জাতীয়

‘রিজার্ভ বাড়াতে প্রবাসীর কাছে যেতে হবে, তাদের কথা শুনতে হবে’

ঢাকা, ০৯ নভেম্বর – ‘সাম্প্রতিক সময়ে আমাদের রেমিট্যান্স কমে এসেছে। প্রতি মাসেই এক থেকে দুই বিলিয়ন ডলার রিজার্ভ থেকে বাজারে চলে যাচ্ছে। এতে রিজার্ভের পরিমাণ আরও কমে যাচ্ছে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বাড়াতে হলে রেমিট্যান্সকে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে নিতে হবে। এজন্য দেশের বাইরে প্রবাসীদের দোরগোড়ায় যেতে হবে। তাদের কথা শুনতে হবে, তাদের বোঝাতে হবে। একই সঙ্গে বৈধভাবে দেশীয় ব্যাংকের মাধ্যমে রেমিট্যান্স পাঠাতে সহযোগিতা ও উৎসাহ দিতে হবে। এতে রেমিট্যান্স বাড়বে, রিজার্বের পরিমাণও বেড়ে যাবে। কেটে যাবে সব সমস্যা আর শঙ্কা।’

বুধবার (৯ নভেম্বর) ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরামের (ইআরএফ) কার্যালয়ে ‘বৈধ পথে সহজে নিরাপদে ডিজিটাল মাধ্যমে রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়াতে করণীয়’ শীর্ষক সেমিনারে বিশিষ্টজনরা এ কথা বলেন।

ইআরএফ সভাপতি শারমীন রিনভীর সভাপতিত্বে ও সাধারণ সম্পাদক এস এম রাশিদুল ইসলামের পরিচালনায় সেমিনারে প্রধান অতিথি ছিলেন পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান। এতে দেশের বিশিষ্ট গবেষক ও অর্থনীতিবিদরা বক্তব্য রাখেন।

পরিকল্পনামন্ত্রী বলেন, আমরা প্রবাসীদের কাছ থেকে কৌশলে রেমিট্যান্স আনার চেষ্টা করছি। প্রবাসীরা না খেয়ে আবেগে টাকা পাঠান মা-বাবা, স্ত্রী-সন্তানদের জন্য। আগে দেখতাম প্রবাসীদের টাকা ব্যাগে করে দিয়ে যেতেন অপরিচিত কিছু লোক। তারা প্রবাসীর পরিবারের কাছে এসে খাওয়া-দাওয়া শেষে টাকার প্যাকেট দিয়ে যেতেন। প্রথমে আমরা বুঝিনি, এখন বুঝছি তারা হুন্ডিওয়ালা। মধ্যপ্রাচ্যে যারা লোক পাঠান তাদের অক্ষরজ্ঞান নেই, তাদের একটু প্রশিক্ষণ দিলে দক্ষ হিসেবে কাজ করতে পাৎরেন। আমাদের যে লোকটা উটের পিঠে হাটেন, অন্য দেশে গেলে তিনি অনেক টাকা পাবেন।

তিনি বলেন, আমাদের ক্যালেন্ডার বিশ্বের সঙ্গে মিল নেই। আমরা শুক্রবার বন্ধ রাখি, শুক্র-শনি মিলে গড়ে তিনটা দিন হেলায় কাটছে। আরবের অনেক দেশ এখন শুক্রবারেও কাজ করে। এখন আড়াই শতাংশ হারে প্রণোদনা দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু আজ দেশের বাইরে গেলে কাল অনেকেই ৫-১০ লাখ টাকা পাঠাচ্ছেন। নিশ্চয়ই হুন্ডি হচ্ছে। তবে হুন্ডিওয়ালা শুধু এখানে থেকে টাকা পাঠান না, ওখান থেকেও পাঠান।

