জাতীয়

১৪ ধরনের অপরাধে জড়িত রোহিঙ্গারা

আবদুল্লাহ মনির

টেকনাফ, ২৫ আগস্ট – কক্সবাজারের উখিয়া-টেকনাফের বাসিন্দারা দিন দিন অনিরাপদ হয়ে উঠছে। স্থানীয় বাসিন্দা যারা রোহিঙ্গা ক্যাম্পসংলগ্ন ছিল, তারা রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীদের ভয়ে এলাকা ছেড়েছে। বেশি রাত হলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও অভিযান করতে ভয় পায় রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীদের কারণে। টেকনাফের পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়ালে দেখা মিলে বিশ্বের সবচেয়ে বড় শরণার্থী বসতি। সব মিলে উখিয়া- টেকনাফের পাহাড়, বনজঙ্গল কেটে ৩৪টি শরণার্থী শিবিরে আশ্রয়স্থল গড়েছেন মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গারা। তবে এসব শিবির দেখে বোঝা খুবই মুশকিল- আসলে রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরের সংখ্যা কত? বিভিন্ন সময়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে ১১ লাখের বেশি রোহিঙ্গার সংখ্যা উল্লেখ করা হয়েছিল। উখিয়া ও টেকনাফের সর্বত্র শরণার্থী শিবির।

এ দুই উপজেলার স্থায়ী বাসিন্দার সংখ্যা চার লাখ ৭১ হাজার ৭৬৮। টেকনাফ শহর থেকে প্রায় ১০ কিলোমিটার উত্তরে উখিয়া-টেকনাফ সড়কের পশ্চিমে লেদা পাহাড়ে ঢালে ২৫ একর জায়গা নিয়ে গড়ে উঠেছিল এই আশ্রয় কেন্দ্র। এখানকার পুরনো বাসিন্দারা প্রায় সবাই বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করেছেন ২০১২ সালে। তবে দিন যতই গড়াচ্ছে, রোহিঙ্গা শিবিরে বাড়ছে অস্থিরতা। একই সঙ্গে বাড়ছে হত্যা, গুম, অপহরণসহ নানা অপরাধ। এভাবে চলতে থাকলে একসময়ে গোটা এশিয়ায় অস্তিরতা বাড়ার আশঙ্কা সংশ্লিষ্টদের।

এ ছাড়া বিশ্বের উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার হচ্ছে ক্যাম্পে। তৈরি হচ্ছে পাসপোর্ট ও নকল এনআইডি কার্ডও। ওই চক্রের সদস্যদের নিয়মিত অভিযানে আটক করেও ঠেকানো যাচ্ছে না। হত্যাকা-, আধিপত্য বিস্তার, ইয়াবার কারবার, অপহরণ, ধর্ষণ, স্বর্ণের চোরাচালান, অবৈধ সিগারেট পাচারসহ বিভিন্ন অপরাধমূলক কার্যকলাপে অপরাধের রাজ্যে তৈরি করেছেন রোহিঙ্গারা।

কক্সবাজার জেলার উখিয়া, টেকনাফ ও নোয়াখালীর হাতিয়ার ভাসানচরসহ সরকার ঘোষিত প্রায় ১৩ লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে অবস্থান করছে। তবে বেসরকারি কয়েকটি সংস্থার ভাষ্য- দেশে রোহিঙ্গা সংখ্যা প্রায় ১৮-১৯ লাখ হবে। এ ছাড়া প্রতিবছর ৩০ লাখের ওপরে রোহিঙ্গা শিশু জন্ম নিচ্ছে, তাদের সংখ্যা এখনো যোগ হয়নি এবং তাদের পরিচয় কী হবে তাও সরকার থেকে বলা হচ্ছে না।

আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থার সহায়তায় খাবারসহ মানবিক সেবা দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু এসব রোহিঙ্গা আগমনের প্রায় পাঁচ বছর হলেও এখনো একজনকেও ফেরত নেয়নি মিয়ানমার। রোহিঙ্গাদের ওই দেশে ফেরত পাঠাতে ব্যর্থতা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। বাংলাদেশের ভূখ- বাঁচাতে যে কোনো মূল্যে রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে পাঠানো দেশের জন্য এখন অনেক বেশি জরুরি হয়ে পড়েছে।

