সনাতন

ভারতচন্দ্রের ‘অন্নদামঙ্গল’-এ জগদ্ধাত্রী পুজোর কোনও উল্লেখ নেই

মৃত্যুঞ্জয় সরদার

বাংলায় বারো মাসে তেরো পার্বণ, আর বাঙ্গালীদের সবচেয়ে ঈশ্বরবিশ্বাসী বেশি।তাই ঈশ্বরের আরাধনা অনেকেই ব্যস্ত এই সময়। একই মা বিভিন্ন রূপে পূজিত হন এই পৃথিবীতে। আমরা প্রত্যেকে নিজের মধ্যে উপলব্ধি করি ঈশ্বরের শক্তিকে। তাই এক সময় আমরা সবাই ঈশ্বর বিশ্বাসী হয়ে উঠেছিলাম।এককালে চন্দননগরের বাড়িতে বাড়িতে জগদ্ধাত্রী পুজোর প্রচলন ছিল। পরবর্তীকালে ব্যবসায়ীদের হাত ধরে এই পুজোর পরিধি আড়ে-বহরে কয়েক গুণ বেড়ে উঠেছে। এখন অধিকাংশই বারোয়ারি বা সর্বজনীন পুজো। বাঙলার অন্যান্য জায়গায় জগদ্ধাত্রী পুজো মাত্র এক দিনের পুজো (নবমী) হলেও চন্দননগরে জগদ্ধাত্রী পুজো চলে চারদিন ধরে। শুক্ল পক্ষের সপ্তমী থেকে দশমী পর্যন্ত সাড়ম্বরে এই পুজো হয় এবং এই উপলক্ষে চন্দননগর শহর আলোকসজ্জায় এবং মানুষের উৎসাহ উন্মাদনায় এক মহা-কার্নিভালের রূপ ধারণ করে। এককালে এই তিনদিন ধরে চলতো নাটক-যাত্রাপালা, কবিগান, তরজা গান, পুতুল নাচের আসর, চুঁচুড়ার বিখ্যাত সঙের গান ইত্যাদি নানা বিচিত্রানুষ্ঠানের আসর।

এখন যদিও এই সমস্ত চিরাচরিত সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানকে পিছনে ঠেলে দিয়ে থিমপুজো এবং বিসর্জনের প্রসেশনের আলোকসজ্জাই চন্দননগরের জগদ্ধাত্রী পুজোর প্রধান আকর্ষণে পরিণত হয়েছে।সেই কারনে হুগলির জগদ্ধাত্রী পুজো বললে প্রথমেই মনে পড়ে চন্দননগরের জগদ্ধাত্রী পুজোর কথা। একথা বললে অত্যুক্তি হয়না, যে চন্দননগরের জগদ্ধাত্রীর ইতিহাসের বুনিয়াদ মূলত মৌখিক বর্ণনার আখরে নির্মিত। সাল তারিখের বিতর্ক এখানে অনর্থক। চন্দননগর তখন প্রধান বন্দর, হুগলীর পরেই। সপ্তদশ শতকের প্রথমার্ধে হুগলী ছিল মূল বন্দর। বাংলায় তখন পর্তুগীজদের রমরমা। সরস্বতীর নদীখাত শুকিয়ে যাওয়ার পরেই পর্তুগীজরা চলে আসে হুগলীতে। সপ্তদশ শতকের প্রথমার্ধে মুঘল বাদশাহ শাহজাহানের কাছে যুদ্ধে পরাজিত হয়ে হুগলী থেকে বিদায় নেয় পর্তুগীজরা। ধীরে ধীরে হুগলী নদী ব্যবসা বাণিজ্য ও পরিবহণের মূল মাধ্যম হয়ে ওঠে। ভারতের ঔপনিবেশিক ইতিহাসের প্রথম অধ্যায়ের যবনিকা পতন সেখানেই। পর্তুগীজদের যাওয়ার সাথেই তিনটি ঔপনিবেশিক শক্তি হগলী নদীর তীরে বাণিজ্য তরী ভেড়ায়। চুঁচুড়ায় ওলন্দাজ, হুগলীতে ব্রিটিশ এবং চন্দননগরে ফরাসীরা। শুরু হয় ঔপনিবেশিক শক্তি আস্ফালনের পরবর্তী অধ্যায়।

