মুক্তিযুদ্ধ

একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে গুজবের ভূমিকা

চৌধুরী শহীদ কাদের

নি:সন্দেহে বাংলা ও বাঙালি জাতিরাষ্ট্রের ইতিহাসে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ সবচেয়ে বড় ঘটনা। সেই ঘটনা নানাভাবে প্রভাবান্বিত হয়েছিল রটনা তথা গুজব দ্বারা। প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে রণাঙ্গন, অবরুদ্ধ বাংলাদেশ কিংবা এক কোটি শরণার্থীর আশ্রয়স্থল মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম মিত্র ভারত, প্রভাবিত হয়েছিল সেইসব গুজব কিংবা রটনা দ্বারা।

আন্দোলিত হয়েছিল আন্তর্জাতিক জনমতও, মুক্তিবাহিনীর হাতে পাকিস্তানি বাহিনী ও রাজাকারদের নাস্তানাবুদ হওয়ার নানা গুজবে সয়লাব ছিল একাত্তর। মানুষের মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়েছিল মুক্তিবাহিনীর কাল্পনিক নানা বীরত্ব। এগুলো একদিকে পাকিস্তান বাহিনীর মনে ভীতির সঞ্চার করে, অন্যদিকে সাধারণ মানুষের মনোবল বৃদ্ধিতে সহায়ক ভূমিকা নেয়। ঢাকা, চট্টগ্রামসহ সমগ্র বাংলাদেশ, ভারতের শরণার্থী অধ্যুষিত পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরা, আসাম পরিণত হয়েছিল গুজবের নগরীতে। মুক্তিযুদ্ধের সময়ে ভারতীয় গণমাধ্যম ও অবরুদ্ধ বাংলাদেশ থেকে প্রকাশিত পত্র-পত্রিকা সেইসব গুজবের পালে হাওয়া দিয়েছিল। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে প্রচারিত চরমপত্রে সেই সব গুজবের রসাত্মক প্রচারণা নতুন মাত্রা দেয় মুক্তিযুদ্ধকে, আকাশবাণীর সংবাদেও প্রকাশ পেয়েছে নানা কল্পিত কাহিনী।

গাছের মতো গুজবের ডালপালা গজায় খুব দ্রুত। আর সেই গুজব চর্চাকারী যদি বাঙালি হয়, তাহলে ডালপালা ছড়াতে খুব বেশি সময় লাগে না। আর গুজব নিয়ে প্রাচীনতম গল্পটা হয়তো অনেকেই জানেন। রানি মা মৃত যমজ সন্তান প্রসব করেছেন। গুজবের ডালপালায় ভর করে দূরতম প্রজার কাছে এই সংবাদ এইভাবে পৌঁছালো যে রানিমা এক জোড়া কালো কাক প্রসব করেছেন! প্রসবের পরপরই ওড়ার চেষ্টা করায় কাক দুটির মৃত্যু হয়েছে। কালো সেই কাক দেখার জন্য প্রজারা দলে দলে ভিড় জমাতে লাগলো রাজমহলের আশেপাশে।

গুজবকে শিল্পে অন্তর্ভূক্ত করার দাবি উঠতে পারে যখন তখন। ইংল্যান্ড ও ইউরোপের দেশগুলোতে গুজবকে নিয়ে অনেক গবেষণা চলে। একবার ইংল্যান্ডের এক বিশ্ববিদ্যালয়ে বিজ্ঞানী রবার্ট ন্যাপের নেতৃত্বে রিউমার ইঞ্জিনিয়ারিং ডিপার্টমেন্ট খোলা হয়েছিল। গুজবের ডালপালা বা পাখা সবচেয়ে গতিশীল। হিটলারকে নিয়ে অনেক গুজব প্রচলিত ছিল। যেমন, প্রথম মহাযুদ্ধে হিটলার নাকি আহত হয়েছিলেন এবং তার একটি অণ্ডকোষ কেটে ফেলতে হয়েছিল। আত্মহত্যা করার আগে পর্যন্ত তিনি নাকি এভাবেই বেঁচে ছিলেন। সবচেয়ে বেশি প্রচলিত গুজব ছিল ক্রিকেট নিয়ে। হিটলার দ্রুত গাড়ি চালানো পছন্দ করতেন। গাড়িতে যাওয়ার সময় দেখলেন লোকজন স্টেডিয়ামে ভিড় করে আছে। দ্বিতীয় দিন ভিড় দেখে জানতে চাইলেন কী হচ্ছে? ড্রাইভার বললো, টেস্ট ক্রিকেট। তৃতীয় এবং চতুর্থ দিন স্টেডিয়ামে ভিড় দেখে হিটলার খুব ক্ষেপে গেলেন। পঞ্চম দিন জানতে চাইলেন- খেলার ফলাফল কী? ড্রাইভার জানালো, টেস্ট ড্র হয়েছে। হিটলার চরম ক্ষেপে ঘোষণা দিলেন, যে খেলা পাঁচদিন খেলার পরও ড্র হয় সেই খেলা জার্মানিতে থাকবে না। মৃত্যুর পরেও গুজব হিটলারের পিছু ছাড়েনি। বলা হতো হিটলার আত্মহত্যা করেননি। তিনি আর্জেন্টিনা পালিয়ে গেছেন এবং সেখানে পঁচানব্বই বছর বয়সে মারা গেছেন!

বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করার পর এই দেশে সবচেয়ে বেশি গুজব ছড়িয়ে পড়েছিল। পরবর্তীকালে এসব গুজবের সত্যতা মেলেনি। আজও কেউ কেউ অর্বাচীনের মতো এসব নিয়ে প্রশ্ন তোলে। বাংলাদেশে যত গুজব প্রচলিত আছে তার ভেতর চাঁদনির্ভর গুজব খুব শক্তিশালী। যেমন নীল আর্মস্ট্রং চাঁদে নামার পর নাকি দেখতে পেয়েছিলেন যে চাঁদ দ্বিখণ্ডিত, পরে তিনি ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন। এই গুজব ছিল বড় ধরনের মিথ্যা প্রচারণা। ২০১৩ সালে বাংলাদেশের সেরা গুজব ছিল চাঁদে জামায়াত নেতা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে দণ্ডপ্রাপ্ত দেলোয়ার হোসেন সাঈদীর ছবি দেখা গেছে। চট্টগ্রামের সাতকানিয়ার এক মসজিদ থেকে এই ঘোষণা দেওয়া হয়।

সাতকানিয়ার বোয়ালিপাড়া, সামিয়ারপাড়া, খলিফাপাড়াসহ কয়েক গ্রামে এই ঘোষণা ছড়িয়ে পরে। লোকজন বেরিয়ে আসে এবং পুলিশের সঙ্গে তাদের সংঘর্ষ বেধে যায়। এরপর সাতক্ষীরা থেকে শুরু করে আরও কয়েক জায়গায় এই গুজব ছড়ানো হয়। ফলাফল, এক শ্রেণির উত্তেজিত মানুষের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ এবং কমপক্ষে ষাট-সত্তর জন মানুষ নিহত হয়। ডাকাত পড়েছে বলে মসজিদের মাইক থেকে ঘোষণা দেওয়া এবং মানুষকে পিটিয়ে মেরে ফেলার পর জানা গেলো- ‘গুজব’। এমন ঘটনাও প্রচুর ঘটেছে।

গুজবকে কাব্যময়তায় তুলে ধরেছেন কবি শামসুর রহমান। লিখেছেন,

‘এই নিয়েছে ঐ নিল যাঃ! কান নিয়েছে চিলে,

চিলের পিছে মরছি ঘুরে আমরা সবাই মিলে।’

(পণ্ডশ্রম)

গুজব সয়লাব ছিল একাত্তর। আকাশে-বাতাসে ছড়িয়ে পড়েছিল নানা গুজব। তবে একাত্তরে বাজারে যেসব গুজব ছড়িয়ে পড়েছিল, ছড়িয়ে পড়েছিল রটনা, প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সেগুলো প্রভাবিত করেছিল যুদ্ধের গতি প্রকৃতিকে, তাই স্বভাবতই এই গুজব ইতিহাসের অংশ। মুক্তিযুদ্ধের সূচনার প্রথম গুজবটির জন্ম হয়েছিল ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণকে ঘিরে। তুলে ধরছি সেসব গুজবের কয়েকটি।

গুজবের ৭ মার্চ
বাঙালী জাতির স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে ৭ মার্চ এক ঐতিহাসিক অবিস্মরণীয় দিন। শেরেবাংলা নগরে অবস্থিত পাকিস্তানি বাহিনীর পূর্বাঞ্চলীয় সামরিক সদর দফতরের সবগুলো দূরপাল্লার কামান এবং মেশিনগানের নল তাক করে রাখা হয়েছিল রমনা রেসকোর্সের দিকে।

উত্তাল জনসমুদ্রের মাথার ওপর দিয়ে চক্কর দিচ্ছিল সামরিক জান্তার হেলিকপ্টার। ৬ মার্চ মধ্যরাতে পূর্বাঞ্চলীয় সদর দপ্তরের কর্মকর্তারা আওয়ামী লীগ হাইকমান্ডকে তীব্র হুমকি দিয়ে জানিয়েছিল, ‘যদি কাল রমনা রেসকোর্স ময়দান থেকে স্বাধীনতার একতরফা ঘোষণা দেয়া হয়- তাহলে জেনারেল অফিসার কমান্ডিংয়ের সব ট্যাঙ্ক, আর্টিলারি, মেশিনগান দিয়ে হত্যা করা হবে জনসভার সবাইকে- প্রয়োজনে ঢাকা শহরকে মাটিতে মিশিয়ে দেওয়া হবে। এসব ভয়ভীতি এবং হুমকিকে উপেক্ষা করেই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের ডাকে সেদিন সকাল থেকেই জনতার অবিরাম ঢল নামে রমনা রেসকোর্স অভিমুখে। সারাদেশ থেকেও লঞ্চে, স্টিমারে, ট্রেনে, বাসে চড়ে ও পায়ে হেঁটে মানুষ ‘চলো, চলো- রেসকোর্স চলো’ স্লোগান দিয়ে ছুটে চলে ঢাকার দিকে। হাতে বাঁশের লাঠি, নৌকার বৈঠা, কারও হাতে লাঙল-জোয়াল, কারও হাতে স্বাধীন বাংলার নতুন পতাকা ও শহীদ স্মরণে কালোপতাকা, গামছায় বাঁধা চিড়া-মুড়ি নিয়ে লাখ লাখ মানুষ-আবাল-বৃদ্ধ-বনিতায় ভরে গেল ঘোড়দৌড় খেলার সেই বিশাল ময়দানটি। জনসমুদ্রের এই বিশাল ঊর্মিমালার একপ্রান্ত গিয়ে পৌঁছল ময়দান ছাড়িয়ে প্রেসক্লাব পয়েন্টে। আর অন্যপ্রান্ত গিয়ে ঠেকল শাহবাগ মোড় ছাড়িয়ে পাবলিক লাইব্রেরি ও ঢাকা আর্ট কলেজ পয়েন্ট পর্যন্ত।

জনতার এই বিশাল উত্থানে ভীতসন্ত্রস্ত পাকিস্তানি সামরিক জান্তা মহাসমাবেশ বানচালের জন্য নানা ষড়যন্ত্র এবং হুমকি-ধমকি ছাড়াও সকাল থেকেই ঢাকা শহরে কিছু পরিকল্পিত গুজবও ছড়াল। এর মধ্যে অন্যতম একটি গুজব ছিল রেসকোর্সে আসার পথেই কমান্ডো আক্রমণে হত্যা করা হবে শেখ মুজিবকে। মুহুর্মুহু গর্জনে ফেটে পড়ছে জনসমুদ্রের উত্তাল কণ্ঠ। স্লোগান গানের ঢেউ একের পর এক আছড়ে পড়ছে। লাখোকণ্ঠে এক আওয়াজ। বাঁধ না মানা দামাল হাওয়ায় সওয়ার লাখোকণ্ঠের বজ্রশপথ। হাওয়ায় পতপত করে উড়ছে পূর্ববাংলার মানচিত্র অঙ্কিত সবুজ জমিনের ওপর লাল সূর্যের পতাকা।