মন্ত্রী আরও বলেন, আমার সঙ্গে দেখা করতে আমারই এলাকার মানুষ এজেন্ট নিয়ে আসেন। তার একটা তদবির করাতে এটা করে থাকেন। অথচ তিনি একাও আসতে পারেন। এজেন্ট নিয়ে আসার এই প্রথাটা ভাঙতে হবে। দূতাবাসের অবস্থাও পরিবর্তন করতে হবে। সেখানে কোনো এজেন্টের মাধ্যমে না কথা বলে সরাসরি কথা বলতে হবে। আবার দূতাবাস কর্মকর্তা-কর্মচারীদেরও ভালো ব্যবহার করতে হবে। কারণ রেমিট্যান্সের ওপর ভর করেই অর্থনীতি শক্তিশালী হয়।

পলিসি রিচার্স ইনস্টিটিউটের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা অর্থনীতিবিদ ড. আহসান এইচ মনসুর বলেন, আমরা প্রতি মাসেই এক, দুই বিলিয়ন করে রিজার্ভ হারাচ্ছি। এর মানে আমরা বাজারে ডলার ছাড়ছি। এতে রিজার্ভ কমছে। এখানে আমাদের সমন্বয়ের জন্য রপ্তানি বাড়াতে হবে এবং আমদানি নির্ভরতা থেকে সরে আসতে হবে। আমাদের দেখতে হবে কেন আমেরিকা থেকে বৈধ পথে বেশি রেমিট্যান্স আসছে, কেন মধ্যপ্রাচ্য থেকে কম আসছে। লোকালি প্রবাসীদের কাছে যেতে হবে, তাদের কথা শুনতে হবে। মার্কেটগুলোতে আমাদের প্রচার করতে হবে যে আপনারা (প্রবাসী) শুধু আমাদের ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে রেমিট্যান্স পাঠান। এটা কেন্দ্রীয় ব্যাংক করতে পারে। শুধু ফরমাল মার্কেট না কার্ব মার্কেটগুলোতেও কিছু ডলার দিতে হবে।

বিশ্ব ব্যাংকের সাবেক কর্মকর্তা ও পলিসি এক্সচেঞ্জের চেয়ারম্যান মাশরুর রিয়াজ বলেন, আমাদের চার স্থান থেকে রিজার্ভ আসতো। এর মধ্য অন্যতম হলো রেমিট্যান্স। এখন রেমিট্যান্স কমেছে এটাকে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে হবে। আমদানি-রপ্তানির ভারসাম্য বজায় রাখার উদ্যোগ নিতে হবে। বাংলাদেশে মোবাইলে আর্থিক সেবায় (এমএফএস) আমরা ভারত-শ্রীলঙ্কার পরে শুরু করলেও আমরা ভালো করছি। ডিজিটাল ফাইন্যান্সের ক্ষেত্রে আমাদের আরও উন্নতি দরকার। দুবাই থেকে রেমিট্যান্স কমেছে কেন সেটা খুঁজে বের করতে হবে। আবার সেই দুবাইয়ে আবাসন খাতে আমাদের বিনিয়োগ বেড়েছে এটাও দেখতে হবে।

বিএফআইইউ’র সাবেক উপ-প্রধান ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক নির্বাহী পরিচালক ইস্কান্দার মিয়া বলেন, আমাদের দূতাবাসগুলো সাহায্যকারী না। অন্যদিকে যারা মাদক বা চোরাকারবার তারা শক্তিশালী। চোরাইপথে ডলারের দাম বেশি দেওয়া হচ্ছে। আমরা সহজেই অবৈধভাবে আদান-প্রদান করতে পারছি। দূতাবাসগুলো প্রবাসীদের খোঁজ-খবর নিলে এটা করতে পারতো না। আমাদের অনেকেই সোনা আনছে বা ডলার আনছে। কিন্তু সেসব ডলারগুলো ব্যাংকে যাচ্ছে না তাহলে যাচ্ছে কোথায়? আমরা তাদের অবৈধতার বিষয়ে বলতে পারলে তারা বৈধভাবে রেমিট্যান্স পাঠাবে, হুন্ডি হবে। আবার অবৈধতার বিষয়ে আমাদের ব্যাংকের তদন্তকারী যখন তদন্তে যান তখন তাদের অর্থের লোভ দেখানো হয়। আবার জীবননাশের হুমকিও দেয়। জীবনের নিরাপত্তার বিষয়েও দেখতে হবে। আইনের কোনো ঘাটতি নেই, শুধু সমস্যা রয়েছে সমাধানের, যেটার সমাধান এখনই প্রয়োজন।

