জাতীয়

নির্ধারিত সময়ের আগেই চালু হতে পারে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র

পাবনা, ২৭ আগস্ট – পাবনার রূপপুরে চলছে দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের নির্মাণকাজ। দুটি ইউনিটে বিভক্ত ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট সক্ষমতার এ বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিটের নির্মাণ অগ্রগতি ৭০ শতাংশ। ইউনিটটি থেকে ২০২৩ সালের শেষ নাগাদ বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যে কাজ এগিয়ে নিচ্ছে রুশ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান রোসাটম। প্রকল্পসংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়নের যে সূচি নির্ধারিত ছিল, তার চেয়ে কাজের অগ্রগতি আরো বেশি। ফলে নির্ধারিত সময়ের আগেই প্রথম ইউনিট উৎপাদনে যাবে বলে আশা করা হচ্ছে।

প্রকল্প কার্যালয় সূত্রে জানা গিয়েছে, এরই মধ্যে দ্বিতীয় ইউনিটের রিঅ্যাক্টর ভবনের অভ্যন্তরীণ কনটেইনমেন্ট নির্মাণকাজ শুরু হয়েছে। পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা এটি। এ ধরনের বিদ্যুৎকেন্দ্রের নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনার চূড়ান্ত ধাপ হিসেবে বিবেচনা করা হয় অভ্যন্তরীণ কনটেইনমেন্ট নির্মাণ প্রক্রিয়াকে। এর আগে ৬ জুলাই বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিটের অভ্যন্তরীণ কনটেইনমেন্ট নির্মাণকাজ শেষ হয়।

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পসংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে সম্প্রতি পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি) একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। প্রতিবেদনে আইএমইডি জানিয়েছে, চলতি বছরের ৩১ জুলাই পর্যন্ত প্রকল্পের দুটি ইউনিটের কাজের গড় অগ্রগতি ৫১ দশমিক ৫০ শতাংশ। ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন প্রথম ইউনিটের সার্বিক কাজের অগ্রগতি ৭০ শতাংশ আর দ্বিতীয় ইউনিটে ৪৫ ভাগ এগিয়েছে। এ প্রকল্পের আওতায় এখন পর্যন্ত খরচ হয়েছে ৫৫ হাজার ৭১৮ কোটি ৩০ লাখ টাকা।

নির্মাণাধীন রূপপুর প্রকল্পটি সরকারের ফাস্ট ট্রাক প্রকল্পভুক্ত। সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে প্রকল্পটি এগিয়ে নিচ্ছে সরকার। রাশিয়ার পক্ষ থেকে পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি সময়ানুযায়ী সরবরাহ করা হচ্ছে। জাতীয় গ্রিড লাইনে এ বিদ্যুৎ যুক্ত করা গেলে দেশের উত্তরাঞ্চলসহ ১৯টি জেলার মানুষ এ বিদ্যুতের সুবিধাভোগী হবে। একই সঙ্গে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সুবিধা পাবে এসব অঞ্চলের মানুষ।

রূপপুর পারমাণবিকের প্রকল্প পরিচালক ড. শৌকত আকবর বলেন, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের কাজ দ্রুতগতিতেই এগিয়ে চলছে। করোনা পরিস্থিতি এবং রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে এ প্রকল্পে এখনো কোনো প্রভাব নেই। ২০২৩ সালের মাঝামাঝি নাগাদ প্রথম ইউনিটের নির্মাণসহ যাবতীয় কাজ শেষ হবে। এরপর কমিশনিং শুরু হবে। এখন পর্যন্ত প্রথম ইউনিটের নির্মাণকাজ সম্পন্ন হয়েছে ৭০ শতাংশ। আর পুরো বিদ্যুৎ প্রকল্পের সার্বিক অগ্রগতি ৪৫ ভাগ।

