ঢাকা

দুর্নীতির ভূত নিউমার্কেটে

ঢাকা, ১০ নভেম্বর – রাজধানীর নীলক্ষেত এলাকায় অবস্থিত সরকারি নিউমার্কেট কমপ্লেক্স। এর আওতাধীন অন্যতম বড় মার্কেট ‘ঢাকা নিউ সুপার মার্কেট দক্ষিণ’। এখানে ব্যবসা করে জীবিকা নির্বাহ করেন প্রায় ১২ হাজার ব্যবসায়ী। তাদের জমানো প্রায় সাত কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন মার্কেটের তিন ব্যবসায়ী নেতা। ভবন সংস্কারসহ নানা বাহানায় এসব অর্থ সরানো হয়েছে। গুরুতর এই আর্থিক অনিয়মের ঘটনায় দায়ের করা মামলায় আদালতে চার্জশিট দিয়েছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। সেখানেই উঠে এসেছে দুর্নীতি আর লুটপাটের আদ্যোপান্ত।

পিবিআইয়ের অভিযোগপত্রে দুর্নীতিতে অভিযুক্ত করা হয়েছে ঢাকা নিউ সুপার মার্কেট (দক্ষিণ) বণিক সমিতির ২০১৬-২০১৯ সাল মেয়াদকালের কার্যকরী কমিটির তিন শীর্ষনেতাকে। তারা হলেন ওই কমিটির সভাপতি মো. আবুল কাশেম, সাধারণ সম্পাদক আমিনুল ইসলাম ফকির সাগর ও কোষাধ্যক্ষ মো. সাইফুল ইসলাম কিরণ। তাদের দাবি এসব অভিযোগ ভিত্তিহীন। ষড়যন্ত্র করে তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছে বলে দাবি করেছেন তারা।

জানা গেছে, মার্কেটের বর্তমান কমিটি (২০২০-২০২৩) ২০২০ সালে দায়িত্ব গ্রহণ করে। এরপরই ২০১৬-২০১৯ মেয়াদের কার্যকরী কমিটির আর্থিক কার্যক্রম খতিয়ে দেখতে একটি অডিট ফার্ম নিয়োগ দেওয়া হয়। তাদের নিরীক্ষায় ২০২১ সালে আগের কমিটির দুর্নীতি ধরা পড়ে। এর জেরে আদালতে মামলা করেন বর্তমান কমিটির সভাপতি মো. সহিদউল্লাহ সহিদ। মামলার চার্জশিটে বলা হয়েছে, আয়-ব্যয় হিসাবে কম হিসাবভুক্ত করে বিদ্যুৎ বিল খাত থেকে হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে ১ কোটি ১০ লাখ ৯৭ হাজার টাকা। এ ছাড়া সাধারণ আয়-ব্যয় খাতে কম হিসাবভুক্ত করে সরানো হয়েছে ৬ লাখ সাড়ে ৯ হাজার টাকা। সাধারণ সংস্কার খাত থেকেও প্রায় ২ লাখ টাকা সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।

নিরীক্ষা প্রতিবেদনের বরাতে চার্জশিটে আরও বলা হয়েছে, মার্কেটের বণিক সমিতির রূপালী ব্যাংকের একটি হিসাব থেকে ১ কোটি ২০ লাখ টাকা সরিয়ে নিয়েছেন অভিযুক্ত আমিনুল ইসলাম সাগর। ২০১৯ সালের ২৩ জানুয়ারি এই টাকা তার ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্টে সরানো হয়। এ ছাড়াও মার্র্কেটের সাধারণ সংস্কার আয়-ব্যয় খাতে প্রাপ্ত ব্যয় দেখানো হয়েছে মোট ৫ কোটি ৩২ লাখ ৫৪ হাজার ৩৯৮ টাকা। কিন্তু এর বিপরীতে বিল ভাউচার ও সাপোর্টিং দ্বারা সমর্থিত খরচের হিসাব পাওয়া গেছে ১ কোটি ৯৫ হাজার ৬৭ হাজার ৫৭২ টাকা। অর্থাৎ এই খাত থেকেই ৩ কোটি ৩৬ লাখ ৮৬ হাজার ৮২৬ টাকা তছরুপ হয়েছে।

আরও দেখা গেছে, অভিযুক্তরা টয়লেট সংস্কার খাত থেকেও ৪৮ লাখ ৮৭ হাজার ৭২৬ টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। মার্কেট প্রাঙ্গনে ডিপ-টিউবওয়েল স্থাপন খাত থেকেও ৪২ লাখ ৬৭ হাজার টাকা সরানো হয়েছে। এ ছাড়াও আরও বেশকিছু খাতে নানা বাহানা ও প্রতারণার আশ্রয় নিয়ে অভিযুক্তরা ২০১৬-২০১৯ পর্যন্ত সমিতির জমাকৃত ৬ কোটি ৬০ লাখ ৬৫ হাজার টাকা আত্মসাৎ করেছেন বলেও চার্জশিটে উল্লেখ করা হয়েছে।

তবে এসব অভিযোগ ভিত্তিহীন বলে দাবি করেছেন বণিক সমিতিটির সাবেক সভাপতি মো. আবুল কাশেম। গতকাল বুধবার রাতে তিনি বলেন, ‘আমার কমিটির মেয়াদকালে যে কাজ হয়েছে তা অন্য কোনো সময় হয়নি। উদ্দেশ্যমূলকভাবে আমাদের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে। প্রতিটি টাকার হিসাব আমাদের কাছে রয়েছে। এই হিসাব আমরা এডহক কমিটির কাছে বুঝিয়ে দিয়েছি।’

একই কমিটির সাধারণ সম্পাদক আমিনুল ইসলাম ফকির বলেন, ‘তিন বছরে আমরা প্রায় ৭ কোটি টাকা নিয়েছি বলে যে অভিযোগ করা হয়েছে তা ডাহা মিথ্যা। এই সময়ে ৭ কোটি টাকা চাঁদা উঠেছে কিনা তা নিয়ে সন্দেহ পোষণ করেন তিনি। সাবেক ওই কমিটির কোষাধ্যক্ষ মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘উদ্দেশ্যমূলকভাবে আমাদের বিরুদ্ধে মামলা দেওয়া হয়েছে। আইনিভাবেই আমরা মোকাবিলা করব।’

মামলার বাদী ও সমিতির বর্তমান সভাপতি মো. সহিদউল্লাহ বলেন, আগের কমিটি কর্তৃক কোটি কোটি টাকা তছরুপের বিষয়টি অডিট ফার্ম তুলে এনেছে, আমরা নই। আদালতে চার্জশিট দিয়েছে পিবিআই। এখানে আমাদের কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই। আগের কমিটি আয়-ব্যয়ের সর্বশেষ যে হিসাব দিয়েছে সেখানেও প্রতারণার আশ্রয় নেওয়া হয়েছে। ব্যবসায়ীদের লুটপাট হওয়া জমানো টাকা ফেরত আনতেই মামলা করা হয়েছে। মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা পিবিআইয়ের এসআইএন্ডও (অর্গানাইজড ক্রাইম-দক্ষিণ)-এর পরিদর্শক মোহাম্মদ মাসুদ রানা বলেন, বাদীর অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় আদালতে প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়েছে।

সূত্র: আমাদের সময়
আইএ/ ১০ নভেম্বর ২০২২

Back to top button