কুমিল্লা

কেমন আছেন মণ্ডপে হামলায় নিহত দিলীপের স্ত্রী-সন্তান?

আবদুল্লাহ আল মারুফ

কুমিল্লা, ০৫ অক্টোবর – কুমিল্লার নানুয়ার দিঘির পাড়ের পূজামণ্ডপে দুর্গাপূজার আনন্দে মেতেছেন সনাতন ধর্মাবলম্বীরা। গত বছর এই পূজামণ্ডপে হামলাকে কেন্দ্র করে নিহত হয়েছিলেন নগরীর গাংচর এলাকার বাসিন্দা দিলীপ কুমার দাস। পূজার আনন্দে সবাই মেতে উঠলেও উৎসব নেই দিলীপের পরিবারে। পূজার আনন্দ ভুলে সেদিনের কথা স্মরণ করে কাঁদছেন দিলীপের স্বজনরা।

সোমবার (৩ অক্টোবর) দিলীপের বাড়িতে গিয়ে দেখা গেছে সুনসান নীরবতা। উৎসব নিয়ে ব্যস্ততা দেখা যায়নি পরিবারের সদস্যদের। ঘরের এক কোণে বসে পূজা করছিলেন দিলীপের স্ত্রী রূপা দাস। পূজা শেষ করে এসে এই প্রতিবেদকের সঙ্গে কথা বলেছেন। জানিয়েছেন সংসারে টানাপোড়েনের কথা।

কথার শুরুতেই দিলীপের স্ত্রী বলেন, ‘তিনি ছিলেন পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। তাকে হারিয়ে আমরা এখন অসহায় জীবনযাপন করছি। কখনও খেয়ে কখনও না খেয়ে দিন যাচ্ছে আমাদের। পূজার আনন্দ থাকবে কীভাবে? আতঙ্কে আছি এখনও। এমন পুজো কারও সংসারে না আসুক।’

রূপা দাসের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তাদের এক ছেলে ও এক মেয়ে। দিলীপ সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে ঠিকাদারির কাজ করতেন। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি ছিলেন। গাংচর এলাকায় টিনশেড ঘরে তাদের বসবাস। ঘরের সামনে দুটি দোকান আছে। ঠিকাদারির পাশাপাশি একটি দোকানে লন্ড্রির কাজ করতেন। দিলীপের মৃত্যুর পর সেগুলো ভাড়ায় চলছে। মাসে আট হাজার টাকা ভাড়া আসে। তা দিয়ে বিদ্যুৎ ও পানির বিলসহ যাবতীয় সংসার খরচ চলে।

দিলীপের আয়েই চলতো মেয়ে প্রিয়া রানী দাস ও ছেলে রাহুল দাসের পড়াশোনার খরচ। বাবার মৃত্যুর পর সংসারে অভাব-অনটন দেখা দেয়। এরপর কুমিল্লা সরকারি কলেজে অনার্স শেষ করে প্রিয়া রানী ঢাকায় চলে যান। ঢাকায় একটি নাট্যদলে অভিনয় করেন। রাহুল কুমিল্লা থেকে এইচএসসি পাস করে ঢাকার একটি কলেজে অনার্সে পড়ছেন। পাশাপাশি পার্টটাইম চাকরি করেন। সবমিলে টানাপোড়েনের মধ্যে দিয়ে চলছে তাদের সংসার।

রূপা দাস বলেন, ‘দিলীপ ছিলেন মুক্তচিন্তার মানুষ। ধর্মভীরুও ছিলেন। পাশের দারোগাবাড়ি মাজারে যেতেন মাঝেমধ্যে। তার অনেক মুসলমান বন্ধু ছিল। অথচ নির্মম ভাগ্যের বলি হলো। আজ পর্যন্ত জানলাম না তাকে কেন হত্যা করা হলো।’

এসব কথা বলতে বলতে কান্নায় ভেঙে পড়েন রূপা দাস। তিনি বলেন, ‘বিয়ের পর থেকে প্রতিদিন সকালে পুজোর ফুল নিয়ে আসতেন দিলীপ। মৃত্যুর দিনের আগ পর্যন্ত তাই করেছেন। আমি ঘরের দরজায় বসে থাকতাম কখন ফুল নিয়ে আসবেন, আর আমি পুজো দেবো। ২৮ বছরের সংসারে প্রতিদিন তাই করেছেন। হঠাৎ হারিয়ে গেলেন। কি করে ভুলি সেসব স্মৃতি। এখন তো প্রতিটি সকাল আমার কান্না দিয়ে শুরু হয়। ২৮ বছরের সংসারে কোনোদিন আমাদের ঝগড়া হয়নি। অথচ এখন কান্নায় দিন শুরু আর কান্নায় দিন শেষ হয়।’

রূপা দাস আরও বলেন, ‘ধর্মীয় উৎসব সবাই করুক। কিন্তু উৎসবে আমার মতো কারও সিঁদুর যেন না মোছে। সব ধর্মের বর্ণের মানুষ যেন মানুষ পরিচয়ে পরিচিত হয়। কোনও ধর্মের পরিচয় আগে নয়। যে স্বজন হারায় সে বোঝে হারানোর বেদনা কতটা তীব্র। কেউ যেন তার প্রিয়জনকে উৎসবে না হারায়। এটাই আমার চাওয়া।’

গত বছরের ১৩ অক্টোবর শহরের নানুয়ার দিঘির পাড়ের পূজামণ্ডপে হামলা, ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। মহাঅষ্টমীর দিনে এ হামলায় নগরের মনোহরপুর রাজ রাজেশ্বরী কালীবাড়ি মন্দিরের প্রধান ফটক বন্ধ করতে গিয়ে আঘাত পান দিলীপ কুমার। এতে প্রচুর রক্তক্ষরণ হয়। তাকে কুমিল্লা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। অবস্থার অবনতি হলে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ২১ অক্টোবর রাতে তিনি মারা যান। এ ঘটনায় ২৪ অক্টোবর রাতে দিলীপের স্ত্রী বাদী হয়ে ৫০-৬০ জনকে অজ্ঞাত আসামি করে হত্যা মামলা করেন।

এ বিষয়ে কোতোয়ালি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সহিদুর রহমান বলেন, ‘দিলীপ হত্যা মামলার কয়েকজন আসামিকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এর মধ্যে কয়েকজন কারাগারে রয়েছেন। ঘটনার তদন্ত চলছে এখনও। অপরাধীদের আইনের আওতায় আনতে কাজ করছে পুলিশ।’

সূত্র: বাংলা ট্রিবিউন
আইএ/ ০৫ অক্টোবর ২০২২

Back to top button