জাতীয়

বাড়ছে দক্ষ নেতৃত্বের সংকট

মাহমুদুল হাসান নয়ন ও তারিকুল ইসলাম

ঢাকা, ১১ অক্টোবর – বাংলাদেশের বড় দুই রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপির ভ্রাতৃপ্রতিম ও সহযোগী সংগঠন ছাত্রলীগ ও ছাত্রদল। ছাত্রলীগের সাড়ে সাত দশক এবং ছাত্রদলের চার দশকেরও বেশি সময়ের ইতিহাস ও ঐতিহ্য রয়েছে। তবে সময়ের ব্যবধানে সংগঠন দুটিতে দক্ষ ও যোগ্য নেতৃত্বের সংকট বেড়েই চলছে। বিভিন্ন পক্ষকে ‘খুশি’ করতে গিয়ে কমিটির আকার বড় হচ্ছে। নড়বড়ে সাংগঠনিক কাঠামোয় আবেদন হারাচ্ছে ছাত্রনেতৃত্ব। ব্যাহত হচ্ছে ছাত্র সংগঠনের মূল উদ্দেশ্য। সংগঠন দুটির সাবেক কেন্দ্রীয় নেতারাও ঢাউস কেন্দ্রীয় কমিটি নিয়ে উষ্মা প্রকাশ করেছেন।

৩০১ সদস্যের কমিটিতে ৬১ সহসভাপতি

ছাত্রলীগে ৪ দশকে পদ বেড়েছে ৫ গুণ

মাহমুদুল হাসান নয়ন

ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের নেতৃত্বের একটি বড় অংশ ছাত্রলীগের রাজনীতি থেকে আসা। ছাত্র অবস্থায়ই তাদের অধিকাংশই কর্মগুণে দেশব্যাপী পরিচিতি লাভ করেন, যা তাদের জাতীয় রাজনীতির পথ সুগম করে। তখন ছাত্রলীগের পদসংখ্যা ছিল খুবই কম। দেশজুড়ে কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের ছিল আলাদা মূল্যায়ন। অথচ চার দশকের ব্যবধানে ছাত্রলীগের পদ বেড়েছে পাঁচ গুণেরও বেশি। ৩০১ সদস্যের কমিটিতে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক ব্যতীত অন্য নেতাদের সেখানে নামমাত্র কার্যক্রম রয়েছে। এর বাইরে বর্ধিত কমিটির নামে চিঠি দিয়ে আরও অন্তত অর্ধসহস্রজনকে কেন্দ্রীয় নেতা ঘোষণা করা হয়েছে। এতে অবস্থা এমন হয়েছে-নিজ সংগঠনের নেতারাও একে অন্যকে নামে বা চেহারায় চিনতে পারছেন না। এক্ষেত্রে ন্যূনতম যোগ্যতা যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে না। ফলে কমিটির কাঠামো বড় হলেও আসছে না যোগ্য নেতৃত্ব।

১৯৪৮ সালে প্রতিষ্ঠার পর ছাত্রলীগের ২৯টি কমিটি হয়েছে। এর মধ্যে ১৯৭০ সালের পর হয়েছে ১৮টি। ১৯৭৭ সালে ছাত্রলীগের কমিটির আকার ছিল মাত্র ৫৯ জনের। তখন সাংগঠনিক সম্পাদকের পদ ছিল মাত্র একটি। সহসভাপতি পদও ছিল ৭টি। নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি পর্যন্ত সংগঠনের কেন্দ্রীয় কমিটিতে পদ ছিল মাত্র ৬৯টি। ২০০২ সালেও কেন্দ্রীয় কমিটি ছিল ১০১ সদস্যের। অথচ বর্তমানের ৩০১ সদস্যের কমিটিতে সহসভাপতিই রয়েছেন ৬১ জন। এই কমিটিতে যুগ্মসাধারণ সম্পাদক ১১ জন এবং সাংগঠনিক সম্পাদক ১১ জন রয়েছেন। এর বাইরে সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক স্বাক্ষরিত চিঠি পেয়ে অসংখ্যজন ‘কেন্দ্রীয় নেতা’ পরিচয় দিচ্ছেন। আনুষ্ঠানিকভাবে বর্ধিত কমিটিতে পদপ্রাপ্তদের কোনো তালিকা ঘোষণা করেনি ছাত্রলীগ। ফলে এদের প্রকৃত সংখ্যা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। বিগত তিনটি কমিটিতে পদ ঘোষণার এমন ধারা কমবেশি অব্যাহত ছিল।

