অপরাধ

যেভাবে শত কোটি টাকার মালিক বিপ্লব

ঢাকা, ৭ সেপ্টেম্বর – ৩৪ বছর বয়সী বিপ্লব লস্কর। বাড়ি গোপালগঞ্জের মুকসেদপুরে। লেখাপড়া অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত। পেশা ছিল কুলি। মুকসেদপুর এবং গোপালগঞ্জের বিভিন্ন বাজারের ঘাটে বাবা ও ভাইদের সঙ্গে কুলি হিসেবে কাজ করতো। এসব করে যা আয় হতো তা দিয়ে পোষাতো না। ২০০০ সালে ঢাকায় এসে মিরপুরের ফুটপাথে গার্মেন্টস পণ্যের ব্যবসা শুরু করে। ফুটপাথে ভ্যানের উপর গার্মেন্টসের ব্যবসা করাকালীন সময়ে কয়েকজন নাইজেরিয়ান নাগরিকের সঙ্গে পরিচয়সূত্রে সখ্যতা গড়ে তোলে। ২০০৭ সালের দিকে তাদের মাধ্যমেই প্রতারণার হাতেখড়ি হয়। বিপ্লব তাদের প্রতারণায় সহযোগিতা করতো এবং বিভিন্ন ফরমায়েশি কাজ করে দিতো।
প্রথমে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট হোল্ডার হিসেবে প্রতারণার জগতে পা রাখে। পরে পুলিশের কাছে দুইবার ধরা পড়ায় নিজেকে আত্মগোপনে রেখে প্রতারণা করার কৌশল নিজে শিখে নেয়। পর্যায়ক্রমে নিজেকে দেশের পার্সেল প্রতারণা জগতের মুকুটহীন সম্রাটের আসনে নিয়ে যায়। প্রতারণা করে কামিয়েছে অন্তত শতকোটি টাকা। গড়ে তুলেছে নিজের ও পরিবারের সদস্যদের নামে-বেনামে বিলাসবহুল গাড়ি, বাড়ি, ফ্ল্যাট, প্লট। ব্যাংক হিসাবে পড়ে আছে কোটি টাকা। বছরের পর বছর ধরে মানুষকে ঠকিয়ে অর্থ উপার্জন করতে গিয়ে বিপ্লবের ওপর দেশের বিভিন্ন থানায় শতাধিক মামলা হয়েছে। সিআইডি’র করা মানিলন্ডারিং মামলার আসামিও বিপ্লব। তার বিরুদ্ধে অন্তত হাজারখানেক ভুক্তভোগী আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে অভিযোগ করেছেন।
বিভিন্ন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা কয়েক বছর ধরে তাকে খুঁজছিলেন। কিন্তু প্রযুক্তি ব্যবহার করে আত্মগোপনে থাকার কারণে তাকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না। পরে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা সংস্থার (ডিবি) তদন্তে তার সন্ধান মিলে। গোপন তথ্যের ভিত্তিতে বিশেষ অভিযান চালিয়ে তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় মিরপুর স্টেডিয়ামের ২নং গেটের সামনে থেকে প্রথমে বিপ্লব চক্রের সদস্য মো. সুমন ওরফে ইমরান (৩১), মোহসিন হোসেন ওরফে শাওন (৩০), ইমরান হাসান ওরফে ইকবাল (৩০) এবং মো. নাজমুল হক রনি (৩০)কে গ্রেপ্তার করা হয়। তাদের দেয়া তথ্যানুযায়ী পশ্চিম শেওড়াপাড়া থেকে কাস্টমস কর্মকর্তার পরিচয়ে ফোন প্রদানকারী প্রতারক চক্রের সদস্য নুসরাত জাহান (২৪)কে তার নিজ বাসা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। এ ছাড়া নাইজেরিয়ান নাগরিক চিডি (৪০), ইম্মানুয়েল (২৬), জন (৩১), আঙ্গোলিনার নাগরিক উইলসন ডা কনসিকাউ (৩৫), ক্যামেরুনের নাগরিক নিগুজেনি পাপিনিকে (৩২) গ্রেপ্তার করে গোয়েন্দা পুলিশের সাইবার অ্যান্ড স্পেশাল ক্রাইম (উত্তর) বিভাগের ওয়েব বেজড ক্রাইম ইনভেস্টিগেশন টিম। গ্রেপ্তারের পর ডিবি তাদের কয়েক দফা জিজ্ঞাসাবাদ করে। একপর্যায়ে তাদের মুখ থেকে চক্রের মূলহোতা শতাধিক মামলার আসামি বিপ্লব লস্কর (৩৪)কে রূপনগর থানাধীন বেড়িবাঁধ এলাকা থেকে একটি বিদেশি পিস্তলসহ গ্রেপ্তার করা হয়। তার বিরুদ্ধে অসংখ্য গ্রেপ্তারি ওয়ারেন্ট রয়েছে। ডিবি সাইবার অ্যান্ড স্পেশাল ক্রাইম বিভাগের উপ- পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ তারেক বিন রশিদ ও অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার ফজলুর রহমানের সার্বিক তদারকিতে ওয়েব বেইজড ক্রাইম ইনভেস্টিগেশন টিমের ইনচার্জ অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার আশরাফউল্লাহ’র নেতৃত্বে অভিযানটি পরিচালিত হয়।

