অপরাধ

এক ব্যক্তির নামে প্রতারণার যত অভিযোগ

আবুল কালাম মুহম্মদ আজাদ

রাজশাহী, ২৯ সেপ্টেম্বর – এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে ব্যাংক, মেডিকেলসহ বিভিন্ন সংস্থায় চাকরি ও নিজের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে অংশীদার বানানোর নামে টাকা নিয়ে প্রতারণার অভিযোগ পাওয়া গেছে। ওই ব্যক্তি নিশ্চয়তাস্বরূপ ৩০০ টাকার স্ট্যাম্পে চুক্তি করেই টাকা নেন। নিজের স্বাক্ষরিত নিয়োগপত্র দেন। চাকরি দিয়ে প্রতারণার অভিযোগে ওই ব্যক্তির বিরুদ্ধে ২৫ সেপ্টেম্বর রাজশাহীর বোয়ালিয়া আমলি আদালতে একটি মামলা হয়েছে। একই দিন ব্যাংকে চাকরি দেওয়ার নামে টাকা নেওয়ার অভিযোগে তাঁকে একটি উকিল নোটিশ পাঠানো হয়েছে।

অভিযুক্ত ব্যক্তির নাম রনি রাজ হোসেন (৩৬)। তাঁর বাবার নাম আবদুল মজিদ। রনি রাজশাহীর ঘোড়ামারা এলাকার সাগরপাড়া কিচেন বাজার গলির বাসিন্দা। ফেসবুকে রনির পরিচয়ের তালিকা আরও লম্বা। মো. রনি রাজ নামের ফেসবুক আইডিতে তিনি নিজেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রভাষক হিসেবে পরিচয় দিয়েছেন। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম উল্লেখ নেই। এ ছাড়া তিনি আল নূর ডায়াগনস্টিক কমপ্লেক্সের পরিচালক, রাজশাহী আইন ও মানবাধিকার সুরক্ষা ফাউন্ডেশনের জেলা সভাপতি, গ্লোরিয়াস ইন্টারন্যাশনাল, নিউ টাইমস ল্যাবরেটরিজ স্কুল এবং ফুড ক্রাশ চাইনিজ রেস্টুরেন্টের মালিক, নিউ টাইমস গ্রুপের চেয়ারম্যান হিসেবে তাঁর পরিচয় উল্লেখ করেছেন।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, আল নূর ডায়াগনস্টিক কমপ্লেক্সের একটি ব্যানার রাজশাহী নগরের লক্ষ্মীপুরে টানানো রয়েছে। তবে এই নামে কোনো প্রতিষ্ঠান নেই। রাজশাহী আইন ও মানবাধিকার সুরক্ষা ফাউন্ডেশনের ফোন নম্বরে যোগাযোগ করলে বলা হয়, রনি রাজ নামে কেউ তাঁদের সভাপতি নন। তাঁর মালিকানাধীন অন্যান্য প্রতিষ্ঠানেরও কোনো অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি।

২৫ সেপ্টেম্বর রাজশাহীর পুঠিয়া উপজেলার পচামাড়িয়া গ্রামের যুবক আক্তারুজ্জামান ওরফে প্রিন্স আদালতে রনির বিরুদ্ধে মামলা করেন। মামলায় রনির স্ত্রী আতিকা খাতুন ও নুরুল ইসলাম নামের আরেক সহযোগীকে আসামি করা হয়েছে। আদালত মামলাটি আমলে নিয়ে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনকে (পিবিআই) তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন।

মামলার আরজিতে বলা হয়েছে, আক্তারুজ্জামানকে নিউ টাইমস গ্রুপের সিইও ও এমডি পদে নিয়োগপত্র দেওয়া হয়েছে। চাকরির সঙ্গে ব্যবসার ২৫ শতাংশ লভ্যাংশ দেওয়ার ঘোষণা দিয়ে ২০২০ সালের ৮ আগস্ট নিয়োগপত্র দেওয়া হয়। মামলার বাদী বলেন, তিনি নিয়োগপত্র পেলেও যোগদান করার জন্য এ নামে কোনো প্রতিষ্ঠান পাননি। পরে তাঁকে রাজশাহী নগরের অলকার মোড়ে ড্রিম ক্যাফের (বর্তমান নাম রংধনু রেস্তোরাঁ) ব্যবস্থাপকের দায়িত্ব দেওয়া হয়। সেখানে প্রায় পাঁচ মাস চাকরি করলেও তাঁকে কোনো বেতন দেওয়া হয়নি। ব্যবসার লভ্যাংশও দেওয়া হয়নি। টাকা না দেওয়ার কারণে তিনি ২০২১ সালের ২ সেপ্টেম্বর লিখিতভাবে ওই চাকরি ও ব্যবসা থেকে অব্যাহতি নেন। বেতন হিসেবে তাঁর প্রাপ্য ৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা চাইতে গেলেই তাঁকে হুমকি–ধমকি দিতে থাকেন।