লক্ষহস্তে বজ্রমুষ্টি মুহুর্মুহু উত্থিত হচ্ছে আকাশে। জাগ্রত বীর বাঙালীর সার্বিক সংগ্রামের প্রত্যয়ের প্রতীক, শত কোটি মানুষের সংগ্রামী হাতিয়ারের বাঁশের লাঠি মুহুর্মুহু স্লোগানের সঙ্গে উত্থিত হচ্ছে আকাশের দিকে। কোনও বাধা-বিপত্তি আর গুজব ঠেকিয়ে রাখতে পারল না বাঙালিকে, ঠেকিয়ে রাখতে পারল না বঙ্গবন্ধুকে। বিকেল ৩টার কিছু পরে ধানমণ্ডি ৩২ নম্বর রোডের ঐতিহাসিক বাসভবন থেকে মোটরবহর নিয়ে ইতিহাসের মহানায়ক এসে পৌঁছলেন রৌদ্রকরোজ্জ্বল রেসকোর্স ময়দানে।

২৫ মার্চ ১৯৭১
জেনারেল খাদিম হোসেন রাজা এবং রাও ফরমান আলী খান অপারেশন সার্চ লাইটের বিশদ পরিকল্পনা প্রস্তুত করেছেন। ট্যাংক বেরোবে, কামান বেরোবে, ভারী অস্ত্রশস্ত্র বেরোবে। খাদিম রাজা ও রাও ফরমান আলী এর আগেই তাদের সন্তান ও কাজের লোককে পশ্চিম পাকিস্তানে পাঠিয়ে দিয়েছেন। কারণ তারা জানেন কী হতে যাচ্ছে। কিন্তু অন্য কারও তা জানার কথা নয়। পুরো ব্যাপারটা গোপন।

ইয়াহিয়া তার গাড়িবহর নিয়ে, পতাকা, গার্ড, প্রটোকল নিয়ে ক্যান্টনমেন্টে ঢুকলেন। একটু পরে তার তারকাশোভিত গাড়ি, পুরো প্রোটোকলসমেত গাড়িবহর ফিরে গেল প্রেসিডেন্ট ভবনে। কিন্তু তিনি রয়ে গেলেন ক্যান্টনমেন্টে। প্রেসিডেন্ট চোরের মতো চুপি চুপি গেলেন তেজগাঁও এয়ারপোর্টে। উঠে পড়লেন প্লেনে। তার সঙ্গে রইলো পিন্ডি থেকে আনা ফিরদৌস।

এয়ারপোর্টে কর্মরত বাঙালি অফিসার দেখে ফেললেন প্রেসিডেন্টকে। সঙ্গে সঙ্গে খবর চলে গেল শেখ মুজিবর রহমানের কাছে। প্রেসিডেন্ট পালিয়ে যাচ্ছেন। খাদিম অস্থির। টিক্কা খান তাকে বলে দিয়েছেন, আজই সেই রাত। শোনো, আমি বাংলার মানুষ চাই না, মাটি চাই। রাও ফরমান আলী কিংবা খাদিম হোসেইন রাজা যদি মানুষ মারতে দ্বিধা করে, টিক্কা খান আনিয়েছেন আরো নিষ্ঠুর দুজন অফিসারকে, জেনারেল মিঠা খান আর খুদাদাদ খানকে।

খাদিম এবং রাও ফরমান আলী গেলেন গ্যারিসন সিনেমা হলে। হলভর্তি সৈনিকরা ছবি দেখছে। সবকিছু ঠিক আছে। বিরতির সময় লাইট জ্বালানো হলো। দেখা গেল, বাঙালি সৈনিকরা কেউ নেই। তারা জেনে গেছে, প্রেসিডেন্ট পালিয়েছেন। আজ রাতই সেই প্রলয়ের রাত।

খাদিমের বাড়িতে একটা ময়না ছিল। সিলেট থেকে ময়নাটা আনা হয়েছিল। এটা ছিল তার মেয়ে রুবিনার প্রিয় সঙ্গী। রুবিনা এখন লাহোরে। এদিকে শেখ মুজিবকেও তারা সাংকেতিক নাম দিয়েছে ‘ময়না’। ২৫ মার্চ রাতে ইয়াহিয়া খানের প্লেন পাকিস্তানের আকাশে ঢোকার সঙ্গে সঙ্গে নির্দেশ দেয়া হলো, মুভ। ট্যাংক কামান রিকোয়েললেস রাইফেল নিয়ে আর্মি শকট চলল জনপদের দিকে। গোলাগুলি শুরু হলো।

কামানের গোলা ট্যাংকের গোলার শব্দে মারা গেল ময়নাপাখিটা। খাদিম রাজা লাহোরে ফোন করেন। আম্মা রুবিনা, ময়নাপাখিটা মারা গেছে। রুবিনা ভাবল, শেখ মুজিব মারা গেছেন। সারা লাহোরে ছড়িয়ে পড়ল এই গুজব যে, শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যা করা হয়েছে।

টিক্কা খান নিহত
বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সূচনা লগ্নে অমৃত বাজার পত্রিকায় ২৭ মার্চ একটি প্রতিবেদন প্রকাশ হয়। ‘জনাব রহমানের (শেখ মুজিবুর রহমান) গ্রেপ্তারের খবর রেডিও পাকিস্তানে ঘোষণা করা হলে (যদিও স্বাধীন বাংলা বেতার সত্যতা অস্বীকার করে) ঢাকার জনগণ উত্তেজিত হয়ে সামরিক আইন প্রশাসক লে. জেনারেল টিক্কা খানের সরকারি বাসভবনে জোর করে ঢুকে তাকে গুলি করে হত্যা করে।’

