কক্সবাজার

রামুর বাঁকখালী নদীতে জাহাজ ভাসা অনুষ্ঠান

কক্সবাজার, ১১ অক্টোবর – বৌদ্ধদের অন্যতম ধর্মীয় উৎসব প্রবারণা পূর্ণিমা উপলক্ষে এবারও কক্সবাজারের রামুর বাঁকখালী নদীতে ভাসলো নয়টি কল্প জাহাজ। বাঁশ, বেত, কাঠ ও রঙিন কাগজের ওপর অপূর্ব কারুকাজে তৈরি এসব দৃষ্টিনন্দন জাহাজ ভাসানো উৎসবকে ঘিরে নদীর দুকূলে উৎসবের আনন্দে মেতেছে হাজারো নরনারী।

 

মূলত বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের উৎসব হলেও সব সম্প্রদায়ের মানুষের অংশ গ্রহণে উৎসব হয়ে ওঠে এক অসাম্প্রদায়িক মিলনমেলা। বিকেল গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে হাজারো নর-নারীর অংশগ্রহণে উৎসব হয়ে ওঠে অন্য রকম মিলনমেলা।

সোমবার (১০ অক্টোবর) দুপুরে কক্সবাজারের রামুর বাঁকখালী নদীর চেরাংঘাটা ঘাটে আয়োজন করা হয় শত বছরের ঐতিহ্যবাহী এ উৎসবের। যেটি চলে রাত পর্যন্ত।

উৎসবে দেখা গেছে, পাঁচ-ছয়টি নৌকার ওপর বসানো এক একটি কল্প ছুটছে নদীর এপার থেকে ওপারে। রঙ-বেরঙয়ের কাগজ, বাঁশ-কাঠের অর্পূব কারুকাজে তৈরি প্রতিটি জাহাজই নজর কাড়া। আর আকর্ষনীয় নির্মাণ শৈলী আর বৈচিত্র্যে ভরা প্রতিটি জাহাজই বেশ দৃষ্টিনন্দন। যেখানে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে বানর, ময়ূর, সিংহসহ বিভিন্ন প্রাণীর প্রতিকৃতি। এছাড়াও রয়েছে বৌদ্ধ ঐতিহ্য জাদী বা চূড়া।

আয়োজকরা জানান, এবার হাইটুপি-শ্রীকুল,পূর্ব মেরংলোয়া, উত্তর মিঠাছড়ি, হাজারীকুল, দ্বীপ শ্রীকুল, পূর্ব রাজারকুলসহ নয়টি কল্প জাহাজ তৈরি করা হয়েছে।

উৎসবে আসা স্কুল শিক্ষক নিরুপমা বড়ুয়া বেবী বলেন, যুগ যুগ ধরে আমরা এ উৎসব উদযাপন করে আসছি। বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের হলেও প্রতিবছর এ উৎসব হয়ে ওঠে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির মিলনমেলা।

স্কুলছাত্রী আদ্রিতা বড়ুয়া বলে, প্রতিবছর আমরা বাঁকখালী নদীতে জাহাজ ভাসানোর আনন্দে মেতে ওঠি। এ যেন প্রাণের সম্মিলন। এখানে না এলে বোঝা যাবে না উৎসবের রূপ কেমন।

সোমবার বিকেলে উৎসবের আলোচনা অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী ব্যারিস্টার বিপ্লব বড়ুয়া।
কক্সবাজার-০৩ আসনের সংসদ সদস্য সাইমুম সরওয়ার কমলের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করেন জেলা প্রশাসক মো. মামুনুর রশীদ। প্রধান আলোচক ছিলেন সাবেক ছাত্রনেতা ব্যারিস্টার প্রশান্ত ভূষণ বড়ুয়া। অনুষ্ঠানে আশির্বাদ মন্ত্র পাঠ করেন ঢাকা আন্তর্জাতিক বৌদ্ধ বিহারের উপাধ্যক্ষ ভিক্ষু সুনন্দ প্রিয়।

বিশেষ অতিথি ছিলেন- রামু উপজেলা নির্বাহী অফিসার ফাহমিদা মুস্তফা, উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. নোবেল কুমার বড়ুয়া, ওসি আনোয়ারুল হোসাইন, কক্সবাজার সাংবাদিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক জাহেদ সরওয়ার সোহেল, জেলা ছাত্রলীগ সভাপতি এসএম সাদ্দাম হোসাইন, রামু প্রেসক্লাব সভাপতি নীতিশ বড়ুয়া, রামু কেন্দ্রীয় বৌদ্ধ যুব পরিষদের সভাপতি কেতন বড়ুয়া প্রমুখ।