ডিবি জানিয়েছে, গ্রেপ্তারের পর বিপ্লব লস্করসহ তার চক্রের হেফাজত থেকে ১টি বিদেশি পিস্তল, ২ রাউন্ড গুলি, ১টি ম্যাগাজিন, ২৮টি মোবাইল, ১টি কম্পিউটার, ৪৯১টি এটিএম কার্ড, ২৬টি চেক বহি, ১৪১৫টি চেকের পাতা, ৩টি ওয়্যারলেস পকেট রাউটার, ১টি প্রাইভেটকার, ৩ লাখ ৫০ হাজার জাল টাকা, নগদ ১১ লাখ ৩৫ হাজার টাকা, প্রতারণা সম্পর্কিত কথোপকথনের অসংখ্য স্ক্রিনশট, বিভিন্ন অপারেটরের ২৬৩টি সিম কার্ড উদ্ধার করা হয়। ডিবি জানায়, বিপ্লব দেশি-বিদেশি পার্সেল প্রতারকদের কাছে কিং বা বিগ বস নামে পরিচিত। তার অসংখ্য মেয়ের সঙ্গে অবৈধ সম্পর্ক রয়েছে। ঢাকার বিভিন্ন ক্লাবে এবং বারে তার নিয়মিত যাতায়াত ছিল। গত ৫ বছরের মধ্যে বিপ্লব কোনো বাংলাদেশি মোবাইল নম্বর ব্যবহার করেনি। এই প্রতারক ওয়্যারলেস পকেট রাউটার ব্যবহার করে ইন্টারনেট সংযোগের মাধ্যমে অন্যান্য প্রতারকের সঙ্গে বিদেশি নম্বর দিয়ে খোলা হোয়াটসঅ্যাপে যোগাযোগ করতো। তদন্ত সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, বিপ্লব লস্করের রূপগঞ্জের ইছাপুরার টেকনর্দ্দা এলাকার ৮ কাঠা জমির উপর ১০ কোটি টাকা দামের বিলাসবহুল ডুপ্লেক্স বাড়ি আছে। সে দামি গাড়িতে চলাফেরা করতো। এ ছাড়াও রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় ও ঢাকার কেরানীগঞ্জে তার শ্বশুরবাড়ির আশপাশের এলাকায় নামে বেনামে অসংখ্য ফ্ল্যাট এবং প্লট রয়েছে। তার ব্যাংক হিসাবে কোটি কোটি টাকা আছে। সবমিলিয়ে তার সম্পদের পরিমাণ ১০০ কোটি টাকার উপরে।