‘পূর্ব পাকিস্তানের সামরিক আইন প্রশাসক লে. জেনারেল টিক্কা খানের বাড়িতে ঢুকে মুক্তিযোদ্ধারা তাকে গুলি করলে গুরুত্বর আহত অবস্থায় একটি নার্সিং হোমে নেওয়া হয় এবং রাত ৮.১৫ মিনিটে তার মৃত্যু হয়।’

২৮ মার্চ যুগান্তর প্রধান শিরোনাম করে, ‘ঢাকায় পাক সামরিক শাসক নিহত’। প্রতিবেদনে শামসুদ্দিন নামে একজন মুক্তিযোদ্ধার হাতে টিক্কা খানের নিহত হওয়ার বিস্তারিত সংবাদ ছাপানো হয়। ১৯৭১ সালে ত্রিপুরা থেকে প্রকাশিত ‘জাগরণ’ পত্রিকার বিশাল হেডলাইন আসে যে- ২৭ মার্চ টিক্কা খান মুক্তিযোদ্ধাদের গুলিতে নিহত হয়েছে এবং ভারতীয় সময় রাত ১টায় তাকে ঢাকার মিলিটারী হাসপাতাল ময়দানে কবর দেয়া হয়েছে।

অবশ্য আকাশবাণীর থেকে প্রথম খবরটির শুরু। এবং স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র তাতে যোগ করে যে টিক্কা খানের ৪ সহকর্মীকেই হত্যা করা হয়েছে এবং মুক্তিবাহিনীর লোকেরা ঢাকাকে প্রায় মুক্ত করে ফেলেছে। টিক্কা খানকে হত্যাটি ছিল স্বাধীনতা পক্ষের বেতার এবং মুদ্রিত মিডিয়াতে প্রচারিত প্রথম সফল গুজব যা মানুষের মনে ব্যাপক সাহস যুগিয়েছিল। গুজবটিকে বিশ্বাসযোগ্য করার জন্য বঙ্গবন্ধুর বরাত দিয়ে (পাকিস্তানিদের প্রচারিত) গুজবে কান না দেয়ার অনুরোধ করা হয়েছে ।

মুজিব কোথায়

শেখ মুজিবের অবস্থান নিয়ে একাত্তরের শুরুতে সবচেয়ে বেশি গুজব ছড়িয়েছিল। পাকিস্তানি সেনা বাহিনী শেখ মুজিবকে গ্রেপ্তার করেছে, এই সত্য মুক্তিযুদ্ধের শুরুতে পাকিস্তান সামরিক জান্তা কর্তৃক প্রচারিত একটি রটনায় পরিণত হয়। উল্টো ভারতীয় গণমাধ্যমের কল্যাণে মুজিব আত্মগোপন করেছে এমন সংবাদ ছড়িয়ে পড়ে। ২৮ মার্চ যুগান্তর লিখছেন, ‘মুজিব মুক্ত আছেন এবং বাংলাদেশের মুক্তি আন্দোলনের নেতৃত্ব তারই হাতে।’

আগরতলায় সংবাদ ছড়িয়ে পড়ে শেখ মুজিব গাড়িবহর নিয়ে সাংবাদিক অনিল ভট্টাচার্যের বাড়িতে উঠেছেন। লোকজন মুজিবকে দেখার জন্য অনিল বাবুর বাড়িতে ভিড় করছে। এছাড়া আনন্দবাজার, আগরতলার দৈনিক সংবাদ শেখ মুজিবের অবস্থান নিয়ে নানারকম গুজবের সৃষ্টি করেন। সেই সব গুজবের কারণ সম্পর্কে জানতে চেয়েছিলাম, আগরতলার চিত্র সাংবাদিক রবীন সেনগুপ্তের কাছে। সদ্য প্রয়াত রবীন সেন বলছিলেন, ‘এটি মূলত ভারতীয় গণমাধ্যমের একটি কৌশল ছিল। একদিকে বাংলাদেশ থেকে আগত লোকজনের মনোবলে যাতে চিড় না ধরে, অন্যদিকে আশ্রয়দানকারী ভারতীয় সাধারণ জনগণ যাতে উৎসাহ পায়।’

১৭ এপ্রিল মুজিব নগর সরকারের গঠনের মধ্য দিয়ে সেই গুজবের অবসান ঘটে। এরপর শুরু হয় মুজিবের জীবিত থাকা নিয়ে নানা গুজব।

রওশন আরা
১৯৭১ সালের ১ এপ্রিল আগরতলার দৈনিক সংবাদের প্রথম পাতায় দুই কলামে ছোট একটি সংবাদ প্রকাশিত হয়- রওশন আরা মৃত্যহীন।

“ঢাকার রওশন আরা তার অমূল্য জীবনকে অর্ঘ্য দিয়ে মানুষের ইতিহাসে চিরস্থায়ী অধ্যায় রচনা করেছে। রওশন আরা ঢাকা মহিলা কলেজের প্রথম বর্ষের ছাত্রী। পাক নাজি বাহিনীর ট্যাঙ্কের আক্রমণে যখন ঢাকার নাগরিক জীবন বিধ্বস্ত তবু মানুষের মনে স্বাধীনতার ব্যাপারে বিন্দুমাত্র অবিশ্বাস থাকেনি। তখন এই তরুণী তার বুকে মাইন বেঁধে নিয়ে রাস্তায় ঝাঁপিয়ে পড়ে ট্যাঙ্কের নিচে। গোলাবোঝাই এই ট্যাঙ্ক তীব্র গর্জনে মুখ থুবড়ে পড়ে। রওশন আরা তার জীবনকে সার্থক করে তুলেছে মহৎ আত্মদানের মধ্য দিয়ে।”

