জাতীয়

প্রক্রিয়াজাত খাবারে লবণের আধিক্যে বাড়ছে স্বাস্থ্যঝুঁকি

ঢাকা, ২৯ সেপ্টেম্বর – দেশের বাজারে বিপণন করা প্রক্রিয়াজাত প্যাকেট খাবারের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ বা ৬১ শতাংশে নিরাপদ মাত্রার চেয়ে বেশি লবণ পাওয়া গেছে। যেখানে প্রতি ১০০ গ্রাম খাবারে সর্বোচ্চ ৭৫০ মিলিগ্রাম পর্যন্ত লবণ স্বাস্থ্যের জন্য নিরাপদ; সেখানে এসব খাবারে নিরাপদ মাত্রার চেয়ে বেশি লবণ পাওয়া গেছে। এসব প্যাকেটজাত খাবারের মধ্যে রয়েছে বিস্কুট, চিপস, চানাচুর, নুডলস, ইনস্ট্যান্ট স্যুপ, ঝালমুড়ি, আচার, চাটনি ইত্যাদি।

এমনকি এসব প্যাকেটজাত খাবারের ৩৪ শতাংশ খাবারে নিরাপদ মাত্রার দ্বিগুণ অর্থাৎ ১ দশমিক ৫ গ্রামের বেশি লবণ পাওয়া গেছে।

ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন অব বাংলাদেশ পরিচালিত ‘অ্যাসেসমেন্ট অব সল্ট কন্টেন্ট অ্যান্ড লেবেল কমপ্লায়েন্স অব কমনলি কনজিউমড প্রসেসড প্যাকেজড ফুডস অব বাংলাদেশ’ শীর্ষক এক গবেষণায় এ তথ্য উঠে এসেছে।

গতকাল বুধবার রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে একটি সেমিনারে যুক্তরাষ্ট্রের রিজলভ টু সেইভ লাইভস সহায়তায় সম্পাদিত এই গবেষণার ফল প্রকাশ করা হয়। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন হার্ট ফাউন্ডেশনের উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ গবেষণা সমন্বয়ক ডা. আহমেদ খাইরুল আবরার।

অনুষ্ঠানে হার্ট ফাউন্ডেশনের রোগতত্ত্ব গবেষণা বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. সোহেল রেজা চৌধুরী বলেন, ‘আমাদের জীবনযাত্রায় প্রচুর পরিমাণ প্রক্রিয়াজাত খাবারের সম্পর্ক রয়েছে, যেখানে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান লবণ। এর অতিরিক্ত ব্যবহার আমাদের স্বাস্থ্যের জন্য খুবই ক্ষতিকর। এ কারণে সরকারসংশ্লিষ্ট নীতিনির্ধারকদের মধ্যে বিষয়টি তুলে ধরার চিন্তা নিয়েই এই গবেষণা।’

এ ব্যাপারে বাংলাদেশ ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশনের গবেষণা সমন্বয়কারী ডা. শেখ মো. মাহবুবুস সোবহান দেশ রূপান্তরকে বলেন, লবণ বেশি খেলে উচ্চ রক্তচাপ হয়। উচ্চ রক্তচাপ হার্টের ক্ষতি করে, স্ট্রোক হয় ও কিডনি নষ্ট করে। গ্রহণযোগ্য মাত্রার চেয়ে বেশি লবণ খেলে মূলত এই তিন রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি। এ ছাড়া দেশে নারীদের বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে যে হাড় ক্ষয় দেখা দেয়, সেটার জন্য বেশি লবণ খাওয়ায় দায়ী।

এই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ও গবেষক বলেন, ‘আমাদের দেশে এই প্রক্রিয়াজাত প্যাকেট খাবারের প্রবণতা দিন দিন বাড়ছে। তাই লবণের ব্যাপারে সবাইকে সতর্ক হতে হবে।’

এই গবেষক জানান, হার্টের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ যেসব কারণ, সেগুলো নিয়ে আমরা গবেষণা করি। গত বছরের জুলাই থেকে এ বছরের জুলাই পর্যন্ত পুরো এক বছর এই গবেষণা করেছি। গবেষণাটিতে বাজারে বহুল প্রচলিত ১০৫টি ব্র্যান্ডের চানাচুর, নুডলস, ইনস্ট্যান্ট স্যুপ, ঝালমুড়ি, লজেন্স, আচার-চাটনি, চিপস, ডালবুট, সস্, বিস্কুট, পাউরুটি, কেক, কোমল পানীয় ও ফ্রুট ড্রিঙ্কসের নমুনা পরীক্ষা করে এই ফল পাওয়া গেছে।