ছাত্রলীগের দপ্তর সেল, বিভিন্ন কমিটিতে দায়িত্ব পালনকারী অন্তত ৩০ জন সাবেক ও বর্তমান ছাত্রলীগ নেতা এবং আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে উল্লিখিত সব তথ্য। জানতে চাইলে ১৯৭০-১৯৭২ সালে ছাত্রলীগের সভাপতির দায়িত্বে থাকা নূরে আলম সিদ্দিকী বলেন, সংগঠনের ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ না থাকলে কলেবর বৃদ্ধি করে কোনো লাভ নেই। এতে অনাসৃষ্টি বাড়ে। অন্তর্দ্বন্দ্ব, বিরোধ, সংঘাত, সংশয় সৃষ্টি হয়। আমাদের সময়ে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের সংগঠনের ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ ছিল। সংগঠন ছিল সবার ওপরে। তখন বঙ্গবন্ধু চেতনার প্রতীক ছিলেন। কিন্তু ছাত্রলীগ আওয়ামী লীগের অঙ্গসংগঠন ছিল না। সম্পূর্ণভাবে একটি স্বাধীন-সার্বভৌম স্বকীয় সত্তায় উজ্জীবিত ছিল। এখন ছাত্রলীগ অঘোষিত অঙ্গসংগঠন হয়ে গেছে। ফলে সংগঠনে বিড়ম্বনা বাড়ছে।

জানা গেছে, ১৯৭৭-১৯৮১ সালে কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের কমিটিতে পদ ছিল ৫৯টি। ১৯৮১-১৯৮৩ থেকে ১৯৯২-১৯৯৪ পর্যন্ত মোট পাঁচ কমিটিতে ৬৯টি করে পদ ছিল। ১৯৯৪-১৯৯৮ সালে গঠনতন্ত্র সংশোধনের মাধ্যমে কেন্দ্রীয় কমিটির পদসংখ্যা বাড়িয়ে ১০১টি করা হয়। ১৯৯৮-২০০২ সালের কমিটি পর্যন্ত এই সংখ্যা ১০১ জনই ছিল। কিন্তু ২০০২-২০০৬ সালে তা বেড়ে হয় ২০১টি। একই সংখ্যা ছিল ২০০৬-২০১১ সালের কমিটিতে। ২০১১-২০১৫ সালে কমিটির আকার বেড়ে দাঁড়ায় ২৫১ সদস্যবিশিষ্ট। ২০১৫-২০১৮ সালে আরও ৫০টি পদ বেড়ে কমিটি হয় ৩০১ জনের। বর্তমানে কাগজে-কলমে কমিটির আকার ৩০১ জনই আছে।

এছাড়া ১৯৭২ সালের আগের কমিটিগুলোর আকার সম্পর্কে একাধিক উৎস থেকে নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তবে ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি (১৯৭২-১৯৭৩) ও জাতীয় পার্টির (জেপি) সাধারণ সম্পাদক শেখ শহিদুল ইসলাম জানান, তার কমিটিতে কেন্দ্রীয় পদ ছিল ১০১টি। এর আগে ১৯৬৯-১৯৭০ সালে এবং ১৯৭০-১৯৭২ সালের কমিটিতেও ১০১টি পদ ছিল। এর আগে ১৯৬০-১৯৬৩ থেকে শুরু করে ১৯৬৮-১৯৬৯ পর্যন্ত ৫টি কমিটিতে এই সংখ্যা ছিল ৭১ সদস্যবিশিষ্ট। এরও আগে ১৯৪৮-১৯৫০ সালের কমিটি থেকে ১৯৫৭-১৯৬০ পর্যন্ত গঠিত ৫টি কমিটিতে ৫১ জন করে সদস্য ছিলেন। ১৯৪৮ সালে প্রতিষ্ঠাকালে আহ্বায়ক কমিটি ছিল ১৭ সদস্যের। তাছাড়া ১৯৭৩-১৯৭৪ সালে কমিটির আকার ছিল ১০১ সদস্যবিশিষ্ট। ১৯৭৬-১৯৭৭ সালে কমিটির আকার ছিল ৫৯-এর কম।