ফরাসীদের বাণিজ্যতরী নেহাতই পাকেচক্রে নিকটবর্তী ওড়িশার উপকূলে এসে পৌঁছায় (১৬৭৩), তখনও চন্দননগর নামকরণ হয়নি। ফরাসীদের এলাকা ফরাসডাঙা পন্ডিচেরীর অধীনে আসে ১৭০১ খ্রিস্টাব্দে। ততদিনে ফরাসীরা কুঠি তৈরীর ফরমান আদায় করে নিয়েছে তৎকালীন মুঘল সম্রাট ঔরঙ্গজেবের থেকে। তৈরী হয়েছে অঁর্লেয়া দুর্গ (১৬৯৬)। ফরাসী ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর তত্ত্বাবধানে বাংলা তথা ফরাসডাঙাকে কেন্দ্র করে ফরাসীদের ব্যবসা বাণিজ্য উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পেতে থাকে। বাঙলার মানচিত্রে কলিকাতাকে তখনও দূরবীন দিয়ে খুঁজতে হয়।  এই সময়ে হুগলী নদীকে নিয়ন্ত্রণ করত অসংখ্য ফরাসী বাণিজ্য তরী। হুগলী নদীতে ফরাসী বাণিজ্য তরীর আধিক্য দেখে কলকাতার ব্রিটিশ ব্যবসায়ীরা তখন নিজেদের দুশ্চিন্তার কথা জানিয়ে মাদ্রাজে চিঠিও লিখত। চন্দননগর ছিল সেকালে বাঙলার শস্য ভাণ্ডার। এখানকার চাউলপট্টি এলাকা তখনকার দিনে বাণিজ্যের দিক থেকে দক্ষিণ বঙ্গের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্থান। এই চাউলপট্টির জগদ্ধাত্রী পুজো তিনশ বছরেরও প্রাচীন বলে শোনা যায়। এখানকার জগদ্ধাত্রী হলেন চন্দননগরের “আদি মা”। শোনা যায় এই পুজোর প্রচলন করেন ফরাসী দেওয়ান ইন্দ্রনারায়ণ চৌধুরী।তবে ইন্দ্রনারায়ণ চৌধুরী তৎকালীন চন্দননগরের চাউল পট্টির মামুলি ব্যবসায়ী থেকে নিজের বুদ্ধি এবং কর্ম তৎপরতার জোরে হয়ে ওঠেন ফরাসী ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর দেওয়ান। ইন্দ্রনারায়ণের জন্ম বর্তমান যশোর জেলার সর্বরাজপুর গ্রামে। জীবনের নানা ওঠানামার মধ্যে দিয়ে এই পিতৃহীন বালকের পরিবারটি মুর্শিদ কুলী খাঁয়েরর বদান্যতায় চন্দননগর অঞ্চলে এসে পৌঁছয়। পরবর্তীকালে ইন্দ্রনারায়ণের বড়ভাই রাজারাম মুর্শিদাবাদে নবাবের দরবারে হিসাব রক্ষণের কাজে নিযুক্ত হন। ভাই ইন্দ্রনারায়ণ চাউলপট্টিতে চালের ব্যবসা শুরু করেন এবং অল্প দিনের মধ্যেই বেশ উন্নতি করেন।

