অপরাধ

খামারবাড়ি যেন ‘দুর্নীতির বাড়ি’

জাহিদুর রহমান

ঢাকা, ১১ অক্টোবর – রাজধানীর খামারবাড়ির কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (ডিএই) ঘিরে নানা অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। কর্মকর্তা-কর্মচারী ও বহিরাগত প্রভাবশালীর একটি সিন্ডিকেটের কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছে ডিএই। নিয়োগ-পদোন্নতিতে দুর্নীতি, দায়িত্বে অবহেলা, জেলা-উপজেলায় বরাদ্দে কমিশন আদায়, কর্মকর্তাদের মধ্যে দলাদলি, সেবা দিতে টাকা লেনদেনসহ নানা অনিয়মে ডুবছে অধিদপ্তরটি। দুর্নীতিবাজের দাপটে ভেঙে পড়েছে শৃঙ্খলা। অবৈধ কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে ওই চক্র হাতিয়ে নিচ্ছে কোটি কোটি টাকা। সংশ্নিষ্টরা বলছেন, খামারবাড়িতে অতীতেও এ রকম দুর্নীতি হয়েছে, তবে সাময়িক বরখাস্ত কিংবা বদলির মাধ্যমে বারবার দুর্নীতিকে ধামাচাপা দেওয়া হয়।

বিশাল সিন্ডিকেট :ডিএই ঘিরে গড়ে ওঠা শক্তিশালী চক্রে কর্মকর্তা-কর্মচারীর পাশাপাশি আছেন সাংবাদিকও। নিয়োগ, বদলি, পদায়ন, দরপত্র ও জেলা-উপজেলা পর্যায়ে বরাদ্দসহ সবকিছুতেই রয়েছে তাঁদের ছায়া। অধিদপ্তরের এই সিন্ডিকেটের মধ্যে রয়েছেন প্রশাসন ও অর্থ উইংয়ের উপপরিচালক (পার্সোনাল) মুহাম্মদ আবদুল হাই, উপপরিচালক (লিগ্যাল ও সাপোর্ট সার্ভিসেস) মোহাম্মদ শহীদুল ইসলাম ও অতিরিক্ত উপপরিচালক (প্রশাসন-১) মোহাম্মদ বনি আমিন, অভিযোগ শাখার প্রধান সহকারী আব্দুল হান্নান খান, প্রটোকল শাখার প্রধান সহকারী মো. তৈফুর রহমান, উচ্চমান সহকারী মো. নাসির উদ্দিন, অর্থ, হিসাব ও নিরীক্ষা শাখার বাজেট অফিসার ও সহকারী পরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) মো. তাইজুল ইসলাম, ঊর্ধ্বতন হিসাবরক্ষক এস এম এস আজম সরকার, প্রশাসন ও অর্থ উইং প্রশাসন-১ শাখার প্রধান সহকারী মো. নাজমুল হুদা। চক্রের অনিয়মে সহায়তা করেন প্রশাসন ও অর্থ উইংয়ের ঊর্ধ্বতন হিসাবরক্ষক নাফিসা সরকার, মহাপরিচালকের ব্যক্তিগত সহকারী মো. দিদারুল আলম, উদ্ভিদ সংরক্ষণ উইংয়ের উচ্চমান সহকারী মো. ফারুক হোসেন, সরেজমিন উইংয়ের সার অনুশাখার উচ্চমান সহকারী মো. শেখ ফরিদ, প্রশাসন ও অর্থ উইংয়ের ঊর্ধ্বতন হিসাবরক্ষক মো. হাবিবুর রহমান, উদ্ভিদ সংগনিরোধ উইংয়ের আমদানি শাখার উচ্চমান সহকারী মো. আমান উল্লাহ, উদ্ভিদ সংগনিরোধ উইংয়ের রপ্তানি শাখার ব্যক্তিগত সহকারী মো. লোকমান, পরিকল্পনা ও আইসিটি উইংয়ের (প্রেষণে হিসাব শাখা) প্রধান সহকারী মো. মোফাজ্জাল আমিন, সরেজমিন উইংয়ের বাজেট বরাদ্দ অনুশাখার প্রধান সহকারী মো. আবুবক্কর মাতুব্বর, প্রশাসন ও অর্থ উইংয়ের হিসাব অনুশাখার অডিটর মো. কামরুল ইসলাম ও উদ্ভিদ সংরক্ষণ উইংয়ের হিসাব অনুশাখার উচ্চমান সহকারী মো. আব্দুর রাজ্জাক।

