সচেতনতা

পেঁয়াজ খেলে ক্যানসার-হৃদরোগের ঝুঁকি কমায়

মানবসভ্যতার ইতিহাসের আদিযুগ থেকেই পেঁয়াজের ব্যবহার শুরু হয়েছে। পৃথিবীর প্রায় সব জায়গায় বিভিন্ন রান্নায় পেঁয়াজ ব্যবহার করা হয়ে থাকে। ঐতিহাসিকভাবে পেঁয়াজের রয়েছে ঔষধি ব্যবহার। প্রাচীন আমলে কলেরা এবং প্লেগের প্রতিরোধক হিসেবে ব্যবহার করা হতো পেঁয়াজ। রোমান সম্রাট নিরো ঠাণ্ডার ওষুধ হিসেবে পেঁয়াজ খেতেন বলেও শ্রুতি রয়েছে।

পেঁয়াজে থাকা এলিসিন নামের উপাদান অ্যান্টি-ফাঙ্গাল এবং অ্যান্টি-ব্যাকটেরিয়াল হিসেবে কাজ করে। অনেক সময় এটি কিছু কিছু ক্যানসার প্রতিরোধক হিসেবে কাজ করে। হৃদরোগের ঝুঁকি হ্রাস, রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা ঠিক রাখা, ব্লাড প্রেশার নিয়ন্ত্রণে রাখার ক্ষেত্রে পেঁয়াজের ব্যবহার দেখা যায়।

পেঁয়াজ আসলে কোনো সবজি নয়। এটি আসলে একটি মশলা জাতীয় উদ্ভিদ। এর বৈজ্ঞানিক নাম এলিয়াম সেপা। এই বর্গের অন্যান্য উদ্ভিদের মধ্যে রয়েছে রসুন, শ্যালট, লিক, চাইব এবং চীনা পেঁয়াজ। রসুনের মতোই এর গোত্র হচ্ছে লিলি।

পেঁয়াজ বিশ্বের প্রায় সব দেশেই উৎপাদিত হয়। তবে বিশ্বে সবচেয়ে বেশি পেঁয়াজ উৎপাদিত হয় ভারত এবং চীনে। বাংলাদেশে যে সব এলাকায় শীত বেশি থাকে সেসব এলাকায় পেঁয়াজ বেশি জন্মায়। আকারে বড় না হলেও বাংলাদেশের পেঁয়াজের বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, এটি ঝাঁজালো বেশি হয়। কারণ এতে এলিসিনের মাত্রাটা বেশি থাকে। যা রোগ প্রতিরোধক ক্ষমতা বাড়িয়ে দেয়।

একটি বড় মাপের পিঁয়াজে ৮৬.৮ শতাংশ পানি, ১.২ শতাংশ প্রোটিন, ১১.৬ শতাংশ শর্করা জাতীয় পদার্থ, ০.১৮ শতাংশ ক্যালসিয়াম, ০.০৪ শতাংশ ফসফরাস ও ০.৭ শতাংশ লোহা থাকে। এ ছাড়া পিঁয়াজে ভিটামিন এ, বি ও সি থাকে। এ ছাড়া শরীরের প্রয়োজনীয় ভিটামিন সি-এর ২০ ভাগ মেটানো সম্ভব একটা পিঁয়াজ থেকেই। এছাড়া ডায়েটারি ফাইবার থাকে অনেক বেশি যা প্রায় ১২%। পেয়াজে মধ্যে কোন ফ্যাট নাই। এছাড়া পেঁয়াজে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন এ, বি এবং আয়রন পাওয়া যায়। পেঁয়াজ ঔষধি গুণে ভরপুর, জেনে নিন যেভাবে পেঁয়াজ খেলে স্বাস্থ্য উপকারিতা পাওয়া যায়-