স্থানীয়রা বলছেন, বর্তমানে রোহিঙ্গা ক্যাম্প অপরাধের স্বর্গরাজ্য। এখানে অস্ত্র ও মাদকের কারবার, মানবপাচার, একটু কথা কাটাকাটি হলেই খুন, অপহরণ, ডাকাতি, আধিপত্য বিস্তারের মহড়া, যৌন নির্যাতন, অবৈধ সিম বাণিজ্য, জমি দখল, হুন্ডি, জালটাকার কারবার, ধর্ষণ এখন নিত্য অপরাধ।

এদিকে সম্প্রতি কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফের ৩৪টি আশ্রয় শিবিরে দুর্গম ক্যাম্পগুলোতে সংঘবদ্ধ রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীরা ‘টার্গেট কিলিংয়ে’ নেমেছে। শিবিরে একের পর এক মাঝি (রোহিঙ্গা নেতা) খুন হচ্ছেন।

গত ১০ আগস্ট মঙ্গলবার মধ্যরাতেও দুই মাঝিকে সন্ত্রাসীরা গুলি করে হত্যা করে। এ নিয়ে গত পাঁচ বছরে সন্ত্রাসীদের হাতে খুন হয়েছেন অন্তত ১৫ মাঝি। গুমের শিকার হয়েছেন আরও অন্তত ১৫ জন। এর মধ্যে গত দুই মাসেই খুন হয়েছেন আট রোহিঙ্গা।

গোয়েন্দা তথ্যমতে, ক্যাম্পের সশস্ত্র সন্ত্রাসী গোষ্ঠী মাস্টার মুন্না গ্রুপ, রোহিঙ্গা ক্যাম্পের ত্রাস ডাকাত হাকিম গ্রুপ, জাবু গ্রুপ, ইসলাম গ্রুপ, নবী গ্রুপসহ ২০ থেকে ৩০টি ছোট-বড় সন্ত্রাসী গ্রুপ জোট বেঁধেছে। তাদের হাতে বিপুলসংখ্যক দেশি-বিদেশি অস্ত্র রয়েছে।

এম-১৬ ও একে-৪৭ সব সন্ত্রাসীর হাতে হাতে। মজুদ অস্ত্র সম্পর্কে যেসব মাঝি জানেন, তারা কেউ জীবনের ভয়ে রাতে ক্যাম্পে থাকেন না। সম্প্রতি ক্যাম্প থেকে পাঁচ শতাধিক গুলিসহ মার্কিন তৈরি এম-১৬টি উদ্ধার করা হয়।

রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীরা স্থানীয়দের অপহরণ করছে : টেকনাফের গহিন পাহাড়ে রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীরা গড়ে তুলেছে সংঘবদ্ধ অপহরণকারী চক্র। ওই চক্রটি স্থানীয় লোকজনকে অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে পাহাড়ি এলাকায় নিয়ে যায়। সেখানে নির্মম নির্যাতনের পর হত্যার হুমকি দিয়ে পরিবারের কাছে মোটা অঙ্কের মুক্তপণ দাবি করে।

ওই চক্রের হাতে অপহরণের শিকার দুই কিশোরসহ চারজনকে সম্প্রতি উদ্ধার করেছে র‌্যাব ও পুলিশের যৌথ টিম। ধরা পড়েছে অপহরণকারী চক্রের এক সদস্যও। ১ আগস্ট টেকনাফের শামলাপুর ইউনিয়নের নোয়াখালিয়াপাড়া এলাকা থেকে স্থানীয় চার বাসিন্দাকে অস্ত্রের মুখে অপহরণ করে নিয়ে যাওয়া হয় গহিন পাহাড়ে।

সেখানে তাদের হাত-পা বেঁধে নির্মম নির্যাতন চালানো হয়। পরে পরিবারের কাছে ফোন করে অপহৃতদের আর্তনাদ শুনিয়ে চাওয়া হয় মুক্তিপণ। উদ্ধার হওয়া আমিনুর রহমান জানান, অস্ত্রের মুখে তুলে নিয়ে যাওয়ার পর পাহাড়ে তাদের প্রচুর মারধর করা হয়েছে। হাত-পা বেঁধে রাখা হতো সব সময়। অপহরণকারীরা ১১ জন ছিল। মারধরের যন্ত্রণা সইতে না পেরে আর্তনাদ করলে সেগুলো ফোন করে শোনানো হতো পরিবারের সদস্যদের।

