অপরাধ

এসি মেরামতকারী থেকে ‘কোটি টাকার মালিক’

ঢাকা, ০৮ নভেম্বর – পেশায় এসি মেরামতকারী হলেও ‘প্রধানমন্ত্রীর পরিবারের প্রটোকল অফিসার’ হিসেবে ভুয়া পরিচয় দিয়ে কোটি কোটি হাতিয়ে এক ব্যক্তির অর্থসম্পদ গড়ে তোলার তথ্য জানিয়েছে র‌্যাব।

ওই ঘটনায় দুজনকে গ্রেপ্তারের পর মঙ্গলবার সংবাদ সম্মেলনে তাদের প্রতারণা কৌশল নিয়ে বিস্তারিত তুলে ধরেন র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক খন্দকার আল মঈন।

গ্রেপ্তাররা হলেন- তাওহীদ ইসলাম (৩৪) ও সহযোগী ইমরান মেহেদী হাসান (৩৮)। সোমবার ঢাকার বনানী থেকে তাদের গ্রেপ্তারের কথা জানায় র‌্যাব।

সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, ধর্মান্তরিত হয়ে মুসলিম হওয়া তাওহীদের বাড়ি বগুড়ার শিবগঞ্জে। তার নাম ছিল হরিদাস চন্দ্র। মুসলিম সবজি বিক্রেতার মেয়েকে বিয়ে করে তিনি মুসলিম হয়ে যান।

“প্রধানমন্ত্রীর পরিবারের প্রটোকল কর্মকর্তা পরিচয় দিয়ে প্রতারণার মাধ্যমে শতাধিক ব্যক্তির কাছ থেকে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেন। পরে ময়মনসিংহে একটি রিসোর্ট গড়ে তোলেন। এসি মেরামতকারী হলেও প্রতারণার মাধ্যমে তিনি এসব সম্পদ গড়ে তোলেন।”

‘ভারত থেকে দেশে ফিরে প্রতারণার ফাঁদ’

কারওয়ান বাজারে র‌্যাব মিডিয়া সেন্টারে খন্দকার মঈন বলেন, “অত্যন্ত গরীব ঘরের সন্তান হরিদাস চন্দ্র পরিবার থেকে বের হয়ে ২০০২ সালে অবৈধভাবে ভারতে চলে যান। সেখানে এক আত্মীয়ের বাসায় অবস্থান নিয়ে এতিম সার্টিফিকেট সংগ্রহ করেন। পরে সেখানে এক স্কুলে ভর্তি হয়ে মাধ্যমিক এবং উচ্চ মাধ্যমিক পাস করেন।

গ্রেপ্তার তাওহীদ ইসলাম।
“পরবর্তীতে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র মেরামতের বিষয়ে প্রশিক্ষণ নেন। প্রায় আট বছর সেখানে অবস্থান করে দালালের মাধ্যমে দেশে এসে ঢাকার উত্তরায় এসে এসি কেনাবেচা ও মেরামতের কাজ শুরু করেন।”

মঈন বলেন, ২০১৮ সালে এক সবজি বিক্রেতার বাসায় সাবলেট থাকার সময় ২০১৯ সালে ধর্মান্তরিত হয়ে নিজের নাম পরিবর্তন করে তাওহীদ ইসলাম রাখেন সেই এসি মেরামতের কারিগর। পরে সেই সবজি বিক্রেতার মেয়েকে বিয়ে করেন।

“তাওহীদ প্রথমে তার শ্বশুরের পরিচয়ে ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়ায় কিছু জমি কেনেন। তাওহীদের পরামর্শে তার শ্বশুর এলাকার লোকজনের কাছে মেয়ের জামাইকে খুবই প্রভাবশালী এবং প্রধানমন্ত্রীর পরিবারের সদস্যদের প্রটোকল অফিসার বলে পরিচয় দেন। তাওহীদও সেটি কাজে লাগিয়ে স্থানীয় রাজনীতিবিদ, প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সাথে সম্পর্ক গড়ে তোলেন। পোশাক ও আচার-আচরণেও পরিবর্তন আনেন।

“এভাবে অবস্থাসম্পন্ন ব্যক্তিদের বিভিন্ন প্রজেক্টের প্রস্তাব দিতেন এবং বিনিয়োগে লভ্যাংশ দেওয়ার কথা বলতেন। সরকারি দপ্তর হতে টাকা ছাড় করা, টেন্ডার পাইয়ে দেওয়া, চাকরি দেওয়াসহ নানা কথা বলে টাকা আদায় করতেন।”

কমান্ডার মঈন বলেন, এই কাজ করতে গিয়ে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ক্যাশিয়ার ইমরান মেহেদীর সঙ্গে পরিচয় হয় তাওহীদের।

“ইমরান পরে চাকরিপ্রত্যাশীদের তাওহীদের কাছে নিয়ে আসতেন এবং মোটা অংকের টাকা আদায় করে ভাগাভাগি করে নিতেন। এভাবে তাদের কাছে শতাধিক ব্যক্তি প্রতারণার শিকার হয়েছেন।”