ভিনেগার দিয়ে পেঁয়াজ

পেঁয়াজের সঙ্গে ভিনেগার যোগ করা হলে তা শরীরের জন্য দ্বিগুণ উপকারী হতে পারে। ভিনেগার দিয়ে পেঁয়াজ খেলে হার্ট থেকে শুরু করে হজমের সমস্যা, সব ধরনের রোগে উপকার পাওয়া যায়। ভিনেগার পেঁয়াজ তৈরি করতে মাঝখান থেকে পেঁয়াজ কেটে তাতে ভিনেগার ও পানি মিশিয়ে নিন। তারপর তাতে লবণ মেশান। ভিনেগারের সঙ্গে পেঁয়াজ একদিকে যেমন সুস্বাদু, তেমন স্বাস্থ্যের জন্যও উপকারী। ভিনেগারের সঙ্গে পেঁয়াজ খেলে হার্টের জন্য ভাল ফল পাওয়া যায়। এটি খারাপ কোলেস্টেরল কমায় এবং গুড কোলেস্টেরল বাড়াতে সাহায্য করে। এতে ভিটামিন বি ৯ এবং ফোলেট রয়েছে যা হৃদরোগের ঝুঁকি কমায়। একটি গবেষণায় বলা হয়েছে, ভিনেগারে ডুবিয়ে পেঁয়াজ খেলে ক্যানসারের ঝুঁকি কমে। এই ধরনের পেঁয়াজ খেলে প্রোস্টেট, স্তন এবং কোলন ক্যানসারের ঝুঁকি অনেকাংশে কমে যায় এবং ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে থাকে।

কালো আঙুর ও পেঁয়াজ

কালো আঙুরে ক্যাটেচিন নামে একটি পলিফেনল অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট রয়েছে, যা কার্ডিওভাসকুলার রোগ, ক্যানসার এবং স্নায়বিক রোগের ঝুঁকি কমায়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পেঁয়াজের সঙ্গে আঙুল খেলে শুধু রক্ত ​​জমাট বাঁধার সমস্যাই কম হয় না, হৃদরোগের ঝুঁকিও কমে।

ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ করে

একটি গবেষণা থেকে জানা গেছে যে, পেঁয়াজের উপাদান ব্লাডসুগার লেভেল কমাতে সাহায্য করে। পেঁয়াজের একটি সালফার উপাদান এবং কুয়েরসেটিন ব্লাড সুগারে কল্যাণকর প্রভাব ফেলে।

ক্যানসার প্রতিরোধক

ইউনিভার্সিটি অব গুয়েলফ এর পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা গেছে যে, স্তন ক্যান্সার এবং কোলন ক্যান্সার এর কোষ ধ্বংস করতে সক্ষম লাল পেঁয়াজ। লাল পেঁয়াজে উচ্চ পরিমাণে কুয়েরসেটিন এবং এন্থোসায়ানিন থাকার কারণে এমনটা হয়ে থাকে। পেঁয়াজে উপস্থিত এই উপাদানগুলো ক্যানসার কোষগুলোর জন্য নিজে নিজে ধ্বংস হয়ে যাওয়ার পথ খুলে দেয়- অনেকটা আত্মহত্যায় উদ্বুদ্ধ করার মত, মানবদেহকে ক্যানসারের জন্য অনুপযোগী করে তোলে আর এর ফলে ক্যান্সার কোষ বাড়তে পারেনা।

হার্টের সুরক্ষায় পেঁয়াজ

লাল পেঁয়াজে উপস্থিত ফ্লেভনয়েডস আপনার হৃদপিণ্ডের সুস্থতা রক্ষায় বিশেষ ভূমিকা পালন করে। পেঁয়াজে আরও আছে প্রচুর পরিমাণে অরগ্যানোসালফার, যা হৃদরোগ থেকে সুরক্ষা প্রদান করে। এক আর্জেন্টাইন গবেষণায় জানা গেছে যে, পেঁয়াজে পাওয়া অরগ্যানোসালফার কার্ডিওভাস্কুলার রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে। পেঁয়াজের থিওসালফাইনেট হার্ট অ্যাটাক এবং স্ট্রোক এর ঝুঁকি কমায়। পেঁয়াজ রক্তে কোলেস্টেরল এর পরিমাণ হ্রাস করে যা হৃদপিণ্ডের সুস্থতার জন্য অত্যন্ত দরকারি। পেঁয়াজের উপাদান রক্তকণিকাগুলোর একটির সাথে আরেকটি লাগতে বাঁধা দেয়, রক্তপিণ্ড সৃষ্টি হতে পারেনা, ফলে হার্ট সুস্থ থাকে।