সাতটি কমিটিতে (১৩৬৪-১৯৭৩) ছাত্রলীগের পদপ্রাপ্ত নেতা শেখ শহিদুল ইসলাম বর্তমান ছাত্রলীগ নিয়ে বলেন, এগুলো ‘খুশি কমিটি’। একেকজনের গ্রুপ ও জেলা থেকে লোককে পদ দিতে গিয়ে এমন অবস্থা হয়। এ ধরনের কমিটির অর্থ কাউকে অসন্তুষ্ট না করার চেষ্টা করা। এত বড় কমিটি নিয়ে মিটিং হয় না। ফলে সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া বিঘ্নিত হয়। তখন সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক নিজেদের মতো সিদ্ধান্ত নেয়। এতে সংগঠনের অভ্যন্তরের গণতান্ত্রিক পরিবেশ নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। অনিয়মিত সম্মেলন ও ছাত্র সংগঠনের অভ্যন্তরে রাজনৈতিক দলের হস্তক্ষেপ পরিবেশ আরও কঠিন করেছে।

ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক বাহালুল মজনুন চুন্নু (১৯৬৮-১৯৮১, সাত কমিটিতে সম্পৃক্ত) বলেন, আমাদের সময় ৫৯ সদস্যের কমিটির পাশাপাশি ২১ জন ছিলেন জাতীয় পরিষদ সদস্য। জেলা কমিটি ছিল ৩৭ সদস্যবিশিষ্ট। এর বেশি দরকার পড়ত না। কারণ, বড় কমিটি হলে নেতৃত্ব দাঁড়ায় না। নেতাদের আমরা দেবতার মতো শ্রদ্ধা করতাম।

পূর্বের কমিটি নিয়ে কথা হয় আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ও ১৯৭৭-১৯৯২ সাল পর্যন্ত ছাত্রলীগের পাঁচটি কমিটিতে বিভিন্ন পদে দায়িত্ব পালনকারী নেতা আহমদ হোসেনের সঙ্গে। তিনি বলেন, তখন কেন্দ্রীয় একজন সদস্য হওয়াও অনেক কঠিন ছিল। এজন্য অনেক স্ট্রাগল করতে হতো। এখন ছাত্রলীগের সংখ্যা অনেক বেড়ে গেছে। সবাইকে প্রোভাইড করতে হয়, পদ দিতে হয়, খুশি রাখতে হয়। ফলে বড় কমিটি সময়ের প্রেক্ষাপটেই হয়েছে। ১৯৬৬-১৯৭৩ সাল পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগের রাজনীতিতে সম্পৃক্ত ছিলেন ডাক ও টেলিযোগাযোগমন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার। কমিটির একাল-সেকাল সম্পর্কে তিনি বলেন, তখন ধরে ধরে নিয়ে গিয়ে নেতা বানানো, সেটা ছিল না। এত বড় কমিটি হবে, যেখানে কেন্দ্রীয় নেতারা নিজেরা নিজেদের চিনবে না, তেমনটা চিন্তাও করা যায় না।

ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি ইসহাক আলী খান পান্না বলেন, তখন কেন্দ্রীয় ১০১ সদস্যের বাইরে অন্য কারও পরিচয় দেওয়ার সুযোগ ছিল না। আর কমিটির নেতারা ভাগ ভাগ হয়ে সারা দেশে সাংগঠনিক সফর করতেন। ছাত্ররাজনীতির আগের আবেদন নেই। এজন্য শিক্ষার্থীদের সমস্যাকেন্দ্রিক বিষয়গুলো বেশি করে দেখা উচিত।

জানতে চাইলে ছাত্রলীগের সভাপতি আল নাহিয়ান খান জয় বলেন, সারা দেশে ছাত্রলীগের কর্মী বেড়েছে, ইউনিট বেড়ে ১২১টি হয়েছে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বাড়ছে। ফলে সময়ের প্রয়োজনেই কমিটিতে পদসংখ্যা বাড়াতে হয়েছে। আমরা চেষ্টা করছি নেতৃত্বের মান ধরে রেখে কমিটি করতে।

