পর্যটন

বগালেকে আকাশ-পাহাড় আর জলের মিতালি

অপু দত্ত

র্দীঘদিন ধরে কেওক্রাডং, বগালেক আর মুনলাইপাড়ায় বেড়াতে যাওয়ার প্রবল ইচ্ছে মনের মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছিলো। কর্ম ব্যস্ততার কারণে কোনোভাবে সেই সুযোগটা মিলছিলো না।

অবশেষে ব্যাটে বলে মিলে গেলো সেই কাঙ্ক্ষিত সুযোগ। চলতি বছরের ৪ সেপ্টেম্বর (শুক্রবার) দেখে এলাম পাহাড়ের ভাঁজে ভাঁজে লুকিয়ে থাকা সৌন্দর্য। পাহাড়ে যে কত রহস্য আর বিস্ময়ে ভরা থাকে তা দেখতে আর উপলব্দি করতে ওই জায়গাগুলোতে গেলেই বোঝা যায়। ছয়জনের একটি টিম নিয়ে শুক্রবার সকালে শুরু হয় আমাদের যাত্রা।

বান্দরবান বাসস্টেশন থেকে একটি জিপ ভাড়া করে দুই ঘণ্টার যাত্রায় প্রথমে গেলাম রুমা উপজেলায়। ওই এলাকায় পৌঁছানোর পর প্রথমে নিরাপত্তা বাহিনীর কাছে জাতীয় পরিচয়পত্রের ফটোকপিসহ আপনাকে বিস্তারিত তথ্য দিতে হবে। সবকিছুই আপনার নিরাপত্তার স্বার্থে। পুরো কাজটিতে আপনাকে গাইড সহযোগিতা করবে। বলে রাখি এসব স্পটে যেতে হলে আপনাকে অবশ্যই গাইড নিতে হবে।

প্রয়োজনীয় কাজ সেরে আমরা রওয়ানা হলাম বগালেকের দিকে। জিপে করে প্রায় ১৭ কিলোমিটারের যাত্রাপথ। পথে বেশ কয়েকটি জায়গায় নিরাপত্তা বাহিনীকে আমাদের তথ্য দিতে থামতে হয়েছে। সবুজের কোল আর পাহাড়ের বুকে পিচঢালা পথ ধরে অকৃত্রিম সৌন্দর্য উপভোগ করতে করতে কখন যে বগালেকে পৌঁছে যাবেন টেরই পারবেন না। তবে, বগালেকের শেষ খাঁড়া পাহাড়টিতে ওঠতে আপনার বুক কেঁপে উঠবে নিশ্চিত। বগালেকে পৌঁছে প্রথমে আপনাকে স্থানীয় সেনাবাহিনীর ক্যাম্পে রিপোর্ট করতে হবে। তারপর… বগালেক আপনার!

বান্দরবান থেকে বগালেক পর্যন্ত প্রায় ৮৭ কিলোমিটারের যাত্রা পথ। সময় সব মিলে সাড়ে তিন ঘণ্টা লাগবে। আর এ লম্বা সময় জার্নি শেষে যখন আপনার চোখের সামনে প্রত্যাশিত বগালেক তখন উচ্ছ্বসিত হওয়াটা স্বাভাবিক। সেখানকার আর্মি ক্যাম্প পাহাড় থেকে পুরো লেকটি দেখে আপনার চোখ ও মন জুড়িয়ে যাবে। আর বলতে থাকবে এত সুন্দর! আগে কেনো আসিনি। চারদিকে সবুজ আর পাহাড়ে ঘেরা মাঝখানে প্রাকৃতিকভাবে সৃষ্ট জলাধার বগালেক। ইচ্ছে করবে এখনি নেমে লেকের পানিতে দাপাদাপি করি। এ যেন নীল আকাশ-পাহাড় আর জলের মিতালী। প্রকৃতিও ঢেলে দিয়েছে একরাশ সবুজের ছোঁয়া!

সরকারি তথ্য বাতায়ন বলছে, রুমা উপজেলার রেমাক্রি প্রাংসা ইউনিয়নে দুই হাজার ৭শ ফুট উঁচু পাহাড় চূড়ায় অবস্থিত লেকটি। প্রায় ১৫ একরের এই লেকের গঠন শৈলী দেখে মৃত আগ্নেয়গিরির জ্বালামুখ বলে ধারণা করা হয়। বাংলাদেশের সর্বোচ্চ উচ্চতার সাধু পানির হৃদ এটি। অবশ্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. শহীদুল ইসলাম ২০০৫ সালে প্রথম বগালেকের পরিমাপ করেন। তার দাবি অনুযায়ী বগালেকের উচ্চতা এক হাজার ৭৩ ফুট এবং গভীরতা ১১৫ ফুট।