সাইমুম সরওয়ার কমল এমপি বলেন, ২০১২ সালে সাম্প্রদায়িক হামলার ঘটনার পর কক্সবাজারের রামুতে আবারও সম্প্রীতি ফিরে এসেছে। যারা রামুর হাজার বছরের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্ট করতে সেদিন এ ঘটনা ঘটিয়েছিলো তারা আজ পরাজিত।

তিনি বলেন, কক্সবাজার জেলায় সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত ছিলে এই রামু উপজেলা। ২০১২ সালের একটি ঘটনা রামুর হাজার বছরের সেই ঐতিহ্যকে কলঙ্কিত করেছে। কিন্তু বর্তমান সরকারের নানা প্রচেষ্ঠায় সেই কলঙ্ক আজ ঘুচে গেছে। পুনরায় ফিরে এসেছে সম্প্রীতি।

প্রধান অতিথি ব্যারিস্টার বিপ্লব বড়ুয়া বলেন, ‘ধর্ম যার যার রাষ্টা সবার’ প্রধানমন্ত্রী যে নীতির আলোকে রাষ্ট্র পরিচালনা করছেন, আজ রামুর এই জাহাজ ভাসানো উৎসবই তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। এ উৎসব বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের হলেও আজ এখানে সব উপলব্ধি করেছি এখানে সব সম্প্রদায়ের মানুষ উৎসবে সামিল হয়েছেন। এটি শুধু রামুর নয়, সারা বাংলাদেশের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। এভাবেই এগিয়ে যাবে বাংলাদেশ।

রামু কেন্দ্রীয় সীমা বিহারের আবাসিক প্রধান প্রজ্ঞানন্দ ভিক্ষু বলেন, মহামতি বুদ্ধ রাজগৃহ থেকে বৈশালী যাওয়ার সময় নাগলোকের মহাঋদ্ধিমান (অলৌকিক ক্ষমতাসম্পন্ন) নাগেরা চিন্তা করলেন বুদ্ধপূজার এই দুর্লভ সুযোগ তারা হাতছাড়া করবে না। সঙ্গে সঙ্গে নাগলোকের পাঁচশ নাগরাজ বিমানের (জাহাজের) মত পাঁচশত ঋদ্ধিময় ফণা বুদ্ধপ্রমুখ পাঁচশ ভিক্ষুসংঘের মাথার ওপর বিস্তার করল।

এইভাবে নাগদের পূজা করতে দেখে দেবলোকের দেবতারা, ব্রহ্মলোকের ব্রহ্মরা বুদ্ধকে পূজা করতে এসেছিলেন। সেই দিন মানুষ, দেবতা, ব্রহ্মা, নাগ সবাই শ্বেতছত্র ধারণ করে ধর্মীয় ধবজা উড্ডয়ন করে বুদ্ধকে পূজা করেছিলেন। বুদ্ধ সেই পূজা গ্রহণ করে পুনরায় রাজগৃহে প্রত্যাবর্তন করেছিলেন।

সেই শুভ সন্ধিক্ষণ ছিল শুভ প্রবারণা দিবস। মূলত এই হৃদয়ছোঁয়া চিরভাস্বর স্মৃতিকে অম্লান করে রাখার জন্য বাংলাদেশের বৌদ্ধরা বিশেষ করে রামুর বৌদ্ধ সম্প্রদায় প্রবারণা পূণিমায় বাঁকখালী নদীতে দৃষ্টিনন্দন কারুকার্য খচিত স্বর্গের জাহাজ ভাসিয়ে প্রবারণা উদযাপন করে।

তিনি আরও বলেন, আজ হতে দুইশ বছর আগে থেকে এ জাহাজভাসা উৎসবের প্রচলন হয় পার্শ্ববর্তী দেশ মিয়ানমারে। সেদেশের মুরহন ঘা নামক স্থানে একটি নদীতে মংরাজ ম্রাজংব্রান প্রথম এ উৎসবেরর আয়োজন করেন। শতবছর ধরে রামুতে মহাসমারোহে এ উৎসব হয়ে আসছে।

সূত্র: বাংলানিউজ
আইএ/ ১১ অক্টোবর ২০২২

Back to top button