ফরাসীদের আরেক ট্রেডিং সেন্টার পন্ডিচেরীতে একবার চাল ভর্তি জাহাজ পাঠিয়ে তিনি প্রভূত লাভের মুখ দেখেন। তবে ফরাসীদের সাথে সখ্যতা ইন্দ্রনারায়ণের আরও ছোটবেলা থেকেই। ফরাসডাঙার নগরের বাইরেই অনতিদূরে সেকালে প্রচুর জঙ্গল ছিল এবং ফরাসীরা সেকালে হাঁস শিকার করার জন্য এই জঙ্গলে আসত। বালক ইন্দ্রনারায়ণ হতেন তাঁদের গাইড। এভাবেই ধীরে ধীরে তিনি রপ্ত করেছিলেন ফরাসী আদব কায়দা ও কাজ চালানো ফরাসী ভাষা। শোনা যায় এভাবেই তিনি মামুলী চালের ব্যবসায়ী থেকে কোম্পানীর এজেন্ট পদে নিযুক্ত হন। তাঁর কাজ ছিল বাংলা, বিহার, ওড়িশা ও দক্ষিণ ভারত থেকে চন্দননগরে আসা মালপত্রের কোম্পানীর তরফে তদারকি, বন্টন ও রাজস্ব আদায় করা। এ কাজের উপর তিনি ৩% কমিশন পেতেন। এছাড়াও ছিল তার নিজের চালের ব্যবসা আর সুদের কারবার, যেখানে তিনি ১২% থেকে ২৪% হারে টাকা ধার দিতেন। আগেই বলেছি, চাউলপট্টি ছিল সেকালের বাঙলার শস্য ভাণ্ডার। লক্ষ্মীগঞ্জের বাজারে ছিল ১১৪ টি ধানের গোলা, যার এক একটিতে ৬০০০ মণ ধান রাখা হত। শুধুমাত্র ১৭৩০ সালেই ফরাসী ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর মোট ব্যবসার পরিমাণ ছিল আড়াই মিলিয়ন পাউন্ড। স্বাভাবিক ভাবেই ইন্দ্রনারায়ণও মাত্র দু’বছরের মধ্যেই কর্মকুশলতা ও নিজের অসাধারণ জনসংযোগ ক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে বিত্ত ও ক্ষমতার শীর্ষে ওঠেন এবং  কোম্পানির দালাল থেকে দেওয়ান রূপে প্রতিষ্ঠিত হন। এই সময়েই তাঁর আলাপ হয় নবদ্বীপের রাজা কৃষ্ণচন্দ্র রায়ের সঙ্গে। শুধু আসা যাওয়াই নয়, সময়ে অসময়ে ইন্দ্রনারায়ণ তাঁকে অর্থসাহায্য করেছেন বলেও শোনা যায়। আর এই দুই বন্ধুর সখ্যতার কারণেই কৃষ্ণচন্দ্র-প্রবর্তিত কৃষ্ণননগরের জগদ্ধাত্রী পুজোর অনুকরণে ইন্দ্রনারায়ণ চৌধুরিও জগদ্ধাত্রী পুজো শুরু করেন বলে শোনা যায়।

এদিকে ১৭৪২ সালে ১২ লক্ষ টাকা অনাদায়ী খাজনার অপরাধে আলিবর্দি খান কৃষ্ণচন্দ্র রায়কে কারারুদ্ধ করেন। এই সময় তিনি স্বপ্নাদিষ্ট হন এবং নবাবের জেল থেকে ছাড়া পেয়ে কৃষ্ণনগর ফিরে গিয়ে তিনি জগদ্ধাত্রী পুজা শুরু করেন। এই মত যদি মেনে নেওয়া হয়, তাহলে চন্দননগরের জগদ্ধাত্রী পুজো শুরু হয় কৃষ্ণনগরের পুজো শুরু হওয়ার পর। অর্থাৎ কিনা ১৭৬২-র আশেপাশে। সেক্ষেত্রে এ পুজো দেখে যাওয়ার সৌভাগ্য ইন্দ্রনারায়ণের হয়নি।অপর একটি মতানুসারে, চন্দননগরে জগদ্ধাত্রী পুজো তার আগে থেকেই প্রচলিত ছিল। খোদ ইন্দ্রনারায়ণের বাড়িতেই জগদ্ধাত্রী পুজো হত। চাউলপট্টির জগদ্ধাত্রীই সেই আদি মা। ১৭৫৭ সালে ক্লাইভের চন্দননগর লুঠের সময় সে পুজো বন্ধ হয়ে যায়, যা আবার শুরু হয় কৃষ্ণনগরে জগদ্ধাত্রী পুজো প্রচলনের অব্যবহিত পরে। আজও শোনা যায়, চাউলপট্টির আদি মায়ের পুজোর সংকল্প হতো ইন্দ্রনারায়ণ চৌধুরীর পরিবারের নামে, এবং পাঁঠা বলির পর একটি করে প্রসাদী পাঁঠা প্রতিবার চৌধুরী বাড়িতে পাঠানোর রীতি বছর পঁচিশ আগেও চালু ছিল। বর্তমানে পরিস্থিতি অনেকটা বিপর্যয়, বাংলার ঘরে ঘরে পূজার ইতিহাস কি সমৃদ্ধ করে বলতে চাই,সপ্তমীর দিন সাতটি বিশাল বারকোশে হয় মায়ের নৈবেদ্যের আয়োজন। সপ্তমী থেকে নবমী প্রত্যেকদিন ছাগবলি হয়, সাথে থাকে আখ, চালকুমড়ো বলিও। নবমীর দিন মাকে ১০৮টি রক্তপদ্ম নিবেদন করার রীতি আছে। আদি মায়ের পুজোর আর একটি বড় বিশেষত্ব হল, গয়না পরানো থেকে শুরু করে প্রতিমা নিরঞ্জন, নৈবেদ্য থেকে শুরু করে প্রতিমা বরণ সবই করেন কমিটির পুরুষ সদস্যরা। অন্যদিকে দশমীর পর দিন আদি মায়ের বিসর্জন হয় মায়ের নিজস্ব ঘাটে। প্রায় ২২ ফুটের ওই দেবী মূর্তিকে ভক্তরা কাঁধে তুলে নিয়ে আসেন ঘাট অবধি।

