জাতীয়

১১ বছরে মেয়াদ বেড়েছে ৭ বার, ব্যয় বেড়েছে ২৪৯৩ কোটি

মফিজুল সাদিক

চট্টগ্রাম, ০৮ অক্টোবর – বন্দর নগরী চট্টগ্রাম। বাংলাদেশের বাণিজ্যিক রাজধানী। দেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের সিংহভাগই হয় চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে। প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষয়ক্ষতি কমানো, বিদেশি বিনিয়োগ উৎসাহিত করা, শহর যানজটমুক্ত রাখাসহ পর্যটনশিল্প বিকাশে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ চট্টগ্রাম শহরের অবকাঠামো উন্নয়ন তাই জরুরি। ২০১১ সালে ‘চিটাগাং সিটি আউটার রিং রোড’ প্রকল্প হাতে নেয় সরকার। উদ্দেশ্য ছিল শহরের যানজট নিরসনসহ বেশ কিছু অবকাঠামো উন্নয়ন। একে একে ১১টি বছর পেরিয়ে গেলেও শেষ হয়নি কাজ। মেয়াদ বেড়েছে সাত দফা। নতুন করে চতুর্থ দফায় ব্যয় বাড়ানোর প্রস্তাব দেওয়ায় ৮৫৬ কোটি ২৮ লাখ ৬০ হাজার টাকার প্রকল্প গিয়ে ঠেকেছে ৩ হাজার ৩৪৯ কোটি ১৯ লাখ ৪১ হাজার টাকায়। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ।

পরিকল্পনা কমিশন সূত্র জানায়, জানুয়ারি ২০১১ থেকে ডিসেম্বর ২০১৪ মেয়াদে প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল। দ্বিতীয় সংশোধিত প্রস্তাবে ব্যয় দাঁড়ায় ১ হাজার ৪৯৬ কোটি ৩৫ লাখে, তৃতীয় প্রস্তাবে ব্যয় দাঁড়ায় ২ হাজার ৬৭৪ কোটি ২৯ লাখ টাকা। চতুর্থ ধাপে ৩ হাজার ৩৪৯ কোটি ১৯ লাখ টাকার প্রস্তাব করা হয়। ফলে মূল প্রকল্প থেকে চতুর্থ সংশোধিত প্রস্তাব পর্যন্ত ব্যয় বাড়ছে ২ হাজার ৪৯৩ কোটি টাকা।

মেয়াদ বেড়েছে সাতবার
ব্যয় বৃদ্ধির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে প্রকল্পের মেয়াদও। একে একে সাতবার মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে। প্রথমে প্রকল্পের কাজ জানুয়ারি ২০১১ থেকে ডিসেম্বর ২০১৪ সালের মধ্যে শেষ হওয়ার সময়সীমা নির্ধারিত ছিল। এর পরে জুন ২০১৭ সাল নাগাদ মেয়াদ বাড়ানো হয়। পর্যায়ক্রমে কয়েক দফায় জুন ২০১৯, জুন ২০২০, জুন ২০২১, ডিসেম্বর ২০২১, ডিসেম্বর ২০২২ সাল নাগাদ মেয়াদ বাড়ে। এই মেয়াদেও প্রকল্পের কাজ শেষ হয়নি। নতুন করে জুন ২০২৪ সাল নাগাদ মেয়াদ বাড়ানোর জন্য পরিকল্পনা কমিশনে প্রস্তাব করা হয়েছে।

মেয়াদ বাড়ানোর কারণ
জংশন উন্নয়ন অন্তর্ভুক্তকরণ: কর্ণফুলী নদীর প্রান্তে সেতু বিভাগের মাধ্যমে তৈরি হচ্ছে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান টানেল। এতে দক্ষিণ চট্টগ্রামের সঙ্গে চট্টগ্রাম শহরের নিরবচ্ছিন্ন যোগাযোগের সুযোগ সৃষ্টি হবে। এ টানেলের সম্মুখেই চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের বাস্তবায়নাধীন ‘চিটাগাং সিটি আউটার রিং রোড’ পতেঙ্গা থেকে চলে গেছে সাগরিকায়। ‘চট্টগ্রাম শহরের লালখান বাজার থেকে শাহ্ আমানত বিমানবন্দর পর্যন্ত এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণ’ শীর্ষক প্রকল্পেরও সংযোগস্থল। প্রকল্পগুলো সমাপ্তির পর এ সংযোগস্থলে সুষ্ঠুভাবে যানবাহন চলাচল করতে না পারলে তা যানজট সৃষ্টি করবে। চীন সরকারের আর্থিক ও কারিগরি সহায়তায় বাস্তবায়নাধীন বঙ্গবন্ধু টানেল প্রকল্পে চুক্তি অনুযায়ী এ জংশনের উন্নয়নের জন্য কাজের পরিধি বাড়ানো অথবা অতিরিক্ত অর্থ বরাদ্দ করা সম্ভব নয়। এজন্য সংযোগস্থলে ফ্লাইওভার ও আন্ডারপাসের মাধ্যমে ২ হাজার ৪১৯ মিটার ইন্টারসেকশন উন্নয়ন বাবদ ৫৩০ কোটি ৬১ লাখ টাকা ব্যয় হবে।

