জাতীয়

দীর্ঘদিন পর কয়লা উত্তোলনের পরিকল্পনা করছে সরকার

দিনাজপুর, ২ সেপ্টেম্বর – দেশের পাঁচটি কয়লা খনির মধ্যে উত্তোলন হচ্ছে দিনাজপুরের বড়পুকুরিয়া থেকে। খনিটিতে উত্তোলন কার্যক্রম শুরু হয় ২০০৫ সালে। অনেক আগে আবিষ্কার হলেও অন্য চারটি খনি থেকে উত্তোলন নিয়ে জোরালো কোনো উদ্যোগ দেখা যায়নি এতদিন। চলমান জ্বালানি সংকটের প্রেক্ষাপটে ব্যয় সাশ্রয়ের পথ খুঁজতে এখন খনিগুলো থেকে কয়লা উত্তোলন শুরুর পরিকল্পনা করছে সরকার। এরই ধারাবাহিকতায় দিনাজপুরের দীঘিপাড়া খনি থেকে কয়লা উত্তোলনের তোড়জোড় শুরু করেছে পেট্রোবাংলা।

এরই মধ্যে পরামর্শক প্রতিষ্ঠান দিয়ে দীঘিপাড়া খনিতে কয়লার প্রকৃত মজুদ, উত্তোলন খরচ, সম্ভাব্য পদ্ধতি নিরূপণসহ প্রাথমিক কিছু কাজ শেষ হয়েছে। সরকারের উচ্চপর্যায়ে এ-সংক্রান্ত প্রস্তাব চূড়ান্তভাবে গৃহীত হলে বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যয় সাশ্রয়ের পাশাপাশি কয়লা আমদানির ওপর নির্ভরতা কমবে বলে প্রত্যাশা করছেন জ্বালানি বিভাগ-সংশ্লিষ্টরা।

পেট্রোবাংলা সূত্রে জানা গিয়েছে, জার্মানিভিত্তিক মিবরাগ কনসাল্টিং ইন্টারন্যাশনাল, নেদারল্যান্ডসভিত্তিক ফুগরো এবং অস্ট্রেলিয়ার রাঞ্জ পিনকক মিনারকোর যৌথ কনসোর্টিয়াম দীঘিপাড়া কয়লা খনির পরামর্শক প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করেছে। কনসোর্টিয়াম দীঘিপাড়া কয়লা খনি থেকে ভূগর্ভস্থ পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলনের সুপারিশ করেছে। কনসোর্টিয়ামের এ-সংক্রান্ত প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, দীঘিপাড়া কয়লা খনিতে সম্ভাব্য মজুদের পরিমাণ ৭০ দশমিক ৬ কোটি টন। বছরে ৩০ লাখ টন হিসাবে ৩০ বছরে খনিটি থেকে নয় কোটি টন কয়লা উত্তোলন করা যাবে। এ কয়লা উত্তোলন করতে ব্যয় হবে প্রতি টনে ১৬০ ডলার।

দীঘিপাড়া থেকে কয়লা উত্তোলনের পরিকল্পনার বিষয়টি নিশ্চিত করে পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান নাজমুল আহসান বলেন, কয়লা উত্তোলন নিয়ে সরকার নতুন করে চিন্তা-ভাবনা শুরু করেছে। এ পরিকল্পনার অংশ হিসেবে আমরা দীঘিপাড়া কয়লা খনি নিয়ে কাজ শুরু করেছি। এরই মধ্যে এ খনির কয়লা উত্তোলন-সংক্রান্ত কাজের বেশ অগ্রগতি হয়েছে। আমরা আশাবাদী প্রয়োজনীয় কাজ সম্পাদন করা গেলে কয়লা খনিটি থেকে দ্রুত সময়ের মধ্যে কয়লা উত্তোলনে যেতে পারব।

তবে বড়পুকুরিয়া কোল মাইনিং কোম্পানি লিমিটেড (বিসিএমসিএল) কর্তৃপক্ষ বলছে, কয়লা উত্তোলনে কনসোর্টিয়ামটি সম্ভাব্য যে ব্যয় নিরূপণ করেছে, তা অনেক বেশি। এজন্য কনসোর্টিয়ামের জরিপ প্রতিবেদনটি এখন ব্রিটিশ কোম্পানি ডিএমটিকে দিয়ে পর্যালোচনা করানো হচ্ছে। এরই মধ্যে বিসিএমসিএল থেকে এ-সংক্রান্ত একটি কমিটিও গঠন করা হয়েছে। কনসোর্টিয়ামের দেয়া প্রস্তাবে কিছুটা সংশোধন আনা হলে খরচ কমানো যাবে বলে মনে করছে সংস্থাটি।

বিসিএমসিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) সাইফুল ইসলাম সরকার এ প্রসঙ্গে বলেন, রিভিউ প্রতিবেদনে ডিএমটি খরচ কমাতে কিছু পরামর্শ দিয়েছে। কনসোর্টিয়ামের পরামর্শগুলো যাচাই করতে একটি কমিটি করা হয়েছে। কমিটি এরই মধ্যে দুই ধাপে খরচ কমাতে প্রস্তাব সংশোধনের বিষয়ে মতামত জানিয়েছে। সেটি হলে টনপ্রতি কয়লা উত্তোলনে খরচ কমবে ৩০ ডলার। সে হিসাব ধরলে মজুদকৃত কয়লা উত্তোলনে অর্থ সাশ্রয় হতে পারে ৫০০ মিলিয়ন (৫০ কোটি) ডলারের সমপরিমাণ।

