সচেতনতা

মুখ বাঁকা ও চোখ বন্ধ না হওয়া রোগের চিকিৎসা

ডা. মিল্টন রায়

আমাদের মস্তিষ্কে ১২ জোড়া ক্রেনিয়াল স্নায়ু আছে। প্রতিটিই নির্দিষ্ট কাজে নিয়োজিত। কার্যকারিতার ওপর ভিত্তি করে ক্রেনিয়াল স্নায়ু শ্রেণিবদ্ধ করা হয়। ১২ জোড়া স্নায়ুর দ্বিতীয় স্নায়ু চোখে দেখার কাজটি করে। ৩ থেকে ৭ নম্বর ক্রেনিয়াল স্নায়ু চোখ ও মুখের মাংসপেশির কার্যকারিতার সঙ্গে জড়িত। ওকুলোমটর স্নায়ু চোখের পলক পড়া এবং নড়াচড়া নিয়ন্ত্রণ করে। ট্রোক্লিয়ার স্নায়ু চোখের সামনে-পেছনে ও উপর-নিচ করা নিয়ন্ত্রণ করে। ট্রাইজেমিনাল স্নায়ু মুখ, গাল, স্বাদ এবং চোয়ালের নড়াচড়ায় সংবেদন বজায় রাখে। আবডুসেন্স স্নায়ু চোখ নাড়ানোর ক্ষমতা বজায় রাখে। ফেসিয়াল স্নায়ু মুখের অভিব্যক্তি এবং স্বাদ অনুভূতি নিয়ন্ত্রণ করে। কনট্রাল্যাটারাল সুপারনিউক্লিয়ার ক্ষত হলে মুখের একপাশে সমস্যা হয় কিন্তু চোখ স্বাভাবিক থাকে। ইপসিল্যাটারাল নিউক্লিয়ার অথবা ইনফ্রানিউক্লিয়ার ক্ষত হলে মুখের একপাশে ও একই পাশের চোখে সমস্যা হয়। দ্বিপার্শ্বিক নিউক্লিয়ার ক্ষত বা দ্বিপার্শ্বিক ইনফ্রানিউক্লিয়ার ক্ষত হলে মুখের দুপাশ ও চোখের দুইপাশে সমস্যা হয়। একই পাশের মুখের ও চোখের সমস্যার নাম বেলস পালসি। এটি হলো মুখের সাম্প্রতিক পক্ষাঘাত, যা মুখের গর্তের মধ্যে বা স্টাইলোমাস্টয়েড ফোরামেনে মুখের স্নায়ুর প্রদাহ এবং ফোলা। বেল পালসি সাধারণত একপার্শ্বিক হয়। খুবই কম পরিমাণে দ্বিপার্শ্বিক হয় এবং পুনরাবৃত্তি হতে পারে। কিছু ক্ষেত্রে পারিবারিক ইতিহাসও থাকে। মূল কারণ অনিশ্চিত। তবে ভাইরাল সংক্রমণের কারণে হতে পারে। যেমন- হারপিস সিমপ্লেক্স।, ভাইরাল ইনফেকশন, মধ্য কর্ণে ইনফেকশন, ঠাণ্ডাজনিত কারণে (অতিরিক্ত ঠাণ্ডা ফ্রিজের পানি, শীতের সময় মোটরসাইকেল চালানো, শীতের মধ্যে পানিতে নেমে সারারাত মাছ ধরা ইত্যাদি), আঘাতজনিত কারণে, মস্তিষ্কের স্ট্রোকজনিত কারণে, কানের অপারেশন পরবর্তী ফেসিয়াল নার্ভ ইনজুরি ইত্যাদি কারণে হতে পারে। বেলস পালসি হঠাৎ করে হয়। এর সঙ্গে স্ট্রোকের মিল থাকলেও দুটো আলাদা। স্ট্রোক হলে শরীরের যে কোনো একদিক পুরোটা আক্রান্ত হয়, অর্থাৎ হাত-পা অবশ হয়ে আসে। বেলস পলসির ক্ষেত্রে শুধু চোখ ও মুখের এক পাশ আক্রান্ত হয়।

উপসর্গ : স্বাদের দুর্বলতা, কানে সাধারণ শব্দ সহ্য করতে না পারা, লালা প্রদাহ হওয়া ইত্যাদি। চোখ দিয়ে পানি পড়া কম হয়। কুলি করতে গেলে অন্যপাশে চলে যায় বা পড়ে যায়। খাবার গিলতে কষ্ট হয়। কপাল ভাঁজ করতে বা ভ্রু কোঁচকাতে পারে না। অনেক সময় কথা বলতে কষ্ট হয়। পানি পান করতে কষ্ট হয়। চোখ বন্ধ করে দাঁত দেখানোর চেষ্টা করার সময় এক চোখ বন্ধ হয় না এবং চোখের গোলা উপরের দিকে এবং বাইরের দিকে ঘোরে।

পরীক্ষা : সিটি স্ক্যান, কমপ্লিট ব্লাড কাউন্ট, এক্স-রে অব টেম্পরো-মেন্ডিবুলার জয়েন্ট, ইএমজি, নার্ভ কন্ডাকশন ভেলোসিটি ইত্যাদি।

চিকিৎসা : কানের পেছনে ব্যথার তীব্রতায় মুখের দুর্বলতা দেখা যায়, যা ৪৮ ঘণ্টা ধরে বিকাশ লাভ করে। ৪৮ ঘণ্টা থেকে সারতে শুরু করে এ রোগ। অধিকাংশ মানুষের ২-৩ সপ্তাহের মধ্যে সেরে যায়। কারও কারও সারতে ছমাস লাগে এবং ছয়মাসের মধ্যে সারবেই। রোগী পুরোপুরি সুস্থ হয়ে ওঠে। তবে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া ভালো। বেশির ভাগ চিকিৎসক অ্যান্টিবায়োটিক বা স্টেরয়েডের সঙ্গে ফিজিওচিকিৎসা নিতে পরামর্শ দিয়ে থাকেন।

ফিজিওথেরাপি : ফিজিওথেরাপিস্টরা দুভাবে চিকিৎসা প্রদান করেন- ইলেকট্রোথেরাপি বা মেকানিকাল থেরাপি এবং ম্যানুয়াল থেরাপি ব্যায়াম চিকিৎসা। এসব থেরাপি যথাযথভাবে প্রয়োগ করা সম্ভব হলে বেল পালসি থেকে দ্রুত মুক্তি পাওয়া যায়।

আইএ

Back to top button