ঘাটের আশেপাশে ও গঙ্গাবক্ষে নৌকাতে অগণিত দর্শনার্থীদের ভিড়ে তিলধারণের জায়গা থাকে না। মূর্তিকে কাঁধে নিয়ে ধীরে ধীরে গঙ্গায় নেমে প্রতিমা নিরঞ্জন করা হয়। প্রতিমা জলে পড়ার পর,  অন্যান্য মূর্তি বিসর্জনের মত কাঠামোর বিচুলি কেটে ফেলা হয়না। অপেক্ষা করা হয় পরের পূর্ণিমা পর্যন্ত। ততদিন ভাসমান কাঠামো ঘাটেই বাঁধা থাকে। মায়ের গা থেকে বেনারসি শাড়িগুলিও বিসর্জনের পর খুলে নেওয়া হয় এবং বিভিন্ন দরিদ্র পরিবারের মেয়ের বিয়ে উপলক্ষে সেই শাড়ি দান করা হয়।আগেকার দিনে মৃন্ময়ী মূর্তির গয়না তৈরি হত মাটির। পরবর্তীকালে মাটির বদলে শোলার উপকরণ দিয়ে মৃন্ময়ী মূর্তিকে সাজানো শুরু হয়। শিল্পীরা শোলার ভিতরের নরম সাদা শাঁসটুকু ব্যবহার করে দেবীর অলঙ্কার তৈরি করেন। দেবীর মাথার মুকুট কিরীট, কানের মাকড়ি, শাড়ির অলংকরণ, হাতির মাথার হাওদা- সর্বত্র এই শোলার সূক্ষ্ম ও নিপুণ কাজ ব্যবহার করা হয়। এর জনপ্রিয় নাম ডাকের সাজ। হাতির দাঁতের কারুকার্যের সাথে এর মিল থাকায়  সোলার আরেক নাম ‘হারবাল আইভরি’। এই ডাকের সাজের শোলা আসে কাটোয়ার বনকাপাসি থেকে। চাউলপট্টির আদি মায়ের ডাকের সাজ আজও নিজে হাতে তৈরি করেন বনকাপাসির আদিত্য মালাকার। বংশপরম্পরায় কয়েক প্রজন্ম ধরে তাঁরা এই কাজ করে আসছেন। একই ভাবে মৃৎশিল্পী অসিত পাল বংশপরম্পরায় আদি মায়ের মূর্তি তৈরী করে আসছেন।এদিকে এই কাহিনির নানা রকমফের আছে। কেউ বলেন, তখন বাংলার সিংহাসনে ছিলেন নবাব মিরকাশিম। বেশ কয়েক লক্ষ টাকা রাজস্ব আদায় করতে কৃষ্ণচন্দ্র এবং তাঁর জ্যেষ্ঠপুত্রকে মুঙ্গের কারাগারে বন্দি করেন মিরকাশিম।