সেমিনারে প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনিয়র অধ্যাপক ও সানেম চেয়ারম্যান বজলুল খন্দকার। প্রবন্ধে তিনি বলেন, এমএফএসে ৫৫ দেশের মধ্যে আমরা ৪৪তম। ভারত-কেনিয়াসহ যারা এগিয়ে আছে তাদের স্কোর ৭৫ প্লাস, আমাদের ৪০ প্লাস। রেমিট্যান্স বাড়াতে হলে ডিজিটাল কাঠামোকে শক্তিশালী করতে হবে এবং ডিজিটাল শিক্ষা বৃদ্ধি করতে হবে। এক্ষেত্রে যারা দেশের বাইরে যাচ্ছেন তাদের প্রশিক্ষণের আওতায় আনতে হবে।

প্যানেল আলোচনায় এক বক্তা বলেন, দেশে বসেও যদি কেউ বাইরের টাকা আনে তাকেও আমরা প্রণোদনার আওতায় আনতে পারি। ওয়েজ অনার্স বন্ডের ক্ষেত্রে এক কোটি টাকার, এ ক্যাপটা করে দেওয়া। কারণ শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ করবেন সে আস্থার জায়গা এখনো নেই। যারা শ্রমিক, দেশের বাইরে যাচ্ছেন, তাদের একটা নয় একাধিক প্রশিক্ষণ দিতে হবে। আবার দেশের বাইরে যারা অবৈধভাবে আছেন তাদেরও ডিজিটালাইজেশনের আওতায় আনতে হবে।

ইসলামী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী মনিরুল মওলা বলেন, আমাদের ব্যাংক শুরু হয়েছিল রেমিট্যান্স দিয়ে। আমরা রেমিট্যান্সে গুরুত্ব দিয়ে আসছি। ৪৮ বিলিয়ন ডলারের রিজার্ভ যখন ছিল, আমরা সেখানে ১২ বিলিয়ন ডলার জমা দিয়েছিলাম। প্রবাসী অধ্যুষিত এলাকায় আমরা কাজ করেছি, সেখানে অ্যাকাউন্ট ওপেন এবং পাঠানোর বিষয়ে উদ্বুদ্ধ করেছি। ২৪ ঘণ্টার যেকোনো সময় রেমিট্যান্স পাঠাতে পারেন, এতে আস্থাভাজন ব্যাংকে পরিণত হয়েছে ইসলামী ব্যাংক। প্রতি ৫ কিলোমিটার দূরে আমাদের এজেন্ট ব্যাংকিং আছে।

বিকাশের প্রতিনিধি শেখ মনিরুল ইসলাম বলেন, বিকাশে সরাসরি রেমিট্যান্স আসে না, ব্যাংক সেটেলমেন্টের মাধ্যমে আসে। এটা হতে পারে কোনো ব্যাংক বা ব্যাংকের নস্ট্রো অ্যাকাউন্ট থেকে আসে। সেটেলমেন্ট ছাড়া বিকাশের মাধ্যমে দেশের বাইরে যেতে পারে না আবার আসতেও পারে না। নভেম্বরে গড়ে দেড় মিলিয়ন পরিমাণ ডলার আসছে। বিকাশে রেমিট্যান্স এলে তার প্রণোদনা ও মূল টাকার বিষয়ে আমরা এসএমএস করে পাঠিয়ে দেই সঙ্গে সঙ্গেই।

সূত্র: জাগো নিউজ
এম ইউ/০৯ নভেম্বর ২০২২

Back to top button