‘ভুয়া সুপারিশ করতে গিয়ে ধরা’

সংবাদ সম্মেলনে র‌্যাব জানায়, তাওহীদের প্রতারণা চক্রের সদস্য ইমরানের বিরুদ্ধে অর্থ জালিয়াতির অভিযোগ উঠলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে তাকে বদলি করে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে পাঠানো হয় এ বছরের শুরুতে। কিন্তু এই বদলি ঠেকাতে দুজন নানা কৌশল করেন।

“প্রধানমন্ত্রীর পরিবারের একজন সদস্যের নাম লিখে সিল মেরে বদলির আদেশ বাতিলের জন্য সুপারিশ করা হয়। পরে ওই আবেদনের ছবিটি স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের একজন কর্মকর্তার মোবাইলে পাঠান তাওহীদ।

“বিষয়টি নিয়ে সন্দেহ হলে খোঁজ নিয়ে ওই কর্মকর্তা জানতে পারেন, সেটি ভুয়া। পরে বিষয়টি জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থার (এনএসআই) এক কর্মকর্তাকে জানানো হয়।”

খন্দকার মঈন বলেন, এনএসআই এর পক্ষ থেকে বিষয়টি জানানোর পর তারা তদন্ত করতে গিয়ে প্রতারক তাওহীদ ও ইমরানের ব্যাপারে অনেক তথ্য পান। এরপরেই তাদের গ্রেপ্তার করা হয়।

‘প্রতারণার অর্থে’ রিসোর্ট

মঈন জানান, তাওহীদ প্রতারণার মাধ্যমে ২০১৯ সালে ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়ায় প্রায় এক বিঘা জমির উপর চার কোটি টাকা ব্যয়ে একটি রিসোর্ট তৈরি করেন। নাম দেন ‘প্যারিস সুইমিংপুল এন্টারটেইনমেন্ট পার্ক’।

গ্রেপ্তার ইমরান মেহেদী হাসান।
“এই রিসোর্টের কাজ শুরু হলে শেয়ার দেওয়ার কথা বলে অনেকের কাছ থেকে লাখ লাখ টাকা নিলেও কোনো রশিদ দেননি বা চুক্তি করেননি তিনি। কাজ শেষ হওয়ার পর গত বছর ফেব্রুয়ারি মাসে এই রিসোর্ট খুলে দেওয়া হয়। সেখানে বড় করে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাথে তার নিজের একটি ছবি টাঙ্গানো হয়, যা পুরোপুরি এডিট করা।”

র‌্যাব জানায়, সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ের ব্যক্তির সঙ্গেও তাওহীদের ছবি টাঙ্গানো হয় রিসোর্টে, যাতে সেখানে আসা পর্যটকরা তাওহীদের ‘প্রভাব’ বুঝতে পারেন ।

‘বিভিন্ন ব্যাংকে একাধিক অ্যাকাউন্ট’

তাওহীদের সঙ্গে আরও কয়েকজনের সম্পৃক্ততার কথা জানিয়ে র‌্যাব কর্মকর্তা মঈন বলেন, “তাওহীদ তার পরিচিতদের মোবাইল নম্বর প্রধানমন্ত্রীর পরিবারের সদস্য কিংবা কোনো প্রতিষ্ঠানের প্রধানের নাম দিয়ে সেইভ রাখতেন। তার এই কৌশল কেউ বুঝত না। ফলে সাধারণ মানুষ সহজেই প্রতারিত হতো”

বিভিন্ন ব্যাংকে তাওহীদের একাধিক অ্যাকাউন্টের তথ্য পেয়েছে র‌্যাব। এসব অ্যাকাউন্টে কোটি কোটি টাকা লেনদেনের তথ্য পাওয়ার কথা জানানো হয় সংবাদ সম্মেলনে।

র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক বলেন, “তাওহীদের রাজনৈতিক কোনো পরিচয় না থাকলেও স্থানীয়ভাবে তার প্রভাব ছিল বেশ। নিজেকে প্রধানমন্ত্রীর প্রটোকল অফিসার পরিচয় দিয়ে একটি টেন্ডার পাইয়ে দেওয়ার জন্য এক সরকারি কর্মকর্তাকে ফোন করেছিলেন। তবে বিষয়টি ফাঁস হয়ে যাওয়ায় সেই কাজটি আর হয়নি।

“তবে যার জন্য এই মিথ্যার আশ্রয় নিয়েছিলেন, সেই ঠিকাদারের কাছ থেকে মোটা অংকের টাকা হাতিয়ে নেন তাওহীদ। সোনা চোরাচালানের সঙ্গেও তিনি জড়িত।”

সূত্র: বিডিনিউজ
এম ইউ/০৮ নভেম্বর ২০২২


Back to top button
🌐 Read in Your Language