মুক্তিলাভের আশায় কৃষ্ণচন্দ্র কারাগারে উপবাসে থেকে ধ্যান শুরু করেন। তত দিনে দুর্গাপুজো শুরু হয়েছে। মনকষ্টে থাকা রাজাকে দেবী প্রসন্ন হয়ে স্বপ্নে দেখা দেন এবং পুরাণবর্ণিত জগদ্ধাত্রী পূজো করতে বলেন। তা হলেই রাজার দুর্গাপুজো দুঃখ দূর হবে। মহারাজ এই ঘটনার কয়েক দিনের মধ্যেই মুক্ত হন কিন্তু। কৃষ্ণনগরে ফিরে নির্দিষ্ট দিনে কৃষ্ণচন্দ্র জগদ্ধাত্রী পুজো করেন। আবার, কেউ বলেন, কৃষ্ণচন্দ্রকে খাজনার বাকি পড়ায় বন্দি করে ছিল মিরজাফর। সেটা ১৭৫৭ সাল। অন্য দিকে, কান্তিচন্দ্র রাঢ়ী তাঁর ‘নবদ্বীপ মহিমা’তে অন্যকথা বলছেন। তাঁর মতে, “মহারাজ গিরিশচন্দ্রের পূর্ব্বে অস্মদেশে জগদ্ধাত্রী পূজা প্রচলিত ছিল না। উক্ত মহারাজের যত্নে তন্ত্র হইতে ঐ মূর্তি প্রকাশিত হয়। শান্তিপুরের নিকটবত্তী ব্রহ্মশাসন গ্রাম নিবাসী চন্দ্রচূড় ন্যায়পঞ্চানন নামক জনৈক তন্ত্রশাস্ত্র বিশারদ পণ্ডিত কর্তৃক ঐ মূর্তি আবিষ্কৃত হয়। পরে নবদ্বীপের পণ্ডিতগণের অনুমোদিত হইলে ঐ মূর্তির পূজা আরম্ভ হয়।”যদিও এই সব পরস্পরবিরোধী জনশ্রুতির মধ্যে জগদ্ধাত্রী পুজোর সূচনার ঠিক ইতিহাস খুঁজে পাওয়া ভার। মনে রাখতে হবে, ভারতচন্দ্রের ‘অন্নদামঙ্গল’-এ জগদ্ধাত্রী পুজোর কোনও উল্লেখ নেই। আলিবর্দির কারাগার থেকে বেরিয়েই কৃষ্ণচন্দ্র জগদ্ধাত্রী পুজো করলে তা ভারতচন্দ্র নিশ্চয়ই ‘অন্নদামঙ্গল’-এ (রচনাকাল ১৭৫২) তার উল্লেখ করতেন। নবদ্বীপ পুরাতত্ত্ব পরিষদের সম্পাদক শান্তিরঞ্জন দেবের মতে, “যতটুকু জানা যায় ১৭৫২-৫৬, এই সময়কালের মধ্যে মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্র বারোদোল, রাস বা জগদ্ধাত্রী পুজোর প্রচলন করেন।

কেননা, ১৭৫৭ সালে পলাশির যুদ্ধের পরবর্তী সময়ে তাঁর আর্থিক সঙ্কট প্রবল হয়েছিল। ফলে, সে সময়ে এত বড়মাপের পুজোর আয়োজন করা সম্ভব ছিল না।” একই কথা বলা যায় মিরকাশিম প্রসঙ্গেও। অলোককুমার চক্রবর্তী তাঁর ‘মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্র এবং তৎকালীন বঙ্গসমাজ’-এ লিখেছেন, “যাঁরা বলেন যে মিরজাফরের কারাগার থেকে মুক্তিলাভ করে কৃষ্ণচন্দ্র এই পূজা করেন, তাঁদের কথাও ঠিক নয়। কেননা, মিরজাফরের কারাগারে কৃষ্ণচন্দ্র কোনওদিন বন্দি ছিলেন না।” তাঁর মতেও, “আলিবর্দির রাজত্বের ১৭৫২ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১৭৫৬ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে তিনি হয়তো এই পূজা করে থাকবেন। আলিবর্দির কারাগার থেকে মুক্তিলাভ করেই তিনি এই পূজা প্রচলন করেছিলেন এমন কথাও মেনে নেওয়া যায় না। কেননা, ১৭৫২ খ্রিস্টাব্দের পূর্বেই তিনি আলিবর্দির কারাগারে বন্দি হয়েছিলেন। মুক্তিলাভ করেই যদি তিনি এই পূজা করতেন তা হলে ভারতচন্দ্র নিশ্চয়ই এর উল্লেখ করতেন।” অন্য দিকে, কান্তিচন্দ্র রাঢ়ী কৃষ্ণচন্দ্রের নাতি গিরীশচন্দ্রকে (১৮০২- ১৮৪১) এই পুজোর প্রবর্তক বলে যে দাবি করেছেন তা-ও ঠিক নয় বলেই মনে করেন পণ্ডিতেরা। তিনি যদি জগদ্ধাত্রী পূজোর প্রবর্তক হবেন, তা হলে নদিয়ার জলেশ্বর শিবমন্দির (১৬৬৫) এবং দিগনগরের রাঘবেশ্বর মন্দিরের (১৬৬৯) গায়ে জগদ্ধাত্রী মূর্তি খোদাই করা থাকত না।

