাকা, ১৫ নভেম্বর – আট বছর আগে যে এয়ারক্রাফট এভিয়েশন ইতিহাসের পাতায় ঠাঁই নিয়েছে, সেই ডিসি-১০ তদারকির জন্য এখনো জনবল পোষে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস। শুধুু ডিসি-১০ নয়, এয়ারবাস, এফ-২৮ বা এটিপি বহর থেকে সরিয়ে ফেলা হলেও এসবের জনবল সেটআপ বা বিন্যাস এখনো বিমানে রয়েছে।

বিষয়টি উল্লেখ করে বিমানের একজন প্রকৌশলী জানান, বিমানের পরিচালনা আধুনিক নয়। আধুনিক এয়ারক্রাফট থাকলেও এই সংস্থার পদে পদে অনাধুনিকতার ছাপ। তা না হলে ডিসি-১০-এর সেটআপ এখনো বয়ে বেড়াত না বিমান ব্যবস্থাপনা। বিমান আসলে সীমাহীন সম্ভাবনার আকাশে ডানা মেলতে পারছে না, ডানা মেলা বলাকার মনোগ্রাম নিয়ে যা যাত্রা শুরু করেছিল স্বাধীন দেশে।

ওই প্রকৌশলী আরও জানান, নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা তদন্ত করছে গোয়েন্দা সংস্থাসহ বিমান নিজেই। শুধু নিয়োগেই জটিলতা, বিষয়টি তা নয়। সর্বাঙ্গে ব্যথা ওষুধ দেব কোথা সেই প্রবাদ মারাত্মকভাবে প্রযোজ্য বিমানের জন্য। রাষ্ট্রীয় এই বাণিজ্যিক সংস্থাটির অনেক কর্মকর্তা-কর্মচারী মুখ খোলার একটি প্ল্যাটফর্ম চাইছেন, যেখানে নির্ভয়ে তারা তাদের বঞ্চনার কথা জানাতে পারবেন। নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা ধরা পড়ার পর পদোন্নতির অনিয়মও ব্যাপক চর্চার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে সংস্থাটিতে। একই সঙ্গে বদলির ঘাপলাও আলোচনায় জায়গা করে নিয়েছে।

২০১৪ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি বহরে শেষবারের মতো আকাশে ওড়ে ডিসি-১০। সেটাই ছিল বিশে^র সব শেষ ডিসি-১০ এয়ারক্রাফট। গবেষণার জন্য এ এয়ারক্রাফটটি যুক্তরাষ্ট্রের বিমান নির্মাতা প্রতিষ্ঠান বোয়িংয়ের মিউজিয়াম অব ফ্লাইটসে রয়েছে। এর মধ্য দিয়ে শেষ হয় ডিসি-১০ এয়ারক্রাফটের উড্ডয়নের ইতিহাস। বিলুপ্ত সেই ডিসি-১০ এয়ারক্রাফটের সেটআপ এখনো রয়েছে বিমানে। ডিসি-১০-এর সেটআপে রয়েছেন পে গ্রুপ ফাইভের কর্মকর্তা ইলেকট্রিক ট্রেডের মো. সাইফুল আলম। ফেজ আউট এয়ারবাসের দায়িত্বে রয়েছেন পে গ্রুপ সিক্সের জুলফিকার আলী ও বিকাশ বরুণ বালো। এটিপির সেটআপে রয়েছেন এম এ বায়াস চৌধুরী। এভাবে ফেজ আউট এয়ারক্রাফটের সেটআপে রয়েছেন ১৯ জন কর্মকর্তা।