সাধারণ সম্পাদক লেখক ভট্টাচার্য বলেন, ৩০১ সদস্যের কেন্দ্রীয় কমিটির পর শূন্যপদে ৪০-৪৫ জনকে পদায়ন করা হয়েছে। নতুন অর্ধসহস্র পদ দেওয়া হয়নি। অনেকে হয়তো জালিয়াতি করে পরিচয় দিয়েছে। আমরা সেগুলোও শনাক্ত করছি।

৩০২ সদস্যের কমিটিতে যুগ্ম সম্পাদক ৮২

ছাত্রদলের গঠনতন্ত্র হয়নি ৪৩ বছরেও

তারিকুল ইসলাম

‘উৎপাদনমুখী শিক্ষা ব্যবস্থা’ স্লোগানকে সামনে রেখে ১৯৭৯ সালের ১ জানুয়ারি আত্মপ্রকাশ করে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল। আশির দশকে দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর ছাত্র সংসদে উল্লেখযোগ্য অবস্থান ছিল এই ছাত্র সংগঠনটির। নব্বইয়ের আন্দোলন কিংবা এর পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন আন্দোলন-সংগ্রামেও সামনের সারিতে দেখা গেছে ছাত্রদলকে। যদিও বর্তমান সময়ে আন্দোলন-সংগ্রামে সংগঠনটির অতীত ভূমিকা দৃশ্যমান নয়। ৩০২ সদস্যের কেন্দ্রীয় কমিটির মধ্যে ২২ সহসভাপতি, ৮২ যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক, ৬২ সহসাধারণ সম্পাদক এবং সহসাংগঠনিক সম্পাদকই ৩৮ জন। জেলার পূর্ণাঙ্গ কমিটির আকারও একইরকম। ‘টাউস’ কমিটির কারণে অযোগ্য ও নিষ্ক্রিয়রাও নেতা হচ্ছেন। যে কারণে অতীত ঐহিত্য হারাচ্ছে বিএনপির ‘ভ্যানগার্ড’খ্যাত এই সহযোগী সংগঠনটি। এছাড়া ৪৩ বছরেও একটি পূর্ণাঙ্গ গঠনতন্ত্র করতে পারেনি। এখন পর্যন্ত ‘খসড়া’ গঠনতন্ত্র দিয়ে চলছে সংগঠনটির কার্যক্রম।

ছাত্রদলের সাবেক নেতারা জানান, ১৯৯৭-৯৮ সালের কমিটির সময় ‘খসড়া’ গঠনতন্ত্র প্রণয়ন করা হয়। তবে কমিটি গঠনের ক্ষেত্রে বিএনপির শীর্ষ পর্যায়ের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন হওয়ায় সাংগঠনিক গঠনতন্ত্রের স্থায়ীরূপ দেওয়া হয়নি। বিএনপির শীর্ষ মহল থেকেও কোনো চাপ ছিল না, আবার যারা দায়িত্বে এসেছেন-তাদের কাছেও বিষয়টি উপেক্ষিত থেকেছে। যদিও ২০১৯ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর গঠনতন্ত্র চূড়ান্ত করার প্রক্রিয়া শুরু হয়। একটি ‘খসড়া’ও চূড়ান্ত করা হয়। কিন্তু কমিটিতে তা এখনো পাশ হয়নি। এছাড়া ছাত্রদলকে দেখভালের জন্য বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটিতে ছাত্রবিষয়ক সম্পাদক ও সহ-ছাত্রবিষয়ক সম্পাদকের পদও রয়েছে। কিন্তু ছয় বছর ধরে সে পদও ফাঁকা আছে। এখন সংগঠনটির সাংগঠনিক অভিভাবক বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সরাসরি নির্দেশে কমিটির নেতারা সারা দেশে তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করছে।