আগরতলার দৈনিক সংবাদ তখন বেশ জনপ্রিয় পত্রিকা। সর্বভারতীয় পত্রিকা তো বটেই, বিশ্বের বেশ কিছু নামী-দামী গণমাধ্যমের বাংলাদেশ বিষয়িক সংবাদের প্রধান তথ্যসূত্র তখন দৈনিক সংবাদ। আগরতলায় তখন বিপুল সংখ্যক বিদেশি সাংবাদিকের আনাগোনা। তাদের কল্যাণে এই সংবাদ ছড়িয়ে পড়ে বিশ্বময়। রওশন আরা হয়ে পড়ে বিশ্ব গণমাধ্যমের মূল আলোচ্য বিষয়। রওশন আরা পরিণত হয় অকুতোভয় বাঙালির নারীদের আদর্শ হিসেবে। দেশে বিদেশে গড়ে ওঠে অসংখ্য রওশন আরা বিগ্রেড। রওশন আরার এই জীবন উৎসর্গ, জ্বলন্ত আত্মত্যাগ, দেশপ্রেম হয়ে পড়ে পুরো ভারতের আলোচনার বিষয়বস্তু। ৮ এপ্রিল ১৯৭১, আগরতলার স্কুল কলেজের ছেলে মেয়েরা পালন করে ‘রওশন আরা দিবস’।

একই দিবস ভিন্ন ভিন্ন সময়ে পালন করা হয় পূর্ব ও উত্তর-পূর্ব ভারতের বেশ কয়েকটি রাজ্যে। ত্রিপুরা, পশ্চিমবঙ্গ, আসাম, মেঘালয়, দিল্লী, বিহারসহ বেশ কয়েকটি রাজ্যে গড়ে ওঠে রওশন আরা বিগ্রেড, রওশন আরার নামেই সংগৃহীত হতে থাকে চাঁদা। দিল্লীতে অরুণা আসফ আলীর নেতৃত্বে গঠিত রওশন আরা বিগ্রেড আগ্রা পর্যন্ত লংমার্চ করে শরণার্থীদের জন্য সংগ্রহ করে পাঁচ লক্ষ টাকা। পাটনার মেয়েরা মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য সেলাই করেন ২ হাজার ৫০০ উলের সোয়েটার। এলাহাবাদ, অমৃতসর, জলন্ধর, মাদ্রাজের রওশন আরা বিগ্রেডের নারীরা বাড়ি বাড়ি ঘুরে সংগ্রহ করেছে ত্রাণ। মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে রওশন আরা বিগ্রেড কিংবা রওশন আরা তহবিলে প্রায় ত্রিশ লক্ষ টাকা চাঁদা জমা পড়ে। (বিকচ চৌধুরী, সাক্ষাৎকার)

রওশন আরা চরিত্রটির পাশাপাশি সংবাদ পত্রিকার যে সাংবাদিক এই সংবাদ করেন তিনিও বিখ্যাত হয়ে পড়েন বিশ্বগণমাধ্যমে। সর্বভারতীয় পত্রিকাগুলোতে সংবাদের বিকচ চৌধুরীর নাম ছড়িয়ে পড়ে। বিদেশের অনেক নামী দামী সাংবাদিক, সংবাদমাধ্যম বিকচ চৌধুরীর সাথে নিত্য-নতুন সংবাদের জন্য যোগাযোগ শুরু করেন।

কয়েক মাস পরেই কলকাতায় রওশন আরা বিপ্লব ঘটে যায়। আনন্দবাজার হেডলাইন করলে যুগান্তর ছাপায় জীবন বৃত্তান্ত। অমৃতবাজার উপসম্পাদকীয় লেখে, তো স্টেটসম্যান শ্রদ্ধার্ঘ্য! সংবাদপত্রের পাতায় ছাপা হয় রওশন আরার জীবন বৃত্তান্ত। ঢাকার ইডেন কলেজের ছাত্রী রওশন। বাবা পুলিশ কর্মকর্তা। সর্ম্পকে শেখ মুজিবের আত্মীয়া। একাত্তরের ২৫ মার্চের কালো রাতে রাজশাহীর নাটোরে নিজ বাড়িতে ছিল রওশন। উত্তরবঙ্গে প্রতিরোধ শুরু হলে মহিলাদের নিয়ে গড়ে তোলে বিগ্রেড। এক রাতে সংবাদ পায় বগুড়া সেনানিবাস থেকে পাকিস্তানি আর্মি রাজশাহীর দিকে রওনা দিয়েছে। প্রতিরোধ করতে হবে সেনাবাহিনীর। সিদ্ধান্ত নিলেন বুকে মাইন বেঁধে প্রতিরোধ করবেন পাকিস্তানি আর্মির। পড়লেন প্রিয় সবুজ শাড়ি, বুকে তিনটি মাইন, উড়িয়ে দিলেন পাকিস্তানি ট্যাঙ্ক। উড়ে গেল উনিশ পাকিস্তানি সৈন্য।

পেপারের পরে রওশন আরাকে নিয়ে রচিত হলো সাহিত্য। কেউ কবিতা লিখলেন, তো কেউ গান, কেউ নাটক।

সৈয়দ শামসুল হক লিখলেন রোশেনারা কবিতা।

রোশেনারা
তোমার বয়স কতো, আঠারো উনিশ?

মুখশ্রী কেমন? রঙ চোখ চুল কী রকম? চলার ভঙ্গিমা?

ছিলে তুমি কারো প্রতিমা?

জানি না।

ওই বুকে মাইন বেঁধে বলেছিলে- জয় বাংলা-

মানুষের স্বাধীনতা দীর্ঘজীবী হোক,

ট্যাঙ্কের ওপর ঝাঁপ দিতে দিতে বলেছিলে-

বর্বরতা এইভাবে মুছে যাক, ধ্বংস হোক সভ্যতার কীট।

ধ্রুবতারা হয়ে গেছে মুক্তির জননী রোশেনারা।

প্রীতিশ নন্দী লিখলেন ‘একটি মেয়ের মৃত্যু’ কবিতাটি।

রোশেনারা মারা গেছে, মনে রেখো।

নদীর মেয়ে রোশেনারা, প্রতিহিংসার সূর্য আমাদের।

দূরের গ্রামগুলো যখন বন্দুকের আওয়াজে শব্দিত হয়ে উঠবে, ওর খোঁপায় গোঁজা অঙ্গারীভূত

লাইলাক ফুলটা রাতের জাফরিতে বুনে দেবে সাহস। সময়ের সেনানী-সবুজ রূপকথাগুলো রোশেনারার

