ইসলাম

প্রাক-ব্রিটিশ আমলে মুসলমানদের শিক্ষা-সিলেবাস

উপমহাদেশে মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর শাসকবৃন্দ রাজ্য পরিচালনার পাশাপাশি শিক্ষার প্রতি সর্বাধিক গুরুত্ব আরোপ করেছেন। মুসলিম সমাজও শিক্ষাদীক্ষার প্রতি প্রচণ্ড অনুরাগী ছিল। জ্ঞান অর্জনকে তারা ধর্মীয় অনুশাসন ও নৈতিক উৎকর্ষ সাধনের উপায় হিসেবে বিবেচনা করত। জ্ঞানচর্চাকে সে সময় সামাজিক মর্যাদা লাভের সর্বোচ্চ মাপকাঠি হিসেবে গণ্য করা হতো।

সে সময় শিক্ষা পার্থিব উন্নতির পথও উন্মুক্ত করত। ফলে মুসলিম যুবকদের মধ্যে শিক্ষা ক্ষেত্রে তীব্র প্রতিযোগিতা বিদ্যমান ছিল। তখন মুসলিম সমাজ মোটামুটি সচ্ছল ছিল। খুব সহজেই তারা সন্তানদের পড়ালেখার ব্যবস্থা করতে পারত। শাসকবর্গ ও বিত্তবানরাও অপেক্ষাকৃত গরিব লোকের সন্তানদের জন্য মাদরাসা ও বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করার প্রতি উৎসাহী ছিলেন। তাই বলতে গেলে উপমহাদেশে মুসলমানরাই ছিল শিক্ষিত জাতি। এ বিষয়ে ইংরেজ ইতিহাসবিদ N. N. Law লিখেছেন : ‘মুসলমানদের ভারত বিজয় শুধু সামাজিক ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রেই নয়, শিক্ষা ও জ্ঞানের ক্ষেত্রেও যুগান্তকারী পরিবর্তনের সূচনা করে। ’ (Promotion of Learning, p 19)
কিন্তু এ কথা কিছুতেই ভুলে গেলে চলবে না যে সেই সময়ের শিক্ষা ছিল মসজিদ ও মাদরাসাকেন্দ্রিক। যারা মসজিদ বা মাদরাসায় লেখাপড়া করত, তারাই ছিল শিক্ষিত, বাকিরা ছিল অশিক্ষিত। গবেষক এম মোহর আলী লিখেছেন : ‘সে সময়ের শিক্ষা ছিল মূলত মসজিদকেন্দ্রিক। গোটা দেশে এমন কোনো মসজিদ ছিল না, যাকে কেন্দ্র করে কোনো মক্তব বা মাদরাসা গড়ে ওঠেনি। এ ছাড়া ইমামবারা, সুফিদের খানকা, আলেম ও বিত্তবানদের বাড়িতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ছিল। ’ (History of The Muslim of Bengal. Vol.1B, Riyad, 1985, p 827)

মুসলিম আমলের শিক্ষার উচ্চ মানের প্রশংসা করে ইংরেজ পণ্ডিত জেনারেল স্লিম্যান মন্তব্য করেন : ‘ভারতীয় মুসলমানদের মধ্যে শিক্ষার যে অগ্রগতি হয়েছে, পৃথিবীর খুব কম জাতির মধ্যে সে ধরনের অগ্রগতি হয়েছে। যে ব্যক্তি মাসে ২০ টাকা বেতনের চাকরি করেন, তিনিও তাঁর সন্তানকে প্রধানমন্ত্রীর সন্তানের সমতুল্য শিক্ষা দেওয়ার ব্যবস্থা করেন। তাঁরা আরবি ও ফারসি ভাষায় জ্ঞান লাভ করেন, যা আমাদের কলেজ যুবকেরা গ্রিক ও ল্যাটিন ভাষার মাধ্যমে ব্যাকরণ, অলংকারশাস্ত্র, তর্কশাস্ত্র শিক্ষা পেয়ে থাকে। সাত বছর অধ্যয়ন করে একজন মুসলিম যুবক মাথায় পাগড়ি পরিধান করে। অক্সফোর্ড থেকে পাশ করা নব্য যুবকদের মতোই তারা জ্ঞানে সব শাখায় পূর্ণতা লাভ করে থাকে। সে সক্রেটিস, এরিস্টটল, প্লেটো, হিপোক্রেটিস, গ্যালন ও ইবনে সিনা সম্পর্কে অনর্গল আলোচনা করতে পারে। ’ (W. H. Sleeman, Rambles and Recollections of an indian Official. Vol.11, London, 1893, p 523-524)

আমরা এ কথার ওপর বারবার জোর দিচ্ছি যে সে সময়ের শিক্ষা কাঠামো ছিল সম্পূর্ণ ধর্মভিত্তিক এবং একশ্রেণির মক্তব ছিল সম্পূর্ণ কোরআনকেন্দ্রিক। এ কথাটা আমরা আবেগের বশে বলছি না। এ বিষয়ে পর্যাপ্ত ঐতিহাসিক দলিল-দস্তাবেজ আছে। সংশয়বাদীরা চাইলে এখানেও চোখ বুলিয়ে আসতে পারেন—(Report of the moslem education Advisory Committee, Alipore, 1934, p 31)