সম্প্রতি অনুমিত হিসাবসংক্রান্ত সংসদীয় কমিটির পাঁচ সদস্যের একটি পর্যবেক্ষণ দল রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প পরিদর্শন করেছে। প্রকল্পের ‘অগ্রগতি ও পর্যবেক্ষণ’ দলের নেতৃত্বে ছিলেন কমিটির সভাপতি উপাধ্যক্ষ মো. আবদুস শহীদ এমপি। দুদিনব্যাপী ওই কমিটি প্রকল্পের সার্বিক বিষয় সরজমিনে পর্যবেক্ষণ ও মূল্যায়নসহ প্রকল্পসংশ্লিষ্টদের সঙ্গে একাধিক সভা করেন। প্রকল্প এলাকা পরিদর্শন শেষে সংবাদ সম্মেলনে উপাধ্যক্ষ আবদুস শহীদ জানান, অত্যন্ত স্বচ্ছতা ও দক্ষতার সঙ্গে শিডিউল অনুযায়ী প্রকল্পের কাজ চলছে। সব ধরনের ঝুঁকিমুক্ত অবস্থায় পরমাণু বিদ্যুৎ নির্মাণ প্রকল্পের কাজ চলছে। রাশিয়ার সঙ্গে ঋণ চুক্তি এবং টাকা ফেরত দেয়া নিয়ে সংসদীয় উপকমিটি জানায়, যে শর্তগুলো রয়েছে তাতে এ প্রকল্প খুবই ইতিবাচক হবে।

চলতি বছরের শুরুতে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হলে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প নিয়ে উদ্বেগের কথা জানান সংশ্লিষ্টরা। রাশিয়ার ওপর অর্থনৈতিকসহ বিভিন্ন নিষেধাজ্ঞার ফলে এ প্রকল্পে অর্থায়ন বন্ধ হয়ে যেতে পারে বলেও শঙ্কা প্রকাশ করা হয় তখন। তবে পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পে অর্থায়ন ও প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ এবং কাজে কোনো ধরনের সংকট তৈরি হবে না বলে সরকার ও রাশিয়ার পক্ষ থেকে জানানো হয়।

বিদ্যুৎ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ২৫ হাজার মেগাওয়াট ছাড়িয়েছে। সক্ষমতার তালিকায় রূপপুরের বিদ্যুৎ যুক্ত হলে উৎপাদন সক্ষমতা সাড়ে ২৭ হাজার মেগাওয়াট ছাড়িয়ে যাবে। তখন দেশের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতার সাড়ে ৯ শতাংশই যাবে রূপপুরের দখলে।

জ্বালানিসংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিপুল অংকের অর্থ ব্যয়ে এ বিদ্যুৎকেন্দ্রের নির্মাণ সম্পন্নের পর তা যথাযথভাবে কাজে লাগানো গেলে দেশের বিদ্যুৎ সংকটের অনেকটাই কেটে যাবে। বিদ্যুতের উৎপাদন ব্যয় কমিয়ে আনার পাশাপাশি নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহের নিশ্চয়তার ক্ষেত্রে বড় ভূমিকায় থাকবে বিদ্যুৎকেন্দ্রটি।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ম. তামিম বলেন, আমাদের যে বিদ্যুৎ সংকট তাতে রূপপুরকে দ্রুত উৎপাদনে আনা গেলে বিদ্যুৎ উৎপাদনে জ্বালানি চাহিদার বড় একটি অংশ পূরণ হবে। অন্যদিকে এ বিদ্যুৎ উৎপাদনের খরচ জীবাশ্ম জ্বালানিভিত্তিক প্রকল্পের চেয়ে কম হবে।

থ্রি-প্লাস প্রজন্মের রুশ প্রযুক্তিকে নির্মাণাধীন এ বিদ্যুৎকেন্দ্রের ব্যয় মোট ১ লাখ ১৩ হাজার কোটি টাকারও বেশি। এর মধ্যে ৯০ শতাংশ অর্থায়ন করছে রাশিয়া। বাকি ১০ শতাংশ অর্থ দিচ্ছে বাংলাদেশ সরকার। ২০১৭ সালের ৩০ নভেম্বর রূপপুর প্রকল্পের আনুষ্ঠানিক নির্মাণকাজ শুরু হয়। গত বছরের অক্টোবরে প্রকল্পের প্রথম ইউনিটের রিঅ্যাক্টর প্রেসার ভেসেল বা পরমাণু চুল্লি স্থাপন করা হয়। আগামী বছর এ বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিট উৎপাদনে আসবে। সমান সক্ষমতার অন্য ইউনিট ২০২৪ সালে চালুর আশা করছে সরকার।

সূত্র: বণিক বার্তা
আইএ/ ২৭ আগস্ট ২০২২

Back to top button