বরণ করা মৃত্যুর জন্য প্রতীক্ষা করবে না আর।

একটা ট্যাঙ্ক একটা জীবনের সমান : হ্যাঁ রোশেনারা ওই দাম ওর।

এগিয়ে এলো পলিটিকাল পার্টিজ। কমিউনিস্ট পার্টি অব ইন্ডিয়া করে রোশেনারা দিবস, তো কংগ্রেস করে রোশেনারা রজনী! সে এক এলাহী কাণ্ড! এছাড়া ১৯৭১-এ যুদ্ধরত সেনাবাহিনীর প্রথম দুটি গোলন্দাজ ইউনিটের একটির নাম রাখা হয়েছিল মুজিব ব্যাটরি, আর আরেকটির রওশন আরা ব্যাটারি। কর্নেল সাজ্জাদ জহির বলছিলেন- একাত্তর সালে তাঁর উপর চাপ আসছিল তার সামরিক ইউনিটের নাম ‘রওশন আরা’র নামে করার জন্য। তিনি রাজি হননি, কারণ ঘটনাটি তিনি বিশ্বাস করতে পারেননি।

প্রকৃত অর্থে রওশন আরা নামের কোনও কলেজ ছাত্রীর ট্যাংকের নিচে মাইন বেঁধে মারা যাওয়ার কাহিনীর সত্যতা পরবর্তীতে পাওয়া যায়নি। রওশন আরা ছিলেন সাংবাদিক বিকচ চৌধুরীর কাল্পনিক সৃষ্টি। সে সময় মুক্তিযোদ্ধাদের বিশেষ করে মহিলাদের সাহস জোগাতে তাকে সৃষ্টি করা হয়েছিল। আর এক অর্থে রওশন আরা ছিলেন একটি প্রতীক। বাংলার লাখ লাখ সাহসী নারীর একজন। যারা সশরীরে যুদ্ধে যাওয়ার সুযোগ পাননি তারাও রওশন আরার কাহিনীতে উজ্জ্বীবিত হয়েছেন।

মুক্তিযুদ্ধের সময় যে রওশন আরাকে নিয়ে এত আলোচনা, এত আগ্রহ সেই রওশন আরা কিংবা এর জনক বিকচ চৌধুরী পরবর্তীতে ব্যাপক আলোচনা সমালোচনার মুখোমুখি হয় এই ঘটনার জন্য। বিকচ চৌধুরী তার ‘লক্ষ মুঠিতে ঝড়ের ঠিকানা’ গ্রন্থে এই ঘটনার অবতারণা করে বলেছেন, “মূলত রণাঙ্গনের শৌর্য বীর্যের গৌরবগাঁথা বিশ্বময় ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য এই কাল্পনিক ঘটনার অবতারণা। আমি প্রথমেই এই কাল্পনিক মেয়ের নাম দিয়েছিলাম ফাতেমা। কিন্তু ছফা ভাই (আহমেদ ছফা) কলম হাতে নিয়ে বলে উঠলেন কলেজ পড়ুয়া মেয়ের আধুনিক নাম হওয়া উচিত। তিনি নামটি শুদ্ধ করে দিয়েছিলেন রওশন আরা।”

আর আহমেদ ছফা তার অলাতচক্র উপন্যাসে বলছেন, বিকচ নাম দিয়েছিল ফুলজান। আমি সংশোধন করে রওশন আরা দেই। বিকচ চৌধুরী সর্ম্পকে এখানে তিনি বলছেন, “ বিকচ নিউজপ্রিন্টের প্যাড নিয়ে বসলেই গানবোট ডুবত, কনভয়ের পর কনভয় সৈন্য ধ্বংস হয়ে যেত; ট্রেন লাইন উড়ে যেত। তথাপি বিকচ সাইকেলটাতে প্যাডেল ঘুরিয়ে সীমান্ত অবধি যেত, কারণ প্রতিদিন যেতে যেতে ওটা তার অভ্যেস দাঁড়িয়ে গিয়েছিল। বিকচ তার ছোট্ট পত্রিকার পাতায় এত সৈন্য মেরেছে, এত ট্যাঙ্ক ছারখার করেছে, এত কর্নেল বিগ্রেডিয়ার বন্দি করেছে, আগরতলার মানুষ তার মারণক্ষমতায় মুগ্ধ হয়ে তাকে পাকিস্তানি সৈন্যের যম টাইটেল দিয়েছে।”

আহমেদ ছফা বলছেন, “পরবর্তীতে ভারতের জনমানসে রওশন আরা এত বেশি প্রভাব বিস্তার করেছে, কখনো সাহস হয়নি বলার, বিকচের এই গল্পটি মিথ্যে।”

বিকচ চৌধুরীর এই কাল্পনিক সংবাদ পরিবেশন, কল্পিত চরিত্র যতই উদ্দীপনামূলক হউক না কেন এটা সংবাদপত্রের নীতি বিবর্জিত। এর ফলে একাত্তরে সংবাদ পত্রিকায় প্রকাশিত অনেক সংবাদের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। অনেকেই এটাকে বিকচ চৌধুরীর সস্তা জনপ্রিয়তা লাভের চেষ্টা বলে অভিহিত করেন। এই ধরনের সংবাদ কেন তিনি করতে গেলেন- এই প্রশ্নটি করেছিলাম বিকচ চৌধুরী ঘনিষ্ঠ বন্ধু, একাত্তরে টাইমস অব ইন্ডিয়ার আগরতলা প্রতিনিধি জ্যোতিপ্রকাশ সইকিয়াকে। তিনি বললেন, মূলত বিকচ বিশ্বব্যাপী মানুষের হৃদয়ে সহমর্মিতা সৃষ্টির উদ্দেশ্যে এটা করেছেন, তবে একজন সাংবাদিক হিসেবে এই ধরনের কাল্পনিক সংবাদ পরিবেশন করা বিকচের উচিত হয়নি। এটা সংবাদপত্রের নৈতিকতা বিবর্জিত।