এসব কর্মকর্তা-কর্মচারী ৫ থেকে ২১ বছর অধিদপ্তরের একই দপ্তরে দিব্যি কাজ করে যাচ্ছেন। তাঁদের বিরুদ্ধে কথা বলার সাহস নেই কারও। নিয়মবহির্ভূতভাবে নিয়োগ-পদোন্নতি বাণিজ্য চালিয়ে যাচ্ছেন তাঁরা। কর্মকর্তা-কর্মচারীদের এই সিন্ডিকেট অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের দপ্তরে তদবির করে অতিরিক্ত উপপরিচালক (পিএস টু ডিজি) মো. মোজাক্কেরের মাধ্যমে। মোজাক্কের ২০১৩ সাল থেকে খামারবাড়ির আইসিটি শাখায় এবং ২০১৭ সাল থেকে মহাপরিচালকের দপ্তরে কর্মরত।

এই চক্র হাতে রেখেছে একদল সাংবাদিককেও। অপকর্ম ধামাচাপা দেওয়া, ওপর মহলে তদবির ও তাদের বিপক্ষের কর্মকর্তাদের শায়েস্তা করতে তৎপর থাকে সাংবাদিক গ্রুপটি। সম্প্রতি অর্থ ও প্রশাসন শাখায় দুর্নীতি অনুসন্ধানে গেলে শেখ নাজমুল নামের একজন সাংবাদিক পরিচয় দিয়ে একটি বেসরকারি টিভির সাংবাদিককে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পক্ষে মোটা অঙ্কের টাকা দেওয়ার প্রস্তাব করেন। যার কল রেকর্ড সমকালের কাছে আছে। তবে বিষয়টি জানাজানির পর গত ২৮ সেপ্টেম্বর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. বেনজীর আলম স্বাক্ষরিত একটি দৈনিকে প্রকাশিত বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, ‘নাজমুল সাংবাদিক পরিচয়ে চাঁদাবাজি করেন। সরকারি কর্মকর্তাদের হয়রানি করেন।’

এ ব্যাপারে শেখ নাজমুল জানান, তিনি কোনো সাংবাদিককে কর্মকর্তাদের পক্ষে ফোন করেননি। তিনি বলেন, ‘ডিজির অনিয়ম-দুর্নীতি নিয়ে আমার কয়েকটি সংবাদ প্রকাশ হয়েছে। এর পর থেকে তিনি ক্ষিপ্ত হয়ে আমার বিরুদ্ধে প্রচারণা চালাচ্ছেন।’
ব্লক পোস্টেও পদোন্নতির পাঁয়তারা :কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কর্মচারী নিয়োগ ও পদোন্নতি বিধিমালা ১৯৮৫, ২০১৫ ও ২০১৯ অনুযায়ী ব্লক পোস্ট থেকে পদোন্নতির কোনো সুযোগ নেই। অথচ অফিস সহায়ক কাম কম্পিউটার মুদ্রাক্ষরিক পদের জন্য নির্বাচিত হয়েছেন সুইপার, ঝাড়ূদার, মালীসহ ২০ গ্রেডের কর্মচারীরা। গত ১ থেকে ১৪ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ১২ ক্যাটাগরিতে পদোন্নতির পরীক্ষা দেন ৭০০ জন। এরপর ২০-১৯তম গ্রেড থেকে ১৬তম গ্রেডে পদোন্নতির জন্য ১৭৯ জনকে নির্বাচিত করা হয়। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের ডিজি মো. বেনজীর আলম স্বাক্ষরিত ওই তালিকায় দেখা যায়, ১৮ জনই কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরে প্রথমে ‘সুইপার-ঝাড়ুদার’ হিসেবে যোগ দেন। এর বাইরে একজন ফার্মলেবার ও একজন মালীও আছেন। পদোন্নতির জন্য এর আগে এই ২০ জনের পদ পরিবর্তন করা হয়। তাঁদের অধিকাংশই কম্পিউটার টাইপ জানেন না। পরীক্ষায় প্রক্সি দিতে গিয়ে ধরাও পড়েছেন একজন।