গতকাল ডিএমপি মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার ও গোয়েন্দা পুলিশের প্রধান মোহাম্মদ হারুন অর রশীদ বলেন, এই প্রতারক দীর্ঘদিন ধরে নিজেকে আত্মগোপনে রেখে পার্সেল প্রতারণা করছিল। সে দেশি কোনো সিম ব্যবহার করতো না। বিদেশি সিম ব্যবহার করে হোয়াটসঅ্যাপ খুলে কথা বলতো তার চক্রের সদস্যদের সঙ্গে। যেখানেই যেত সেখানে ওয়্যারলেস রাউটার ব্যবহার করার কারণে তার অবস্থান শনাক্ত করা কঠিন ছিল। ডিবি’র ওয়েব বেইজড ক্রাইম ইনভেস্টিগেশন টিমের কর্মকর্তা বলেছেন, বিপ্লবের চক্রের সদস্য সুমন হোসেন ওরফে ইমরান চক্রের ম্যানেজার হিসেবে কাজ করতো। প্রতারণার কাজে ব্যবহৃত ব্যাংক অ্যাকাউন্টের ম্যানেজমেন্ট করা, হিসাব রাখা, টাকা তুলে বিদেশি প্রতারকদের ভাগের টাকা পৌঁছে দেয়া এবং বিপ্লবের নির্দেশে প্রতারণা সংক্রান্ত যেকোনো কাজ করতো। আরেক সদস্য মোহসিন হোসেন ওরফে শাওন চক্রের হেড অব কার্ড ডিভিশন হিসেবে কাজ করতো। বিভিন্ন ব্যক্তির নামে খোলা ব্যাংকের অ্যাকাউন্টসমূহের কার্ড বিপ্লবের ম্যানেজার সুমনের নিকট পৌঁছে দেয়া, তার নিকট থেকে কার্ড নিয়ে আসা, অ্যাকাউন্ট হোল্ডারদের সঙ্গে বিদেশি নম্বর দিয়ে হোয়াটসঅ্যাপে যোগাযোগ রাখা, ব্যাংকের এটিএম বুথ থেকে প্রতারণার মাধ্যমে অর্জিত অর্থ উত্তোলন করা ও তা ম্যানেজার সুমনের নিকট পৌঁছে দিতো। এ ছাড়া জাল ডকুমেন্ট তৈরি করে বিভিন্ন ব্যাংকে অ্যাকাউন্ট খোলাও তার কাজ ছিল।

ইমরান হাসান ওরফে ইকবাল কার্ড ডিভিশনের দ্বিতীয় ব্যক্তি। সেও একই কাজ করতো। নাজমুল হক রনি চক্রের ব্যাংকিং ডিভিশনে কাজ করতো। বিভিন্ন ব্যক্তির পাসপোর্ট বা অন্যান্য ডকুমেন্ট জালিয়াতি করে নিজের ছবি বসিয়ে মোহসিনের সহযোগিতায় ভুয়া ডকুমেন্ট দিয়ে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলা এবং চেক ও কার্ডের মাধ্যমে টাকা উত্তোলন করতো। চক্রের নারী সদস্য নুসরাত জাহান কাজ করতো কলিং ডিভিশনে। কাস্টমস কর্মকর্তা পরিচয়ে ভিকটিমকে কল করা এবং প্রতারকদের সরবরাহ করা অ্যাকাউন্ট নম্বর ভিকটিমদের দিতো। ডিবি জানায়, চক্রের নাইজেরিয়ান প্রতারক চিডি, ইম্মানুয়েল, জন, আঙ্গোলিনার নাগরিক উইলসন ডা কনসিকাউ, ক্যামেরুনের নাগরিক নিগুজেনি পাপিনি ছদ্ম পরিচয়ে ভিকটিমের সঙ্গে বন্ধুত্বের সম্পর্ক গড়ে তোলা দামি উপহার-ডলার পাঠানোর নামে পার্সেল প্রেরণের রিসিট ও ছবি ভিকটিমের নিকট প্রেরণের মাধ্যমে ভিকটিমদের প্রলোভিত করতো। ডিবি সূত্র জানিয়েছে, চক্রটি নারীসহ বিভিন্ন শ্রেণি- পেশার লোকজনের মানুষের ফেসবুক আইডি, হোয়াটসঅ্যাপ নম্বর, ই-মেইল সংগ্রহ করে ফেসবুকে ইউএস আর্মি, ইউএস নেভীসহ ছদ্ম পরিচয় ধারণ করে ফেসবুকে ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠিয়ে বন্ধুত্ব করে পরে লোভ দেখিয়ে পার্সেল পাঠানোর কথা বলে প্রতারণা করে। কাস্টমস কর্মকর্তা পরিচয়ে কল দেয়ার (কলিং ডিভিশনে) জন্য অধিকাংশ বাংলাদেশি মেয়েদের ব্যবহার করা হয়। কলিং ডিভিশনে স্বল্প সংখ্যক বাংলাদেশি পুরুষ প্রতারকরাও কাজ করে।

