নারায়নগঞ্জ

‘চার মৃত্যুর ভার আমি সইতে পারছি না’

নারায়ণগঞ্জ, ৩ সেপ্টেম্বর – ‘সকালে শাওন যখন বাইর হইয়া যাইতাছিল, জিজ্ঞেস করলাম, কই যাসরে বাবা? কোনো কথা না বইলাই বাইর হইয়া গেল। সেই যে গেল, আইলো তো লাশ হইয়া। পর পর চার মৃত্যুর ভার আমি সইতে পারছি না। ’ গতকাল শাওন প্রধানের মা ফরিদা বেগম কাঁদতে কাঁদতে এসব কথা বলেন।

নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলার বক্তাবলী ইউনিয়নের পূর্ব গোপালনগর গ্রামে তাঁদের বাড়ি। অনেকে গ্রামটিকে চরনবীনগর হিসেবেও ডেকে থাকে। গতকাল শুক্রবার বিকেলে তাঁদের বাড়িতে গিয়ে দেখা গেছে, শোকাহত স্বজনদের ভিড়। তবে সব ছাপিয়ে ভেসে আসে মায়ের বিলাপ। অন্যরাও এই নারীকে সান্ত্বনা দিতে গিয়ে যেন ভাষা হারিয়ে ফেলেন।

পরিবারের লোকজন জানায়, পাঁচ বছরের মধ্যে তিন সদস্যকে হারাতে হয়েছে। বাবা সাহেব আলী প্রধান ছিলেন ইটখোলার ঠিকাদার। পাঁচ বছর আগে স্ট্রোক করে মারা যান তিনি। সেই শোক না কাটতেই মারা যান বড় ভাই লিটন প্রধান। তারপর ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে চলে যান বোন হেনা প্রধানও। এই পরিবারের মৃত্যুর মিছিলে সর্বশেষ যুক্ত হলেন শাওন প্রধান (২১)। গত বৃহস্পতিবার পুলিশ-বিএনপির সংঘর্ষে নিহত হন তিনি। চার ভাই ও দুই বোনের মধ্যে শাওন ছিলেন সবার ছোট।

বিলাপ করতে করতে শাওনের মা বলেন, ‘আমার শরীরটা তেমন ভালো না। সকালে শাওন যখন বাইর হইয়া যাচ্ছিল, জিজ্ঞেস করলাম, কই যাসরে বাবা, কামে যাবি না? কোনো কথা না বইলাই বাইর হইয়া গেল। সেই যে গেল, আইলো তো লাশ হইয়া। ’ বলেই হাউ মাউ করে চিৎকার করেন তিনি। আরো বলেন, ‘আমি তো জানি না এই দলের মধ্যে যাইব। পুত দুইটা যায় না (বড় দুজন), ওরেও যাইতে না করি। অহন আমি শাওন বইলা কারে ডাকমু? কে আমারে আদর কইরা খাওন আইনা দিব? আহারে আমার ছোট পুত, আমার নাড়িছেঁড়া মানিকরে, কই গেলি তুই আমারে ছাইড়া। ’ শাওনের মায়ের এমন আকুতি করা ডাক আর কান্নার দৃশ্য উপস্থিত সবার চোখে পানি ঝরিয়েছে।

শাওনের দুলাভাই মো. আফজাল শরীফ বলেন, ‘এমন হত্যা যেন আর কোনো মায়ের ছেলের ক্ষেত্রে না ঘটে। আমরা এর সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে উচিত বিচার চাই। ’

শাওনের বড় ভাই ফরহাদ প্রধান বলেন, ‘আমরা ঘুণাক্ষরেও জানতাম না, ও (শাওন) রাজনীতি করে। ও প্রতিদিনই ধর্মগঞ্জের একটি ওয়ার্কশপে কাজে চলে যেত এবং সময়মতো আবার বাড়িতে ফিরত। আসলে এই হত্যা মেনে নেওয়া যায় না। ভাই হত্যার ন্যায্য বিচার চাই আমি। ’ একই কথা জানালেন শাওনের দুলাভাই আফজাল শরীফ।

যে ওয়ার্কশপে কাজ করতেন শাওন, তার মালিক মো. শহীদুল্লাহও এসেছিলেন স্বজনদের সান্ত্বনা দিতে। তিনি জানালেন, প্রতিদিনই সময়মতো কাজে যেতেন শাওন। ওয়েল্ডিংয়ের কাজে খুব দক্ষ ছিলেন। কোনো রাজনীতির সঙ্গে জড়িত থাকার কথা তিনিও জানতেন না।

সূত্র: কালের কন্ঠ
আইএ/ ৩ সেপ্টেম্বর ২০২২

Back to top button