সংগীত

‘আমার জীবনে যে ঘটনা ঘটে গেল তা কোনো দিন ভুলব না’

ঢাকা, ২১ সেপ্টেম্বর – স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে যে কয়জন শিল্পীর হাত ধরে দেশে পপ সংগীত জনপ্রিয়তা লাভ করে তার মধ্যে অন্যতম ফেরদৌস ওয়াহিদ। কিংবদন্তি এই পপস্টার তার পথচলার কথাগুলো বলেছেন প্রাণখুলে। লিখেছেন- তারেক আনন্দ

সপ্তাহখানেকের অপেক্ষার পর এলো সেই কাক্সিক্ষত দিন। শনিবার। আমি, ফিরোজ সাঁই, আজম খান, ইদু, ইশতিয়াক, ল্যারি মুসা এবং সেই দিনটির জন্য যিনি মুখ্য ছিলেন তিনি এনায়েতুল্লাহ খান। এখন ঢাকা কুরিয়ারের সম্পাদক। আমার নিকট-বন্ধু। আমরা বসলাম আড্ডা, আলোচনায়। একটি সিদ্ধান্তে একমত হলাম যে, আমরা নিজেদের ধরে রাখার জন্য, মানুষের কানে কানে গান পৌঁছানোর জন্য রেকর্ড বের করব। চারটি রেকর্ড। দুটি গাইবেন আজম খান। অন্য দুটি আমি। আজম খানের গান হলোÑ ‘হাইকোর্টের মাজারে’, ‘ওরে সালাকা ওরে মালেকা’। আর আমার দুই গান ‘চাঁদ জাগে তারা জাগে’ ও ‘দুনিয়াটা কত যে মজার’। ওরা গান শুনে খুশি। ওরা বুঝল গানের মাঝে ছন্দ প্রবেশ করানো কোনো ঘটনাই নয়। আজম খানের রক এবং আমার পপ। ওদের ধাঁচের মধ্যেই পড়ে গেছে সুরগুলো। তাদের ভালো লাগার কারণও এখান থেকেই শুরু। সংগীত পরিচালক কে হবেন? মাথায় এলো একটি নামÑ আজম খানের বড় ভাই বিখ্যাত সংগীত পরিচালক আলম খান। ওনাকে যদি আমরা অনুরোধ করি তা হলে আমাদের সবাইকে গাইড করে গান চারটি নামিয়ে দেবেন। গান করতে আমাদের তিনশ টাকা খরচ হবে। এই খরচ আমি বহন করব।

পরদিন ফিরোজ সাঁই ও আমি মিলে রাজি করালাম আলম খান ভাইকে। যেভাবেই রাজি হোক না কেন, আমি বলব যে নতুন দীগন্তে পা রেখেছি। ওনার মতো সংগীত পরিচালক যদি নাও আসতেন, তা হলে আমাদের কিছুই বলার ছিল না। আজম খানের ভাই বলে নন, তিনি একজন বৈচিত্র্যময় সংগীত পরিচালক। আলম ভাই সব শুনলেন। শুনে নিশ্চয়ই ভালো লেগেছিল বলেই বললেন, আমি স্টুডিওতে যাব।

আমি একাই চলে গেলাম ঢাকা রেকর্ড কোম্পানিতে। মজিদ সাহেব। ঢাকা রেকর্ড কোম্পানির তত্ত্বাবধায়ক। প্রথম দেখায় তিনি খুব আনন্দ নিয়ে কথা বললেন। আমাদের পরিকল্পনার কথা শুনলেন। শুনে খুব খুশি হলেন। তিনি আমাদের তারিখ দিলেন। হাফ শিফটের জন্য ২৬৪ টাকা। আমার ধারণা তিনিও কেন জানি অপেক্ষায় ছিলেন, আসলে কী হতে যাচ্ছে। তার কাছেও তো সবকিছু নতুন। তিনি অবাক। কারণ এই ধরনের কাজ আগে হয়নি দেশে।

পাঁচ দিন পর। সারাদিন আমরা ভাত খাইনি। প্রচুর সিঙাড়া আর চা খেয়েছি। এখানে আমাদের ৫০ টাকা খরচ হয়েছে কিনা বলতে পারব না।

একটি কথা বলে রাখি, আজকের ক্যাটস আইয়ের স্বত্বাধিকারী সাঈদ সিদ্দিকী রেকর্ডের জন্য দিয়েছিল ১০০ টাকা। আমার পকেট থেকে খরচ করলাম ১২৫ টাকা। এই টাকা বাবা-মার কাছ থেকে মেরে দেওয়া টাকা। এছাড়া আমার দুই বন্ধু গোলাম সারওয়ার খান ও মাসুদ আহমেদ কিছু টাকা দিয়েছিল। সবমিলিয়ে তিনশ, সোয়া তিনশ টাকা খরচ হলো। আলম খান ভাই চলে এলেন। আমরা সবাই দাঁড়িয়ে সম্মান জানালাম। কন্ট্রোল রুমে বসলেন। মাঝে মাঝে ভেতরে এলেন। আমরা শুরু করলাম। ভুল-ত্রুটি দেখিয়ে দিচ্ছিলেন। সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো রেকর্ডিস্ট মজিদ সাহেবও বার বার আমাদের রিহার্সেল দেখতে এলেন। তখনকার দিনে দুটি স্টুডিও। ঢাকা রেকর্ড কোম্পানি এবং এফডিসি। তারাই একমাত্র আরপিএম রেকর্ড বের করত। আর এখানকার সবকিছু দেখেন মজিদ ভাই। সন্ধ্যার আগেই আমাদের চারটি গান রেকর্ড হয়ে গেল। সবাই খুব খুশি। সেই যে উজ্জ্বলতা এবং আমার জীবনে যে ঘটনা ঘটে গেল তা কোনোদিন ভুলব না।

আলম খান ভাই ডেকে পাঠালেন। আমি গেলাম তার কাছে। তিনি পিঠ চাপড়িয়ে বললেন, তোমার গলা আমার খুব ভালো লেগেছে। তুমি ফিল্মের জন্য গান করবে?

আমি মনে মনে ভাবলাম, ফিল্মের গান আবার করব না! তখন ফিল্মই ছিল একমাত্র প্রধান মাধ্যম। আমি কী করব বুঝতে পারছিলাম না। সালাম করব নাকি কান্না করব, একদিকে খুশি আরেক দিকে আশ্চর্য!

উনার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে মজিদ সাহেবের কাছে এলাম। উনি অবাক হয়ে বললেন, আমি তো এ ধরনের গান শুনিনি আগে, আমার খুবই ভালো লাগল। তোমাদের অভিনন্দন। তিনি সরাসরি প্রস্তাব দিলেন রেকর্ড করব কিনা? উনি বললেন, আমার ধারণা নতুন একটি দিগন্ত সৃষ্টি হবে বাংলাদেশের আকাশে।

উনার প্রস্তাবে আমি রাজি। খুশিতে, আহ্লাদে আটখানা। শুধু একটি প্রশ্ন করলাম, কবে আসব? তোমার আসতে হবে না। ফোন নম্বর দিয়ে যাও। আমি যোগাযোগ করব।

আমি একটি বিশাল অপেক্ষার পালা নিয়ে চলে এলাম।

আইএ/ ২১ সেপ্টেম্বর ২০২২

Back to top button