ইউরোপ

স্কুল নাটকের দস্যু রাজা ব্রিটিশ সিংহাসনে

লন্ডন, ১২ সেপ্টেম্বর – সেই দিনগুলোতে চিত্রকলা ও পরিবেশের প্রতি অনুরাগ তৈরি হয়েছিল ছোট্ট চার্লসের, কিন্তু সেই সঙ্গে বুলিংয়ের শিকার হয়ে তার মনে জমেছিল কষ্ট, এক চিঠিতে তার বাড়ি ফেরার তাড়নার কথাও প্রকাশ পেয়েছিল।

রয়টার্স জানিয়েছে, চার্লসের সেই চিঠির কথা তাকে নিয়ে লেখা ‘দ্য প্রিন্স অব ওয়েলস: আ বায়োগ্রাফি’-তে তুলে ধরেছেন জীবনীকার জনাথন ডিম্বলবি।

১৯৬২ সালের মে মাসে ১৩ বছর বয়সী চার্লস স্কটল্যান্ডের উত্তর উপকূলের বেসরকারি স্কুল গর্ডনস্টনে লেখাপড়া শুরু করেন। তার বাবা প্রয়াত প্রিন্স ফিলিপও সেখানে পড়েছেন। ছেলে চার্লসও সেখানে পড়বে, সেটাই তিনি চেয়েছিলেন।

গর্ডনস্টনের অধ্যক্ষ লিসা কের রয়টার্সকে বলেন, “ব্রিটিশ সিংহাসনের প্রথম কোনো উত্তরাধিকারীকে শিক্ষাদানের বিষয়টি এ স্কুলের প্রত্যেকের জন্য অত্যন্ত গর্বের বিষয়।

“আমাদের জন্য আরও আনন্দের বিষয় হল, প্রিন্স চার্লসের রাজা হওয়ার পথে যে গুণগুলো আমরা এগিয়ে নিতে দেখেছি, তার অনেকগুলোই গর্ডনস্টনে বিকশিত হয়েছিল।”

চার্লসের মা রানি এলিজাবেথসহ ব্রিটিশ সিংহাসনের আগের প্রজন্ম রাজপ্রাসাদেই গৃহশিক্ষকের কাছে দীক্ষা লাভ করেছেন।
চার্লস এমন একটি স্কুলে পড়েছেন, যেখানে নিয়ম-শৃঙ্খলা ছিল খুবই কঠোর, খুব ভোরে ঠাণ্ডা পানিতে গোসলের পর ছাত্রদের দৌড়াতে হত। ফলে সে সময় কঠিন জীবন পার করতে হয়েছে ব্রিটিশ সিংহাসনের উত্তরসূরীকে।

ঔপন্যাসিক উইলিয়াম বয়েডও একই সময়ে ওই স্কুলে পড়েছেন। তার মতে, চার্লস স্কুল জীবনের ওই সময়কে পছন্দ করতে পারেননি। আর জনাথন ডিম্বলবি লিখেছেন, তখনকার যুবরাজের কাছে সেই স্কুলের দিনগুলো ছিল কারাগারের মত।

“বয়প্রাপ্ত হওয়ার পর প্রিন্স অব ওয়েলস হয়ত ভাবতেন, যে স্কুলকে তার কারাগারের মত মনে হত, সেই গর্ডনস্টনে পাঠানোর সিদ্ধান্ত আসলে তার উপকারই করেছিল। স্কুল তার মধ্যে দায়িত্ব আর শৃঙ্খলাবোধ তৈরি করে দিয়েছিল, তা না হলে তিনি হয়ত গোল্লায় যেতেন।”

ডিম্বলবি জানান, চার্লস একবার বাড়িতে পাঠানো চিঠিতে লিখেছিলেন, “আমার ডরমিটরির ছেলেরা সব বজ্জাত। তারা রাতভর জুতো ছোড়াছুড়ি করে, না হলে বালিশ দিয়ে আমাকে মারে… আমার ইচ্ছা করে বাড়ি চলে যাই।”

চার্লসের ছেলে হ্যারিও এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, স্কুলের ওই সময়টা তার বাবার মনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছিল।

চার্লস নিজে পরে বলেছেন, তার স্কুল জীবনকে মাঝেমধ্যে যেভাবে চিত্রায়িত করা হয়, ঠিক ততোটা খারাপ ছিল না। বরং তিনি সেখান থেকে যা শিখেছিলেন, তার প্রশংসাই তিনি করেছেন।

১৯৭৫ সালে তিনি হাউজ অব লর্ডসে বলেছিলেন, “গর্ডনস্টন সম্পর্কে যে পরিমাণ আজে-বাজে কথা এবং অসতর্কভাবে পুরনো ঢোল বাজানো হয়, তা দেখে আমি সবসময় বিস্মিত হই।