রনি রাজ হোসেনের প্রতারণার শিকার আরেকজন হলেন নওগাঁর নিয়ামতপুর উপজেলার গোলাম রাব্বানী। তাঁকে ২০২০ সালের ১৭ আগস্ট নিয়োগপত্র দেওয়া হয়। তাঁর আইনজীবী শুয়াইব আক্তার ২৫ সেপ্টেম্বর রনিকে উকিল নোটিশ পাঠিয়েছেন। এতে বলা হয়েছে, আজিজ কো-অপারেটিভ কমার্স অ্যান্ড ফাইন্যান্স ব্যাংক লিমিটেডের (এসিসিএফ) চাটমোহর পাবনা শাখায় গোলাম রাব্বানীকে সিনিয়র অফিসার পদে চাকরি দেওয়ার জন্য ৩০০ টাকার নন–জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে চুক্তি করা হয়। জামানতস্বরূপ গোলাম রাব্বানীর কাছ থেকে ২ লাখ ৫০ হাজার টাকা নেওয়া হয়। গোলাম রাব্বানী যোগদান করতে গিয়ে এ নামে কোনো প্রতিষ্ঠান খুঁজে পাননি। পরে টাকা ফেরত চাইলে রনি তাঁকে নানাভাবে হয়রানি করেন।

উকিল নোটিশে আগামী ১৫ দিনের মধ্যে টাকা ফেরত দিতে বলা হয়েছে। অন্যথায় তাঁর বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। এর আগে তিনি নগরের বোয়ালিয়া থানায় একটি অভিযোগ করেছিলেন। নগরের মালোপাড়া তদন্ত ফাঁড়ির ইনচার্জ হায়দার আলীর মধ্যস্থতায় একটি সালিস হয়েছিল।

একইভাবে ২০২০ সালের ১৮ জুলাই রাজশাহী নগরের রাজপাড়া থানার এলাকার বাসিন্দা বাসিতুজ্জামানকে একই প্রতিষ্ঠানে নিয়োগপত্র দিয়ে ৩ লাখ টাকা নেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। বাসিতুজ্জামান ওই প্রতিষ্ঠানে যোগদান করতে গিয়ে প্রতিষ্ঠানের কোনো অস্তিত্ব পাননি। এ নিয়ে ২০২১ সালের ১ সেপ্টেম্বর রাজশাহী মহানগরের ২০ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলরের কার্যালয়ে এক সালিস হয়। সেখানে রনি তিন লাখ টাকা ফেরত দিতে বাধ্য হন। প্রতারণার মাধ্যমে টাকা নেওয়ার বিষয়টি সালিসনামায় উল্লেখ করা হয়েছে।

আরেক ভুক্তভোগী নওগাঁর মুস্তাকিম হোসেন অভিযোগ বলেন, ২০২১ সালের ১৮ মার্চ রনি তাঁকে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ওয়ার্ড বয় পদে নিয়োগপত্র দেন। নিয়োগপত্রে ‘লেটার’ বানান ভুল দেখেই তাঁর সন্দেহ হয়। পরে তিনি খোঁজ নিয়ে জানতে পারেন, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এ পদে তাঁকে নিয়োগ দেয়নি। তাঁর সঙ্গে তিন লাখ টাকা চুক্তিতে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। পরে তাঁকে কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের ‘ইলেকট্রিশিয়ান’ পদে নিয়োগপত্র দেওয়া হয়। তিনি যোগাদান করতে গিয়ে জানতে পারেন, ওই নিয়োগপত্রও ভুয়া। তিনি এক মধ্যস্থতাকারীর হাতে টাকা দিয়েছিলেন। পরে অর্ধেক টাকা ফেরত পেয়েছেন। এখনো বাকি টাকার জন্য ঘুরছেন।

এ ব্যাপারে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে রনি রাজ বলেন, ‘ফোনে নয়, সামনাসামনি একদিন বসে আপনাকে সব অভিযোগ খণ্ডন করে দেব।’

পরে গতকাল মঙ্গলবার সন্ধ্যায় রনি রাজ বেশ কিছু কাগজপত্র এই প্রতিবেদককে দেখান। এ সময় রনি একটি ব্যাংক জমার রসিদ দেখান। ওই রসিদে দেখা যায়, আজিজ কো-অপারেটিভ কমার্স অ্যান্ড ফাইন্যান্স ব্যাংক লিমিটেডের চাটমোহর শাখায় গোলাম রাব্বানী নিজ সঞ্চয়ী অ্যাকাউন্টে আড়াই লাখ টাকা জমা দিয়েছেন। রাব্বানীর টাকা ব্যাংকেই আছে। কোনো টাকা নেননি বলে রনি দাবি করেন।
এরপর রনি মুঠোফোনের কিছু খুদে বার্তা দেখান, যেগুলো গোলাম রাব্বানী ও আক্তারুজ্জামান ওরফে প্রিন্সকে প্রায় তিন লাখ টাকা দেওয়ার প্রমাণপত্র বলে তিনি দাবি করেন।

তবে চাটমোহরে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, চাটমোহরে এ ধরনের ব্যাংকের কোনো শাখা নেই। রেজাউল করিম দুলাল নামের স্থানীয় এক ব্যক্তি বলেন, চার বছর আগে তাঁর বাসায় ওই নামে একটি ব্যাংকের জন্য ভাড়া নিয়েছিল। ব্যাংকটি খোলার পর ৮ থেকে ৯ মাস চালু ছিল। তারপর তাঁরা বাসাভাড়া ও আমনতের তিন লাখ টাকা মেরে পালিয়ে গেছেন। এ ছাড়া এলাকার অনেক লোকেরও টাকা মেরে দিয়েছে। ওই ব্যাংকের এখন আর কোনো অস্তিত্ব নেই।

সূত্র: প্রথম আলো
আইএ/ ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২২

Back to top button