সাবেক ছাত্রনেতারা আরও জানান, জিয়াউর রহমান যখন বিএনপি প্রতিষ্ঠা করেন, তখন ভবিষ্যতের নেতৃত্ব তৈরির জন্য একটি ছাত্র সংগঠন প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন। এরই পরিপ্রেক্ষিতে প্রথম ১৬১ সদস্যের কমিটি গঠন করেন। এরপর এ পর্যন্ত আরও ২৩ বার নতুন কমিটি করা হয়। এর মধ্যে ছয়বার নির্বাচনের মাধ্যমে সরাসরি ভোটে নতুন নেতৃত্ব নির্বাচন করা হয়। তবে প্রতিষ্ঠার পর থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত সব কেন্দ্রীয় কমিটির আকার দুইশর মধ্যে রাখা হয়। কিন্তু এরপর কমিটির আকার বাড়তে থাকে। ২০০৯ সালে কেন্দ্রীয় কমিটি হয় ২৩৫ সদস্যের, ২০১২ সালে বেড়ে হয় ২৯১ সদস্যের, ২০১৪ সালে আরও বেড়ে হয় ৭৩৬ সদেস্যর। যদিও ২০১৯ সালে আংশিক কমিটি ছিল ৬০ সদস্যের। সবশেষ চলতি বছরের এপ্রিলে ৩০২ সদস্যের কেন্দ্রীয় কমিটি ঘোষণা করা হয়। যদিও এর মধ্যে বিবাহিতসহ নানা অভিযোগে ৩২ জন নেতার পদ স্থগিত রাখা হয়েছে।

ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি ও বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু বলেন, ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় কমিটি সর্বোচ্চ দেড়শ বা দুইশর মধ্যে হওয়ার কথা। কিন্তু সেক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে এখন অনেক বড় কমিটি হচ্ছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে বিভিন্ন নেতা বা ব্যক্তিকে সন্তুষ্ট করারও হয়তো প্রশ্ন থাকে। তবে কখনো কখনো জরুরি মুহূর্তে সভা করতে হলে একশ বা দেড়শ সদস্যের কমিটি হলে, ত্রিশ শতাংশ নেতার উপস্থিতিতে জরুরি সিদ্ধান্ত নেওয়া যায়। কিন্তু বড় কমিটি হলে তা হয়তো কষ্ট হবে। কমিটি বড় হলে অনেকে সন্তুষ্ট হয়। কিন্তু সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে অনেক জটিলতা দেখা দেয়।

ছাত্রদলের আরেক সাবেক সভাপতি ও বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, অতীতের মতোই ছাত্রদল তাদের ভূমিকা পালন করছে। বিগত কমিটির মধ্যে যারা প্রতিটি কর্মসূচিতে থেকেছে এবং শিক্ষাঙ্গনে শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখার জন্য সংগ্রাম করেছে, সাধারণ ছাত্রসমাজের মধ্যে যারা আবির্ভূত হয়েছে তাদের দিয়েই কমিটি করা হয়েছে। অনেক যাচাই-বাছাই করেই কমিটি করা হয়েছে। সুতরাং এখানে কোনো ধরনের ব্যত্যয় হয়নি।

ছাত্রদলের বর্তমান কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক সাইফ মাহমুদ জুয়েল বলেন, বিষয়টি আকার বা প্রকৃতির ওপর নির্ভর করে না। সমাজ বাস্তবতার ওপর নির্ভর করে। যেহেতু দীর্ঘ সময় ধরে ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা আন্দোলন-সংগ্রাম করছে। এ সময়ে সবচেয়ে বেশি গুম-খুন-নির্যাতনের শিকার হয়েছে ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা। সেখানে একজন ছাত্রের পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার প্রয়োজন জরুরি হয়ে পড়ে। এক্ষেত্রে সারা বাংলাদেশের নেতাদের সংগঠিত করে কেন্দ্রীয় সংসদের কমিটি হয়। ছাত্রদলের ১১৭টি সাংগঠনিক ইউনিট রয়েছে। সেক্ষেত্রে ৩০২ সদস্যের কমিটি অনেক বড় বলে আমরা মনে করি না।

গঠনতন্ত্র প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ছাত্রদলের খসড়া গঠনতন্ত্র রয়েছে। পূর্ণাঙ্গ গঠনতন্ত্রের বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন আছে। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে নিঃসন্দেহে সিদ্ধান্তের প্রয়োজন হয়। এখন খসড়া গঠনতন্ত্র দিয়ে আমরা কাজ করছি।

সাবেক ছাত্রনেতারা জানান, ছাত্রদলের অতীত ঐতিহ্য গৌরবোজ্জ্বল। ৯০-এর আন্দোলনসহ গুরুত্বপূর্ণ আন্দোলনে অগ্রণী ভূমিকা রেখেছে। ডাকসুর ভিপিসহ দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর ছাত্র সংসদে উল্লেখযোগ্য অবস্থান ছিল। সাবেক নেতারা এখনো জাতীয় পর্যায়েও ভূমিকা রাখছে।