একই প্রশ্ন করেছিলাম আগরতলার সিনিয়র সাংবাদিক, দৈনিক দেশের কথার সম্পাদক গৌতম দাশকে, তিনি এটাকে বিকচ চৌধুরীর ‘ধাপ্পাবাজি’ বলে উল্লেখ করেন এবং বলেন এই ধরনের কাল্পনিক ঘটনার ফলে মুক্তিযুদ্ধের অনেক গৌরবগাঁথা যেগুলো একাত্তরে আগরতলার পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে সেগুলোকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।

মুখোমুখি হয়েছিলাম বিকচ চৌধুরীর। স্বভাবতই জানতে চেয়েছিলাম, কেন তিনি এই ধরণের কাল্পনিক গল্পের আশ্রয় নিলেন। বিকচ চৌধুরীর মতে, এটি তার ৪০ বছরের সাংবাদিকতা জীবনের শ্রেষ্ঠ সাংবাদিকতা, শ্রেষ্ঠ অর্জন। চরিত্রটি কল্পিত হলেও একাত্তরে আগরতলাসহ ভারতের নানা জায়গায় রওশন আরার নামে মিছিল বের হয়েছে। লোকজন সাহায্য সহযোগিতা করেছে। তারা ভাষায়- “প্রকৃত অর্থে আমি রওশন আরা কল্পিত চরিত্রের মধ্য দিয়ে বীর বাঙালির অপরিসীম আত্মত্যাগকে তুলে ধরার চেষ্টা করেছি।”

একজন সাংবাদিক হিসেবে এটা সাংবাদিকতার নীতি বিবর্জিত কিনা, প্রশ্ন করলে তিনি বলেন, “জনগণের আবেগে অভিঘাত হানার জন্য, শরণার্থীদের সহায়তা বৃদ্ধির জন্য এটা অমি করেছি। নীতি-নৈতিকতা ভেবে দেখিনি। তবে আমি গর্ব করি, রওশন আরা চরিত্রটি সৃষ্টির জন্য।”

রওশন আরা, চরিত্রটি কাল্পনিক হলেও, একাত্তরে এই কাল্পনিক চরিত্রের প্রভাব ছিল অপরিসীম। একাত্তরে আগরতলা, শিলচর, গোয়াহাটি, পশ্চিমবঙ্গ, মেঘালয় থেকে প্রকাশিত সংবাদপত্রগুলো দেখলেই রওশন আরা বিগ্রেডের নানা কর্মসূচি চোখে পড়ে। রওশন আরা উদ্দীপিত করেছিল হাজারো মুক্তিকামী তরুণকে, নারীকে। শরণার্থী শিবিরগুলোতে রওশন আরার গল্প ছড়িয়ে পড়লে অনেকেই শিবির ছেড়ে যোগ দেন মুক্তিফৌজ প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে।

ঢাকার কলেজ পড়ুয়া এক ছাত্রীর বুকে মাইন বেঁধে এই আত্মত্যাগ একাত্তরে একদিকে সৃষ্টি করেছিল ব্যাপক উদ্দীপনার। রওশন আরা যেন চিরায়ত বাংলার বিদ্রোহী নারীর প্রতিমূর্তি।

ভৌতিক কলেরা মিথ
একাত্তরে ভারতের শরণার্থী শিবিরগুলোতে কলেরা মহামারী রূপ নিয়েছিল। বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গ ও মেঘালয়ের শরণার্থী শিবিরগুলোতে বিপুল সংখ্যক লোক কলেরায় আক্রান্ত হয়ে মারা যান। ২২ জুন ১৯৭১ ওয়াশিংটন ডেইলি নিউজে James Foster এর একটি রির্পোট প্রকাশ হয়।

রির্পোটটির শিরোনামই ছিল ‘60,000 of 5 million Refugees have died’। ডিসেম্বরে নিউ ইয়র্ক টাইমস এর একটি প্রতিবেদনে উঠে আসে কলেরায় ভয়াবহ মৃত্যুর বর্ণনা, টাইম ম্যাগাজিনের সাংবাদিক জন সার ও ফটোগ্রাফার মার্ক গডফেরি জুন মাসে নদীয়া সফর করে সচিত্র প্রতিবেদন তুলে ধরেছেন- “The Bengali Refugees: A Surfeit of woe” শিরোনামে। একদিকে হাজার হাজার লোকের কলেরায় আক্রান্ত হওয়া, বিভিন্ন দাতা সংস্থা থেকে কলেরার প্রতিষেধক প্রদান, সব মিলিয়ে কলেরা শরণার্থী শিবিরগুলোতে ভয়াবহ আতঙ্ক ছড়িয়ে দেয়। সেই আতঙ্ক উঠে আসে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে। নিউ ইয়র্ক টাইমসে লেখা হয়, শেষপর্যন্ত কতজন বেঁচে থাকবে সেটা বলা যায় না।

গুজবের সেই আতঙ্ক আর অস্থিরতা ছড়িয়ে পড়ে শরণার্থী ক্যাম্পে। জন্ম নেয় ভৌতিক কলেরা মিথের। ঝড়ের বেগে এই গুজব ছড়িয়ে পড়ে ক্যাম্প থেকে ক্যাম্পে। সেই গুজবের আতঙ্কে অনেকেই হারাতে থাকে প্রাণ।

বলছি ভারতের সুতানটি শরণার্থী ক্যাম্পের কথা। ক্যাম্পে এক তাঁবুর নিচে গাদাগাদি করে থাকা, মশা, চরম অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে থাকতে থাকতে শরণার্থীদের মধ্যে তৈরি হলো এক ভৌতিক মিথ। রিলিফে পর্যাপ্ত খাবার পেলেও সে খাবার সহ্য হতো না বেশিরভাগ মানুষের। সমস্যা হতো হজমের। অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে সব মিলে নানান কারণে দেখা দিতো প্রাণঘাতী কলেরা। আর একবার দেখা দিলে মরতো শয়ে শয়ে। চারপাশে করুণ মৃত্যু দেখতে দেখতে একসময় শরণার্থী শিবিরের মানুষ হঠাৎ করে দেখতো কেউ একজন মানুষ থেকে গরু হয়ে গেছে। আবার কখনও দেখতো মানুষ থেকে ছাগল হয়ে গেল; আবার হঠাৎ উধাও হয়ে গেলো চোখের নিমিষে। এসব যারা দেখতো তারা আক্রান্ত হতো কলেরায়। মূলত সুন্দর-দেখতে ও যুবা বয়সের ছেলেমেয়েদেরই ভয় দেখিয়ে মারতো বলেই মত শিবিরে দিনকাটানো মানুষের।