পেট্রোবাংলা ও বিসিএমসিএল সূত্রে জানা গিয়েছে, দীঘিপাড়া থেকে কয়লা উত্তোলনের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ে ২০১৭ সালের ৩১ মে জার্মানি, নেদারল্যান্ডস ও অস্ট্রেলিয়াভিত্তিক প্রতিষ্ঠান তিনটির সমন্বয়ে গঠিত কনসোর্টিয়ামের সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষর করে বিসিএসসিএল। প্রায় তিন বছর ধরে খনি এলাকায় জরিপ চালায় কনসোর্টিয়াম। কনসোর্টিয়ামটি পেট্রোবাংলায় প্রতিবেদন জমা দেয় ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারিতে। এতে ভূগর্ভস্থ বিশেষ পদ্ধতিতে (সুড়ঙ্গ পদ্ধতি) কয়লা তোলার পক্ষে সুপারিশ করা হয়।

বিসিএমসিএলের একটি সূত্র বলছে, দীঘিপাড়া কয়লা খনি থেকে কয়লা উত্তোলনের সিদ্ধান্ত-সংক্রান্ত একটি প্রতিবেদন শিগগিরই চূড়ান্ত করে জ্বালানি বিভাগে পাঠানো হবে। সেখান থেকে কয়লা উত্তোলনের বিষয়ে সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে গ্রিন সিগন্যাল পাওয়া গেলে তখন প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবে সংস্থাটি। তবে চূড়ান্তভাবে শুরুর পর খনির উন্নয়নকাজে সময় লেগে যেতে পারে আরো আট বছর। সে হিসেবে চলতি বছরেই চূড়ান্ত কাজ হাতে নিলে খনিটি থেকে কয়লা উত্তোলন শুরু করতে সময় লেগে যেতে পারে ২০৩০ সাল পর্যন্ত।

বড়পুকুরিয়ায় উত্তোলন শুরুর প্রায় ১৭ বছর পর এখন দীঘিপাড়া কয়লা খনি থেকে উত্তোলন শুরুর পরিকল্পনা করা হচ্ছে। এরপর কয়লা উত্তোলন নিয়ে বিশেষজ্ঞদের নানা পরামর্শ ও চাপ থাকলেও রাজনৈতিকসহ বিভিন্ন কারণে এ কার্যক্রম এগোয়নি। এক পর্যায়ে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত অভিঘাত প্রতিরোধ ও বৈশ্বিক উঞ্চায়নে লাগাম টানতে কয়লাভিত্তিক তাপবিদ্যুৎ প্রকল্পগুলো বন্ধের প্রতিশ্রুতিও দেয়া হয়। এরই অংশ হিসেবে দেশে ১০টি কয়লাভিত্তিক তাপবিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়ন থেকে সরে আসে সরকার। তবে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে এখন গোটা বিশ্বেই জ্বালানি সংকট দেখা দিয়েছে। উন্নত দেশগুলোও এখন নতুন করে কয়লায় ফিরতে শুরু করেছে। সে হিসেবে বাংলাদেশও এখন ব্যয় সাশ্রয়ের অংশ হিসেবে কয়লা উত্তোলনে মনোযোগ বাড়িয়েছে।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও ভূতত্ত্ববিদ অধ্যাপক বদরূল ইমাম এ বিষয়ে বলেন, স্থানীয় খনিগুলোয় যে পরিমাণ কয়লার মজুদ রয়েছে, তা বিদ্যুৎ প্রকল্পের জ্বালানি হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারে। বিশেষ করে বড়পুকুরিয়া, ফুলবাড়ী ও দীঘিপাড়ার খনি থেকে কয়লা উত্তোলনের সুযোগ রয়েছে। এসব কয়লা উত্তোলন করা গেলে বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য পুরো জ্বালানি আমদানির প্রয়োজন হবে না। স্থানীয় উৎসের ওপর নির্ভরতাও বাড়বে। এতে বিদ্যুৎ উৎপাদনও সাশ্রয়ী হবে।

বিসিএমসিএল সূত্রে জানা গিয়েছে, দেশে এখন ৭৯৬ কোটি ২০ লাখ টন কয়লা মজুদ রয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি কয়লা মজুদ রয়েছে জয়পুরহাটের জামালগঞ্জে। খনিটিতে ৫৪৫ কোটি টন কয়লা মজুদ রয়েছে। এর বাইরে দিনাজপুরের দীঘিপাড়ায় সাড়ে ৮৬ কোটি, বড়পুকুরিয়ায় ৩৯ কোটি, ফুলবাড়ীতে ৫৭ কোটি ২০ লাখ ও রংপুরের খালাসপীরে সাড়ে ৬৮ কোটি টন কয়লা মজুদ রয়েছে।

বিদ্যুৎ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে সাত হাজার মেগাওয়াট সক্ষমতার কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণাধীন রয়েছে। এর সবক’টিতেই জ্বালানি হিসেবে আমদানি করা কয়লা ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। এর মধ্যে মাতারবাড়ীতে নির্মাণাধীন ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট, রামপালে ১ হাজার ৩২০, চট্টগ্রামের বাঁশখালীতে ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াটসহ আরো অনেক ছোট ও মাঝারি ধরনের বিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়নাধীন রয়েছে।

সূত্র: বণিক বার্তা
আইএ/ ২ সেপ্টেম্বর ২০২২

Back to top button