এ ব্যাপারে প্রশাসন ও অর্থ উইংয়ের পরিচালক মো. তাওফিকুল আলম বলেন, ‘পদোন্নতির প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন ওঠায় তাঁদের কাগজপত্র আমরা চেয়েছি। কাগজপত্র বোর্ড দেখবে, যাচাই-বাছাই হবে।’

আইনের ফাঁক গলে পদোন্নতি কিংবা পদ পরিবর্তন চরম অপরাধ বলে মনে করেন সাবেক কৃষি সচিব আনোয়ার ফারুক। তিনি বলেন, যদি জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়সহ সংশ্নিষ্ট মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন ছাড়াই পদ পরিবর্তন কিংবা পদোন্নতির জন্য বাছাই করা হয়ে থাকে, তাহলে উদ্দেশ্য খারাপ ছিল।
১৪ বছর আগে শেষ হওয়া প্রকল্পে থেকে চাকরি স্থায়ীকরণ :বৃহত্তর সিলেটের কমলা ও আনারস উন্নয়নসহ সমন্বিত কৃষি উদ্ভাবন উন্নয়ন প্রকল্পটি ২০০০ সালের ১ জুলাই শুরু হয়ে ২০০৮ সালের ৩০ জুন শেষ হয়। প্রকল্পের ২৪ কর্মচারী চাকরি রাজস্ব খাতে স্থায়ী করার দাবিতে ২০১৭ সালে রিট করলে হাইকোর্ট তাঁদের রাজস্ব খাতে নিয়োগের নির্দেশনা দেন। ২০১৯ সালে এ রায়ের বিপক্ষে রাষ্ট্রপক্ষ আপিল করলে আপিল বিভাগ মামলাটি নিষ্পত্তি করেন। মামলার রায় স্পষ্ট করার জন্য গত বছরের ২৭ জানুয়ারি কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের একটি প্রস্তাব কৃষি মন্ত্রণালয়ের সম্প্রসারণ-২ অধিশাখা আইন ও বিচার বিভাগে পাঠায়। গত ২৬ জানুয়ারি রায়ের আলোকে ওই ২৪ কর্মচারীর চাকরি রাজস্ব খাতে স্থানান্তরের সুযোগ নেই বলে জানায় সম্প্রসারণ-২ অধিশাখা। এর মধ্যে রিটকারী আবার আবেদন করলে গত ৩০ জুন কৃষি মন্ত্রণালয়ের আইন অধিশাখা থেকে আদালতের আদেশ পর্যালোচনা করে পদক্ষেপ নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। এ নির্দেশনার পরই গত ১২ জুলাই থেকে ধাপে ধাপে ১৭ জনকে রাজস্ব খাতে নিয়োগের আদেশ দেয় ডিএই। এর মধ্যে তাসলিমা খানম নামের একজন অন্য প্রকল্পের। নিয়োগ পাওয়ার পর সংশ্নিষ্টরা কাজে যোগ দেন। তবে তাঁদের কাগজপত্র দেখে হিসাব মহানিয়ন্ত্রকের কার্যালয় থেকে জানানো হয়, এ নিয়োগ অবৈধ। এরপর গত ২৮ সেপ্টেম্বর ওই নিয়োগ আদেশ বাতিল করে চিঠি দেন ডিজি বেনজীর। ওই চিঠিতে বলা হয়, ‘কৃষি মন্ত্রণালয় থেকে আইন ও বিচার বিভাগে প্রস্তাব পাঠানো হলেও ওই বিষয়টি ডিএই অবগত ছিল না।’

ভুক্তভোগী চাকরিপ্রার্থীরা জানান, রিটসহ চাকরি স্থায়ী করতে প্রধান সহকারী আব্দুল হান্নান খানসহ কয়েকজন কর্মকর্তা মোটা অঙ্কের টাকা নিয়েছেন।

এ ব্যাপারে আব্দুল হান্নান খান বলেন, রায় পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, আত্তীকরণ সঠিক হয়নি। ফলে নিয়োগ বাতিল হয়েছে। অনেকে অনেক কথা বলবে, আমরা জাতির স্বার্থেই কাজ করছি।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের আইন অধিশাখার এক কর্মকর্তা বলেন, ডিএইকে বলা হয়েছে, আদালতের আদেশ পর্যালোচনা করে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে। ডিএই বিধি না দেখেই নিয়োগ দিয়েছে।