সীমান্তঘেঁষা নাটনা সুতানটি শরণার্থী শিবিরে এমন ভৌতিক অবস্থার মুখোমুখি হয়ে প্রাণ হারান অসংখ্য মানুষ। নয় বছর বয়স তখন তার। নাম জুলমত আলী ঝিলা। যুদ্ধের ডামাডোলে নিজগ্রাম বালুঘাট-শালিকা থেকে পাড়ি জমালেন পাশের নাটনা মাঠে। সেখানে সুতানটি শরণার্থী ক্যাম্প। মাঝে ভৈরব নদের ছোট একটি শাখা বালুরখাল। খালপাড়ের পশ্চিমপাশ থেকেই ভারতের নাটনা। নদীয়া জেলার তেহট্টার নবীনগর, ছাটনি, গরিবপুর পশ্চিমের সীমান্তজুড়ে। দিগন্তবিস্তৃত মাঠ পেরিয়ে খাল পেরুলেই নিরাপদ। তাই কয়েক হাজার শরণার্থী যুদ্ধ শুরুর সঙ্গে সঙ্গেই নাটনা গিয়ে ঘর-আস্তানা গাড়তে শুরু করে। মেহেরপুর সদর থেকে নাটনার দূরত্ব ১০ কিলোমিটার।

আর শালিকা থেকে নাটনার ৩ কিলোমিটার সড়ক এই ৪৫ বছরে কাদামাটির স্তর বাড়িয়েছে শুধু। জুলমত আলীর সঙ্গে দেখা সেখানেই। তখন গরু চরাতেন। আর এখন সেই মাঠে, সেই খালের পাড়ে করেন কৃষিকাজ। ঝিলার মা ফাতেমাও মারা যান এমন অদ্ভুত কলেরায়। বমিও হতো। তার ভাষ্য, এভাবে আরও মারা যান শালিখার জয় হালসানার বউ জমিরন, মহিউদ্দিনের স্ত্রী আয়েশা। শেষে সবাই বলা শুরু করলো ওই ক্যাম্পে গেলে মরবি সব।

সেই ক্যাম্পে রেশন বণ্টনের দায়িত্বে ছিলেন নূর মিয়া। বলছিলেন, মূলত বিভিন্ন ক্যাম্প থেকে কলেরায় মারা যাওয়ার খবর আসা শুরু করল। টিকাসহ কোনও ধরনের চিকিৎসা সরঞ্জাম নেই। সুতারাং কলেরা হলে বাঁচার কোন সম্ভাবনা নেই। এমন অবস্থায় ‘ওলা বিবির’ গুজব ছড়িয়ে পড়ে। সুতানটিসহ আশে পাশের ক্যাম্পে কলেরায় আক্রান্ত হওয়ার চেয়ে কলেরার আতঙ্কে বেশি লোক প্রাণ হারিয়েছে।

সব কষ্ট, সব আতঙ্ক, সব অনিশ্চয়তার মধ্যে এই কলেরা আতঙ্কই বড় হয়ে উঠেছিল সুতানটি শরণার্থী শিবিরে।

একই ভৌতিক কলেরা মিথ ছড়িয়ে পড়েছিল মেঘালয়ের বালাট, মাইলাম শরণার্থী শিবিরে। রাতে স্বপ্ন দেখছে, গরু ছাগলের বেশে ওলা বিবি আসছে, সকালে রক্তবমি। আর শয়ে শয়ে মানুষের মৃত্যু।

রেডিও মিহির
আগরতলার এমবিবি কলেজের শিক্ষক ছিলেন মিহির দেব। পাশাপাশি সাংবাদিকতা করতেন দৈনিক সংবাদে। পদার্থবিজ্ঞানের শিক্ষক মিহির বাবুর কাছে একাত্তরে একটি ট্রানজিস্টর ছিল। যেটাতে হয়তো তিনি কিছু সংবাদ শুনতে পেতেন। সেই ট্রানজিস্টর কে সম্বল করে সংবাদে নিত্য নূতন গুজব ছড়িয়ে দিতেন মিহির। বলছিলেন রবীন সেন গুপ্ত, ‘ট্রানজিস্টরের নব ঘুরিয়ে মিহির যে কতো নিত্য নতুন সংবাদ বানিয়েছে তার ইয়ত্তা নেই। মিহির দেব আর বিকচ চৌধুরীর হাতে পড়ে একাত্তরের দৈনিক সংবাদ পরিণত হয়েছিল গুজবের বাক্সে।’ আর একাত্তরের শুরুতে দৈনিক সংবাদের বরাতে বাংলাদেশের সংবাদ ভারতীয় গণমাধ্যম এমনকি বৈশ্বিক গণমাধ্যমে স্থান পেত।

একাত্তর ঢাকা হয়ে পড়েছিল গুজবের নগরী, নানামুখী গুজবের শাখা-প্রশাখা গজাতে শুরু করল ঢাকার আকাশে বাতাসে। পশ্চিমবঙ্গের নদীয়া, মুর্শিদাবাদ, দিনাজপুর থেকে বনগাঁ নানা কল্পকাহিনীতে ভরপুর হয়ে উঠেছিল। এসব গুজবে মানুষ আশ্রয় খুঁজে পাওয়ার চেষ্টা করত। দুর্বিষহ জীবনে আশার বুক বাঁধত। একসময় এসব নানামুখী গুজব, রটনাকে ছাপিয়ে ‘স্বাধীন বাংলাদেশের’ জন্ম হয়। জন্ম নেয় বীর বাঙালির ইতিহাসের সবচেয়ে উজ্জ্বল ঘটনার।

আডি/ ০৯ অক্টোবর

Back to top button