জাতীয়

দশ বছরে গবাদি পশু বেড়েছে ৬.৬২%, দুধ-মাংস বেড়েছে ১৫৭ শতাংশ

শাহাদাত বিপ্লব

ঢাকা, ০৯ সেপ্টেম্বর – গত এক দশকে দেশে পশুপালন খাতে বিনিয়োগ বেড়েছে। বাজারে বাণিজ্যিকভাবে দুধ ও মাংস সরবরাহের ব্যবসায় নেমেছেন নতুন অনেক খামারি। সরকারি পর্যায়ে গরু, ছাগল, ভেড়া ও মহিষের জাত উন্নয়নে বিনিয়োগ বাড়িয়েছে প্রাণিসম্পদ বিভাগও। এতে গত ১০ বছরে দেশে গবাদিপশুর সংখ্যা সামান্য বাড়লেও দুধ ও মাংস উৎপাদন বেড়েছে ১৫০ শতাংশেরও বেশি।

দেশে পশুপালন খাতে এ মুহূর্তে অন্যতম বড় সংকট হয়ে দাঁড়িয়েছে জমিস্বল্পতা ও চারণভূমির অভাব। গবাদিপশুর সংখ্যা বৃদ্ধি দেশের সক্ষমতাকে ছাড়িয়ে গেলে এ সংকট ভয়াবহ রূপ নেবে বলে আশঙ্কা খাতটির নীতিনির্ধারকদের। প্রাণিসম্পদ বিভাগসহ দেশের কৃষি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো গবাদিপশুর সংখ্যা সীমিত রেখে দুধ ও মাংস উৎপাদন বাড়ানোয় অগ্রাধিকার দিচ্ছে সবচেয়ে বেশি। গরু, ছাগল, ভেড়া ও মহিষের জাত উন্নয়ন নিয়ে ব্যাপক মাত্রায় গবেষণাও চলছে। দুধ-মাংসসহ ডেইরি পণ্যের উৎপাদন বৃদ্ধিতে এরই প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের (ডিএলএস) তথ্য অনুযায়ী, ২০১২-১৩ অর্থবছরে দেশে গরু, ছাগল, ভেড়া ও মহিষের সংখ্যা ছিল ৫ কোটি ৩২ লাখ ১১ হাজার। ওই সময় দুধ ও মাংস উৎপাদন ছিল প্রায় ৮৭ লাখ টন। সেখান থেকে সর্বশেষ গত অর্থবছরে (২০২১-২২) দেশে গবাদিপশুর সংখ্যা কিছুটা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫ কোটি ৬৭ লাখ ৩৪ হাজারে। অন্যদিকে দুধ ও মাংস উৎপাদন হয়েছে ২ কোটি ২৩ লাখ টনের বেশি। সে হিসেবে গত এক দশকে দেশে গবাদিপশু ৬ দশমিক ৬২ শতাংশ বাড়লেও দুধ ও মাংস উৎপাদনে প্রবৃদ্ধি ১৫০ শতাংশ ছাড়িয়েছে।

২০১২-১৩ অর্থবছরে দেশে গরুর সংখ্যা ছিল ২ কোটি ৩৩ লাখ ৪১ হাজার। পরের ১০ বছরে গরুর সংখ্যা বেড়ে হয়েছে ২ কোটি ৪৭ লাখ। একই সময় ছাগলের সংখ্যা ২ কোটি ৫২ লাখ ৭৭ হাজার থেকে বেড়ে ২ কোটি ৬৭ লাখ ৭৪ হাজারে দাঁড়িয়েছে। ভেড়ার সংখ্যা ৩১ লাখ ৪৩ হাজার থেকে বেড়ে হয়েছে ৩৭ লাখ ৫২ হাজার। মহিষের সংখ্যা বেড়ে এখন দাঁড়িয়েছে ১৫ লাখ ৮ হাজারে। ১০ বছর আগে এর সংখ্যা ছিল সাড়ে ১৪ লাখ।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জমিস্বল্পতার কারণে চাইলেও খামার বা গবাদিপশুর সংখ্যা বাড়ানো কঠিন। এ কারণে গত কয়েক বছরে দেশে গবাদিপশুর সংখ্যাবৃদ্ধি সীমিত রেখেই দুধ ও মাংস উৎপাদন বৃদ্ধিতে জোর দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। এজন্য পশুর জাত উন্নয়ন ও বাণিজ্যিক খাবার ব্যবহারের ওপর মনোযোগ দেয়া হয়েছে সবচেয়ে বেশি। এতে গবাদিপশুর সংখ্যায় প্রবৃদ্ধিকে সীমিত রাখা গেলেও দুধ ও মাংস উৎপাদন বাড়িয়ে আড়াই গুণেরও বেশিতে নেয়া সম্ভব হয়েছে।