হজমে সহায়তা

পেঁয়াজে রয়েছে প্রচুর পরিমাণে ফাইবার, যা প্রাকৃতিকভাবে রেচন প্রক্রিয়ার সহায়ক হিসেবে কাজ করে অন্ত্র আন্দোলন সহজ এবং আরামদায়ক করে তোলে। দেহের অন্ত্র সাফ করতে এবং শরীর থেকে বর্জ্য নিষ্কাশনে ফাইবার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। পেঁয়াজের আছে স্যাপোনিন যা পেট ব্যথার উপশম করে। পেঁয়াজের ফাইটোকেমিকেলস গ্যাস্ট্রিক আলসারের ঝুঁকি কমায়। পেঁয়াজের প্রাকৃতিক প্রি-বায়োটিক উপাদান কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করে।

রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি

পেঁয়াজের সেলেনিয়াম দেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে। রাশিয়ায় ঠাণ্ডা এবং ফ্লু এর উপশমের জন্য হারবাল মেডিসিন হিসেবে পেঁয়াজ ব্যবহৃত হয়। ঠাণ্ডা লাগার উপশম হিসেবে পেঁয়াজের চা অত্যন্ত উপকারী। এছাড়া পেঁয়াজের রসের সাথে মধু মিশিয়ে খেলেও ঠাণ্ডা লাগা থেকে মুক্তি মেলে। এছাড়া পেঁয়াজের উপাদান সমূহ অ্যাজমা থেকে সুস্থতা লাভে সহায়তা করে।

ঘুম বাড়ায় এবং স্ট্রেস কমায়

পেঁয়াজের প্রিবায়োটিকস ঘুম বাড়ায় এবং স্ট্রেস কমায়। পাকস্থলীর গুড ব্যাকটেরিয়া প্রিবায়োটিক ফাইবারের রেচন ঘটায়, তখন সেই ব্যাকটেরিয়া দ্বিগুণ হয় এবং পাকস্থলী সুস্থ রাখে- এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, এর ফলে মেটাবলিক বাইপ্রোডাক্ট উন্মুক্ত হয়। এই বাইপ্রোডাক্টগুলো মস্তিষ্কের ক্রিয়ায় ইতিবাচক প্রভাব ফেলে এবং ঘুম বাড়ায়।

অ্যানিমিয়া নিয়ন্ত্রণে

দেহে আয়রনের অভাবে অ্যানিমিয়া হয় এবং তা হয়ে উঠতে পারে মরণঘাতি। সাধারণত দেহের হিমোগ্লোবিনের পরিমাণ ঠিক রাখতে বিভিন্ন ধরণের ওষুধের ব্যবহার বর্তমানে স্বাভাবিক বিষয়। কিন্তু প্রাকৃতিক পন্থা অনুসরণ করলে ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া এড়ানো সম্ভব।

সুস্থ হাড়

ভাঙ্গা হাড় নিরাময়ে পেঁয়াজ উপকারী। দেখা গেছে যে। পেঁয়াজে উপস্থিত কন্ড্রসাইটস হাড়ের বৃদ্ধি এবং জোড়া লাগাতে সাহায্য করে। এছাড়াও পেঁয়াজে এমন কিছু উপাদান আছে যা দেহের যোজক কলা তৈরিতে অবদান রাখে।

চোখের সুস্থতায় পেঁয়াজ

পেঁয়াজের সালফার চোখের লেন্সের অবস্থার উন্নতি ঘটায়। পেঁয়াজের সালফার গ্লুটাথিওন নামের এক ধরণের প্রোটিন তৈরিকে ত্বরান্বিত করে যা চোখের এন্টি অক্সিডেন্ট হিসেবে কাজ করে। বেশি পরিমাণে গ্লুটোথিওন থাকলে গ্লুকোমায় আক্রান্ত হবার ঝুঁকি কমে।

