ইসলাম

অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে শরিয়াহ প্রতিপালনের লক্ষ্য

ড. ইকবাল কবীর মোহন

শরিয়াহ সামগ্রিক মানবজীবনকে নিয়েই আলোচনা করে। গোটা মানবজীবনকে সুষ্ঠু, সুন্দর ও কল্যাণময় করাই হচ্ছে শরিয়াহর মূল লক্ষ্য। মানবজীবনের একটি বড় অংশ জুড়ে আছে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ও লেনদেন। ফলে শরিয়াহর লক্ষ্য কিভাবে এ ক্ষেত্রে বাস্তবায়িত হতে পারে, তা-ও আলোচনার বিষয়।

অর্থনৈতিক লেনদেনে শরিয়াহর কয়েকটি লক্ষ্য আছে। নিচে এগুলো আলোচনা করা হলো—
সম্পদের সরবরাহ চালু রাখা : কোনো ব্যক্তিবিশেষের কল্যাণ নয়, গোটা সমাজের কল্যাণ সাধনই ইসলামে অর্থনৈতিক লেনদেন ও কর্মকাণ্ডের লক্ষ্য। তাই সম্পদ বা অর্থ গুটিকয় মানুষের হাতে পুঞ্জীভূত না হয়ে সমাজের সব মানুষের মধ্যে যাতে সঞ্চারিত হয়, ইসলাম তার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে। এ জন্য ইসলামে জাকাতের কথা বলা হয়েছে। দান ও সদকার কথা বলা হয়েছে। এগুলোর মধ্য দিয়ে সম্পদ ধনীদের কাছ থেকে অভাবী ও দীনহীন মানুষের কাছে সরবরাহ হয়। একই সঙ্গে মজুদদারি ও একচেটিয়া ব্যবসাকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে, যাতে সম্পদ কোথাও জমে না থাকে। আল্লাহপাক এ সম্পর্কে বলেছেন : আল্লাহ জনপদবাসীর কাছ থেকে তাঁর রাসুলকে যা দিয়েছেন, তা আল্লাহর, রাসুলের, তাঁর আত্মীয়-স্বজনের, এতিমদের, অভাবগ্রস্তদের এবং মুসাফিরদের জন্য, যাতে ধন-সম্পদ তোমাদের মধ্যে যারা বিত্তশালী শুধু তাদের মধ্যে পুঞ্জীভূত না হয়। (সুরা : হাশর, আয়াত : ৭)

নবী করিম (সা.) এক হাদিসে বলেছেন : আল্লাহ যাকে ধন-সম্পদ দিয়েছেন, সে যদি তার জাকাত আদায় না করে তা হলে কিয়ামতের দিন তা একটি বিষধর অজগরের রূপ ধারণ করবে, যার দুই চোখের ওপর দুটি কালো চিহ্ন থাকবে। কিয়ামতের দিন তা তার গলায় জড়িয়ে দেওয়া হবে। সাপটি তার মুখের দুই পাশে কামড়াতে থাকবে এবং বলবে আমিই তোমার সম্পদ, আমিই তোমার পুঞ্জীভূত ধন। (সহিহ বুখারি)

অতএব, ইসলামী অর্থব্যবস্থা ও ব্যাংকের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব হচ্ছে সম্পদকে ব্যাপক জনগোষ্ঠীর মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়ার কর্মকৌশল অবলম্বন করা।

সম্পদের বিনিয়োগ অব্যাহত রাখা : যেহেতু সমাজ উন্নত হচ্ছে, এর অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাড়ছে এবং বৃদ্ধি পাচ্ছে লেনদেন, এর ফলে স্বাভাবিকভাইে সমাজের মানুষের উন্নতি অগ্রগতি ও কল্যাণের স্বার্থে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডও বাড়বে। সমাজের উন্নতির জন্য পুঁজি বা সম্পদকে বিনিয়োগ করতে হবে, যাতে তা অনেক মানুষের হাতে আবর্তিত হয়। কেননা আল্লাহ মানুষের মেধা ও সামর্থ্য কাজে লাগিয়ে সম্পদ বা পণ্য উৎপাদন এবং তা ভোগ করার জন্য তাকে অধিকার দিয়েছেন। আল্লাহ বলেন : ‘আমিই বণ্টন করে রেখেছি তাদের জীবিকা পার্থিব জীবনে তাদের মধ্যে এবং তাদের একজনকে অন্যজনের ওপর শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছি, যাতে একে অন্যকে দিয়ে কাজ করিয়ে নিতে পারে। ’ (সুরা : জুখরুফ, আয়াত : ৩২)