২০১২-১৩ অর্থবছরে দেশে দুধ উৎপাদন হয়েছিল ৫০ লাখ ৭০ হাজার টন। গত অর্থবছরে এর পরিমাণ দাঁড়ায় ১ কোটি ৩০ লাখ ৭৪ হাজার টন। এ ১০ বছরে দুধ উৎপাদন বেড়েছে ৮০ লাখ ৪ হাজার টন বা প্রায় ১৫৮ শতাংশ। এছাড়া মাংস উৎপাদন ২০১২-১৩ অর্থবছরের ৩৬ লাখ ২০ হাজার টন থেকে বেড়ে গত অর্থবছরে দাঁড়িয়েছে ৯২ লাখ ৬৫ হাজার টন। সে হিসেবে এ সময় দেশে মাংস উৎপাদন বেড়েছে ৫৬ লাখ ৪৫ হাজার টন বা ১৫৬ শতাংশ। তবে মাংস উৎপাদনে পশুপালন খাতের অবদান ৫০-৫৫ শতাংশের মতো। বাকিটা আসে পোলট্রি থেকে।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের পশু প্রজনন ও জেনেটিকস বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. মুনির হোসেন বলেন, দুধ ও মাংস উৎপাদন বাড়াতে কয়েক বছর ধরেই পশুর নতুন নতুন জাত তৈরি করা হচ্ছে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই মানুষ এখন হাইব্রিড জাতের গবাদিপশু পালন করছে। এতে এখন আগের তুলনায় দুই-তিন গুণ দুধ পাওয়া যাচ্ছে। আমাদের দেশে গবাদিপশু পালনের উপযুক্ত জমির পরিমাণ বাড়ছে না। ঘাসের জমি সীমিত হয়ে পড়ছে। তার পরও হাইব্রিড জাত থেকে উৎপাদন বাড়ানো গিয়েছে। যথাযথ খাদ্য ও পরিচর্যা থাকলে দুধ ও মাংস উৎপাদন আরো বাড়ানো সম্ভব। এ কারণে আমরা চাচ্ছি যেন সংখ্যা ঠিক রেখে মাংস ও দুধ উৎপাদন বাড়ানো যায়। কারণ সংখ্যা বাড়ালে আমাদের ধারণক্ষমতা থাকবে না। এখন জাত উন্নয়নের দিকে নজর দেয়া হচ্ছে। সরকার যদি জৈবপ্রযুক্তির ওপর নজর দেয় তাহলে উৎপাদন আরো অনেক বেড়ে যাবে। মানুষ বাণিজ্যিক খাবার খাওয়াচ্ছে। তার কারণেও উৎপাদন বেড়েছে।

একই ধরনের পর্যবেক্ষণ খামারিদেরও। এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে রাজধানীর নর্থ বেঙ্গল ডেইরি ফার্মের পরিচালক মো. মকবুল হোসেন বলেন, আগে একটি গরু থেকে পাঁচ-ছয় কেজি দুধ পাওয়া যেত। আর এখন প্রতিটি গরু থেকে কমপক্ষে ১৫ কেজি দুধ পাওয়া যায়। জাত উন্নয়নের কারণে বর্তমানে গরু কম সময়ে দ্রুতবর্ধনশীল। এর কারণে তুলনামূলক অনেক বেশি মাংস পাওয়া যায়। বাণিজ্যিকভাবে চাষাবাদ বাড়ার কারণে মাংস ও দুধের পরিমাণ বেড়ে গিয়েছে। এখন দেশী গরুরও মাংস বেশি হচ্ছে। গরু মোটাতাজা করা হচ্ছে।

দেশে একজন মানুষের দৈনিক গড়ে ২৫০ মিলিলিটার দুধ ও ১২০ গ্রাম মাংসের চাহিদা রয়েছে। সে হিসেবে দেশে বছরে দুধের চাহিদা ১ কোটি ৫৬ লাখ ৬৮ হাজার টন আর মাংসের চাহিদা ৭৫ লাখ ২০ হাজার টন। মাংস উৎপাদন চাহিদার চেয়ে বেশি হলেও দুধ উৎপাদন কম। একজন মানুষ প্রতিদিন গড়ে ২০৮ মিলিলিটার দুধ পান করতে পারে। আর মাংস খেতে পারে ১৪৭ গ্রাম।

বাণিজ্যিক খাবারের অধিক প্রয়োগের কারণে পুষ্টির ক্ষেত্রে কোনো ধরনের নেতিবাচক প্রভাবের শঙ্কা রয়েছে কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের পশু উৎপাদন ও ব্যবস্থাপনা বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, প্রাকৃতিক খাবারের স্বল্পতা থাকায় গবাদিপশু পালনে বাণিজ্যিক খাবারের বিকল্প নেই। পুষ্টি গুণাগুণও ঠিক থাকে। তবে অনেক সময় বলা হয়, পশুখাদ্যে ভারী ধাতু পাওয়া যায়। এটা আসলে মাটি থেকে আসছে। এসব স্বাস্থ্যঝুঁকি সব ক্ষেত্রেই আছে। একসময় খাদ্যের মান নিয়ে কেউ মাথা ঘামাত না। কারণ প্রয়োজন ছিল উৎপাদন বাড়ানোর। কিন্তু এখন খাদ্যের মানে নজর দেয়া হচ্ছে। সরকার এরই মধ্যে বিষাক্ত কিছু উপকরণ নিষিদ্ধ করেছে। অ্যান্টিবায়োটিক মেশানো নিষিদ্ধ করা হয়েছে। সুতরাং খাবার নিয়ে চিন্তার কোনো কারণ নেই।

সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের সম্প্রসারণ শাখার পরিচালক ডা. মো. আব্দুল আজিজ আল মামুন বলেন, আমাদের উৎপাদন বেড়েছে। নতুন নতুন জাত এসেছে। আগে একটি গরু যে সময়ে ২০০ কেজি ওজন হতো, এখন সেটা একই সময়ে ৬০০ কেজি হচ্ছে। মূলত জাতের কারণে উৎপাদন বেড়েছে। আবার খাদ্যও এখানে প্রভাব ফেলছে। দেশীয় জাতগুলো থেকে ক্রস করতে করতে এখন হাইব্রিড জাতগুলো এসেছে। বাণিজ্যিক খাদ্য ল্যাবে পরীক্ষা করে পুষ্টি গুণাগুণ নিশ্চিত করা হয়। দুধের ক্ষেত্রেও একই অবস্থা।

সূত্র: বণিক বার্তা
আইএ/ ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২২

Back to top button