অপরাধশিক্ষা

‘স্যার সমকামী’ প্রমাণ পেয়েও ব্যবস্থা নিতে দীর্ঘসূত্রিতা

আরিফুল ইসলাম সাব্বির

ঢাকা, ০২ নভেম্বর – কখনও যৌন নির্যাতন, কখনও শিক্ষার্থীদের বাধ্য করতেন সমকামিতায়। রাজি না হলে মারধর এবং পরীক্ষায় কম নম্বর দেওয়ার ভয় দেখানো ছিল নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার। এমনকি শিক্ষার্থীদের দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে কুরুচিপূর্ণ আলাপচারিতা এবং মেসেঞ্জারে নগ্ন ছবিও চাইতেন তিনি।

ঢাকার ধামরাইয়ে ভালুম আতাউর রহমান খান ডিগ্রি কলেজের ভূগোল বিভাগের জ্যেষ্ঠ প্রভাষক আমিনুল ইসলামের বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ দীর্ঘদিনের। ওই শিক্ষকের যৌন নির্যাতনের শিকার প্রায় ৩০ শিক্ষার্থী অবশেষে মুখ খুলেছে। প্রতিকার চেয়ে লিখিত অভিযোগ করেছে উপজেলা নির্বাহী অফিসারের কাছে।

এ ঘটনায় গত ৩ অক্টোবর তদন্ত কমিটির দেওয়া প্রতিবেদনে ওই শিক্ষকের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে বলে জানা গেছে।

এর আগে ধামরাই উপজেলা নির্বাহী অফিসার ও কলেজটির গভর্নিং বডির সভাপতি হোসাইন মোহাম্মদ হাই জকি শিক্ষার্থীদের অভিযোগের ভিত্তিতে পাঁচ সদস্য বিশিষ্ট তদন্ত কমিটি গঠন করেন। পরে ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীদের বক্তব্য গ্রহণ শেষে কলেজের আরেক প্রভাষক তদন্ত কমিটির প্রধান হাবিবুর রহমান হাবিব প্রতিবেদন জমা দেন। কিন্তু এরপর এক মাস অতিবাহিত হলেও অদৃশ্য কারণে কলেজ কর্তৃপক্ষ কার্যত ওই শিক্ষকের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থাই নেয়নি।

বুধবার (২ নভেম্বর) এই প্রতিবেদকের কাছে অভিযুক্ত শিক্ষকের যৌন ও মানসিক নির্যাতনের কথা তুলে ধরেন কয়েকজন শিক্ষার্থী। তাদেরই একজন উল্লেখিত কলেজের মানবিক বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের এক শিক্ষার্থী বলেন, ‘ওই স্যার (আমিনুল ইসলাম) শিক্ষার্থীদের হয়রানি করে। মেয়েদের করে না, শুধু ছেলেদের। সে অনেক আগে থেকেই এটা করে আসতেছে। পড়ালেখার কথা চিন্তা কইরা কেউ মুখ খোলে নাই। আমরা যারা অভিযোগ করছি তারা পড়ালেখার কথা চিন্তা করে নাই। কারণ আমরা কলেজ শেষ করার পর সেখান থেকে চলে আসলে ওই শিক্ষক আমাদের ছোট ভাইদের সাথেও একই কাজ করবে। এ কথা চিন্তা করেই আমরা অভিযোগ দিছি।’

‘প্রায় এক মাস আগে অভিযোগ দিছি। কিন্তু এখনও কোনো বিচার হয় নাই। আমরা তো কিছু বুঝতেছি না।’ যোগ করেন ওই শিক্ষার্থী।

মানবিক বিভাগের আরেক ছেলে শিক্ষার্থী বলেন, ‘একদিন আমিনুল স্যার আমাকে আলাদা রুমে ডেকে নিয়ে যায়। পরে জোরপূর্বক আমার কাপড় খুলে যৌন নির্যাতন করে। এ কথা কাউকে বললে আমাকে পরীক্ষা দিতে দিবে না এমন ভয় দেখায়।’

‘স্যার বিভিন্ন সময় সিঁড়ি দিয়ে নামার সময় কৌশলে ছেলেদের স্পর্শকাতর স্থানে হাত দেয়। মেসেঞ্জারে বিভিন্ন কূরুচিপূর্ণ কথা বলে। নগ্ন ছবি চায়। সে (আমিনুল ইসলাম) মূলত সমকামী। তার এমন নোংরা কাজে কলেজের পরিবেশ নষ্ট হয়ে গেছে। অনেক ছাত্র তার যৌন নির্যাতনের শিকার। অবিলম্বে আমরা তার প্রত্যাহার ও কঠিন শাস্তি দাবি করছি।’ অভিযোগ করে বলেন মানবিক বিভাগের আরেক শিক্ষার্থী।

প্রভাষক হাবিবুর রহমান হাবিব বলেন, ‘তদন্তে যা পেয়েছি সেটা তো ভাষায় প্রকাশ করা করা যায় না। ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে ২০ দিন আগে আমরা তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিয়েছি। ওই প্রভাষকের বিরুদ্ধে ভুক্তভোগীদের অভিযোগের সত্যতা পেয়েছি।’

অভিযুক্তের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে কিনা এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘এটা তো প্রিন্সিপাল দেখবেন। কলেজের পরিচালনা কমিটি এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবেন। তবে অভিযুক্ত শিক্ষক এখন কলেজে আসেন না।’

অভিযুক্ত প্রভাষক আমিনুল ইসলামকে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি। এসএমএস করেও সাড়া মেলেনি। পরে তিনি মুঠোফোন বন্ধ করে দেন।

এ প্রসঙ্গে কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মাইন উদ্দিন বলেন, ‘ওই শিক্ষকের বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীরা লিখিত অভিযোগ করেছে ইউএনও’র কাছে। ফলে এ বিষয়ে সেই সিদ্ধান্ত নেবে। আমার কাছে তো অভিযোগ করে নাই। তাছাড়া ইউএনও স্যার তো ব্যবস্থা নেবেই। এক সপ্তাহের মধ্যেই সিদ্ধান্ত দেবে।’

ধামরাই উপজেলা নির্বাহী অফিসার মোহাম্মদ হাই জকী বলেন, ‘আমরা অভিযোগ পেয়েছি। এটি প্রক্রিয়াধীন। শীঘ্রই আপনারা ফলাফল জানতে পারবেন।’

তবে ব্যবস্থা নিতে দীর্ঘসূত্রিতা কেন এ প্রশ্নে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি নির্বাহী অফিসার।

সূত্র: রাইজিংবিডি
এম ইউ/০২ নভেম্বর ২০২২

Back to top button