জাতীয়

সাজেদা চৌধুরীর মৃত্যু দেশের ক্ষতি, আমার নিজেরও

ঢাকা, ৩০ অক্টোবর – সৈয়দা সাজেদা চৌধুরীর মৃত্যুতে আওয়ামী লীগ নিবেদিত প্রাণ এক কর্মীকে হারিয়েছে উল্লেখ করে দলটির সভাপতি ও সংসদে নেতা শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘আমার প্রতিটি কাজের সঙ্গে সাজেদা চৌধুরী ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিলেন। তার অবদান বলে শেষ করা যায় না। চলার পথে সবসময় তাকে সঙ্গে পেয়েছি। সাজেদা চৌধুরীর মৃত্যুতে দেশের ক্ষতি, জাতির ক্ষতি; আমার নিজেরও।’

রবিবার (৩০ অক্টোবর) জাতীয় সংসদের প্রয়াত উপনেতা সাজেদা চৌধুরী ও প্রয়াত সংসদ সদস্য শেখ এ্যানী রহমানের মৃত্যুতে আনা শোক প্রস্তাবের উপর আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি এসব কথা বলেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘যাদের সঙ্গে ছিলাম, একে একে সবাই চলে যাচ্ছে। বয়স হয়ে গেছে, যেতেতো হবেই। হয়তো আমিও একদিন চলে যাবো। তবে যে যেটা করেছে, সেটা আমাদের স্মরণ করতেই হবে।’

চলার পথে সবসময় সাজেদা চৌধুরী পাশে ছিলেন জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘(সাজেদা চৌধুরীকে) ফুফু বলে ডাকতাম, তিনি ঠিক আমার ফুফুই ছিলেন। দিনের পর দিন যখন সফরে যেতাম, অনেক সময় জ্বর এসে যেতো, অসুস্থ হয়ে পড়তাম। মাইক্রোবাসে করে যাচ্ছি… তখনতো গাড়ি তেমন ছিল না। আমাকে তিনি তার কোলে রেখে মাথায় জলপট্টি দিয়ে দিতেন। আবার আমরা নামতাম, বক্তব্য দিতাম…। এভাবেই স্নেহ দিয়ে তিনি আগলে রেখেছিলেন।’

আওয়ামী লীগের প্রতিটি নেতাকর্মী বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের নির্যাতনের শিকার উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, ‘শুধু আমরা কেন? এখানে বিরোধী দলের যেসব নেতাকর্মী আছেন। বিরোধী দলীয় নেতা রওশন এরশাদ, জেনারেল এরশাদ (হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ), আনোয়ার হোসেন মঞ্জুসহ যারাই আছেন; তারাও কিন্তু কম নির্যাতিত হননি।’

আওয়ামী লীগ জন্মলগ্ন থেকেই এদেশের মানুষের জন‌্য সংগ্রাম করেছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘এই দলের প্রতিটি নেতাকর্মী সবসময় নিবেদিত প্রাণ ছিল। বেগম সাজেদা চৌধুরী আওয়ামী লীগের একজন নেতা হিসেবে তারও অবদান রয়েছে। তার চলে যাওয়াটা আমাদের সংগঠনের জন‌্য অত্যন্ত ক্ষতিকর।’

সাজেদা চৌধুরীকে ছোটবেলা থেকেই চিনতেন উল্লেখ করে আওয়ামী লীগ সভাপতি বলেন, ‘পঁচাত্তরের পর সাজেদা চৌধুরীকে জিয়াউর রহমান যখন গ্রেফতার করে কারাগারে নিয়ে যায়, তখন তিনি অপারেশনের রোগী ছিলেন। তার পেটে ব্যান্ডেজ ছিল। ঘা-ও ভালো করে শুকায়নি। জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় এসে আমাদের নেতাদের ওপরই হামলা করে। গ্রেফতার করে জেলে পাঠায়। তাদের সাধারণ কয়েদিদের মাঝে ফেলে রাখে।’

বঙ্গবন্ধুর নাম ইতিহাস থেকে মুছে ফেলার চেষ্টা হয়েছিল উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘ওই সময় রাজনৈতিক দলের নিবন্ধনের উদ্যোগ নেয় জিয়াউর রহমান। তার শর্ত ছিল কারও নাম ব্যবহার করা যাবে না। কিন্তু সাজেদা চৌধুরী বঙ্গবন্ধুর নাম দেওয়ার জন্য অটল ছিলেন। এ নিয়ে তিনি দলের ভেতরে থেকেও যথেষ্ট প্রতিবাদ করছেন। এজন্য তাকে কারও কারও রুদ্র-রোষেও পড়তে হয়েছে। সেইসময় তিনি সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব নিয়ে সংগঠনকে ঐক্যবদ্ধ করার চেষ্টা করেন। আমি আসার পরও তিনি দীর্ঘদিন সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন।’