সব খাবারেই দ্বিগুণের বেশি লবণ: গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, বহুল প্রচলিত চানাচুর, নুডলস, ইনস্ট্যান্ট স্যুপ ও ঝালমুড়ির কোনোটিতেই নির্ধারিত মাত্রার লবণ পাওয়া যায়নি, বরং এগুলোতে দ্বিগুণের বেশি লবণ রয়েছে। একইভাবে বাজারে বিক্রি হওয়া আচার ও চাটনির ৮৩ শতাংশে, চিপসের ৬৩ শতাংশে এবং ডাল-বুট ভাজার ৬০ শতাংশে দ্বিগুণ লবণ রয়েছে। তবে চিপস, ডাল-বুটের একটিতেও নির্ধারিত মাত্রার লবণ নেই।

মোড়কে ভুল তথ্য: গবেষণায় বলা হয়েছে, মূলত বাংলাদেশে সরকারিভাবে প্রক্রিয়াজাত খাবারে লবণের সর্বোচ্চ কোনো সীমা নির্ধারণ করা নেই। যার ফলে কোম্পানিগুলো তাদের পণ্যে ইচ্ছেমতো লবণ যোগ করে। যদিও মোড়কাবদ্ধ খাদ্য লেবেলিং প্রবিধানমালা ২০১৭ অনুসারে, প্রক্রিয়াজাত খাবারে বিদ্যমান লবণের পরিমাণ মোড়কের লেবেলে উল্লেখ করা বাধ্যতামূলক। কিন্তু গবেষণায় প্রায় অর্ধেক বা ৪৪ শতাংশ খাবারের মোড়কে উল্লিখিত পরিমাণের চেয়ে বেশি লবণ পাওয়া গেছে। লবণের পরিমাণের সঠিক তথ্য পাওয়া গেছে ২৭ শতাংশ মোড়কে ও ৯ শতাংশ মোড়কে লবণের কোনো তথ্যই পাওয়া যায়নি।

৯৭% মানুষ এই খাবার খাচ্ছে: গবেষণায় দেখা গেছে, দেশের ৯৭ শতাংশ মানুষই এ জাতীয় খাবার খেয়ে থাকে। গড়ে এক ব্যক্তি সপ্তাহে ১৫ বার অর্থাৎ দিনে ২ বারের বেশি এসব খাবার গ্রহণ করেন। আর অত্যধিক লবণ গ্রহণের ফলে উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ, স্ট্রোক ও কিডনি রোগের ঝুঁকি অনেক বেড়ে যায়।

শিশুরা বেশি খায় বিস্কুট, কম ঝালমুড়ি: গবেষণায় বলা হয়েছে, বাজারের প্রক্রিয়াজাত প্যাকেট খাবারের মধ্যে শিশুরা সবচেয়ে বেশি খায় বিস্কুট, ৮৭ শতাংশ এবং কম খায় ঝালমুড়ি, ২৩ শতাংশ। এ ছাড়া ৮১ শতাংশ চকলেট, ৭৮ শতাংশ চিপস, ৬৮ শতাংশ নুডলস, ৬৫ শতাংশ চানাচুর, ৬০ শতাংশ কেক, ৪৩ শতাংশ বাদাম-বুট, ৩৯ শতাংশ ব্রেড, ৩৬ শতাংশ আচার-চাটনি, ৩১ শতাংশ সস, ৩০ শতাংশ সফট ড্রিঙ্কস ও ২৫ শতাংশ ফ্রুট ডিঙ্কস খায় শিশুরা।

বাজারে বিক্রি হওয়া এসব খাবারের মধ্যে সবচেয়ে বেশি খাওয়া হয় বিস্কুট, যা মোট খাবারের ৭৮ শতাংশ ও কম ফ্রুট ড্রিঙ্কস, ১০ শতাংশ। এ ছাড়া চানাচুর ৫৩ শতাংশ, নুডলস ৫২ শতাংশ, চকলেট ৪৬ শতাংশ, চিপস ৪৫ শতাংশ, কেক ৪২ শতাংশ, ব্রেড ৩১ শতাংশ, সফট ড্রিঙ্কস ২৯ শতাংশ, বুট-বাদাম ২৮ শতাংশ, সস ২৬ শতাংশ, আচার-চাটনি ২৪ শতাংশ ও ঝালমুড়ি ২৩ শতাংশ খাওয়া হয়।

বেশি খায় শিশুরা ও মেট্রোপলিটনে: বাজারে বিক্রি হওয়া প্রক্রিয়াজাত প্যাকেট খাবার বেশি খায় শিশুরা, ২১ শতাংশ। এরপর কিশোর-কিশোরীরা খায় ১৬ শতাংশ ও পূর্ণ বয়স্করা ১১ শতাংশ। বেশি খায় পুরুষ ১৫ শতাংশ ও নারী ১৪ শতাংশ। মেট্রোপলিটন এরিয়ায় খায় ১৭ শতাংশ, শহরাঞ্চলে ১৫ শতাংশ ও গ্রামে ১১ শতাংশ মানুষ।

সূত্র: দেশ রূপান্তর
আইএ/ ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২২

Back to top button