অনিরাপদ হয়ে উঠেছে টেকনাফ-উখিয়া বিদেশি পিস্তল-মাদকসহ প্রতিদিনই আটক হচ্ছে রোহিঙ্গারা। দেশের অনিরাপদ অঞ্চল হয়ে উঠেছে টেকনাফ-উখিয়া। বিদেশি অস্ত্র, বিদেশি মাদকসহ সব সময় রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীরা আটক হচ্ছে।

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন সংগ্রাম প্রতিরোধ কমিটির সভাপতি মাহমুদুল হক চৌধুরী বলেন, রোহিঙ্গারা শেষ করে ফেলছে এ দেশকে। রোহিঙ্গা বড় বড় অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। এই বিপুলসংখ্যক বৈধ-অবৈধ রোহিঙ্গার কারণে কক্সবাজারে দেখা দিয়েছে আইনশৃঙ্খলার অবনতিসহ নানা সামাজিক অস্থিরতা। এতে উদ্বিগ্ন এখানকার সাধারণ মানুষ। অবিলম্বে তাই রোহিঙ্গা শরণার্থী প্রত্যাবাসন কার্যক্রম শুরু করার তাগিদ স্থানীয়দের। এদিকে স্থানীয় বাজারে নিত্যপণ্য সংকট ও শ্রমবাজার অনেকটা রোহিঙ্গাদের দখলে চলে গেছে। বাজারমূল্য কোনোভাবেই স্থিতাবস্থায় নেই।

রোহিঙ্গা কর্মকা- ও প্রত্যাবাসন বিষয়ে জানতে চাইলে রোহিঙ্গা নেতা ড. মুহম্মদ জুবায়ের বলেন, প্রকৃত রোহিঙ্গারা কেউ অপরাধ কর্মকা-ে জড়িত নেই। এবং আছে যারা মিয়ানমারের মামলা দারি সন্ত্রাসী রোহিঙ্গা আছে এরাই জড়িত অপরাধ কর্মকা-ে। আজ পাঁচ বছর পূর্ণ হচ্ছে আমাদের। এসব থেকে মুক্তি পাওয়ার একটা উপায় দ্রুতগতিতে আমাদের ফেরত পাঠানোর প্রস্তুতি নিশ্চিত করা। নাইলে বাংলাদেশের মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হবে, সঙ্গে আমরাও। প্রত্যাবাসনে কেউ বাধা দিচ্ছে না। কয়েকটি দেশ ছাড়া। আমরা নাগরিক অধিকার নিয়ে ফিরে যেতে চায়।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে অতিরিক্ত রোহিঙ্গা শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার সামছুদ্দৌজা নয়ন জানিয়েছেন, বিভিন্ন গোষ্ঠীর মধ্যে দ্বন্দ্ব ও নিরাপত্তার অভাবে সব সময়ই রোহিঙ্গা

ক্যাম্পের বাসিন্দারা আতঙ্কে দিনযাপন করছেন। বেশিরভাগ রোহিঙ্গার অভিমত হচ্ছে- আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মির (আরসা) সশস্ত্র দলগুলোর তৈরি করা ত্রাসের রাজত্বের কারণে সম্প্রতি ক্যাম্পগুলোতে নিরাপত্তার পরিবেশ অত্যন্ত নাজুক।

কক্সবাজার জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, কক্সবাজারের আশ্রিত রোহিঙ্গাদের একটি অংশকে টার্গেট করে সক্রিয় হয়ে উঠেছে মানবপাচারকারী চক্র। রোহিঙ্গারা ১৪ ধরনের অপরাধে জড়িত। এসব অপরাধের দায়ে ২০১৭ থেকে ২০২২ সালের জুলাই পর্যন্ত থানায় এক হাজার ৯০৮টি মামলা হয়েছে। আর এ সময়ের মধ্যে খুনের ঘটনা ঘটেছে ৯৯টি।

সূত্র: আমাদের সময়
আইএ/ ২৫ আগস্ট ২০২২

Back to top button