শেখ হাসিনা বলেন, ‘সাজেদা চৌধুরী লতা-পাতা-ফুল প্রকৃতিকে ভালোবাসতেন। দেশকে বনায়নের জন্য তাকে বন ও পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেই। তিনি সেটা করেওছিলেন। সুন্দরবনকে সাজানো ও রক্ষা করতে বিরাট ভূমিকা তিনি রেখেছিলেন। উপনেতা হিসেবে সজেদা চৌধুরী নিয়মিত সংসদে আসতেন। সংসদের কাজে তার খুবই আগ্রহ ছিল।’

সাজেদা চৌধুরী ও মতিয়া চৌধুরীকে গ্রেফতার করে জিয়াউর রহমান ডিভিশন না দিয়ে ফেলে রেখেছিল, খালেদা জিয়াও ঠিক একই কাজ করেছিল বলে দাবি করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘রওশন এরশাদ মাস্টার্স পাস। জেল কোডে আছে, মাস্টার্স পাস হলেই তাকে ডিভিশন দিতে হয়। খালেদা জিয়া কিন্তু তাকে ডিভিশন দেয়নি, এরশাদকেও না। সাধারণ কয়েদিদের সঙ্গে তাকে ফেলে রেখেছিল। একদম সাধারণ কয়েদির সঙ্গে।’

‘খালেদা জিয়া অসুস্থ হওয়ায় নির্বাহী আদেশে সাজাপ্রাপ্তি স্থগিত রেখে বাসায় থাকার সুযোগ করে দিয়েছি’, মন্তব্য করে শেখ হাসিনা বলেন, ‘বয়োবৃদ্ধ মানুষ হওয়ায় মানবিক দিক বিবেচনা করে এটা করা হয়েছে। কিন্তু খালেদা জিয়া সেটা করেনি। এমনকি আমাদের সাবেক বিমানবাহিনী প্রধান জামালউদ্দিন সাহেবকে গ্রেফতার করে, তার নামে ঘড়ি চুরির মামলা দিয়ে, কোনও ডিভিশন না দিয়ে, মাত্র দুটো কম্বল দিয়ে জেলখানায় ফেলে রেখেছিল। এইভাবে মানুষের ওপর তারা অত্যাচার করেছে, নির্যাতন করেছে।’

তিনি বলেন, ‘আমি জানি না… জাতীয় পার্টি সেই নির্যাতনের কথা ভুলেই গেছে এখন। ভুলে গেছে অনেকেই সেটা। আওয়ামী লীগতো সবার হাতে নির্যাতিত। জিয়াউর রহমান, তারপর খালেদা জিয়া, তারপরে জেনারেল এরশাদ। দফায় দফায় গ্রেফতার, দফায় দফায়… এগুলোতো অনবরত আমরা ভুক্তভোগী।’

আওয়ামী লীগ জনগণের সংগঠন এবং সাজেদা চৌধুরীর মত অসংখ্য নিবেদিতপ্রাণ নেতাকর্মীরা এই সংগঠনের হাল ধরেছে বলেই চরম দুঃসময়ে দিক হারায়নি বলে মন্তব্য করেন দলটির সভাপতি শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, ‘আমি আশাকরি আমাদের নেতাকর্মীরা প্রয়াত নেতাদের আদর্শটা মাথায় রেখে সংগঠনকে এগিয়ে নিয়ে যাবেন, আমি যেটা চাই।’

এসময় কমনওয়েলথভুক্ত দেশগুলোর জন্য ব্রিটেনের রানি প্রয়াত দ্বিতীয় এলিজাবেথের ‘আলাদা আন্তরিকতা ছিল’ বলেও উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী। কমনওয়েলথ সম্মেলনে গিয়ে রানির সঙ্গে সাক্ষাতের স্মৃতিচারণ করেন শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, ‘উনি বলতেন আমাদের কমনওয়েলথ দেশগুলোতে নারী নেতৃত্ব খুব কম ছিল। এটা ওনার একটা আফসোস ছিল। পরিবেশ নিয়েও সচেতন ছিলেন তিনি।’

একবার মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুরের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে রানির সঙ্গে সাক্ষাতের স্মৃতিচারণ করে তিনি বলেন, ‘প্রথমে আমাকে ও মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী ওনার দেওয়া পার্টিতে গেছি। পরিচয় দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তিনি বললেন তোমরা দুই জনই দ্বিতীয় প্রজন্ম। এরপর সিঙ্গাপুরের প্রধানমন্ত্রীকে যখন দেখলেন। তখন বললেন, ও, তোমরা তিনজনইতো দ্বিতীয় প্রজন্ম। ওনার স্মরণ শক্তি ছিল অসাধারণ।’

প্রয়াত সংসদ শেখ এ্যানী রহমানকে নিয়েও স্মৃতিচারণ করেন প্রধানমন্ত্রী।

সূত্র: বাংলা ট্রিবিউন
আইএ/ ৩০ অক্টোবর ২০২২

Back to top button