এত পাহাড়ের উঁচুতে কিভাবে হলো ওই জলাধার! কৌতূহল হলো জানবার। সেই আগ্রহ থেকেই খোঁজ নেওয়া। রহস্যঘেরা ওই লেকটির সৃষ্টি নিয়ে রয়েছে নানা গল্প। তারমধ্যে উল্লেখযোগ্য ‘ড্রাগন হত্যা’।

এ বিষয়ে স্থানীয় সাংবাদিক ও পর্যটক সহযোগী পানুয়াম বম বলেন, স্থানীয়দের ভাষ্য মতে বহু বছর আগে বগালেক এলাকায় প্রায় ৬০ পরিবার মুরং (ম্রো) সম্প্রদায় বসবাস করতো। একটি ড্রাগন তাদের গৃহপালিত পশু মেরে খেয়ে নিতো। পরে স্থানীয়রা ড্রাগনটিকে হত্যা করে তার মাংস গ্রামবাসীর মধ্যে বিতরণ করে দেয়। ওই রাতেই স্থানীয় এক বৃদ্ধা স্বপ্নে দেখেন ‘ড্রাগন হত্যার’ কারণে গ্রামটি পানিতে তলিয়ে যাচ্ছে। পরের দিন সকাল হওয়ার আগেই তিনি গ্রামটি ছেড়ে চলে যান। সূর্য উঠার পর ম্রো সম্প্রদায়ের বসবাসকৃত এলাকাটি পানিতে তলিয়ে যায়। এর কারণে ওই লেকের সৃষ্টি।

ঘটনার মিল খুঁজে পাওয়া গেছে পাহাড়ের প্রবীণ সাংবাদিক চৌধুরী আতাউর রহমানের লেখাতেও। ১৯৮৩ সালে দৈনিক বাংলা পত্রিকায় ‘বগালেক’ নিয়ে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে এমনি ‘ড্রাগন হত্যার’ গল্পটি উঠে আসে।

লেকের রহস্য রয়েছে আরো! স্বাভাবিকভাবে বগালেকের পানি স্বচ্ছ নীল হলেও তিন থেকে চার বছর পর পর লেকের পানি ঘোল হয়ে যায়। রং অনেকটা কাদামাখা পানির মতন ঘোলাটে। তিন থেকে চার দিন পানির রং ঘোলাটে থাকার পর ফের স্বাভাবিক রংয়ে ফিরে আসে। তবে কেন এমন ঘটনা তা এখনো অজানা।

এখন ওই লেকের সৌন্দর্য পর্যটকরা উপভোগ করতে পারলেও লেকে নামার ক্ষেত্রে স্থানীয় প্রশাসনের রয়েছে ‘নিষেধাজ্ঞা’। এই সংক্রান্ত একটি নিষেধাজ্ঞার কাগজ আপনাকে রুমায় তথ্য দেওয়ার সময় পূরণ করতে হয়। যেখানে আপনি লেকে নামবেন না মর্মে অঙ্গীকার করা লাগে। যদিও নিষেধাজ্ঞা থাকলেও ঘাটের কাছে নেমে গোসল করা যায়। মূলত লেকের পানিতে নেমে পর্যটকসহ চারজনের মৃত্যু হওয়ার পর নিরাপত্তার স্বার্থে প্রশাসন এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

আর্মি ক্যাম্প থেকে একটু সামনে এগোলেই বগালেকের মূল গ্রাম দেখা যাবে। এখন প্রায় ৩৬টি বম পরিবার এখানে বসবাস করছে। ছোট্ট গ্রাম এবং লেকটিকে যেন সযত্নে আগলে রেখেছে বড় বড় পাহাড়গুলো। এখানে বিদ্যুৎ নেই। তাই সোলার প্যানেলই ভরসা। তবে মোবাইলের ব্যাটারি চার্জ দেওয়ার বিশেষ ব্যবস্থা রয়েছে সেখানে। রয়েছে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা।

ভ্রমণপিপাসুদের কাছে এখানকার পরিচিত নাম হলো লাল এং সিয়াম বম। সবাই ‘সিয়াম দিদি’ নামেই চেনে তাকে। আলাপকালে জানা গেলো, ২০০৪ সালের দিকে তিনিই প্রথম কটেজ নির্মাণ করেন। এখন এখানে তার ছয়টি কটেজ রয়েছে। মূলত মাটি থেকে ওপরে মাচাং করে বানানো ঘরটিকে এখানে ‘কটেজ’ বলা হয়। তিনি নিজে একটি দোকান চালান। পর্যটকরা তার কটেজের থাকার পাশাপাশি পাবেন খাবারের সুবিধাও।

ভরা পূর্ণিমাতে আমাদের সময় কাটে লেকের পাড়ে। সেখানে চলে আমাদের বারবিকিউর আয়োজন, মাথার ওপর পূর্ণিমার আলোতে কোলাহলমুক্ত বুনো প্রাণ প্রকৃতির শব্দ যেন বলে যায়…এইতো জীবন!

আডি/ ০৯ সেপ্টেম্বর

Back to top button