সব মিলিয়ে ইতিহাস গবেষকেরা নিশ্চিত— মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্রই বঙ্গদেশে জগদ্ধাত্রী পূজার প্রচলন করেন। এ কথা বলেছেন রাজ পরিবারের ইতিহাসের নির্ভরযোগ্য লেখক দেওয়ান কার্তিকেয় চন্দ্র। তবে এ কথাও ঠিক যে কৃষ্ণচন্দ্র-পরবর্তী সময়ে গিরীশচন্দ্রের আমলে জগদ্ধাত্রী পুজোয় ব্যাপক জাঁকজমক হত। সে সময়ে ইংরেজরাও পুজো দেখতে আসত। অন্য দিকে, কৃষ্ণচন্দ্রের বন্ধু চন্দননগরের ইন্দ্রনারায়ণ চৌধুরী এই পুজো শুরু করেন। তবে, পুজো প্রকরণ কৃষ্ণনগরের চেয়ে ভিন্নতর চন্দননগরে। এ হেন জগদ্ধাত্রী শব্দের আভিধানিক অর্থ ‘জগৎ’ যোগ ‘ধাত্রী’। জগৎ বা ত্রিভুবনের ধাত্রী (ধারণকর্ত্রী, পালিকা)। ধ্যানমন্ত্রে তাঁকে বর্ণনা করা হয়েছে— “সিংহস্কন্ধ সমারূঢ়াং নানালঙ্কার ভূষিতাম্। চতুর্ভূজাং মহাদেবীং নাগযজ্ঞোপবীতিনীম্। শঙ্খশার্ঙ্গসমাযুক্ত বামপাণিদ্বয়ান্বিতাম্।  চক্রঞ্চ পঞ্চবাণাংশ্চদধতীং দক্ষিণে করে। রক্তবস্ত্রাপরিধানাং বালার্কসদৃশীতনুম্”— এই ভাবে।

জগদ্ধাত্রী দেবীর মূর্তিতত্ত্ব ব্যাখ্যা করতে গিয়ে স্বামী নির্মলানন্দ বলেছেন, “অর্ক বা সূর্যই বিশ্বের পোষণকর্তা। পৃথিব্যাদি আবর্তনশীল গ্রহ-উপগ্রহদিগকে সূর্যই নিজের দিকে আকর্ষণ করে রেখেছেন। দেবী জগদ্ধাত্রীর মধ্যেও ধারণী ও পোষণী শক্তির পরিচয় বিদ্যমান। তাই তাঁকে বলা হয়েছে বালার্কসদৃশীতনু। একই কারণে জগৎপালক বিষ্ণুর শঙ্খ চক্র শার্ঙ্গধনু আদি আয়ুধ দেবীর শ্রীকরে।… দেবীর রক্তবস্ত্র ও রক্তবর্ণের মধ্যে, দেবীর সিংহাসনস্থ রক্তকমলে সেই রজোগুণেরই ছড়াছড়ি। রজোদীপ্ত বলেই জগদ্ধাত্রী মহাশক্তিময়ী। তাঁর অস্ত্রশস্ত্র, তাঁর বাহন— সকলই তাঁর শক্তিমত্তার ভাবটি আমাদের অন্তরে উদ্দীপ্ত করে দেয়।”

এন এ/ ২২ নভেম্বর

Back to top button