বিদেশি প্রতারকদের সঙ্গে বাংলাদেশি মেয়ে প্রতারকদের সখ্যতা গড়ে ওঠে শারীরিক সম্পর্ক স্থাপনের মাধ্যমে। নাইজেরিয়া, ক্যামেরুন এবং অ্যাঙ্গোলাসহ আফ্রিকান দেশের নাগরিকরা বাংলাদেশে আসার পর তাদের ভিসার মেয়াদ শেষ হলেও তাদের নিজ দেশে ফেরত না গিয়ে প্রতারণাসহ বিভিন্ন ধরনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত হচ্ছে। এসব দেশের বিপথগামী নাগরিকরা শুধু বাংলাদেশ নয়, সারা বিশ্বেই পার্সেল/কাস্টমস ফ্রডের মাধ্যমে অবৈধ উপায়ে উপার্জিত অর্থ সরাসরি তাদের নিজ দেশে না নিয়ে ব্যবসার নামে বিভিন্ন দেশে পাঠায়। বাংলাদেশ থেকে বিপ্লব লস্করের সহায়তায় প্রায় শতকোটি টাকা প্রতারণা করে বিদেশিরা মানিলন্ডারিংয়ের মাধ্যমে তাদের নিজ দেশে পাঠানোর প্রমাণ পেয়েছেন তদন্ত কর্মকর্তারা। ডিবি জানায়, অধিকাংশ নাইজেরিয়ান/ক্যামেরুনিয়ান প্রতারকরা ফুটবল প্লেয়ার, স্টুডেন্ট, এবং গার্মেন্টস ব্যবসার কথা বলে বাংলাদেশে আসলেও তাদের মূল কাজ প্রতারণা করে মানিলন্ডারিং করা। তারা প্রতারণার মাধ্যমে অর্জিত অর্থ দিয়ে গার্মেন্টসের পণ্য কিনে নিজ দেশেও পাঠায়। দেশি এবং বিদেশি প্রত্যেক প্রতারক নিজের বর্তমান ঠিকানায় অন্য প্রতারককে নিয়ে যায় না। তারা একে অপরের সঙ্গে বিদেশি নম্বর দিয়ে খোলা হোয়াটসঅ্যাপ নম্বর দিয়ে যোগাযোগ করে এবং প্রয়োজনে তারা বিভিন্ন রাস্তায় দেখা করে। দেশি- বিদেশি প্রত্যেক প্রতারকেরই বাংলাদেশি একাধিক মেয়ের সঙ্গে অবৈধ সম্পর্ক থাকার তথ্য প্রমাণ পাওয়া গেছে।

সূত্র: মানবজমিন
আইএ/ ৭ সেপ্টেম্বর ২০২২

Back to top button