এটাও ঐতিহাসিকভাবে প্রমাণিত যে মুসলিম শাসন আমলে মুসলমানদের পাঠ্যসূচিতে বাগদাদের দরসে নিজামি সবচেয়ে বেশি প্রভাব বিস্তার করেছিল। সেলজুকি সুলতান আলপ আরসালান ও মালিক শাহের স্বনামধন্য মন্ত্রী ছিলেন নিজামুল মুলক তুসি। তিনি ১০৬৫ সালে দুই লাখ দিনার ব্যয় করে বাগদাদে নিজামিয়া নামে একটি পাঠশালা স্থাপন করেন। এ প্রতিষ্ঠানটি পরবর্তী কয়েক শ বছর মুসলিম বিশ্বে ইসলামী জ্ঞান-বিজ্ঞান বিস্তারে সুদূরপ্রসারী ভূমিকা পালন করে। এতে যে শিক্ষাপদ্ধতি প্রবর্তিত হয় এবং যে পাঠ্যসূচি অনুসৃত হয়, সেটাই দরসে নিজামি নামে পরিচিত। এই পাঠ্যসূচির প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো, এতে ধর্মীয় ও লৌকিক উভয় বিষয়ের জ্ঞান-বিজ্ঞান অন্তর্ভুক্ত ছিল। সেখানে ধর্মতত্ত্ব, যুক্তিবিদ্যা, মনোদর্শন, ইতিহাস, গণিত, জ্যোতির্বিদ্যা, ব্যাকরণ, হাদিস, ইসলামী আইন, তাফসির ইত্যাদি ছিল উল্লেখযোগ্য। আশ্চর্য হলো, মুসলমানদের জন্য রচিত সে পাঠ্যসূচি অনুযায়ী হিন্দুরাও পড়াশোনা করত! মুসলমানদের আগমনের আগে উপমহাদেশে হিন্দু সমাজের শিক্ষাব্যবস্থা ব্রাহ্মণদের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। যেকোনো ধরনের জ্ঞান অর্জনের ক্ষেত্রে নিম্ন বর্ণের হিন্দুদের প্রবেশাধিকার নিষিদ্ধ ছিল। মুসলিম শাসকদের শাসন আমলে অবহেলিত হিন্দুরা সুবিধাভোগী হিন্দুদের কবল থেকে মুক্তি লাভ করে। তারা বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশের পথে অগ্রসর হয়। মুসলিম শাসকরা শিক্ষার পৃষ্ঠপোষণে যে করমুক্ত ভূমি দান করতেন, তা হিন্দুদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জন্যও দেওয়া হতো। মুর্শিদাবাদ এস্টেটের দেওয়ান ফজলে রাব্বি (১৮৪৯-১৯১৭) হিন্দুদের জন্য পাঁচ ধরনের লাখেরাজ সম্পত্তি প্রচলনের কথা উল্লেখ করেছেন। মোটকথা, সাধারণ হিন্দুদের শিক্ষা সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে উপমহাদেশে যেকোনো অমুসলিম শাসকদের চেয়ে মুসলিম শাসকদের অবদান ছিল সবচেয়ে বেশি। (সূত্র : Khondkar Fuzli Rubbee, The Origin of the Musalmans. p 69-75)

আরো আশ্চর্য সংবাদ হলো, কখনো কখনো মুসলমানদের মক্তব ও হিন্দুদের পাঠশালা একই ছাদের নিচে বসত! ভোরে ‘মুন্সি’ আর অপরাহ্নে ‘গুরু’ তাঁদের ছাত্রদের শিক্ষা দিতেন। (দীনেশ চন্দ্র সেন, বঙ্গ সাহিত্য পরিচয়, প্রথম খণ্ড, কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়, ১৯১৪, পৃ ৭২)

ব্রিটিশ আমলে বাংলার মুসলিম শিক্ষা বিষয়ে পিএইচডি করেছেন গবেষক মো. আবদুল্লাহ আল-মাসুম। তিনি লিখেছেন, ‘মুসলমানদের পরিচালিত ফারসি শিক্ষার বিদ্যালয়গুলোতে হিন্দু ছাত্ররা ব্যাপক হারে অধ্যয়ন করত। মুঘল আমলের শেষ পর্যায়ে ফারসির গুরুত্ব আগের তুলনায় বৃদ্ধি পেলে বাংলার হিন্দুরা কোনো কোনো প্রতিষ্ঠানে এ শিক্ষায় মুসলমানদেরও অতিক্রম করে যায়। কিছু ক্ষেত্রে হিন্দু শিক্ষার্থীরা আরবি ভাষাও শিক্ষা নিত। ’ (মো. আবদুল্লাহ আল-মাসুম, ব্রিটিশ আমলে বাংলার মুসলিম শিক্ষা : সমস্যা ও প্রসার, বাংলা একাডেমি, ২০০৮, পৃ ১৬)

তবে এটাও সত্য যে হিন্দুদের জোর করে ইসলামী বিধি-বিধান কিংবা কোরআন ও হাদিস পড়ানো হতো না। ধর্মীয় বিষয় অধ্যয়নের ক্ষেত্রে হিন্দু ছাত্রদের জন্য নিজস্ব জাতীয় গ্রন্থ পাঠ্যভুক্ত ছিল। (N. N. Law, Promotion of Learning in india, p 161-162)

আইএ

Back to top button