সংযোগ সড়ক নির্মাণকাজের নকশা পরিবর্তন
পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের দাখিল করা নকশা ও প্রাক্কলন অনুসারে অনুমোদিত তৃতীয় সংশোধিত ডিপিপিতে রিং রোডের সঙ্গে চট্টগ্রাম রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চলের (সিইপিজেড) সংযোগ সড়ক নির্মাণ ব্যয় অন্তর্ভুক্ত করা হয়। সে অনুযায়ী নির্মাণকাজের জন্য ঠিকাদার নিয়োগ দেওয়া হয়। নির্মাণকাজ করার প্রাক্কালে দেখা যায়, তৃতীয় সংশোধিত ডিপিপি প্রণয়নের সময় পরামর্শক প্রতিষ্ঠান নকশা করার ক্ষেত্রে মাটির যে বৈশিষ্ট্য বিবেচনা করেছিল বাস্তবে কিছু কিছু অংশে তার ভিন্নতা রয়েছে। সে কারণে মাটির বৈশিষ্ট্য ও জায়গার সীমাবদ্ধতার কারণে আগের ড্রয়িং ডিজাইন অনুযায়ী কাজটি বাস্তবায়ন করা সম্ভব হচ্ছে না। সংশোধিত নকশা অনুসারে রিং রোডের সঙ্গে সিইপিজেডের সংযোগ সড়কটি নির্মাণ এবং সিইপিজেডের অনুরোধে রিং রোড সংলগ্ন সিইপিজেডের কয়েকটি অংশে সীমানাপ্রাচীর নির্মাণ বাবদ অতিরিক্ত অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে ১২১ কোটি ৯৪ লাখ টাকা।

এলইডি স্ট্রিট লাইট অন্তর্ভুক্তকরণ
প্রকল্প এলাকাটি চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন এলাকায় এবং ভৌগোলিক কারণে রাস্তাটি সাগরপাড়ে হওয়ায় রাতে যানবাহন দুর্ঘটনা রোধ জরুরি। এজন্য রাস্তার উভয় পাশে এলইডি সোলার অন্তর্ভুক্ত করা হয়। ৯৪৯টি স্ট্রিট লাইট অন্তর্ভুক্তির কারণে ব্যয় বাড়ছে ১২ কোটি ১০ লাখ টাকা। এলইডি স্ট্রিট লাইট বারের মধ্যে ১৫০ ওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন লাইট, ডাটা কন্ট্রোল ইউনিট, কন্ট্রোল অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম সফটওয়্যার, স্টিল বডি এমডিবি/ডিবি/এসডিবি, গ্রিল কেস, জিআই পাইপ, পিভিসি পাইপ, ২৯ ফুট দীর্ঘ জিআই গোল, ক্যাবল, ট্রান্সফরমার, ড্রপ আউট ফিউস, আয়রন চ্যানেল, ফাউন্ডেশনসহ আনুষঙ্গিক কাজ অন্তর্ভুক্ত।

বারবার প্রকল্পের সময়-ব্যয় বৃদ্ধি প্রসঙ্গে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের প্রধান প্রকৌশলী কাজী হাসান বিন শামস বলেন, ‘টানেল ইন্টারসেকশন ও জমি অধিগ্রহণের কাজ বাকি। রেললাইনের ওভার ব্রিজের অনুমতি লাগবে। এসব কারণে সংশোধন করতে হবে। পরিকল্পনা কমিশন অযৌক্তিকভাবে আমাদের প্রস্তাব কমিয়ে দিয়েছে। প্রথমে ১৫শ কোটি টাকার প্রস্তাব পাঠানো হয়। পরিকল্পনা কমিশন ৮৫৬ কোটির অনুমোদন দেয়। পরে দ্বিতীয় সংশোধনে ১ হাজার ৪৫৬ কোটি টাকা ব্যয় ধরা হয়। নানান কারণে কাজটা শুরু হয় ২০১৭ সালে। প্রকল্পে বিশাল একটি বাঁধ নির্মাণ করেছি। এটার ওপর সড়ক তৈরি করেছি। টানেল সংযোগ না থাকলে তৃতীয় সংশোধনে প্রকল্পের কাজ সমাপ্ত হতো।’