অতএব, ইসলামী ব্যাংক ব্যবস্থায় বিনিয়োগ ব্যবস্থাপনা এমনভাবে পরিচালিত করতে হবে, যাতে বিনিয়োগের ক্ষেত্র প্রসারিত হয় এবং এর মাধ্যমে ব্যাপক জনগোষ্ঠী অর্থনীতির সুফল ভোগ করতে পারে।

সামগ্রিক সামাজিক কল্যাণ সাধন : ব্যক্তিগত সন্তুষ্টি ও সামাজিক স্বচ্ছতা ও নিরাপত্তার মাধ্যমে সমাজের সামগ্রিক কল্যাণ নিশ্চিত করা শরিয়াহর অন্যতম লক্ষ্য। সমাজের সবার উন্নতি ও কল্যাণ ছাড়া প্রকৃত শান্তি ও নিরাপত্তা সম্ভব নয়। তাই ইসলাম সবার উন্নত থাকা ও সচ্ছল থাকাকে গুরুত্ব দিয়ে মুসলমানদের জাকাত আদায়, একে অন্যকে সহযোগিতা করা ও দানকে উৎসাহিত করেছে। এই লক্ষ্য অর্জনের জন্য প্রয়োজন সম্পদকে গুটিকয়েক মানুষের হাত থেকে বেশির ভাগ মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়া এবং সম্পদ বিনিয়োগের মাধ্যমে এর উপযোগিতা বৃদ্ধি করা। ইসলামী আর্থিক লেনদেন ও ব্যাংকিং ব্যবস্থায় সম্পদ নানা মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়া সহজ।

আর্থিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা : ইসলামী আর্থিক কর্মকাণ্ডকে সব ধরনের অপচয়, অস্বচ্ছতা থেকে মুক্ত রাখা এবং আর্থিক বিষয়ে সব ধরনের বিবাদ, বিরোধ ও বিতর্ক থেকে ঊর্ধ্বে রাখাই আর্থিক স্বচ্ছতা। যেমন—ব্যাংকিং লেনদেনের বেলায় ব্যাংক গ্রাহকের সঙ্গে মুদারাবা ও মুশারাকার ভিত্তিতে যে চুক্তিতে আবদ্ধ হয়, সেখানে মুনাফা বণ্টন ও লোকসানে অংশগ্রহণের বিষয়টিতে পরিষ্কার ধারণা থাকতে হবে, যাতে কোনো ভুল-বোঝাবুঝির সৃষ্টি না হয়। এখানে ব্যবসায়ীকে এ বিষয়ে খুবই স্বচ্ছ থাকা দরকার এ জন্য যে ব্যবসায় মুনাফা হলে উভয়ে মুনাফা পাবে। আর লোকসান হলে মুশারাকার ক্ষেত্রে পুঁজির আনুপাতিক হারে লোকসান বহন করতে হবে এবং মুদারাবার বেলায় পুঁজির মালিককে পুরো লোকসান বহন করতে হবে। ফলে কোনো রকম অস্বচ্ছতা ও ব্যত্যয় এ ধরনের ব্যবসায় ঝামেলা ও বিরোধ তৈরি করতে পারে।

আর্থিক মালিকানার সিদ্ধতা : ইসলামী আর্থিক লেনদেনের বেলায় আর্থিক বিষয়ে আইনগত মালিকানা নির্ধারণ একটি মৌলিক বিষয়। ইসলামে আইনগত বা বৈধভাবে সম্পদ অর্জন ও ভোগ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে এবং বিধিবহির্ভূতভাবে সম্পদ উপার্জন বা অর্জনকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। আল্লাহ বলেন : ‘হে মুমিনরা! তোমরা পরস্পরের মধ্যে তোমাদের ধন-সম্পদ অন্যায়ভাবে খেয়ো না, তবে পারস্পরিক সম্মতিতে ব্যবসার মাধ্যমে হলে ভিন্ন কথা। আর তোমরা নিজেরা নিজেদের হত্যা কোরো না। ’ (সুরা : আন নিসা, আয়াত : ২৯) ইসলামী ব্যাংকিংয়ে মুরাবাহা বিনিয়োগের বেলায় সম্পদের মালিকানার বিষয়টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সম্পদ বিক্রির বেলায় ব্যাংক এর মালিকানা নিজের দখলে আনার পর তা গ্রাহকের কাছে বিক্রি করতে পারে।

আইএ

Back to top button