জাতীয়

মূল্যস্ফীতি নিয়ে ‘লুকোচুরির’ কারণ জানতে চেয়েছে আইএমএফ

ঢাকা, ০২ নভেম্বর – আগস্ট মাসের মূল্যস্ফীতির তথ্য প্রকাশ করতে দেরি হলো কেন, তা জানতে চেয়েছে সফররত আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) প্রতিনিধিদল। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে মঙ্গলবার অনুষ্ঠিত বৈঠকে এই প্রশ্ন করা হয়েছে। জবাবে বিবিএসের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, মাঠপর্যায়ে তথ্য আসতে বিলম্ব হওয়ায় এবং নীতিনির্ধারকদের অনুমোদন পেতে দেরি হয়েছে।

এ ছাড়া মূল্যস্ফীতি ও মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) গণনার হিসাবপদ্ধতি সংস্কার করার পরামর্শ দিয়েছে আইএমএফ। মঙ্গলবার সকালে সফররত আইএমএফের মিশনপ্রধান রাহুল আনন্দের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধিদল বৈঠক করতে আগারগাঁওয়ের বিবিএস কার্যালয়ে যায়। বৈঠকে বিবিএসের মহাপরিচালক মো. মতিয়ার রহমানসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

গত আগস্ট মাসের প্রথম সপ্তাহে পেট্রল, অকটেন, ডিজেলসহ জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির কারণে সব জিনিসের দাম বেড়ে যায়। পরিবহনভাড়াও বৃদ্ধি পায়। এসব কারণে আগস্ট মাসে উচ্চ মূল্যস্ফীতির আশঙ্কা করেছিলেন অর্থনীতিবিদেরা। কিন্তু মূল্যস্ফীতি বেড়ে যাওয়ায় ওই মাসের তথ্য প্রকাশ করেনি বিবিএস। পরে গত অক্টোবর মাসে আগস্ট ও সেপ্টেম্বর মাসের তথ্য একসঙ্গে প্রকাশ করা হয়।

আগস্ট মাসে মূল্যস্ফীতি ছিল ৯ দশমিক ৫২ শতাংশ। সেপ্টেম্বর মাসে এই হার কিছুটা কমে ৯ দশিমক ১ শতাংশ হয়। আগস্ট মাসে গত ১১ বছর ৩ মাসের (১৩৫ মাস) মধ্যে সর্বোচ্চ মূল্যস্ফীতি হয়েছে। এর আগে ২০১১ সালের মে মাসে সর্বোচ্চ ১০ দশমিক ২০ শতাংশ মূল্যস্ফীতি ছিল।

এ বিষয়ে বিবিএসের মহাপরিচালক মো. মতিয়ার রহমান বলেন, ‘আইএমএফের প্রতিনিধিদল জানতে চেয়েছিল, আগস্ট মাসের মূল্যস্ফীতির তথ্য প্রকাশ করতে কেন দেরি হলো?

জবাবে বলেছি, মাঠপর্যায় থেকে তথ্য আসতে দেরি হয়েছে। এ ছাড়া নীতিনির্ধারকদের অনুমোদন পেতেও সময় লেগেছে। এখন নিয়মিতভাবে মূল্যস্ফীতির তথ্য প্রকাশ করা হচ্ছে।’

বৈঠকে মূল্যস্ফীতি গণনার হিসাবপদ্ধতিতে সংস্কার আনার পরামর্শ দিয়েছে আইএমএফ। বর্তমানে ২০০৫-০৬ ভিত্তি বছর ধরে মূল্যস্ফীতির হিসাব করা হয়। এটি পরিবর্তন করে ২০১৫-১৬ ভিত্তি বছর ধরে মূল্যস্ফীতি হিসাব করার তাগিদ দিয়েছে প্রতিনিধিদল।

মূল্যস্ফীতির প্রকৃত চিত্র পেতে কয়েক বছর পর পর ভিত্তি বছর পরিবর্তন করা হয়। ১০ বছরের বেশি সময় ধরে মূল্যস্ফীতির ভিত্তি বছর পরিবর্তন করা হচ্ছে না। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের খাদ্য ও খাদ্যবহির্ভূত পণ্য ভোগের চিত্র পাল্টে যায়। মানুষের খাদ্যাভ্যাসে যেমন পরিবর্তন হয়, তেমনি জীবনধারায় পরিবর্তন আসে। তাই ভিত্তি বছর পরিবর্তন হলে একজন মানুষের খরচের প্রবণতার চিত্র উঠে আসে। একজন মানুষ আগের চেয়ে কোন ধরনের পণ্য ও সেবা বেশি বা কম ভোগ করছে, তা জানা যায়।

তিন মাস পর পর জিডিপির তথ্য

বর্তমানে পুরো অর্থবছরে দুবার জিডিপির তথ্য প্রকাশ করে বিবিএস। একবার জিডিপির সাময়িক হিসাব। পরে জিডিপির চূড়ান্ত হিসাব। কিন্তু গতকালের বৈঠকে তিন মাস পর পর জিডিপির হিসাব প্রকাশ করার পরামর্শ দিয়েছে আইএমএফ। আইএমএফের প্রতিনিধিরা বলেছেন, আন্তর্জাতিকভাবে সর্বোত্তম চর্চা (ইন্টারন্যাশনাল বেস্ট প্র্যাকটিস) হিসেবে জিডিপির হিসাব তিন মাস পর পর করা যায় কি না? প্রান্তিকভিত্তিক জিডিপির হিসাব করলে জিডিপির প্রকৃত চিত্র পাওয়া যায়। জিডিপির হিসাব গণনায় এই সংস্কারে বিবিএসের দক্ষতা বাড়াতে আইএমএফ প্রয়োজনে সহায়তা করবে।

আইএমএফের জিডিপি গণনার হিসাব পরিবর্তন প্রসঙ্গে বিবিএসের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, জিডিপির প্রান্তিকভিত্তিক হিসাব করার জন্য ইতিমধ্যে বিবিএস কাজ শুরু করেছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নানা ধরনের প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। যখনই বিবিএস তিন মাস অন্তর জিডিপির হিসাব দেওয়ার জন্য প্রস্তুত হবে, তখনই সরকারকে জানানো হবে। তবে চলতি অর্থবছরে তিন মাস অন্তর জিডিপির হিসাব করা সম্ভব হবে না। আগামী অর্থবছর থেকে প্রান্তিকভিত্তিক হিসাবব্যবস্থা চালুর চেষ্টা করছে বিবিএস।

গত ৩০-৩১ অক্টোবর বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে বৈঠক করেছে আইএমএফ। ওই বৈঠকে মুদ্রানীতি বছরে চারবার দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছে আইএমএফ। জবাবে বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, জিডিপির হিসাব বছরে একবার দেওয়ার কারণে পর্যাপ্ত তথ্য–উপাত্ত পাওয়া যায় না।

আইএমএফের কাছ থেকে প্রায় ৪৫০ কোটি ডলার পেতে আলোচনা শুরু করেছে বাংলাদেশ। এর অংশ হিসেবে আইএমএফের একটি প্রতিনিধিদল গত সপ্তাহে বাংলাদেশে এসেছে। ইতিমধ্যে অর্থ মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ ব্যাংক, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সঙ্গে বৈঠক করেছে।

সূত্র: প্রথম আলো
আইএ/ ০২ নভেম্বর ২০২২

Back to top button