মো. আমিনুল হক এয়ারক্রাফট ক্লিনার হিসেবে ২০০১ সালের ৫ আগস্ট বিমানে যোগ দেন। পদটি রূপান্তর করে শুধু শিফট বদল করে তাকে ২০১২ সালে পদোন্নতি দিয়ে এয়ারক্রাফট মেকানিক করা হয়। তাকে পদোন্নতি দেওয়ার জন্য শপ নম্বর বদল করে এনডিটি শপে বদলি করা হয়। এনডিটি থেকে গত বছরের ২০ জুন জুনিয়র টেকনিশিয়ান পদে পদোন্নতি দেওয়া হয়। ৯ মাসের ব্যবধানে চলতি বছরের ১৩ এপ্রিল তিনি পদোন্নতি পান জুনিয়র টেকনিশিয়ান অফিসার পদে। যদিও বিমান সার্ভিস রেগুলেশনে পদোন্নতির জন্য চাকরিকাল হতে হয় তিন বছর।

বিমানের সার্ভিস রেগুলেশন অনুযায়ী, প্রতিটি পদোন্নতির আগে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নামে কোনো বিভাগীয় অভিযোগ বা আদালতে মামলা আছে কি না, তা যাচাই করা বাধ্যতামূলক। অথচ ২০১৫ সালের ১৬ ডিসেম্বর বিজি ৪৩৩ ফ্লাইটে অতিরিক্ত ওজন বহনের জন্য আমিনুল হকের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়। ২০১৯ সালের ২৪ মে ভিভিআইপি ফ্লাইটে কর্তব্যে অবহেলার কারণে তার বিরুদ্ধে আরেকটি অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়। এসব বিভাগীয় মামলা এখনো চলমান।

বিমানে ইচ্ছা করলেই কর্মীদের এক ট্রেড থেকে আরেক ট্রেডে বদলি করা যায় না। ২০২০ সালে এ-সংক্রান্ত এক প্রশাসনিক আদেশে বলা হয়েছে, এক ট্রেড থেকে অন্য ট্রেডে পদায়ন বা প্লেসমেন্ট প্রদানের ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় প্রশাসনের অনুমোদন নিতে হবে। ইতিপূর্বে যাদের এক ট্রেড থেকে অন্য ট্রেডে বিধিবহির্ভূতভাবে বদলি করা হয়েছে, তাদের নিজ ট্রেডে ফেরত আনতে হবে। বিধিবহির্ভূত পদায়নের ক্ষেত্রে যেসব কর্মচারীকে পদোন্নতি বঞ্চিত করা হয়েছে, তাদের পদোন্নতিরও আদেশ দেওয়া হয়।

বিমানের আইটি বিভাগের যোগাযোগ (কমিউনিকেশন) দপ্তর থেকে তারেক মাহমুদকে ২০২০ সালের ২৩ ডিসেম্বর সম্পূর্ণ ভিন্ন কাজের পরিবেশে সিএসকিউ দপ্তরের মান নিয়ন্ত্রণ বিভাগে বদলি করা হয়। সিএসকিউ দপ্তরের মান নিয়ন্ত্রণ বিভাগ থেকে ২০২১ সালের ৭ জানুয়ারি প্রকৌশল অ্যান্ড ম্যাটেরিয়াল ম্যানেজমেন্ট পরিদপ্তরের টেকনিক্যাল লাইব্রেরিতে সংযুক্তিতে পদায়ন করা হয়। ২০২১ সালের ৬ ডিসেম্বর ইঞ্জিনিয়ারিং প্ল্যানিংয়ে বদলি করা হয়।

বিমানের আইটি বিভাগের যোগাযোগ (কমিউনিকেশন) দপ্তরের জনবল জ্যেষ্ঠতা নির্ধারণসহ যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে অন্যত্র সরিয়ে পদায়ন দেখানো হয়। সহকারী ব্যবস্থাপক (যোগাযোগ) থেকে উপব্যবস্থাপক ইঞ্জিনিয়ারিং প্ল্যানিং অ্যান্ড শিডিউলিং পদে গত ৮ আগস্ট পদোন্নতি দেওয়া হয়। আবার ২০২১ সালের ২১ সেপ্টেম্বর তারেক মাহমুদসহ ১৮ জনকে এবং গত ২৬ সেপ্টেম্বর ৩ জনকে বদলি করে স্থায়ীভাবে আত্তীকরণ করা হয়। ইঞ্জিনিয়ারিং টেকনিক্যাল লাইব্রেরি হিসেবে স্থায়ীভাবে আত্তীকরণের পর ২৭ সেপ্টেম্বর আবার বিমানের গ্রাহকসেবা পরিদপ্তরে বদলি করা হয়।

