জাতীয়

ভারতের ‘উদ্বৃত্ত’ থেকে তেল পেতে চায় বাংলাদেশ

ঢাকা, ০৬ সেপ্টেম্বর – ভারতের উদ্বৃত্ত জ্বালানি তেল আমদানি করার প্রস্তাব দেবে বাংলাদেশ। আজ মঙ্গলবার ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে বৈঠকে এ প্রস্তাব তুলে ধরবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। গতকাল সোমবার বিকেলে নয়াদিল্লিতে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের এ তথ্য জানান পররাষ্ট্র সচিব মাসুদ বিন মোমেন।

ভারতের সঙ্গে জ্বালানিসহ জরুরি পণ্য সরবরাহ নিয়ে আলোচনা বিষয়ে তিনি বলেন, বাংলাদেশ ভারত থেকে যেসব কৌশলগত পণ্য আমদানি করে, সেগুলোর বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে ভারত যাতে বাংলাদেশকে অবহিত করে, এ বিষয়টি মূল আলোচনায় থাকবে। জ্বালানি সংগ্রহের ক্ষেত্রে অনেক দেশ সমস্যায় পড়ছে। এ বিষয়টি নিয়েও আলোচনা করা হবে। ভারতের যদি উদ্বৃত্ত জ্বালানি থাকে, তা কীভাবে ঐকমত্যের ভিত্তিতে সরবরাহ করবে, তা নিয়েও আলোচনা হবে। এটি নিশ্চিত করা গেলে ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের কারণে যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, তা কাটিয়ে উঠতে পারবে বাংলাদেশ।
রাশিয়া থেকে জ্বালানি ক্রয় নিয়ে আরেক প্রশ্নের উত্তরে মাসুদ বিন মোমেন বলেন, রাশিয়া থেকে জ্বালানি কেনা যাবে না- এটা ঠিক না। কিন্তু রাশিয়ার যে কারিগরি বিষয়গুলো রয়েছে, সেগুলো এখন যাচাই করা হচ্ছে। সেই সঙ্গে কীভাবে এর মূল্য পরিশোধ করা হবে, তা খতিয়ে দেখার বিষয় রয়েছে। ভারতের কাছে যদি উদ্বৃত্ত জ্বালানি থাকে, আর যদি সহজ শর্তে পাওয়া যায়, তাহলে এ জ্বালানি সংগ্রহের বিষয়টি অবশ্যই বাংলাদেশ বিবেচনা করবে।

বর্তমানে বিশ্ব অর্থনীতি যে সংকটের মধ্যে পড়েছে, তা মোকাবিলায় বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়ে জয়শঙ্করের সঙ্গে আলোচনা করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
ভারত সফরের প্রথম দিন প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সৌজন্য সাক্ষাতের পর পররাষ্ট্র সচিব বলেন, দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক ও আঞ্চলিক বিষয়ে বৈঠকে আলোচনা হয়েছে। বৈঠকে কানেক্টিভিটির বিষয়ে জোর দেওয়া হয়েছে। দুই দেশের মধ্যে অমীমাংসিত বিষয়গুলো বৈঠকে তুলে ধরা হয়েছে। ভারতসহ ভুটান, নেপাল ও বাংলাদেশ মিলিয়ে পুরো অঞ্চলে মানুষের কল্যাণের জন্য যেসব প্রকল্প হতে পারে, সে বিষয়গুলো আমাদের অগ্রাধিকার হওয়া উচিত বলে প্রধানমন্ত্রী বৈঠকে বলেছেন। বেশ কিছু প্রকল্পের ক্ষেত্রে দেরি হচ্ছে। যেমন- বিবিআইএন, নেপাল ও ভুটানের বাংলাদেশের বন্দর ব্যবহার।
তিনি বলেন, এ ছাড়া ইউক্রেন-রাশিয়ায় যে সংকট চলছে, তাতে সমগ্র বিশ্ব-অর্থনীতির ওপর বিরূপ প্রভাব পড়েছে। সবাই এ কারণে ক্ষতিগ্রস্ত। এ বিষয়টি বৈঠকে আলোচনা হয়েছে। কীভাবে নিজেদের মধ্যে সহযোগিতা আরও বৃদ্ধি করতে পারি, যাতে এ সংকট মোকাবিলায় একসঙ্গে কাজ করতে পারি সে বিষয়ে আলোকপাত করা হয়েছে। বিষয়গুলো মূল বৈঠকে তুলে ধরা হবে।

পররাষ্ট্র সচিব বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে রাখাইনে অস্থিরতার বিষয়টি প্রধানমন্ত্রী বৈঠকে তুলে ধরেছেন। রাখাইনের এ পরিস্থিতি বাংলাদেশে থাকা রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের ক্ষেত্রে বিরূপ প্রতিক্রিয়া ফেলবে কিনা, এ বিষয়ে সবার মনে শঙ্কা রয়েছে। ভারত জানিয়েছে, তারাও লক্ষ্য করছে রাখাইনে কিছুটা অশান্তি বিরাজ করছে। এ পরিস্থিতি কারও জন্য মঙ্গলজনক নয়।