৫০২ সদস্যবিশিষ্ট বিএনপির বর্তমান কেন্দ্রীয় কমিটি পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকদের মধ্যে অনেকে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান, উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য, সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব, যুগ্ম মহাসচিব, সম্পাদক ও সহসম্পাদক পদ পেয়েছেন। এছাড়া বিএনপির অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠন যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দল, কৃষক দলের নেতৃত্বেও রয়েছেন কয়েকজন সাবেক ছাত্রনেতা।

ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি ও বিএনপির প্রচার সম্পাদক শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানী বলেন, জিয়াউর রহমান ছাত্রদল প্রতিষ্ঠা করেছিলেন ছাত্রদের অধিকার আদায়ের জন্য। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানভিত্তিক ছাত্রদল কাজ করে আসছে। ছাত্রদের অধিকার নিয়ে কাজ করতে গেলে অনেক বাধা-বিপত্তি আসে। অনেক চড়াই-উতরাই পেরিয়ে ছাত্রদল তাদের ঐতিহ্যকে লালন করে আসছে। বিভিন্ন গণতান্ত্রিক আন্দোলনে ছাত্রদল ভূমিকা পালন করে আসছে।

তিনি বলেন, এখন একটা ফ্যাসিবাদী সরকার দেশে তাদের শাসনকার্য চালিয়ে যাচ্ছে। যেখানে ছাত্ররা তাদের অধিকার থেকে বঞ্চিত, তাদের অধিকার নিয়ে কথা বলতে পারে না। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের স্বাভাবিক কার্যক্রম, সাংগঠনিক কার্যক্রম চালাতে পারছে না। এরপরও বাধা-বিপত্তি উপেক্ষা করে এ দেশের ছাত্র সমাজের নেতৃত্ব ছাত্রদল দিচ্ছে। আগামী দিনে দেশনেত্রী খালেদা জিয়া এবং তারেক রহমানের নেতৃত্বে একটি দুর্বার গণআন্দোলন গড়ে তোলার লক্ষ্যে এই মুহূর্ত পর্যন্ত কাজ করে যাচ্ছে। আমার বিশ্বাস ছাত্রদলের যে ঐতিহ্য লড়াই সংগ্রামের তারই ধারাবাহিকতায় এবারও জয়ী হবে।

ছাত্রদলের বর্তমান সাধারণ সম্পাদক সাইফ মাহমুদ জুয়েল মনে করেন, অতীতে ছাত্র রাজনীতিতে একটি সংস্কৃতি ছিল। যেখানে সভা-সমাবেশ করার অধিকার ছিল, যা সংবিধানেও আছে। কিন্তু এখন কোনো কিছুই নেই। তারপরও জাতীয় রাজনীতিতে প্রভাব ফেলার মতো শক্তি-সামর্থ্য ছাত্রদলের রয়েছে। অতীতের যে কোনো সময়ের চেয়ে আমরা এখন সুসংগঠিত। কিন্তু যেহেতু আন্দোলন এখনো চূড়ান্ত পর্যায়ে যায়নি, ফলাফল আসেনি, সেক্ষেত্রে এর বিকাশ দৃশ্যমান নয়। কিন্তু ছাত্রদলের অতীতের মতো এখনো গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা রাখার মতো সবকিছুই রয়েছে। কারণ বর্তমান প্রজšে§র ছাত্রদল যে ফ্যাসিস্টকে মোকাবিলা করছে, অতীতের ছাত্র রাজনীতির ইতিহাসে এ রকম মোকাবিলা করতে হয়নি। এখন অসংখ্য সহযোদ্ধা গুম-খুন হওয়ার পরও রাজপথে তেজোতীপ্ত ভূমিকা পালন করছে ছাত্রদল। মৃত্যুর উপত্যকায় দাঁড়িয়ে, মুক্তির স্লোগান দেওয়া সংগঠন হচ্ছে ছাত্রদল। এটি অনেক তাৎপর্য বহন করে।

সূত্র: যুগান্তর
আইএ/ ১১ অক্টোবর ২০২২

Back to top button