২০১৮ সালে ৩০ জন কর্মকর্তারকে সহকারী ব্যবস্থাপক (জেনারেল) হিসেবে নিয়োগ করা হয়। তাদের যে পদে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, দাপ্তরিক দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে অন্যত্র। যে কাজের জন্য নিয়োগ করা হয়েছে, তাদের সেই কাজ না করিয়েই একধাপ ওপরে পদোন্নতি দিয়ে উপব্যবস্থাপক করা হয়েছে।

সহকারী ব্যবস্থাপক (জেনারেল) নুরুল হককে গ্রাহকসেবা (ফ্লাইট সার্ভিস) পদে নিয়োগ দেওয়া হলেও তাকে পদায়ন করা হয় পরিকল্পনা পরিদপ্তরে। তানভীর আহমেদকে ফ্লাইট অপারেশন্সের জন্য নিয়োগ করা হলেও তাকে পদায়ন করা হয় রাজশাহী স্টেশনে। মো. শাহাদাত হোসেনকে ম্যাটেরিয়াল ম্যানেজমেন্টের জন্য নিয়ে পদায়ন করা হয় এজেন্সি অ্যাফেয়ার্সে, মোহাম্মদ রকিবুল হোসেনকে কার্গোর জন্য নিয়োগ দিয়ে আরএমএসে, মো. শোয়েব হাসান আরাফাতকে করপোরেট প্ল্যানিংয়ের জন্য নিয়োগ দিয়ে মার্কেট রিসার্চে, মো. বাদশা ফাহাদকে বিপণন ও বিক্রয়ে নিয়োগ দিয়ে যানবাহন বিভাগে, মো. রেজা-ই-রাব্বি চৌধুরীকে কার্গোর জন্য নিয়ে ম্যাটেরিয়াল ম্যানেজমেন্টে, মো. আবু ইউসুফকে ফ্লাইট অপারেশন্সে নিয়োগ দিয়ে রুট অ্যান্ড ফুয়েলে, মো. তৌহিদুর রহমানকে গ্রাহকসেবায় নিয়োগ দিয়ে নিরাপত্তা বিভাগে, আবদুল্লাহ আল মামুনকে ম্যাটেরিয়াল ম্যানেজমেন্টে নিয়োগ দিয়ে রেভিনিউ ইন্টারলাইনে, মো. চাঁদ মিয়াকে বিপণন ও বিক্রয়ে নিয়োগ দিয়ে কার্গোতে এবং শাকিলকে বিপণন ও বিক্রয়ে নিয়োগ দিয়ে ফ্লাইট সার্ভিসে পদায়ন করা হয়।

সহকারী ব্যবস্থাপক গ্রাউন্ড সার্ভিস মো. জাহাঙ্গীর হোসেনসহ আরও ছয় কর্মকর্তাকে এক পরিদপ্তর থেকে অন্য পরিদপ্তরে বদলি করা হয়; অথচ তাদের পদোন্নতি আগের জায়গায় হয়।

বিমানে শুধু অভ্যন্তরীণ বদলিজনিত কারণে পদ শূন্য করে পদোন্নতি দিয়ে আবার পূর্ব পদে ফিরিয়ে আনা হয়। যাকে অভ্যন্তরীণ বদলি করা হয়েছে পদোন্নতির ক্ষেত্রে তাকে কোথাও বিবেচনা করা হয় না। এমনকি যে পদ থেকে বদলি করা হয়েছে, সেখানে পদ শূন্য দেখানো হয়।

