জাতীয়

২২০০ কোটি টাকার জন্য মাফ ২৬০০ কোটি

ঢাকা, ২০ সেপ্টেম্বর – এ বছরের এপ্রিল-জুন প্রান্তিকে বেসরকারি ব্যাংকে পুনঃতপশিল করা ঋণের পরিমাণ ২ হাজার ২১২ কোটি টাকা। এর বিপরীতে সুদ মওকুফ করা হয়েছে ২ হাজার ৫৫৭ কোটি টাকা। এই প্রান্তিকে ব্যাংক খাতে সব মিলিয়ে তিন হাজার ৭০৬ কোটি টাকার ঋণ পুনঃতপশিলের বিপরীতে মাফ করে দেওয়া হয়েছে ২ হাজার ৫৯৫ কোটি টাকা। এর মানে পুনঃতপশিল ও সুদ মওকুফের বেশিরভাগই হয়েছে বেসরকারি ব্যাংকে। বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে। এদিকে পুনঃতপশিল করা এ ঋণের সবই যে আদায় হবে তা নিশ্চিত নয়। এর আগে বিভিন্ন সময়ে কোনো ঋণ একাধিকবার পুনঃতপশিলেরও ঘটনা রয়েছে।

গত প্রান্তিকের চিত্রটি বেশ অস্বাভাবিক। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, এ বছরের প্রথম তিন মাসে (জানুয়ারি-মার্চ) ২ হাজার ২৫৪ কোটি টাকা পুনঃতপশিল করা হয়। এর বিপরীতে সুদ মওকুফ হয়েছিল মাত্র ২২১ কোটি টাকা। ২০২১ সালের এপ্রিল-জুন প্রান্তিকে ২ হাজার ৯১৫ কোটি টাকা পুনঃতপশিলের বিপরীতে সুদ মওকুফ হয় ১৯৩ কোটি টাকা। আগের বিভিন্ন প্রান্তিকেও একই ধরনের চিত্র ছিল, অর্থাৎ পুনঃতপশিল করা অঙ্কের তুলনায় সুদ মওকুফ ছিল অনেক কম।

জানা গেছে, গত প্রান্তিকে পুনঃতপশিলে অস্বাভাবিকতার মূল কারণ হলো, বেসরকারি খাতের দুটি ব্যাংকের যোগসাজশে বিপুল অঙ্কের সুদ মওকুফ। এ দুটি ব্যাংকের মালিকানায় থাকা বিভিন্ন পক্ষ একে অপরকে সুবিধা দিতে বিপুল অঙ্কের সুদ মওকুফ করে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক বিষয়টি জানার পর শুরুতে দুটি ব্যাংকের সঙ্গেই আলোচনা করে। তবে বাংলাদেশ ব্যাংক শেষ পর্যন্ত এর অনুমোদন দেয়।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত জুন শেষে ব্যাংক খাতের খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ২৫ হাজার ২৫৮ কোটি টাকা। ওই সময় পর্যন্ত বিতরণ করা ঋণস্থিতির যা ৮ দশমিক ৯৬ শতাংশ। গত ডিসেম্বর পর্যন্ত খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ১ লাখ ৩ হাজার ২৭৪ কোটি টাকা। গত ৬ মাসে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ২১ হাজার ৯৮৪ কোটি টাকা। এর বাইরে অবলোপন করা খেলাপি ঋণ রয়েছে ৪৫ হাজার কোটি টাকার মতো। মামলাসহ বিভিন্ন উপায়ে চেষ্টা করেও এসব খেলাপি ঋণ আশানুরূপভাবে আদায় করতে পারছে না ব্যাংকগুলো।

ব্যাংকাররা জানান, কঠোরতার চেয়ে খেলাপি ঋণ কম দেখানোর উপায় হিসেবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিভিন্ন ছাড় দিচ্ছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। বিশেষ করে করোনার প্রভাব শুরুর পর ২০২০ সালে কেউ কোনো টাকা না দিলেও তাকে খেলাপি করা হয়নি। ২০২১ সালে একজন উদ্যোক্তার যে পরিমাণ ঋণ পরিশোধ করার কথা, কেউ ১৫ শতাংশ দিলে তাকে আর খেলাপি করা হয়নি। এর আগে ২০১৯ সালে বিশেষ ব্যবস্থায় মাত্র ২ শতাংশ ডাউনপেমেন্ট দিয়ে ১০ বছরের জন্য বিপুল পরিমাণের ঋণ পুনঃতপশিল করা হয়। এরও আগে ৫০০ কোটি টাকার বড় অঙ্কের ঋণ পুনর্গঠন, রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে বিশেষ বিবেচনায় পুনঃতপশিলসহ বিভিন্ন শিথিলতা দেওয়া হয়। বারবার এ রকম শিথিলতার কারণে উদ্যোক্তাদের কেউ কেউ ঋণ পরিশোধের চেয়ে সুবিধা নেওয়ার পেছনে ছুটছেন বেশি। আর এসব ছাড়ের কারণে ব্যাংক খাতের খেলাপি ঋণের আসল চিত্র প্রতিফলিত হচ্ছে না।

বিভিন্ন অঙ্কের ডাউনপেমেন্ট দিয়ে ব্যাংকগুলো আগ থেকেই ঋণ পুনঃতপশিল করতে পারত। তবে নিয়ম মেনে নির্ধারিত হারে ডাউনপেমেন্ট দিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে ঋণ পুনঃতপশিল কম হয়েছে। বেশিরভাগ ঋণ পুনঃতপশিল হয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংকের বিশেষ অনুমোদনে। এমন প্রেক্ষাপটে ঋণ পুনঃতপশিল নীতিমালায় ব্যাপক শিথিলতা এনে এখন পুরো সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা ব্যাংকের ওপর ছেড়ে দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। গত ১৮ জুলাই জারি করা নীতিমালার আওতায় বড় অঙ্কের একটি মেয়াদি ঋণ চার দফায় পুনঃতপশিল করার সুযোগ দেওয়া হয়েছে। সব পর্যায়ে ডাউনপেমেন্টের হারও কয়েক গুণ কমানো হয়েছে। আবার পুনঃতপশিলের পর নতুন ঋণ নেওয়ার জন্য যে ‘কম্প্রোমাইজ অ্যামাউন্ট’ দিতে হয় সেটার পরিমাণও কমানো হয়েছে অনেক।

সূত্র: সমকাল
আইএ/ ২০ সেপ্টেম্বর ২০২২

Back to top button