তিনি বলেন, ভারত থেকে বিদ্যুৎ আনাসহ নেপাল ও ভুটান থেকে বিদ্যুৎ বাংলাদেশে আনা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। সেই সঙ্গে বাংলাদেশের ওপর দিয়ে ভারতের এক অংশ থেকে অন্য অংশে বিদ্যুৎ সরবরাহ নিয়েও আলোচনা হয়েছে। এ বিষয়ে দুই নেতাই একমত হয়েছেন। এ ছাড়া পানি ইস্যু নিয়ে কীভাবে অগ্রগতি নিশ্চিত করা যায়, তা নিয়েও আলোচনা হয়েছে। মূল বৈঠকে বিষয়গুলো আরও বিস্তারিত আলোচিত হবে। দুই দেশের সমঝোতা নিয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, সাতটি সমঝোতা নিয়ে চূড়ান্ত পর্যায়ে কাজ করছে দুই দেশ।
বৈঠক শেষে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এক টুইটে বলেন, দুই দেশের নেতাদের মধ্যকার উষ্ণ সম্পর্ক এবং যোগাযোগের মাত্রা দুই প্রতিবেশীর গভীর অংশীদারিত্বের প্রমাণ।
এদিকে, প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকের পর আদানি গ্রুপের চেয়ারম্যান গৌতম আদানি এক টুইটে বলেন, চলতি বছরের ১৬ ডিসেম্বর গদ্দা বিদ্যুৎ প্রকল্পের উদ্বোধন এবং এ বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইন বাংলাদেশ পর্যন্ত স্থাপনে তাঁরা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। বাংলাদেশের জন্য সুনির্দিষ্ট সঞ্চালন লাইনে ১৬০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হবে।

গতকাল সকালে বিশেষ বিমানে ভারতের উদ্দেশে ঢাকা থেকে রওনা হন প্রধানমন্ত্রী। ভারতে পৌঁছলে দেশটির রেল ও টেক্সটাইল প্রতিমন্ত্রী দর্শনা বিক্রম জারদোস তাঁকে স্বাগত জানান। এ সময় প্রধানমন্ত্রীকে লালগালিচা সংবর্ধনা দেওয়া হয়। বিকেলে শেখ হাসিনা এস জয়শঙ্করের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাতের পর নিজামউদ্দিন আউলিয়ার দরগায় যান। সেখান থেকে এসে সন্ধ্যায় ভারতের অন্যতম বড় শিল্প গ্রুপ আদানির চেয়ারম্যানের সঙ্গে বৈঠক করেন শেখ হাসিনা। তাঁর ভারত সফর উপলক্ষে বাংলাদেশ হাইকমিশনারের বাসায় নৈশভোজের আয়োজন করা হয়।

আজ মঙ্গলবার দিনের শুরুতে রাষ্ট্রপতি ভবনে যাবেন শেখ হাসিনা। সেখানে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি তাঁকে অভ্যর্থনা জানাবেন। এখানকার আনুষ্ঠানিকতা শেষে রাজঘাটে মহাত্মা গান্ধীর সমাধিসৌধে শ্রদ্ধা জানাতে যাবেন শেখ হাসিনা। এর পর হোটেলে ফেরত এসে দুই দেশের আনুষ্ঠানিক দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে যোগ দিতে হায়দরাবাদ হাউসে যাবেন তিনি। সেখানেও নরেন্দ্র মোদি তাঁকে অভ্যর্থনা জানাবেন। এর পর দুই দেশের প্রধানমন্ত্রী রুদ্ধদ্বার ও একান্ত বৈঠকের পাশাপাশি দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করবেন। দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের পর দুই দেশের মধ্যকার সমঝোতা চুক্তি সইয়ের পাশাপাশি যৌথ বিবৃতি দেওয়া হবে। শেখ হাসিনার সফর উপলক্ষে তাঁর সম্মানে মধ্যাহ্নভোজের আয়োজন করেছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী। সেখানে যোগ দেবেন শেখ হাসিনা। বিকেলে ভারতের উপরাষ্ট্রপতির সঙ্গে বৈঠক করতে তাঁর কার্যালয়ে যাবেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী। এ বৈঠকের পর ভারতের রাষ্ট্রপতির সঙ্গে বৈঠক করতে রাষ্ট্রপতি ভবনে যাবেন তিনি। এ দুটি বৈঠক দিয়েই দিনের কর্মসূচি শেষ করবেন শেখ হাসিনা।
আগামীকাল বুধবার সকালে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের উন্নয়নমন্ত্রী কিষান রেড্ডির সঙ্গে বৈঠক করবেন শেখ হাসিনা। এর পর হোটেলের একটি কক্ষে বাংলাদেশ-ভারত ব্যবসায়িক ফেরামের অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করবেন। এ ছাড়া এদিন বিকেলে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেওয়া যুদ্ধাহত ভারতীয় সৈনিকদের পরিবারের সদস্যদের ‘মুজিব স্কলারশিপ’ প্রদান অনুষ্ঠানে যোগ দেবেন তিনি। এদিন প্রধানমন্ত্রীর আর কোনো কর্মসূচি নেই।

বৃহস্পতিবার সকালে জয়পুর যাবেন প্রধানমন্ত্রী। সেখানে আজমিরে খাজা গরিবে নেওয়াজ দরগাহ শরিফে যাবেন তিনি। সেখানে সারাদিন কাটিয়ে বিকেলে জয়পুর থেকেই বাংলাদেশের উদ্দেশে রওনা দেবেন তিনি।

সূত্র: সমকাল
আইএ/ ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২২

Back to top button