প্রকল্পের অন্যতম উদ্দেশ্য
উপকূলীয় বাঁধ শক্তিশালীকরণের মাধ্যমে বন্যা ও সামুদ্রিক জলোচ্ছ্বাস থেকে চট্টগ্রাম শহর, বিমানবন্দর ইপিজেডসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা রক্ষা করা, বাঁধের ওপর রাস্তা নির্মাণ করে চট্টগ্রাম শহর ও বন্দর থেকে ভারী যানবাহন এই বাইপাসের মাধ্যমে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করে যাতায়াতের সুবিধার্থে চট্টগ্রাম শহরের যানজট নিরসন করা, শহর ও উপকূলীয় বাঁধের মধ্যস্থিত এলাকার উন্নয়নের মাধ্যমে আবাসন, বাণিজ্য ও পর্যটনশিল্পকে উৎসাহিত করা এবং যাতায়াত সুবিধা বাড়িয়ে বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করে শিল্পের প্রসার ঘটানো। কর্ণফুলী নদীর মোহনায় টানেলের সঙ্গে সড়কের সংযোগের মাধ্যমে চট্টগ্রাম শহরকে বাইপাস করে দক্ষিণ চট্টগ্রামের যানবাহনকে ঢাকা অভিমুখে চলাচলের সুযোগ সৃষ্টি করা।

প্রকল্পের মূল কার্যক্রম
চট্টগ্রাম শহরের যানজট নিরসনের জন্য প্রয়োজনীয় সড়ক ও ব্রিজের উন্নয়ন জরুরি। জাপান ব্যাংক ফর ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন (জেবিআইসি) চট্টগ্রাম শহরের অপ্রতুল অবকাঠামোগত অসুবিধা চিহ্নিতকরণে ২০০৬ সালে একটি সমীক্ষা পরিচালনা করে। এই সমীক্ষায় ট্রাক রোড নেটওয়ার্কের আওতায় দুটি রিং রোড ও ছয়টি রেডিয়াল রোড নির্মাণের প্রস্তাব করা হয়। এ পরিপ্রেক্ষিতে চট্টগ্রাম শহর রিং রোডটি (আউটার রিং রোড) নির্মাণ করার জন্য গুরুত্ব দেওয়া হয় বেশি। চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন মাস্টারপ্ল্যানেও বিষয়টি উল্লেখ থাকার প্রেক্ষাপটে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়। চিটাগাং সিটি আউটার রিং রোডটি মূলত শহর রক্ষাকারী বিদ্যমান উপকূলীয় বাঁধের ওপর নির্মিত হবে। পর্যটনশিল্পের বিকাশের জন্য সমুদ্রতীরে সৌন্দর্যবর্ধন অন্তর্ভুক্ত করে অনুমোদন করা হয় প্রকল্পটি।

ব্যয় নিয়ে প্রশ্ন
প্রকল্পের নানা খাতের ব্যয় নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে পরিকল্পনা কমিশন। ডিজাইন ও সুপারভিশনের জন্য পরামর্শক বাবদ প্রায় ১৮ কোটি টাকার সংস্থান রাখা হয়েছে, যা অধিক বলে মত দিয়েছে কমিশন। প্রকল্পের মেয়াদব্যাপী পরামর্শকের সংস্থান না রেখে সুনির্দিষ্ট কাজ সম্পাদনের চুক্তিতে (অ্যাসাইনমেন্ট বেজড) পরামর্শক নিয়োগের মাধ্যমে এ ব্যয় কমানো সম্ভব কি না সে বিষয়ে আলোচনা হতে পারে। প্রকল্পের আওতায় কেনা একটি জিপ, একটি পিকআপ এবং তিনটি মোটরসাইকেলের জন্য ২৫ লাখ টাকা জ্বালানি ব্যয়ের প্রস্তাব করা হয়েছে, যা মাসিক জ্বালানি প্রাপ্যতার ভিত্তিতে নির্ধারণপূর্বক ব্যয় কমানো উচিত বলে মনে করে কমিশন।

অধিগ্রহণে প্রস্তাবিত জমির স্থাপনার ক্ষতিপূরণের জন্য দুই কোটি টাকা থোক ধরা হয়েছে। এটা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে কমিশন।

প্রকল্পের আওতায় কিছু বাড়তি ব্যয়ের প্রস্তাব করা হয়েছে। ২ দশমিক ৪৯ কিলোমিটার টানেল জংশন উন্নয়নের জন্য ২৭২ কোটি ৭৫ লাখ টাকার প্রস্তাব করা হয়েছে। এ জংশনটি কীভাবে নির্মাণ করা হবে বা কী কী কাজ অন্তর্ভুক্ত থাকবে সে সম্পর্কে সভাকে অবহিত করা যেতে পারে বলে মনে করে কমিশন।

সিইপিজেড সংযোগ সড়ক ১ দশমিক ১৭৫ কিলোমিটার নির্মাণ বাবদ অনুমোদিত ব্যয় ছিল ৪০ কোটি ৫৪ লাখ টাকা, এখন ব্যয় বাড়িয়ে ১৬২ কোটি ৪৯ লাখ টাকা প্রস্তাব করা হয়েছে। এক্ষেত্রে ডিজাইনে কী পরিবর্তন আনা হয়েছে সে সম্পর্কে পরিকল্পনা কমিশনকে অবহিত করা যেতে পারে বলে মত দেওয়া হয়েছে।

সূত্র: জাগো নিউজ
আইএ/ ০৮ অক্টোবর ২০২২

Back to top button