বিমানের শতভাগ মালিকানা সরকারের থাকায় বিমানের জনবলকাঠামো অন্যান্য সরকারি প্রতিষ্ঠানের মতো অর্থ মন্ত্রণালয় ও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। বিমান তার সংশোধিত সাংগঠনিক কাঠামো অনুমোদন ছাড়াই নিজেদের খেয়াল খুশিমতো পদ-পদবি পরিবর্তন করছে এবং ইচ্ছেমতো পদোন্নতি দিচ্ছে। একটি শাখা যথাযথভাবে বিলুপ্ত না করেই সেখানে কর্মরতদের বিভিন্ন স্থানে পদায়ন করছে, যাতে নানা জটিলতার সৃষ্টি হয়েছে।

যোগ্যদের দূরে রেখে পদোন্নতির ফলে প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা দুর্বল হচ্ছে। ক্যাজুয়াল কর্মচারীদের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে। একেক চুক্তিতে একেক রকম শর্তারোপ করা হচ্ছে। কেউ পেনশন সুবিধা পাচ্ছেন, আবার কেউ গ্রাচ্যুইটি সুবিধা পাচ্ছেন। একই গ্রেডের কর্মীদের ভিন্ন ভিন্ন সুবিধা দিয়ে বেতন-ভাতার বৈষম্য তৈরি করে শ্রমিক সংগঠনগুলোকে আন্দোলনের দিকে ঠেলে দিচ্ছে অনেকটা ইচ্ছে করেই। এতে বিভিন্ন মামলার ক্ষেত্র তৈরি হচ্ছে বলে মনে করছেন বিমানের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।

গত ৩০ জুলাই কিউআর-৬৪২ ফ্লাইটে মোবাইল ফোন চুরির অপরাধে যে এয়ারক্রাফট টেকনিক্যাল হেলপারকে এপিবিএন আটক করে, কোনো ধরনের শাস্তি না দিয়ে তাকে বরিশালে বদলি করা হয়।

সব বদলিরই আদেশ করেন এ জেড এম আরিফ। যিনি চাকরিজীবনের শুরু থেকে একই জায়গা অ্যাপয়েন্টমেন্ট, প্রমোশন পোস্টিং (এপিপি) শাখায় বাড়তি দায়িত্ব পালন করছেন। বিমানে কর্মকর্তা আসে, কর্মকর্তা যায়। কিন্তু আরিফ বহাল তবিয়তে এ শাখায় কাজ করেন। বাইরে থেকে কোনো কর্মকর্তা বিমানে প্রেষণে গিয়ে আরিফকে খুঁজে নেন। তিনি প্রেষণে আসা কর্মকর্তাদের বিমানের প্রশাসন সাজাতে সহায়তা করেন। বিনিময়ে তিনি সেই শাখায় বসে খেয়াল-খুশিমতো বিমানের কর্মীদের এখান থেকে সেখানে বদলি করেন।

বাংলাদেশ বিমান করপোরেশনকে পাবলিক লিমিটেড কোম্পানিতে রূপান্তরের জন্য মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ ২০০৭ সালে জনবল ৬ হাজার ৮৮৩ থেকে ৩ হাজার ৪০০তে নামিয়ে আনাসহ স্বেচ্ছা অবসর নেওয়া ১ হাজার ৮৭৭ জনবলের পদ বিলুপ্ত করার শর্ত দেয়। এ ছাড়া সাংগঠনিক কাঠামো জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের সম্মতি নেওয়ার শর্ত দেয়। এসব শর্ত না মেনে বিমান কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে।

বিমানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা যাহিদ হোসেন বলেন, ‘বিধিবিধান দিয়ে বিমান চলে। অনিয়ম হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়।’

সূত্র: দেশ রূপান্তর
আইএ/ ১৫ নভেম্বর ২০২২

Back to top button