এন্টি-এজিং এ অবদান

পেঁয়াজে এন্টি অক্সিডেন্ট থাকার কথা নিশ্চয়ই অজানা নয়। পেঁয়াজের এন্টি অক্সিডেন্ট দেহের ভেতরে এন্টি অক্সিডেন্ট এর উৎপাদন ত্বরান্বিত করে। চামড়ার মাধ্যমে বিভিন্ন রকম দূষিত উপাদান আমাদের দেহে প্রবেশ করে যার ফলে স্কিন সেল এজিং ঘটে। পেঁয়াজের ডিটক্সিফাইং এবং এন্টি অক্সিডেন্ট উপাদানগুলো এই এজিং প্রসেসের গতি কমিয়ে দেয়।

চুলের স্বাস্থ্য রক্ষায়

পেঁয়াজ চুলের জন্য অত্যন্ত উপকারী। চুল পড়া এবং চুল পেকে যাওয়ার মত সমস্যার দূরীকরণ করে পেঁয়াজ। চুলে এবং চুলের গোঁড়ায় পেঁয়াজের রস নিয়মিত দিলে চুল পড়া কমে গিয়ে নতুন চুল গজানো ত্বরান্বিত করে। পেঁয়াজের রস চুলে লাগালে খুশকি দূর হয়। পেঁয়াজের রসের সাথে দই মিশিয়ে টা চুলে আধাঘণ্টা রেখে ধুয়ে ফেলতে হবে। এই হেয়ার প্যাক চুলের গোঁড়া শক্ত করে এবং চুলের খুশকি দূর করে। এমন কি, চুলের উকুন দূর করতে পেঁয়াজের রস অত্যন্ত উপকারী।

ত্বকের উজ্জ্বলতা বৃদ্ধি

পেঁয়াজে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন এ, সি এবং ই আছে যা ত্বকের জন্য খুবই উপকারী। ত্বকের দ্রুত বুড়িয়ে যাওয়া থেকে রক্ষা করে পেঁয়াজ। পেঁয়াজের রসের সাথে অলিভ অয়েল মুখে লাগালে ব্রণ থেকে উপশম পাওয়া যায়। ত্বকের কালো দাগ দূর করে ত্বকে পুষ্টি যোগায়।

কানের ব্যথা কমাতে

হঠাৎ করে কানের ব্যথা শুরু হলে পেঁয়াজ হতে পারে এর তাৎক্ষণিক একটি উপশম । এতে রয়েছে অ্যান্টিইনফ্ল্যামেটরি যা প্রদাহ প্রতিরোধ করে । কানে ব্যাথা করলে এক টুকরো পেঁয়াজ কানের ভেতরে রাখুন । এটি কানের ময়লাকে নরম করে ভেতর থেকে বের করে দিতে সাহায্য করে থাকে ।

মৌমাছির কামড় ভালো করতে

মৌমাছির কামড়ে পেঁয়াজ পিষে বা এক টুকরা পেঁয়াজ কেটে লাগাতে পারেন । এটি জ্বালাপোড়া রোধ করবে এবং মৌমাছির কামড়ের কারণে কোনো অ্যালার্জিজনিত পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার হাত থেকে রক্ষা করে ।

রক্ত বন্ধ করতে

দেহের কোনো স্থানে কেটে গেলে এক টুকরা পেঁয়াজ ঘষুন। দেখবেন সাথে সাথে রক্ত বন্ধ হয়ে গেছে এবং এটি ইনফেকশন প্রতিরোধেও সাহায্য করবে।

যৌন ক্ষমতা বাড়ে

গবেষকরা জানাচ্ছেন, পেঁয়াজের রস টেস্টোস্টেরন হরমনের ক্ষরণ বেশ খানিকটা বাড়িয়ে দেয়। ফলে স্বাভাবিকভাবেই সঙ্গমের ইচ্ছা বা স্ফুর্তি অনেকটাই বৃদ্ধি পায়। হরমোন বিশেষজ্ঞ এলিসা ভিটির মতে, ধীরে ধীরে সময় নিয়ে পেঁয়াজের রস খেতে পারলে তা কামেচ্ছা বাড়িয়ে তোলে, সক্রিয় করে তোলে যৌনাঙ্গকে। কাঁচা নয়, পেঁয়াজ কুচি সামান্য মাখনে ভেজে মধু দিয়ে প্রতিদিন সকালে খেতে পারলে যৌন ক্ষমতা প্রায় তিন গুণ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেতে পারে।

আইএ

Back to top button