“এই অর্থে বিষয়টা কঠিন ছিল যে- একজন ব্যক্তি হিসাবে আপনার কাছ থেকে স্কুল অন্যদের তুলনায় বেশি আশা করছে, হোক সেটা শারীরিক বা মানসিক। আমি ভাগ্যবান, আমি বিশ্বাস করি এটা আমার নিজের সম্পর্কে এবং নিজের সক্ষমতা ও অক্ষমতা সম্পর্কে অনেক কিছু শিখিয়েছে। এটা আমাকে চ্যালেঞ্জ আর উদ্যোগ নিতে শিখিয়েছে।”

পড়ুয়া তরুণ

গর্ডনস্টনে চার্লস খুশি ছিলেন কিনা, সেই প্রশ্নে অধ্যক্ষ কের বলেন, “আমি মনে করি প্রত্যেকের স্কুলজীবনে উত্থান-পতন আছে। আর মিডিয়ার দৃষ্টিতে পতনের গল্পই বেশি আকর্ষণীয়, এতে আশ্চর্যের কিছু নেই।

“মজার বিষয় হল, প্রিন্স চার্লস নিজেই বলেছেন, গর্ডনস্টন সম্পর্কে যে পরিমাণ বাজে কথা বলা হয়েছে, তাতে তিনি সবসময় বিস্মিত… তার জীবনের সেই সময়গুলো সত্যিই ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছিল, অনেক বক্তৃতায় সেই কথা বলেছেন।”

চার্লসকে একজন ‘পড়ুয়া তরুণ’ হিসেবে বর্ণনা করে অধ্যক্ষ বলেন, “স্কুলে সব ধরনের পরিবার ও পরিবেশের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে তিনি মিশে গিয়েছিলেন।”

১৯৬৭ সালে চার্লস গর্ডনস্টন ছেড়ে যান। পরে পড়ালেখা করেন কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে।

অধ্যক্ষ কের বলেন, স্কুলের দিনগুলোতে গান আর নাটকও উপভোগ করেছেন চার্লস, বেশ কয়েকটি অনুষ্ঠানেও তিনি অংশ নিয়েছিলেন।

সে সময় গর্ডনস্টন ছিল কেবল ছেলেদের স্কুল, কাছাকাছি আরেকটি হাই স্কুলের মেয়েরা তাদের সঙ্গে অভিনয়ে যোগ দিয়েছিল। তাদের মধ্যে একজন ব্রিটিশ সিংহাসনের উত্তরাধিকারীর সঙ্গে এক মঞ্চে অভিনয় করার রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতার কথা স্মরণ করেছেন।

সেদিনের সেই স্কুলছাত্রী অ্যালিসন স্টকলি এখন একজন অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক। তিনি বলেন, “গর্ডনস্টনের কোনো নাটকে অভিনয় করব- এটাই তো অনেক উত্তেজনার বিষয় ছিল। আরপর যখন দেখলাম, প্রিন্স চার্লসও নাটকে থাকছেন, আমাদের উত্তেজনা তো আরও বেড়ে গিয়েছিল।”

“এক সময় তাকে দেখতে দেখতে আমরা অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছিলাম। তাকে দোকানে দেখা যেত, কমিউনিটির আরও অনেক বিষয়ে তিনি যুক্ত ছিলেন।…আমরা জানতাম তিনি খুব সংগীতপ্রিয়।”

‘দ্য পাইরেটস অব পেনজান্স’সহ কয়েকটি নাটকে চার্লসের সঙ্গে অভিনয় করেছিলেন স্টকলি। ওই নাটকে চার্লস অভিনয় করেছিলেন জলদস্যু রাজার ভূমিকায়।

স্টকলি স্মরণ করেন, “তিনি ওই ভূমিকায় খুব ভালো অভিনয় করেছিলেন। অন্য ছেলেগুলোর মতই… আমরা যেভাবে নাটকে কাজ করছিলাম, তিনিও খুব সহজভাবে সেটাই করছিলেন।”

১৯৩৪ সালে জার্মান শিক্ষাবিদ কুর্ট হান গর্ডনস্টন প্রতিষ্ঠার পর থেকে এর ছাত্রদের স্থানীয় কমিউনিটির বিভিন্ন কাজেও যুক্ত করা হত। প্রিন্স চার্লস ছিলেন কোস্টগার্ডের সদস্য, তিনি মোরে উপকূলে নজর রাখতেন।

ব্রিটেনের এই নতুন রাজাই কেবল ওই স্কুলের সাবেক ছাত্র নন; প্রয়াত অভিনেতা শন কনারি, প্রয়াত সংগীত শিল্পী ডেভিড বোয়িও তাদের সন্তানদের ওই স্কুলে পাঠিয়েছেন।

সূত্র: বিডিনিউজ
আইএ/ ১২ সেপ্টেম্বর ২০২২

Back to top button