বাকৃবি-শেকৃবি দ্বন্দ্ব :এদিকে, অনিয়ম-দুর্নীতি ছাড়াও খামারবাড়িতে দীর্ঘদিন ধরে চলছে বিশৃঙ্খলা। কর্মকর্তাদের দু’পক্ষের মধ্যে রেষারেষিতে খেই হারাচ্ছে কার্যক্রম। ময়মনসিংহের বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় (বাকৃবি) ও ঢাকার শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় (শেকৃবি) থেকে পাস করা কৃষিবিদদের বিবাদ এখন অনেকটা প্রকাশ্যে। এখন এই বিরোধের তেজ খামারবাড়ি ছাপিয়ে দেশের নানা প্রান্তে। গত জুলাইয়ে শেকৃবির কিছু শিক্ষার্থী অনিয়ম বন্ধের দাবিতে ডিজিকে স্মারকলিপি দিতে যান। এরই জেরে ডিএই ব্যবস্থাপনা কমিটি বেশ কিছু সিদ্ধান্ত নেয়। এখন কর্মকর্তা-কর্মচারী ছাড়া অন্যদের ডিএইতে ঢুকতে লাগবে পাস, বহিরাগতদের গাড়ি ও মোটরসাইকেল প্রবেশ বন্ধ, তিন বছর একই স্থানে টানা চাকরি করলে বদলিসহ নানা সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। খামারবাড়িতে ঢুকতে কড়াকড়ি আরোপের পর পেছনের গেটে দেয়াল তুলে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (ডিজি) কক্ষে তালাবদ্ধ অবস্থায় অফিস করেন। প্রশাসন ও অর্থ উইংয়ের প্রবেশের গেটও থাকে তালাবদ্ধ।
ডিজির দরজায় তালার বিষয়ে অতিরিক্ত উপপরিচালক (পিএস টু ডিজি) আরিফ মোহাম্মদ মোজাক্কের বলেন, ‘স্যারের রুমে সব সময় তালা থাকে না। শুধু মাঝেমধ্যে অ্যাডমিন উইংয়ের সঙ্গে কোনো সভা থাকলে তালা দেওয়া হয়, যাতে কেউ বিরক্ত করতে না পারে।’

কয়েকজন কর্মকর্তা জানান, বর্তমান কৃষিমন্ত্রী দেশের কৃষি উন্নয়নে প্রত্যন্ত অঞ্চল ঘুরছেন। প্রযুক্তির উদ্ভাবন ও সম্প্রসারণে তাঁর নিরলস চেষ্টায় কৃষি এগিয়ে যাচ্ছে। তবে ডিএইর মতো গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরে অনিয়ম-দুর্নীতির কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন কৃষক। এ নিয়ে নেই কোনো জবাবদিহি। ফলে বাড়ছে অনিয়ম-দুর্নীতি।
মহাপরিচালক যা বললেন :কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. বেনজীর আলম বলেন, এখানে আর্থিক কোনো অনিয়ম হয়নি। ব্লক পোস্ট থেকে কোনো কর্মীকে নিয়োগ দেওয়া হয়নি। তাঁরা কম্পিউটার টাইপ জানেন কিনা- এ রকম একটি পরীক্ষা নিয়েছি। আমাদের এখানে টাইপিস্ট নেই। আমার তো অফিস চালাতে হবে। আদালত ও কৃষি মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা না মেনে ১৪ বছর আগে শেষ হওয়া প্রকল্প থেকে চাকরি স্থায়ীকরণ ও পরে নিয়োগ বাতিলের বিষয়ে ডিজি বলেন, এখানে একটু সমস্যা আছে। তাঁরা হাইকোর্ট ও সুপ্রিম কোর্টে রায় পেয়েছেন। আবার না করেছে। এগুলোতে অনেক ঝামেলা আছে। একই দপ্তরে অনেক দিন কর্মরত থাকা ও অন্যান্য অনিয়ম-দুর্নীতির বিষয়ে প্রশ্ন করতেই ডিজি বলেন, আমার একটা জরুরি ফোন এসেছে। আপনি ফোন রাখেন। এগুলো নিয়ে পরে কথা বলেন।

সূত্র: সমকাল
আইএ/ ১১ অক্টোবর ২০২২

Back to top button